রক অ্যান্ড রোল জিহাদ: আ মুসলিম রকস্টার’স রেভল্যুশন—পাকিস্তানের সুফি রক ব্যান্ড জুনুনের প্রতিষ্ঠাতা সালমান আহমেদের আত্মজৈবনিক গ্রন্থের শিরোনাম। সম্ভবত এ শিরোনামেই লুকিয়ে আছে ইসলামী দুনিয়ায় রক ব্যান্ড ও রকস্টারদের ভূমিকা। নানা রকম সংগীতচর্চার ইতিহাস সামনে রেখে রক ব্যান্ডে মুসলিম তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল বড় আলোড়ন তোলা ঘটনা। সালমান যাকে রীতিমতো ‘বিপ্লব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার ব্যক্তিগত লড়াইতে বিষয়টি নিশ্চয় বিপ্লবই ছিল। রক ব্যান্ড হিসেবে জুনুনের জন্ম ও বিকাশ আধুনিককালে মুসলিমদের মধ্যে সংগীতচর্চার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তাদের পরিচয় সুফি রক ব্যান্ড হিসেবে, যার মাধ্যমে ইসলামী চিন্তা-দর্শন, সংস্কৃতির ঘরেও তারা আগন্তুক নন।

নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় বেড়ে ওঠা কিশোর-তরুণদের কেউ জুনুনের গান গুনগুন করেননি—এমনটা হয়নি নিশ্চয়। ধর্মীয় রক্ষণশীল মহল আর স্বৈরাচারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিউজিক চার্টের শীর্ষ অবস্থানে হাজির হয় জুনুন। পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো রক ও পপ মিউজিক হাজির করেন এ ব্যান্ডের শিল্পীরা। গান গাওয়ার জন্য যেমন মোল্লাতন্ত্রের হুমকি সয়েছেন, তেমনি রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও দুর্নীতির সমালোচনা করে গান গাওয়ায় নব্বইয়ের দশকে বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফের শাসনামলে সেন্সরশিপের কবলে পড়তে হয়েছে তাদের। পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার সমালোচনা করায় নওয়াজ শরিফের আমলে নিষিদ্ধ করা হয় জুনুনকে। অনেকে জুনুকে ‘এশিয়ার ইউটু’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

সালমান আহমেদের কৈশোর কেটেছে নিউইয়র্কের এক হাই স্কুলে। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে ফিরে আসেন। স্কুলে থাকতেই রক মিউজিকে তার হাতেখড়ি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার পাকিস্তানের রক্ষণশীল পরিবেশে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের বাস্তবতা নিয়ে হতাশ হয়ে যান। মেডিকেল স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে সংগীত, শান্তি আর প্রেমের সাধনায় নিজেকে সমর্পিত করেন সালমান। তার ভাবনায় ছিল প্রখর, পরিষ্কার দৃষ্টি। বলেছেন, আমি তৃতীয় বিশ্বের ভেদাভেদ দূর করতে চাই। ব্রিটিশদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও উন্নত বিশ্বের শৃঙ্খল আনতে চাই না।

১৯৯০ সালে জন্ম হয় জুনুনের। প্রথম অ্যালবাম জুনুন নামে বের হয় ১৯৯১ সালে। দ্বিতীয় অ্যালবাম তালাশ ১৯৯৩-এ। তালাশ দিয়ে রীতিমতো সাড়া ফেলে দেয় জুনুন। তৃতীয় অ্যালবাম ইনকিলাব প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে। এবার রক গিটারের সঙ্গে তবলা, রাগ আর স্থানীয় লোক সুর ব্যবহার করে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সাড়া ফেলে দেয় তারা।

জুনুন উর্দু শব্দ। বাংলায় বলা যায় পাগলামি, ইংরেজিতে প্যাশন। সালমান এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, লায়লার জন্য মজনুর পাগলামি আমি জানি। তবে আমার জুনুন যে কী তা নিজেই ভালো বুঝতে পারিনি, শুধু অন্তরে অনুভব করতে পেরেছি। সালমান একবার স্বপ্ন দেখেছিলেন তার এক শিক্ষক হাত মিলিয়ে তাকে বলছেন, তোমার তো মিউজিকের জুনুন আছে! তারপর একদিন জুনুন তৈরি হয়। দল তৈরির অনেকে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সালমানকে ছেড়ে যান আবার ব্রায়ান ও’কেনেলের মতো অনেকে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসে যুক্ত হন।

জুনুনের বৈশিষ্ট্য পশ্চিমা সংগীতের সঙ্গে পুবের কাব্যকে মিশিয়ে দেয়া। গিটারের ঝংকারের মাঝে হঠাৎ নীরবতায় শোনা যায় মাওলানা রুমি, শাহ হুসেন, বুল্লে শাহ ও আল্লামা ইকবালের কবিতা। স্থানীয় বিশ্বরাজনীতি, শান্তি নিয়ে কথা থাকে তাদের গানে। স্থানীয় রাজনীতি, অর্থনীতিতে সংকটে আটকে থাকা পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মকে অন্তত এক দশকের বেশি সময় ধরে মগ্ন করে রেখেছিল জুনুন।

সালমান আহমেদ জানিয়েছেন তার গানের সবচেয়ে বড় প্রেরণা লেড জেপেলিন ও নুসরাত ফতেহ আলী খান। কবিতার বড় প্রভাব রয়েছে সালমানের লেখা গানের কথায়। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি শিল্পীদের ওপর জুনুনের বড় প্রভাব ছিল। আতিফ আসলাম, গহের মুমতাজের মতো গায়করা তাদের ওপর জুনুনের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন।

ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে সালমান স্পষ্টই জানান তিনি সুফি দর্শনের মানুষ। তার মতে, সুফিবাদের মাধ্যমেই তিনি ইসলামের মর্ম অনুভব করেছেন, যেখানে মানবতার জন্য প্রেম আর সবার সহাবস্থানের বার্তা আছে। তার মধ্যে জ্ঞানর্জনের তৃষ্ণার অভাবে ৪০০ বছর ধরে মুসলিম দুনিয়া অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। তার কথায়, সুফিবাদই রুমি, আল আরাবি, আল্লামা ইকবালের জন্ম দিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর সালমান সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান।

রক মিউজিকে জুনুনের পর দৃষ্টি দেয়া যেতে পারে সামি ইউসুফের দিকে। টাইম ম্যাগাজিন তাকে আখ্যা দিয়েছিল মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বড় রক স্টার হিসেবে। আল জাজিরা বলেছিল, ইসলামী পপের রাজা। আজারবাইজানের বংশোদ্ভূত সামির জন্ম ইরানে, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যে গিয়ে স্থায়ী হওয়া। ২০০৭ সালে তার অ্যালবামের ২০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছিল।

 

এসএম রশিদ: লেখক