সবার আগে ২৬ নভেম্বর ১৯৬৩ নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউনে প্রকাশিত ‘জেএফকের গোর খনন তার জন্য সম্মানের’ প্রতিবেদনটি অনূদিত হলো:
ক্লিফটন পোলার্ড বেশ নিশ্চিত ছিলেন রোববার তাকে কাজে যেতে হবে। কোরকোরান স্ট্রিটের তিন রুমের অ্যাপার্টমেন্টে সকাল ৯টায় ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরে নাশতার জন্য যাওয়ার আগেই খাকি ওভারঅল পরে নিলেন। তার স্ত্রী হেট্টি তার জন্য বেকন ও ডিমের নাশতা করেছে। যে ফোনটি তিনি প্রত্যাশা করছিলেন নাশতা অর্ধেক হতেই এসে গেল। ফোনটা মাজো কাওয়ালচিকের, তিনি আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির গোরখোদকদের ফোরম্যান, আর এখানেই জীবিকার জন্য পোলার্ডকে কাজ করতে হয়। কাওয়ালচিক জিজ্ঞেস করলেন, ‘পলি তুমি দয়া করে ১১টার মধ্যে এখানে এসে পৌঁছবে তো?’ তিনি আরো বললেন, ‘কী জন্য তা তো বুঝতেই পারছ।’ পোলার্ড বুঝতে পেরেছেন।
ফোনটা যথাস্থানে রাখলেন, নাশতা শেষ করলেন এবং বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন, যেন রোববারটা জন ফিটজেরাল্ড কেনেডির কবর খনন করে কেটে যায়।
কবরখানার যন্ত্রপাতি যে হলুদ কাঠের গ্যারাজে, পোলার্ড সেখানে পৌঁছলেন। সেখানে কাওয়ালচিক ও আর্লিংটন সিমেট্রির তত্ত্বাবধায়ক জন মেত্জলার তার জন্য অপেক্ষা করছেন। মেত্জলার বললেন, ‘দুঃখিত তোমাকে রোববারে টেনে আনতে হলো।’
পোলার্ড বললেন, ‘এ কথা বলো না, আমি যে এ কাজের জন্য এসেছি, এটা আমার সম্মান।’
পোলার্ড রিভার্স হো নামে একটি যন্ত্রের পেছনে। আর্লিংটনে কোদাল আর মানুষ দিয়ে গোর খনন করানো হয় না। রিভার্স হো একটি পরিবেশবান্ধব যন্ত্র, সঙ্গে হলুদ বালতি। মাটি কেটে যন্ত্রটি সেই মাটি চালকের দিকেই নিয়ে আসে। ক্রেন যেমন সরিয়ে দেয়, তেমন নয়।
পাহাড়ের পাদদেশে অজানা সৈনিকদের স্মৃতিসৌধের সামনের জায়গাটাতে পোলার্ড মাটি কাটতে শুরু করলেন।
ঝরে পড়া পাতায় ঘাস ঢেকে আছে, যখন রিভার্স হোর হলুদ দাঁত প্রথম কোপ বসাল, তখন পাতার এমন শব্দ হলো যে মেশিনের মোটরের শব্দ ছাপিয়ে তা শোনা গেল। প্রথম তোলা মাটি নিয়ে বালতিটা যখন এল, সিমেট্রির তত্ত্বাবধায়ক মেত্জলার এগিয়ে এসে তা দেখলেন।
তিনি বললেন, ‘মাটিটা খুব চমত্কার।’
পোলার্ড বললেন, ‘আমি এ মাটির একটু জমিয়ে রাখতে চাই।’
পোলার্ড আরো বললেন, ‘যন্ত্রটা যেদিকে চলেছে, তার ট্র্যাক তৈরি হয়ে গেছে, আমি এটা ভরাট করে কিছু ভালো ঘাস বিছিয়ে দেব। এরও খানিকটা আমি জমিয়ে রাখব।’
অন্য একজন গোরখোদক জেমস উইনার্স মাথা নাড়লেন।
পোলার্ড বললেন, ‘খুব ভালো কিছু মাটি তুলে গাড়িতে গ্যারেজে নিয়ে আসবেন এবং এর ওপর ঘাস বুনবেন।’
পোলার্ড বললেন, ‘তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন।’
মেত্জলার বললেন, ‘হ্যাঁ তিনি ভালো ছিলেন।’
পোলার্ড বললেন, ‘আর আমি যে কবরটা খনন করছি, তারা তাকে ঠিক এখানে রেখে যাবে। আমি যে এ কাজটা করতে পারছি, এটা আমার জন্য অনেক সম্মানের।’
পোলার্ডের বয়স ৪২ বছর। স্লিম শরীরের একজন মানুষ, গোঁফ আছে, জন্ম পিটসবার্গ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি সেপাই হিসেবে ৩৫২ ইঞ্জিনিয়ার্স ব্যাটালিয়নের সঙ্গে বার্মায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি যন্ত্রপাতির চালক। তার বেতন দশম গ্রেডের হিসাবে। তার মানে কাজের জন্য তিনি ঘণ্টায় ৩ ডলার ১ পেন্স পান।
এ দেশের পঁয়ত্রিশতম প্রেসিডেন্ট জন ফিটজেরাল্ড কেনেডিকে শেষ সময়ে যারা সেবা দিয়েছেন, তাদের একজন শ্রমিক, যিনি ঘণ্টায় ৩ দশমিক শূন্য ১ ডলার আয় করেন।
এবং বলেন কবর খনন সম্মানের কাজ।
(দুই)
এই প্রতিবেদন যিনি রচনা করেছেন, তিনি খবরের কাগজের ডেস্কে বসা আয়েশি রিপোর্টার নন, তিনি বরাবরই মাঠের মানুষ।
জন এফ কেনেডি সমাহিত হওয়ার পর সাধারণভাবে উপেক্ষিত একজন গোরখোদককে নিয়ে লেখা তার প্রতিবেদন সবার দৃষ্টি কেড়েছিল। তিনি জিমি ব্রেসলিন। পুলিত্জার পুরস্কার পাওয়া বহুল সমাদৃত এ আমেরিকান সাংবাদিক ১৯ মার্চ ২০১৭ প্রয়াত হয়েছেন। জেমস আর্ল ‘জিমি’ ব্রেসলিন ১৭ অক্টোবর ১৯২৮ নিউইয়র্কের জ্যামাইকাতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রতিবেদন দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত কলাম লেখক হিসেবে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তিনি আমেরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুসন্ধিত্সু প্রতিবেদক। তিনি বিভিন্ন মাফিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন। এ রকম একটি অপরাধী গোষ্ঠীর হাতে ১৯৭০ সালে তিনি ভয়ঙ্কর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
১৯৮৫ সালে জিমি মেট্রোপলিটন রিপোর্টিংয়ের জন্য জর্জ পোলক অ্যাওয়ার্ড এবং সংবাদ ভাষ্যের জন্য ১৯৮৬ সালে পুলিত্জার পুরস্কার পান।
১৯৪০ দশকে লং আইল্যান্ড প্রেসে কপি বয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তার পর নিউইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন, ডেইলি নিউজ, নিউজ ডে ও নিউইয়র্ক পোস্টে দায়িত্ব পালন করেন।
জিমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, এবিসি টেলিভিশনে সপ্তাহে দুদিন ব্রেসলিন’স পিপল শো করেছেন।
কুইনস বারোর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড মেইনসের দুর্নীতির খবর তিনিই প্রকাশ করেন এবং ডোনাল্ড আত্মহত্যা করেন।
জিমির প্রকাশিত গ্রন্থ একুশটি। তার স্মৃতিকথার নাম ‘আমাকে মনে রাখার জন্য আমার মস্তিষ্ককে ধন্যবাদ দিতে চাই।’
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়ার্ল্ড অব জিমি ব্রেসলিন; দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকর্ডিং টু জিমি ব্রেসলিন, ওয়ার্ল্ড উইদআউট অ্যান্ড, আমেন; দ্য চার্চ দ্যাট ফরগট ক্রাইস্ট, টেবল মানি। তার একটি উপন্যাসও আছে— আই ডোনট ওয়ান্ট টু গো টু জেইল। জিমি খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতেন, জুতা জোড়ায় পা গলিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। তিনি কখনো গাড়ি চালাতে শেখেননি। হাঁটতেন সাবওয়েতে; ক্যাব, বাস যা সুবিধে, তাতেই চড়তেন। তার অফিস ছিল কিন্তু অফিসে আসতেন না। তার কর্মক্ষেত্র যেখানে সংবাদ, সেখানেই। তিনি প্রতিবেদনটি পাঠিয়ে দিতেন। যারা নিয়মিত অফিসে আসতেন, তিনি তাদের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতেন এবং তা বেশি গুণমানসম্পন্ন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আগাগোড়া মিথ্যেবাদী ও প্রতারক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জিমি ব্রেসলিনকে তার দেশবাসী জানে ‘চ্যাম্পিয়ন ফর অর্ডিনারি পিপল’ হিসেবে।
(তিন)
বেলা ১১টা ১৫ মিনিট।
জ্যাকুলিন কেনেডি স্বামীর সমাধির দিকে যাচ্ছেন।
তিনি হোয়াইট হাউজের উত্তর পোর্টিকোর নিচ থেকে বেরিয়ে এলেন, ধীরে ধীরে স্বামীর মরদেহ অনুসরণ করছেন। কফিন পতাকায় ঢাকা এবং দুটি কালো বেল্ট কফিনকে স্ট্র্যাপ করে রেখেছে। মাথা উঁচু করে তিনি হেঁটে যাচ্ছেন, সাতটি পাতাঝরা ওক বৃক্ষের ছায়ায় ব্লুস্টোন এবং কালো আস্তরের ড্রাইভওয়ে ধরে। যারা এ দেশের রাজ্যগুলোর পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি তাদের অতিক্রম করলেন। তাকে দেখে নীরব ব্যথাতুর যেসব মানুষ মাথা নুইয়ে হাত দিয়ে তাদের চোখ চেপেছে, তিনি তাদের অতিক্রম করলেন। জ্যাকুলিন উত্তর-পশ্চিম গেট দিয়ে বেরিয়ে পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ মাঝামাঝি পর্যন্ত এলেন। তিনি দৃঢ় পদক্ষেপে মাথা উঁচু রেখে খুন হওয়া স্বামীর দেহের পেছন পেছন ওয়াশিংটনের সড়ক ধরে হাঁটলেন।
জ্যাকুলিন যখন হাঁটছেন, সবাই তাকে দেখছে। তিনি দুটি পিতৃহীন সন্তানের জননী— তিনি এ দেশের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। যারা নিজেদের বৃদ্ধ, অসহায় এবং আশাহীন মনে করছেন, তাদের তিনি দেখাচ্ছেন তার প্রচণ্ড শক্তি, আর যা এখন সবার দরকার।
যদিও তারা তার স্বামীকে হত্যা করেছে, মৃত্যুর সময় স্বামীর রক্তধারা তার কোলে এসে পড়েছে— তিনি পারছেন সড়ক দিয়ে হেঁটে যেতে তার কবরে, আমাদের সবাইকে এই হাঁটার সময়ও সাহায্য করছেন।
শোকবিহ্বল জনতা, তাদের প্রার্থনা সভা, তার পর আর্লিংটনে মিছিল। সিমেট্রির ভেতরে জ্যাকুলিন যখন কবরের কাছে পৌঁছলেন, ততক্ষণে কাস্কেট নামানো হয়েছে। পিতলের রেলিংয়ের ভেতরে মাটিতে নামানোর জন্য প্রস্তুত।
অবশ্যই এটাই সবচেয়ে খারাপ সময়, যখন একজন নারী তার স্বামীর কফিন দেখেন, যখন দেখেন সমাহিত করার জন্য তা প্রস্তুত। তিনি জেনে গেছেন সমাহিত চিরজীবনের জন্য। তার পর আর কিছু থাকবে না। চুমো খাওয়ার জন্য কিংবা দুই হাতে জড়িয়ে ধরার জন্য কাস্কেটও না। আঁকড়ে ধরার মতো কিছুই আর নেই। কিন্তু তিনি সমাহিত করার জায়গাটিতে গেলেন, তার পর সামনের সারিতে; পেছনে সবুজ আচ্ছাদনের দুটি চেয়ার। তিনি একটিতে বসতে গিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি সোজা দাঁড়িয়ে রইলেন যতক্ষণ না শেষকৃত্যের পরিচালক তাকে বলবেন যে, তিনি চান জ্যাকুলিন বসে পড়ুক।
আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো মাথার ওপর জেট প্লেনের গর্জন, আকাশ থেকে পাতা ঝরানো হলো। কফিনের পেছনের পাহাড়ে মানুষ সজোরে প্রার্থনা করছে। ক্যামেরাম্যান, লেখক, সৈনিক, গোয়েন্দা সদস্য সবাই সজোরে প্রার্থনা করছেন, তাদের কণ্ঠ ধরে এসেছে।
কবরের সামনে লিন্ডন জনসন তার মাথা রেখে ডান দিকে ঘোরালেন। তিনি এখন প্রেসিডেন্ট। তাকে সুস্থির থাকতে হবে। এটা বরং ভালোই যে তিনি বারবার কাস্কেট এবং জন ফিটজেরাল্ড কেনেডির কবরের দিকে তাকাননি। তার পর সব শেষ হয়ে গেল। কালো লিমোজিন সিমেট্রির গাছের নিচে এসে থামল এবং বীথিকার ভেতর দিয়ে হোয়াইট হাউজের দিকে চলে গেল।
পাহাড়ের ওপর দাঁড়ানো একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন কটা বাজে?’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একজন বললেন, ৩টা বেজে ২০ মিনিট।
ক্লিফটন পোলার্ড শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি। তিনি সিমেট্রির অন্যদিকে অন্যভাগে ঘণ্টায় ৩ দশমিক শূন্য ১ ডলার হিসাবে কবর খুঁড়ছিলেন। তিনি জানতেন না এসব কবর কাদের জন্য। তিনি কবর খুঁড়ছেন এবং বোর্ড দিয়ে ঢেকে রাখছেন।
তিনি বললেন, ‘এগুলো কাজে লাগবে, তবে কখন তা জানি না। আমি সেই কবরটা দেখতে যেতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু এত জনাকীর্ণ যে, একজন সৈন্য আমাকে বলেছে ভিড় ঠেলে আমি যেতে পারব না। কাজেই আমি এখানে থেকেই কাজ করে গেছি। তবে পরে আমি এক সময় একটু দেখার জন্য ওদিকটায় যাব। কেবল একটু দেখার জন্য— দেখতে কেমন হয়েছে, বোঝেনই তো স্যার। আমি তো আপনাকে বলেছি এটা আমার জন্য সম্মানের।’
পাদটীকা: ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ জন এফ কেনেডি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ২৫ নভেম্বর তিনি আর্লিংটন সিমেট্রিতে সমাহিত হন।
ক্লিফটন পোলার্ড ১৯৮০ সালে এই সিমেট্রি থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং ১৯৯২ সালের ৫ এপ্রিল ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এবং আর্লিংটনেই সমাহিত হন।
আর জিমি ব্রেসলিন মারা যান ১৯ মার্চ ২০১৭তে।
১৯৬৭ সালে পুরনো কবর থেকে কেনেডির দেহাবশেষ সরিয়ে বর্তমান সমাধিতে রাখা হয়। এ কাজে ক্লিফটন পোলার্ড সহযোগিতা করলেও সেদিন তিনি কেঁদেছেন। তার মনে হয়েছে, প্রেসিডেন্টকে ডিস্টার্ব করা হচ্ছে।






