শিরোনাম দেখে কি অবাক হচ্ছেন একটু? আসলে রূপকথা নিয়ে বা রূপকথার নতুন ধরনের ব্যাখ্যা নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক দিনের। তবে আইডিয়া লিখে প্রকাশের আগে কারো সঙ্গে শেয়ার করার বিপদ হলো, আইডিয়া চুরি হয়ে যায়। তেমন হয়েছে একবার আমার। ভয়াবহভাবে হয়েছে। সে দুঃখ আর না করি! আইডিয়া তো আমার একটি গেলেই ফুরিয়ে যাচ্ছে না! আজ আমি প্রতীচ্য রূপকথা ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’-এর একটি নতুন বিশ্লেষণ করতে চাইছি।
বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্টের গল্পটা তো আমরা সবাই মোটামুটি জানি, না? ফরাসি ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল-সুজানে বার্বোত দ্যু ভিলেনোয়ুভ ১৭৪০ সালে ‘লা বেল এ লা বেত (সুন্দরী এবং পশু)’ নামের এ রূপকথা লিখেছিলেন ‘La Jeune AmÍ•ricaine et les contes marins (The young American and Marine Tales)’ নামে পত্রিকায়। মূল গল্পটি অনেক দীর্ঘ ছিল। তবে দীর্ঘ এ গল্প ১৭৫৬ সালে অনেকটা সংক্ষেপিত ও পুনর্লিখিত আকারে ‘Magasin des enfants (Children’s Collection)’-এ মুদ্রিত হয়। এ রূপকথার উপরে ‘কিউপিড অ্যান্ড সাইকি’ (রচনা: লুশিয়াস আপুলেইয়াস মোদারেনসি, স্বর্ণগোধিকা/দ্য গোল্ডেন অ্যাশ— দ্বিতীয় শতাব্দী) এবং ‘দ্য পিগ কিং (ইতালীয় রূপকথা, প্রকাশক: গিওভান্নি ফ্রান্সেসকো স্ট্রাপ্যারোলা) জাতীয় পূর্বসূরি গল্পগুলোর প্রভাব রয়েছে। ডারহাম ও লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, প্রায় চার হাজার বছর আগে ইউরোপে লোকের মুখে মুখে এ গল্পের উদ্ভব ঘটেছিল।
আমি আজ যে বিষয়টি আলোচনা করতে চাইব, তার আগে বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্টের জানা গল্পটিই সংক্ষেপে একটু বলে নিই। এক ধনবান, widowed বণিক তার তিন পুত্র ও তিন কন্যাকে নিয়ে একটি প্রাসাদে বাস করতেন। তার তিন কন্যাই সুন্দরী। তবে কনিষ্ঠতমা বিউটিই সবচেয়ে প্রিয়দর্শিনী, দয়ালু, সুশিক্ষিত ও ভালো হূদয়ের অধিকারিণী। তার অন্য দুই বোন তুলনায় অনেকটাই মন্দ, স্বার্থপর, অহঙ্কারী ও খানিকটা বখে যাওয়া। গোপনে তারা বিউটিকে উপহাস করে এবং যতটা না বোন, তার চেয়ে খানিকটা কাজের মেয়ে হিসেবেই যেন আচরণ করে তার সঙ্গে। অন্য দুই বোন যখন সকাল ১০টায় ঘুম থেকে ওঠে আর বাহারি গাউনগুলো পুরনো হয়ে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করে, বিউটি ঘরের নানা কাজ করে সকাল থেকে, পড়াশোনা করে এবং হাসি-খুশি থাকে। কালে কালে বণিক সমুদ্রে একবার এক ঝড়ে তার জাহাজগুলো হারিয়ে দরিদ্র হয়ে পড়েন। তিনি বাধ্য হন তার সন্তানদের নিয়ে একটি ছোট্ট কুটিরে এসে উঠতে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু হয় তার ও তার পরিবারের।
কয়েক বছর পর বণিক জানতে পারলেন, তার জাহাজগুলোর একটি বন্দরে ফিরে এসেছে। যদিও অন্য জাহাজগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে। শুনে তিনি বন্দরে জাহাজ দেখতে গেলেন এটা আবিষ্কার করতে যে, জাহাজগুলো কিছু হারিয়েছে কিনা সেটা জানতে? বাড়ি ছাড়ার আগে সন্তানদের জিজ্ঞাসা করলেন, তাদের জন্য তিনি কী উপহার আনবেন? ছেলেরা অস্ত্র আর অশ্বের আবদার জানাল আর বড় দুই মেয়ে সুন্দর নানা পোশাক আর গহনা চাইল। বিউটি চাইল একটি গোলাপ, যা দেশের যে এলাকায় তারা থাকে, সেখানে ফোটে না। বণিক ভদ্রলোক অবশ্য বন্দরে গিয়ে দেখলেন, তার জাহাজের কার্গো কর্তৃপক্ষ কেড়ে নিয়েছে তার দেনার টাকা আদায়ের জন্য। কাজেই কপর্দকশূন্য হয়ে পড়লেন তিনি এবং শিশুদের উপহার কিনে দেয়ার তার সামর্থ্য রইল না।
ভগ্ন মনোরথ বণিক বাড়ি ফেরার পথে অরণ্যের ভেতর একটি ঝড়ে পথ হারিয়ে ফেললেন। আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে বনের ভেতরেই এক চোখ ধাঁধানো প্রাসাদে ঢুকে পড়লেন। একটি লুক্কায়িত দেহ পেল্লায় দরজাগুলো খুলে তাকে ভেতরে ঢোকার আহ্বান করল। প্রাসাদে ঢুকেই বণিক দেখলেন টেবিলে থরে থরে সাজানো নানা খাবার ও পানীয়, যা তার জন্য এ প্রাসাদের মালিকই হয়তো সাজিয়ে রেখেছেন। বণিক খুশিমনে সব আতিথেয়তা গ্রহণ করলেন এবং সেখানেই রাত কাটালেন। পরের সকালে বণিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা করার সময় দেখলেন, প্রাসাদে রয়েছে একটি গোলাপ বাগান। ছোট মেয়ের আবদারের কথা মনে পড়ল তার। যেই না বাগানের সুন্দরতম গোলাপটি বাড়ির ছোট মেয়ের জন্য তিনি নিলেন, তার সামনে এসে দাঁড়াল লুকিয়ে থাকা বিশাল ‘পশু’টি। পশুটি তাকে বলল, রাতের আতিথেয়তা গ্রহণের পরও প্রাসাদের মালিকের (পশুটির) অনুমতি না নিয়ে তার প্রাসাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এ সুন্দরতম গোলাপ নিয়ে বণিক অন্যায় করেছে এবং এ অন্যায়ের শাস্তি হিসেবে তার মৃত্যুই প্রাপ্য। বণিক তার মুক্তির জন্য মিনতি করে জানাল, তার ছোট মেয়ের জন্যই এ গোলাপ তিনি ছিঁড়েছেন। পশু তখন গোলাপটি বিউটিকে দিতে রাজি হলো এই শর্তে যে, বদলে বণিক বা তার মেয়েদের একজনকে এই প্রাসাদে আসতে হবে।
এ কথা শুনে বণিকের মন খারাপ হলেও তার কিছু করার ছিল না। তিনি শর্ত মেনে নিলেন। খুশি হয়ে পশু তাকে অনেক টাকা-কড়ি, দামি গহনা ও সুন্দর নানা পোশাক উপহার দিল তার সন্তানদের জন্য আরো জোর দিয়ে বলে দিল যে, বণিকের ছোট মেয়ে বিউটি যেন বিষয়টি না জানে! বণিক বাড়িতে ফিরে বিউটির কাছ থেকে বিষয়টি লুকাতে চাইলেও সে বাবাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করে সব জেনে নিল। তার ভাইয়েরা বলল, দরকারে তারা প্রাসাদে গিয়ে পশুটির সঙ্গে লড়াই করবে। কিন্তু বণিক এ কথায় রাজি হলেন না এবং বললেন, অমন ভয়ানক এক দৈত্যাকৃতি পশুর সঙ্গে তারা লড়াই করে পারবে না।
কাজেই বণিকের সন্তানদের মধ্যে শেষমেশ বিউটিই রাজি হলো পশুটির প্রাসাদে যেতে। পশুটি তাকে খুব ভালোভাবে অভ্যর্থনা জানাল এবং বলল, সে-ই এখন এ প্রাসাদের কর্ত্রী আর সে তার ‘ভৃত্য’ (The Beast receives her graciously and informs her that she is now mistress of the castle, and he is her servant)।
পশুটি বিউটিকে খুবই দামি কাপড় ও খাবার দেয় এবং লম্বা সময় ধরে তার সঙ্গে গল্প করে। এর পর প্রতি রাতে বিউটিকে বলে তাকে বিয়ে করতে, কিন্তু বিউটি প্রতি রাতেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে। প্রতি রাতে পশুকে প্রত্যাখ্যানের পর বিউটি রাতে স্বপ্নে দেখে এক সুদর্শন রাজপুত্রের, যে তাকে অনুনয় করে যে, সে কেন পশুকে বিয়ে করতে চাইছে না? উত্তরে বিউটি বলে, সে পশুকে আসলে ‘বন্ধু’র মতো ভালোবাসে এবং বিয়ে করতে চায় না। বিউটি পশু ও সুদর্শন রাজপুত্রের ভেতর কোনো সংযোগ খুঁজে পায় না। সে ভাবে, পশুটি হয়তো কোনো সুদর্শন রাজপুত্রকে এ প্রাসাদের ভেতর কোথাও বন্দি করে রেখেছে।
কয়েক মাস বিউটি সেই পশুর প্রাসাদে দারুণ বিলাসের জীবন কাটাল। অদৃশ্য পরিচারকরা তার সব খেয়াল মেটায়। তাকে আনন্দ দিতে যথোপযুক্ত ঐশ্বর্যের কোনো শেষ নেই। শেষ নেই দামি রেশমি কাপড়ের। তবু দেখতে দেখতে বাড়ির জন্য মন কেমন করে বিউটির এবং একদিন সে পশুর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করে যে, তাকে বাড়িতে যেতে দেয়া হোক। পশুটি তাকে অনুমতি দেয় এই শর্তে যে, সে যেন ঠিক এক সপ্তাহ পর ফিরে আসে। বাড়ি যাওয়ার পথে পশুটি তাকে একটি আংটি ও একটি আয়না দেয়। আয়নায় সে দেখতে পারবে যে, প্রাসাদে কী হয়েছে আর আংটিটি আঙুলের পাশে তিনবার ঘোরালেই এক পলকে সে প্রাসাদে ফিরতে পারবে। বাড়িতে ফেরার পর বিউটির বড় বোনরা তার দামি জামাকাপড় আর সুন্দর চেহারা দেখে অবাক হয়। বড় দুই বোনকে যেই না নিজের দামি জামা আর গহনা দিতে যায় সে, তাদের গায়ে সেগুলো মলিন কাপড়ে পরিণত হয়। আবার বিউটি স্পর্শ করলেই সব দামি আবরণ-আভরণ হয়ে ওঠে। বিউটির কাছে তার প্রাসাদের বিলাসী জীবনের কথা শুনে বোনেরা হিংসা করতে থাকে। তারা তাকে আরেকটি দিন থাকতে বলে। এমনকি চোখের ওপর পেঁয়াজ রেখে তারা কান্নার অভিনয়ও করে। ভেতরে তাদের সুপ্ত আশা যে, নির্দিষ্ট সময়ে না ফিরলে পশুটি রেগে গিয়ে বিউটিকে খেয়ে ফেলবে। বিউটি তো বোনদের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে যায় এবং সে থেকে যেতে রাজি হয়। এদিকে নির্দিষ্ট সময়ে না ফেরা বা শর্ত না মানায় বিউটির ভেতর অপরাধবোধ তৈরি হতে থাকে। সে তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখে, পশুটি মন খারাপ হয়ে প্রাসাদের গোলাপঝাড়ের পাশে অর্ধমৃত হয়ে শুয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বিউটি হাতে আংটিটি তিনবার ঘুরিয়ে প্রাসাদে ফিরে গেল। পশুটির গায়ের ওপর পড়ে কাঁদতে কাঁদতে সে বলল যে, সে পশুটিকে ভালোবাসে। মেয়েটির অশ্রুজলের ধারা পশুকে স্পর্শ করামাত্র সে রূপান্তর হলো এক সুদর্শন রাজপুত্রে।
রাজপুত্র তাকে জানাল, অনেক আগে এক পরী বৃষ্টির সময় আশ্রয় প্রার্থনা করলেও রাজপুত্র তাকে আশ্রয় না দেয়ায় ক্রুদ্ধ পরী তাকে এক কদাকার পশুতে পরিণত করে। পরীটি বলেছিল, এই কদর্য চেহারা সত্ত্বেও তাকে কেউ ভালোবাসলেই কেবল সে শাপমুক্ত হবে। এর পর বিউটি ও রাজপুত্রের বিয়ে হয় এবং তারা সুখে-শান্তিতে বাস করতে থাকে।
যেহেতু এ গল্পে কোনো কৃষক চরিত্র নেই বা সেভাবে রাজন্য শ্রেণীর উপস্থিতি নেই, অনেকে মনে করেন যে, হয়তো বাস্তব কোনো গল্প থেকেই এ রূপকথার উদ্ভব। স্পেনের টেনেরিফ দ্বীপ থেকে পেট্রুস গঞ্জালভাস নামে এক অভিবাসী ষোড়শ শতকে ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় হেনরির সভায় উপস্থিত হন। হাইপারট্রিকোসিস নামে এক রোগে তার মুখমণ্ডলসহ দেহের নানা জায়গায় অস্বাভাবিক রোমরাজি হওয়ায় তাকে কদাকার দেখাত। পরে রাজার আশ্রয় পেয়ে তিনি ক্যাথেরিন নামের এক সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেন।
যাক, মূল গল্প বলতেই অনেক সময় নিলাম। সাধারণভাবে বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট গল্পের মর্যালস বা নীতিশিক্ষার অংশ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য বিষয় নয়। বিষয় হলো সঙ্গী বা সঙ্গিনীর প্রতি তার কর্তব্যবোধ। খুব ভালো কথা। কিন্তু এ গল্পের কোনো উল্টো সংস্করণ পাওয়া যায় না কেন? কেন সর্বদাই ব্যাঙ রাজপুত্র থেকে পশু... সবক্ষেত্রেই কদাকার প্রাণীটি পুরুষ বা মেয়েটি সর্বদাই রূপবতী? এমন কেন হয় না যে, গল্পের মেয়েটি শুরুতে কদাকার আর ছেলেটি রূপবান? পরে ছেলেটির ভালোবাসায় মেয়েটি হয়ে উঠল অনিন্দ্যসুন্দরী? আমরা এবার একটু নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি? আর এখানেই চলে আসবেন রুশ বংশোদ্ভূত নৈরাজ্যবাদী তাত্ত্বিক এমা গোল্ডম্যান, যিনি তার পৃথিবী কাঁপানো প্রবন্ধ ‘লাভ অ্যান্ড ম্যারেজ (প্রেম ও বিয়ে)’তে বলেই দিয়েছেন, বিয়ে আসলে একটি অর্থনৈতিক চুক্তি, যেখানে মেয়েটির রূপ ও যৌবন আর ছেলেটির টাকা-কড়ি ছাড়া আর কিছুই দেখা হয় না।
এমার ওই প্রবন্ধের একটি বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম বহু আগে। হাতের কাছে নেই। নেট থেকে ইংরেজিতেই কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:
‘প্রেম ও বিয়েকে সাধারণত সমার্থক মনে করা হলেও আসলে তাদের ভেতর মিল খুবই কম। বরং তারা অনেকটাই মেরু দূরবর্তী বিষয়। বলতে গেলে পরস্পরের খুবই দূরবর্তী (Marriage and love have nothing in common; they are as far apart as the poles; are, in fact, antagonistic to each other)।
বিয়ে মূলত একটি অর্থনৈতিক চুক্তি, একটি ইন্স্যুরেন্স দলিল। ইনফার্নো বা অনন্ত নরকে যাওয়ার আগে দান্তের সেই অমোঘ বাণী: তোমরা যে এখানে প্রবেশিবে, দুয়ারে ত্যাগ করে যাও সব আশা (Marriage is primarily an economic arrangement, an insurance pact. Thus Dante’s motto over Inferno applies with equal force to marriage: “Ye who enter here leave all hope behind ).”
এমা আরো বলছেন, শৈশব থেকেই গড়পড়তা মেয়েদের শেখানো হয় যে, বিয়েই তার জীবনের অন্তিম লক্ষ্য। তার যাবতীয় লেখাপড়া, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য বিয়ে। বলির জন্য যেমন একটি পশুকে খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করা হয়, কনে বউকেও তেমন সাজিয়ে-গুজিয়ে তোলা হয় বিয়ের জন্যই। তবু অবাক করা বিষয় হলো, কোনো শিল্পের কারুশিল্পীকে তার পেশা সম্পর্কে যে জ্ঞান থাকতে হয়, বিয়ের কনেকে সেটাই সবচেয়ে কম জানানো হয়— সেটা হলো যৌনতা। হবু বউ ও মাকে তার পেশার মূল বিষয়টি সম্পর্কেই কিছু জানানো হয় না।
এমার পুরো প্রবন্ধ এখানে উদ্ধৃত করা পরিসরগত কারণেই সম্ভব নয়। তবে এমা যথার্থ বলেছেন, মধ্যবিত্ত সমাজে মেয়েকে যৌনতা সম্পর্কে খুব কম জানানোর ফলে অধিকাংশ ‘ভদ্র’ মেয়ে বিয়ে ছাড়া আর কিছুতেই যৌনতার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না এবং বিবাহিত দম্পতির জীবন কাটে ঝগড়াঝাঁটি, কলহে। স্বামীর ‘চাহিদা’ মেয়েটি পূরণ করতে পারে না। কখনো কখনো সারা জীবন ধরেই।
এমা আরো বলছেন, ‘আমাদের যুগটি বাস্তবতার যুগ। রোমিও ও জুলিয়েট যখন তাদের বাবাদের ক্রোধকে উপেক্ষা করেছিল প্রেমের জন্য বা গ্রেশেন তার পড়শিদের গুজবের কাছেও নিজেকে মেলে ধরেছে, তা আজ আর নেই। যদি কখনো কদাচিত্ কোনো তরুণ জুটি প্রেমের শৌখিনতা করেও, অভিভাবকরা তাদের পক্ষপুটে নিয়ে ঠুকতে ও গুঁতোতে থাকেন যতক্ষণ না তারা ‘বিবেচনাসম্পন্ন’ হয়।
এমা আরো বলছেন, ‘একটি মেয়ের ভেতরে এ নীতিশিক্ষাই ঢোকানো হয় যে, বিয়ের ক্ষেত্রে একটি পুরুষের যোগ্যতা এটা নয় যে, সে কতটা তার ভেতর প্রেম তৈরি করতে পারে, বরং এটাই যে ‘কতখানি?’ বাস্তব মার্কিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ও একমাত্র ঈশ্বর হলো: ছেলেটি সংসার চালাতে সমর্থ তো? সে কি একটি মেয়ের খাওয়া-পরা চালাতে পারবে? এটাই একমাত্র বিষয়, যা বিয়েকে বৈধ করে। ক্রমশ এ বিষয়টিই প্রত্যেক মেয়ের ভাবনাকে পেয়ে বসে। চাঁদের আলো আর চুম্বন নয়, হাসি ও কান্না নয়, তার স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় শপিং ট্যুর আর দোকানের দর কষাকষির কাউন্টার (The moral lesson instilled in the girl is not whether the man has aroused her love, but rather is it, “How much?” The important and only God of practical American life: Can the man make a living? Can he support a wife? That is the only thing that justifies marriage. Gradually this saturates every thought of the girl; her dreams are not of moonlight and kisses, of laughter and tears; she dreams of shopping tours and bargain counters )।
এমা আরো দেখিয়েছেন, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে আজকের বাংলাদেশের মতোই লক্ষ লক্ষ মেয়ে কারখানায় শ্রমিক হচ্ছে। তবে শ্রমিক হয়ে বা রোজগার করেও তারা ট্রেড ইউনিয়নে যাচ্ছে না। কেন? কারণ এ কাজটা তো তাদের বিয়ে করার আগের অন্তর্বর্তী সময়। স্বাধিকার তো তার মূল লক্ষ্য নয়। বিয়েটা তো এই সেদিন পর্যন্ত ছিল বা আজ অবধি অনেক মেয়ের ‘পেশা’। এঙ্গেলস যাকে তিক্তভাবে বলেন যে, পতিতা অনেক পুরুষের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদে ও বিবাহিতা বধূ একজন পুরুষের কাছে দীর্ঘমেয়াদে বা আজীবন ভিত্তিতে ‘দেহ ভাড়া’ দেয়। আমি হুবহু উদ্ধৃত করলাম না আর কি এখানে!
কাজেই এ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে ‘স্বামী’ মানে ‘ভর্তা’ বা যে ভরণ করে, সেখানে যে বণিক কন্যার পিতা ঝড়ে তার জাহাজ হারিয়েছে আর দেনায় সর্বস্বান্ত, তার মেয়েকে পশুর কাছে যেতেই হবে। পশু তাকে থরে থরে খাবার আর পোশাক দিচ্ছে। এ ক্রমাগত খাওয়া-পরার জোগান একসময় পশুর ‘কদাকার’ রূপকে ভুলিয়ে দেয়। একসময় ‘কদাকার’ পশুটি যাকে দৈহিকভাবে সহ্য করা কঠিন, তাকেই ‘রাজকুমার’ হিসেবে মেনে নেয়। পশুটি শুরুতেই বিউটিকে বলে যে, সে-ই প্রাসাদের ‘মিসট্রেস।’
মিসট্রেসের বাংলা কর্ত্রী কি সঠিক প্রতিশব্দ হলো? আচ্ছা ধরে নিলাম যে পশুটি ‘জেন্টলম্যান’ এবং সে মেয়েটিকে জোর করেনি। কিন্তু দিনের পর দিন অর্থনৈতিক নির্ভরতা মেয়েটিকে মানিয়ে নিল? অথবা বলপ্রয়োগ করেছিল? মেয়েটি বাড়ির জন্য কাতর হয়ে পড়ে। কিন্তু বাড়িতে গিয়েও সেই আগের জীবন তো আর জোড়া লাগে না বা লাগার নয়। পিতৃগৃহে সেই স্বাচ্ছন্দ্যও নেই। আর... আমাদের আশপাশেই এমন অনেক মেয়েকে কি দেখিনি বা চিনি না, যারা সুদর্শন, তবে অপ্রতিষ্ঠিত প্রেমিককে বাসার চাপে ছেড়ে দিয়ে অচেনা, প্রতিষ্ঠিত আগন্তুককে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়ে আজীবন ‘ধর্ষণ’ সয়ে গেছে?
রবীন্দ্রনাথের ‘যোগাযোগ’-এ বনেদি সামন্ত পরিবারের মেয়ে কুমুকে নব্য বড়লোক, রুচিহীন, কদাকার দর্শন ও বয়স্ক মধুসূদনকে মেনে নিতে হয়েছিল। যদিও মধুসূদনের সঙ্গে ফুলশয্যা কুমুর কাছে ‘ধর্ষণে’র বেশি কিছু ছিল না। কুমুর দাদা যতই রুচিবান হোন না কেন, তার বনেদিয়ানা তো নব্য পুঁজির মধুসূদনের কাছে হেরে যাচ্ছে। কুমুকে তাই ফিরে আসতেই হয় মধুসূদনের কাছে। লা বেল এ বেত বা সুন্দরী ও পশুর চিরদিনের গল্প তো এটাই। অন্যদিকে দেখুন ‘দত্তা’য় বিজয়াকে, বিলাস নরেশের প্রতি বিজয়ার মুগ্ধতাকে ‘সকাম রূপতৃষ্ণা’ বলে শাসন করলেও বিজয়া তার রূপমুগ্ধতা সফল করতে পারে। কারণ তার ছিল জমিদারি সম্পত্তির একক উত্তরাধিকার। আমরা জানি, সিমন দ্য ব্যুঁভোয়া সার্ত্রের সঙ্গে পরিচয়ের আগে তার প্রথম ভালোবাসার ছেলেটিকে বিয়ে করতে পারেননি। যত মেধাবিনী আর সুন্দরী হোন না কেন সিমন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিত্তশালী পরিবারের এক মেয়ে তার ভালোবাসার ছেলেটিকে ‘কিনে’ নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, মেয়েরাও কখনো কখনো ‘কেনে’ বা ‘কিনতে পারে’ বৈকি। খুব বিত্তশালী পরিবারের ‘অসুন্দর’ নারী দরিদ্র পরিবারের ‘সুদর্শন’ ছেলেকে বিয়ে করছে, এমন দৃষ্টান্তও একদম বিরল নয়। শুধু পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার নয়, হালের মেয়েরা চাকরি-বাকরি করে আজকাল কেউ কেউ ‘বাসার চাপে’ ‘বেত’ বা ‘পশু’র মতো কাউকে বিয়ে করে ‘রাজপুত্র’ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন না। সমাজ বদলাচ্ছে। প্রচুর রেস্তোরাঁয় এখন শুধু ছেলেরা বিল দেন না। আত্মপ্রতিষ্ঠিত নারী শৌখিন বেকার ছেলেবন্ধুর বিল হাসিমুখে দিনের পর দিন দিয়ে যাচ্ছেন, এটাও দেখা যাচ্ছে। আসল কথা তো কার সঙ্গ কার ভালো লাগে? কারো কাছ থেকে হীরা-জহরত পেয়েও মন ভরে না আর কাউকে বিনা আধুলিতে মনে হয় জীবনের সব ঐশ্বর্য ঢেলে দিই, সেটাই তো প্রশ্ন! সকাম রূপ পিপাসা শুধু যে নারীর জন্য পুরুষের রয়েছে তা নয়। পুরুষের জন্যও নারীর রয়েছে। অনেক সুদর্শন পুরুষই দেখবেন কখনো কখনো অতি সুন্দরী নারীর মতো জীবনে নিজের পায়ে খুব বেশি দাঁড়াতে পারেন না। প্রায় বিনা আয়াসে, বিনা অর্থ ব্যয়ে বা এমনকি বিনা মমতায় এত ‘প্রেম’ পান যে, জীবনের প্রতি যথেচ্ছাচারও করেন অনেকে। সম্পর্কের বিশ্বস্ততা ভঙ্গ করেন বারবার। সেসব ডন জুয়ানের হাত থেকে কন্যাদের বাঁচাতেও কদাকার তবে অহরহ খাদ্য-বস্ত্রের জোগানদাতা ‘বেত’ বা পশুদের গল্পকে নীতিশিক্ষার মোড়কে রূপকথার মাধ্যমে মেয়েদের কাছে তুলে ধরা হয়। তবে যতই মেয়েরা শিক্ষিত হয়ে আত্মসংস্থান করতে পারবে, দরকারে সে জীবনভর একা থাকলেও জীবনসঙ্গীর প্রশ্নে রুচির সঙ্গে আপস না গড়ার সংকল্প তার আরো পোক্ত হবে। তবে মেয়েদের সমস্যাও আছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, আজো পৃথিবীতে সেই মেয়েরাই ধনাঢ্য, যারা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পদ পেয়েছেন। কিন্তু চাকরি-ব্যবসাসহ নানা পেশায়ই আজো যেহেতু পুরুষ সংখ্যায় ভারি ও বড় কর্তা, ‘অপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’র মতো অনেক মেধাবী তরুণীই পেশার জগত্ থেকে মাঝে মাধ্যেই ছিটকে পড়েন ঊর্ধ্বতনদের নারী মাংস লোলুপতায় সায় না দেয়ার কারণে। এমনটা মাঝে মধ্যে হতে থাকলে পেশাগত স্থিতিশীলতা কঠিন হয়ে যায়। তার পর আছে গর্ভধারণ বা মাতৃত্বের মতো যত কঠিন দায়! সব মিলিয়ে বিয়ে দেখা যাচ্ছে আজো মেয়েদের একটি সামাজিক নিরাপত্তার প্লাটফর্ম। ফলে সেখানে ‘বেত’দের তাদের প্রায়ই মেনে নিতে হয়।





