ইসলামী শরিয়ত ও ফিকাহ তথা আইনশাস্ত্রে সংগীতের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত রয়েছে। তবে ইসলামের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক (যেমন ইমাম আল গাজ্জালি, আল্লামা ইবনে কাছির, ইমাম আবুল কাশেম আল কুশাইরি, প্রখ্যাত সুফি হজরত দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরী) এ সিদ্ধান্তে এসে উপনীত হয়েছেন, যে সংগীত ‘হাওয়া এ নফস’ তথা নফসের তাড়নাকে উসকে দেয়, কুপ্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে, সে ধরনের সংগীত সম্পূর্ণরূপে হারাম এবং তা শোনা স্পষ্ট গুনাহের কাজ। পক্ষান্তরে, সংগীতের উদ্দেশ্য যদি হয় অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে এক আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন স্থাপন করা, তবে তাতে কোনো দোষ নেই। সংগীতকে তাই আধ্যাত্মিক ভাবমত্ততা তথা ‘মাস্তি’র চূড়ায় পৌঁছে স্রষ্টার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে সুফিগণ জন্ম দিয়েছেন সংগীতের এক স্বকীয় ঘরানার, সুফি পরিভাষায় যাকে সামা বলা হয়।

সামার মজলিসে বসে একজন সুফি যখন ভাবের তুঙ্গে পৌঁছান, তখন আপনাতেই তার শরীর আন্দোলিত হতে থাকে। এ অবস্থায় একেকজনের একেক রকম ‘হরকত’ তথা শারীরিক নড়াচড়া হয়। কেউ কেউ নিজ স্থানে বসে ডানে-বামে মাথা দোলাতে থাকেন, কেউ দাঁড়িয়ে একই স্থানে সামনে-পেছনে পর্যায়ক্রমে হেলতে থাকেন, কেউবা আবার ‘বে-খুদ হাল’ তথা আত্মহারা হয়ে লাফাতে থাকেন, আবার কেউ কেউ ঘুরতে থাকেন। এ শারীরিক আন্দোলনকে সুফি পরিভাষায় বলা হয় ‘রক্বস’ (সুফি নৃত্য)। সামার সঙ্গে রক্বস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং সামার মতোই রক্বসকে নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক।

চিশতিয়া তরিকার মহান কুতুব হজরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য হজরত আমির খুর্দ ‘সিয়ারুল আউলিয়া’ কিতাবে খাজা নিজামউদ্দিনের বরাতে লেখেন, সামা চলাকালীন যদি ‘কালাম’-এর (সুফি পরিভাষায় আধ্যাত্মিক গানকে ‘কালাম’ বলা হয়) কোনো কথা কারো অন্তরকে প্রভাবিত করে এবং সেহেতু তার শরীর বিনা আয়াসে, আপনাতেই আন্দোলিত হতে থাকে, তবে সেই রক্বস বৈধ। মোট কথা, পরিশুদ্ধ সামা এবং রক্বসের সম্মিলনে পরিপূর্ণ হয় সুফিদের আধ্যাত্মিক সংগীতের আসর। উপমহাদেশে এ আধ্যাত্মিক সংগীতকে জনপ্রিয় করে তোলেন চিশতিয়া এবং মৌলভিয়া (মাওলানা জালালউদ্দিন রুমির অনুসারীরা এ নামে পরিচিত) তরিকার সুফিরা, যার ধারাবাহিকতায় উদ্ভব ঘটে ‘মাইজভান্ডারি গান’ নামক আধ্যাত্মিক সংগীতের সমৃদ্ধ এক ধারা।

সুফি সাধক হযরত সৈয়দ আহমদুল্লাহ ১৮২৬ সালে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভান্ডার নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পূর্বপুরুষরা আরব থেকে হিজরত করে ভারতবর্ষের গৌড় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। সেখান থেকে তার প্র-প্রপিতামহ হযরত সৈয়দ হামিদউদ্দিন গৌড়ী চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় এসে যে স্থানে থিতু হন, তার নামানুসারে সেটির নাম হয় ‘হামিদগাঁও’, চাটগাঁইয়া উচ্চারণে যা এখন ‘হাইদগাঁও’ নামে পরিচিত। সেখান থেকে সৈয়দ হামিদউদ্দিনের পরিবারের একটি অংশ চলে আসে ফটিকছড়ির মাইজভান্ডার গ্রামে, যেই ধারায় এই মহান তাপস জন্মগ্রহণ করেন। আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তার নামের শুরুতে ‘গাউসুল আযম’ (অর্থ মহান ত্রাতা) উপাধি এবং মাইজভান্ডার গ্রামে জন্ম হওয়ার কারণে নামের শেষে ‘মাইজভান্ডারি’ যুক্ত হয়। কালক্রমে তার মূল নামকে ছাপিয়ে এই দুটি উপাধিই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তিনি ‘গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে তিনি কিছুদিন যশোরে কাজির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তবে আধ্যাত্মিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কাজি পদে ইস্তফা দিয়ে মাইজভান্ডারে চলে আসেন, যেখানে তিনি প্রবর্তন করেন এক সুফি তরিকার, যা ‘মাইজভান্ডারি তরিকা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। কাদেরিয়া ও নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার পাশাপাশি মাইজভান্ডারি তরিকা চিশতিয়া ও মৌলভিয়া তরিকার উত্তরাধিকার বহন করে এবং সেই সূত্রে সামা-রক্বসের সম্মিলনে গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় তার মুরিদ ও খলিফাদের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় মাইজভান্ডারি আধ্যাত্মিক সংগীতের, যা সাধারণের কাছে ‘মাইজভান্ডারি গান’ আর সুফিদের কাছে ‘মাইজভান্ডারি কালাম’ হিসেবে পর্যায়ক্রমে অদ্যাবধি স্বমহিমায় প্রবহমান। স্রষ্টার নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হওয়া ছাড়াও মাইজভান্ডারি তরিকার দর্শন এবং মাইজভান্ডারি পীরদের আধ্যাত্মিক পরিচয় ও গুণাবলি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়ার ভিত্তি হিসেবে মাইজভান্ডারি গান হয়ে উঠেছে মাইজভান্ডারি তরিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাইজভান্ডারি পীরদের কারামাত তথা ব্যক্তিগত ক্যারিশমাকে আমলে নিয়েও কেবল এ মাইজভান্ডারি গানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাইজভান্ডারি তরিকার ব্যাপক জনপ্রিয়তার এক সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করা যায়। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সংগীতের যে গ্রহণযোগ্যতা, সেটির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে খুব দ্রুত মাইজভান্ডারি গান সাধারণ মানুষের মর্মের গভীরে গিয়ে পৌঁছে এবং সেই সহজিয়া সুর ও গীতের আকর্ষণে ‘মাইজভান্ডার’ হয়ে ওঠে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের এক মহামিলনস্থল, ভক্তরা শ্রদ্ধাভরে যার নাম দিয়েছে ‘মাইজভান্ডার দরবার শরিফ’। তবে এ জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিতর্কও শুরু হয় মাইজভান্ডারি গান নিয়ে, যার নেতৃত্ব দেন তত্কালীন চট্টগ্রামের দেওবন্দ ফেরত কিছু মুফতি-মাওলানা। উল্লেখ্য, উপমহাদেশে দেওবন্দ তখন ইসলামী শিক্ষার অন্যতম মারকাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে স্থান-কাল-পাত্রের সমন্বয়ে ইসলামের যে সর্বব্যাপক ও সর্বগ্রাহী সংস্কৃতি সুফিদের মাধ্যমে উপমহাদেশে বিস্তার লাভ করে, দেওবন্দি আলেমরা কঠোর অনুশাসনের নামে সুফিদের বহু কার্যক্রমকে বেদাত (অর্থ নব উদ্ভাবন) হিসেবে ফতোয়া দিয়ে একটি প্রতি-সংস্কৃতি স্থাপনের প্রয়াস চালান, যার ঢেউ চট্টগ্রামেও এসে লাগে। এ আলেমরা সামাকেও বেদাত হিসেবে ফতোয়া তা পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেন। ফলে পূর্বসূরি চিশতিয়া ও মৌলভিয়া তরিকার সাধকদের মতো গাউসুল আযম মাইজভান্ডারিকেও কতিপয় আলেম ও তাদের ভক্তকুলের সামার ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি স্বয়ং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসাফেরত জবরদস্ত আলেম ছিলেন, আর তার মুরিদ ও খলিফাদের মধ্যেও অনেকেই আলেম ছিলেন। এদের মধ্যে মাইজভান্ডারের অদূরে ফরহাদাবাদ নামক স্থানে জন্ম নেয়া মুফতি মাওলানা আমিনুল হক ফরহাদাবাদি সাহেবের নাম উল্লেখযোগ্য। সামাবিরোধীদের তারা যথাযথ উত্তর প্রদান করেন। এতে অনেকের মন পরিবর্তন হয়, আবার অনেকেই নিজেদের মতে অটল থেকে মাইজভান্ডারি গানের বিরোধিতা চালিয়ে যান। মাইজভান্ডারি গানের মাধ্যমে গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি নিজের কারামাত প্রদর্শন করেছেন এমন বহু কিংবদন্তি চাটগাঁর জনসমাজে প্রচলিত আছে। এমনই একটি কিংবদন্তি অনুসারে, একবার কয়েকজন আলেম মাইজভান্ডারি সামার ব্যাপারে জবাবদিহিতা চাওয়ার জন্য মাইজভান্ডার দরবার শরিফের উদ্দেশে রওয়ানা হন। তাদের আসার খবর গাউসুল আযম মাইজভান্ডারি অবগত হলে তিনি সামার আয়োজন করতে নির্দেশ দেন। ঢোল-তবলা-বেহালার বাদ্যসহকারে শুরু হলো মাইজভান্ডারি ভাব সংগীতের আসর। আর সেই আলেমরা দরবার শরিফের ফটক দিয়ে প্রবেশের সময় ঢোল-তবলার বাদ্য কর্ণকুহরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে বাজনার তালে তালে তাদের শরীর নাচতে থাকে এবং মুখ দিয়ে উচ্চস্বরে আওয়াজ বের হতে থাকে ‘আল্লা-হু’, ‘আল্লা-হু’। আর কি তারা জবাবদিহিতা চাইবেন, বরং মাইজভান্ডারি গানের সুরে আত্মহারা হয়ে তারা রক্বস করতে করতে হজরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির সামনে উপস্থিত হয়ে তার কাছে নিজেদের সমর্পণ করেন। বস্তুত ঢোল, তবলা, বেহালাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সমারোহে এক বিশেষ তালে পরিবেশিত মাইজভান্ডারি গান শ্রোতাদের দেহ-মনে এমন এক আধ্যাত্মিক আন্দোলনের সঞ্চার করে, যারা মাইজভান্ডারি গান না শুনেছে, তাদের তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়।

এ পর্যন্ত মাইজভান্ডারি গানের ধারাবাহিকতাকে প্রধানত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ের শুরু হয় হজরত গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির (১৮২৬-১৯০৬) জীবদ্দশায়, তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে। এ পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য গীতিকার হলেন গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির আধ্যাত্মিক প্রতিনিধি (খলিফা) হজরত মাওলানা আবদুল গনি কাঞ্চনপুরি, হজরত মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরি, হজরত মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনি। গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির কাছে অত্যধিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে মাওলানা আবদুল গনি কাঞ্চনপুরি ‘মকবুল এ গাউসুল আযম’ খেতাব লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কেবল ‘মকবুল’ নামেই সর্বজনের কাছে পরিচিত হন। নিজের রচিত গানের শেষ অন্তরায় পদকর্তা হিসেবে তিনি কেবল ‘মকবুল’ ব্যবহার করতেন। মাইজভান্ডারি গান রচনার পাশাপাশি তিনি বহু কিতাবও লিখেছেন। এর মধ্যে ফারসি ভাষায় গদ্য ও পদ্যের মিশেলে রচিত ‘আয়না এ বারী’ কিতাবটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধি অর্জন করে। গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির জীবনী ও কারামাত, সুফিবাদের স্বরূপ, বিভিন্ন তরিকার বর্ণনা ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনায় কিতাবটি সমৃদ্ধ হয়েছে এবং তরিকতপন্থীদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। মাইজভান্ডারি গানে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরি ‘বুলবুল এ গাউসুল আযম’ উপাধিতে ভূষিত হন। তবে স্বরচিত গানের শেষ অন্তরায় পদকর্তার পরিচয় হিসেবে তিনি ‘হাদী দাস’, ‘দাস হাদী’, ‘দাস হাদী হীন’ এগুলো ব্যবহার করতেন। মাইজভান্ডারের অদূরে কাঞ্চনপুর গ্রামে জন্ম নেয়া এই দুই মাওলানা, মকবুল ও বুলবুল, ছিলেন সহোদর। তাদের আরেক সহোদর হযরত মাওলানা আবদুস সালাম ভুজপুরিও গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির খলিফা ছিলেন। তিনিও বেশকিছু মাইজভান্ডারি গান রচনা করেন। হাটহাজারী উপজেলার মন্দাকিনি নদীর তীরবর্তী মন্দাকিনি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনি। তার রচিত গানগুলোতে রচয়িতা হিসেবে ‘করিম’ নামটি পাওয়া যায়। প্রথম পর্যায়ের এই সময়কালে মাইজভান্ডারি গান মাইজভান্ডার দরবার শরিফের পরিমণ্ডলে এবং মাইজভান্ডারি তরিকার একনিষ্ঠ অনুসারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

মাইজভান্ডারি গানের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির ভ্রাতুষ্পুত্র হজরত সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারি ওরফে ‘বাবা ভান্ডারি’ (১৮৬৫-১৯৩৭) এবং পৌত্র ‘অছি এ গাউসুল আযম’ হজরত সৈয়দ দেলোয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারির (১৮৯৩-১৯৮২) সময়কালে। তারা উভয়েই মাইজভান্ডার দরবার শরিফের বিখ্যাত পীর। এ পর্যায়ের প্রধান গীতিকার হলেন কবিয়াল রমেশ শীল আল মাইজভান্ডারি (১৮৭৭-১৯৬৭)। তিনি হজরত বাবা ভান্ডারির শিষ্য ছিলেন। রমেশ শীলের মাধ্যমে মাইজভান্ডারি গান দরবারি পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে আসে এবং মাইজভান্ডারিদের পাশাপাশি আমজনতার মাঝেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। রমেশ শীলের গানে রচয়িতা হিসেবে ‘রমেশ’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

মাইজভান্ডারি গানের তৃতীয় পর্যায়ের শুরু হজরত বাবা ভান্ডারির পুত্র হজরত সৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারি (১৯১৯-২০০২) এবং অছি এ গাউসুল আযমের পুত্র হজরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারির (১৯২৮-১৯৮৮) সময়কালে। এ পর্যায়ের প্রধান গীতিকার হলেন হজরত আবদুল গফুর হালী মাইজভান্ডারি (১৯২৯-২০১৬), যিনি ‘গফুর হালী’ নামেই সমধিক পরিচিত এবং এ নামেই তিনি গানের শেষ অন্তরায় নিজের স্বাক্ষর রাখতেন। দ্বিতীয় পর্যায়ে রমেশ শীলের হাত ধরে আমজনতার মাঝে মাইজভান্ডারি গান যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, গফুর হালীর মাধ্যমে তা আরো ব্যাপকতা পায়। এ পর্যায়ের একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো নারী কণ্ঠে প্রথম মাইজভান্ডারি গান গীত হওয়া। আশির দশকের প্রথম দিকে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পী কল্যাণী ঘোষের গলায় গফুর হালী তুলে দেন তার স্বরচিত মাইজভান্ডারি গান, যা সেই সময় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে সমালোচনার অধিক তা জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং সেই সঙ্গে শুরু হয় নারী কণ্ঠে মাইজভান্ডারি গান গাওয়ার চল। তবে তা ছিল দরবারি পরিমণ্ডলের বাইরে, দরবারের ভেতরে সামার মজলিসে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। মাইজভান্ডারি পীর হজরত সৈয়দ শফিউল বশর মাইজভান্ডারিও এ পর্যায়ে সমৃদ্ধ কিছু মাইজভান্ডারি গান রচনা করেন। এক্ষেত্রে মাইজভান্ডারি পীরদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যতিক্রম।

মাইজভান্ডারি দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে প্রেম। স্রষ্টার প্রতি প্রেম, সর্বপ্রাণের প্রতি প্রেম। এ প্রেমের শিক্ষা দিতেই গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির আগমন এ ধরাধামে। রমেশ তাই গানের ছন্দে তার পরিচয় দিচ্ছেন—‘তিনি প্রেমের অবতার, প্রেমের অবতার/প্রেম শিক্ষা দিতে এলেন মওলা মাইজভান্ডার।’ প্রেমের এ দর্শনের বাস্তব প্রয়োগে মাইজভান্ডার দরবার শরিফ হয়ে উঠেছে প্রেমের এক বাজার। মাইজভান্ডারির বসানো সেই প্রেমের হাটে যাওয়ার জন্য প্রেমানুরাগীদের মাওলানা হাদী আহ্বান করছেন তার গানে—‘চলো গো প্রেম সাধুগণ প্রেমেরই বাজার/প্রেম হাট বসাইয়াছেন মওলা মাইজভান্ডার।’ মাইজভান্ডারি দর্শনে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির, মুরিদের সঙ্গে মুর্শিদের সম্পর্ক প্রেমের। সেই প্রেমে রয়েছে বিরহ, মিলন, অভিমান, যার বয়ান ব্যক্ত হয়েছে মাইজভান্ডারি গানে। মুর্শিদের প্রেমে বিভোর হয়ে মাওলানা মকবুল নিজেকে নিবেদন করছেন এই গানে—‘এসো আমার কুঞ্জবনে প্রাণ ভ্রমর মাইজভান্ডারি/তোমার জন্য রাখিয়াছি হূদ কমলে মধু ভরি।’ তবে আহ্বানে সাড়া না পেয়ে বিরহে ও অভিমানে আরেকটি গানে তিনি প্রশ্ন করেন—‘বন্ধু তোমায় প্রেম করিতে কে বইলাছে/প্রেম করিয়ে ভুলে যাওয়া কে শিখাইছে!’ প্রেমে বিরহের যাতনা যেমন আছে, মিলনের আনন্দও তো আছে। সেই আনন্দঘন অভিজ্ঞতার বিবরণ রয়েছে মকবুলের গানে—‘মারহাবা মারহাবা, ছল্লে আলা মারহাবা, মনবাঞ্ছা এখন পুরিল রে/মকবুলের সঙ্গে, নানা রস রঙ্গে, হলো ভালোবাসাবাসি রে।’ মাইজভান্ডারি দর্শনের আরেক মূল ভিত্তি হলো ‘ওয়াহদাত আল ওজুদ’ কিংবা ‘হামে উ আস্ত’ অর্থাৎ সর্বঘটে স্রষ্টার উপস্থিতি। রমেশের কালামে পাওয়া যায় তার প্রমাণ—‘মওলা তুই রে তুই/আউয়ালে আখেরে মওলা তুই রে তুই’ কিংবা ‘আউয়ালে আখেরে তুমি/জাহেরে বাতেনে তুমি/কবরে হাশরে বাবা মওলানা/নুরের পুতুলা বাবা মওলানা।’ মাইজভান্ডারি গানের মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে মাইজভান্ডারি তরিকার সাধন পদ্ধতি। উদাহরণস্বরূপ ‘সাধনের কায়দা জানা চাই’ এবং ‘লতিফার খবর জানা চাই’ এ দুটি গানের কথা বলা যায়। এছাড়া মহান ত্রাতা হিসেবে গাউসুল আযম মাইজভান্ডারির কথা বলা হয়েছে মাইজভান্ডারি গানে। যেমন ‘ঠেকিয়াছি ভবের ঘাটে তরাও বাবা মওলানা/তুমি না তরাইলে মওলা, কে তরাবে বলো না!’

সামার সুনির্দিষ্ট কিছু আদব তথা শিষ্টাচার রয়েছে। অজু করে সামার মজলিসে বসা, মাথায় টুপি রাখা, কাওয়াল তথা গায়ক প্রাপ্তবয়স্ক এবং পুরুষ হওয়া, নামাজের ওয়াক্তে সামা না করা, কোলাহলমুক্ত স্থানে সামা করা, সমমনা লোকেদের নিয়ে সামা করা ইত্যাদি। দরবারের পরিমণ্ডলে যে মাইজভান্ডারি সামা হয়, তাতে এসব শিষ্টাচার যথাযথ পালন করা হলেও মাইজভান্ডারি গানের বাণিজ্যিক ধারায় তা রক্ষিত হয় না। সামার আদবের ভিত্তিতে তাই মাইজভান্ডারি সংগীতকে ‘দরবারি’ ও ‘বাজারি’—এ দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।

আলেম, তরিকতপন্থী এবং আপামর জনসমাজের মধ্যে মাইজভান্ডারি গানকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি ধারা লক্ষ করা যায়—১. যারা মাইজভান্ডার দরবার ও মাইজভান্ডারি গান—দুটোকেই শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। ২. যারা মাইজভান্ডার দরবার ও মাইজভান্ডারি গান দুটোরই বিরোধিতা করেন। ৩. যারা মাইজভান্ডার দরবারকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু মাইজভান্ডারি গানের সমালোচনা করেন। ৪. যারা মাইজভান্ডার দরবারকে শ্রদ্ধা করেন, কিন্তু নীতিগত কারণে মাইজভান্ডারি গানসহ সব ধরনের সামা মজলিস থেকে নিজেদের দূরে রাখেন, তবে এসবের কোনো সমালোচনাও করেন না। ৫. যারা মাইজভান্ডারি গানের ‘দরবারি’ ও ‘বাজারি’ দুটো ধারাকেই পছন্দ করেন। ৬. যারা মাইজভান্ডারি গানের ‘দরবারি’ ধারাটি পছন্দ করেন, তবে ‘বাজারি’ ধারাটির সমালোচনা করেন। ৭. যারা দরবার, তরিকত এসব বোঝেন না, কেবল গানের প্রতি ভালো লাগা থেকেই মাইজভান্ডারি গান শোনেন।

মাইজভান্ডারি গানের প্রতি মাইজভান্ডারিদের তীব্র আকুলতার যথার্থ উপস্থাপন ঘটেছে মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনির এ গানে—‘আমার মরণ কালে ঢোল বেলা (বেহালা) বাজাইও, দরবারি ভাই ওরে।’ এতটাই গভীর সেই টান!

 

নিজাম আশ শামস: লেখক