হরিশ কর্মকাররা তিন ভাই। হরিশ, হরিহরণ আর হরিচরণ। হরিশ কর্মকারের বয়স যখন এগারো বছর, তখন তার পিতা ক্ষয়রোগে ভুগে ধরাধাম ত্যাগ করেন।

তখন ছিল ঘোরতর পাকিস্তানি জমানা। আইয়ুব খান আর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে তাসখন্দে শান্তিচুক্তি হওয়ায় সবে পাক-ভারত যুদ্ধ শেষ হয়েছে।

কিছু বুঝেশুনে ওঠার আগে শত্রুসম্পত্তি আইন হওয়ায় গ্যাঁড়াকলে পড়ে হরিশ কর্মকাররা বাস্তুচ্যুত হয়ে গেল। দিশেহারা হরিশ কর্মকারের মা সারদা দেবী তাঁর তিন নাবালক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রথমে বড়দার বাড়িতে আশ্রয় নিলেন, মাস দুয়েক বড়দার বাড়িতে থেকে তারপর বড়দার পরামর্শে ছোট দুই ছেলে হরিহরণ আর হরিচরণকে ভারতে মেজদার কাছে পাঠিয়ে হরিশকে সঙ্গে নিয়ে মাইল তিনেক দূরে বাবার বাড়িতে ফিরে গেলেন।

বাড়িতে তখন ছোড়দা সপরিবারে বসবাস করছেন। দিন কয়েক পর সেখান থেকেই শুনলেন, তাঁর বড়দা ঘরবাড়ি বিক্রি করে রাতের আঁধারে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। বাহক মারফত একটা চিরকুট এল। সারদা দেবী চিরকুটটিও পড়লেন।

স্নেহের ছটু,

নিতান্ত অপারগ হইয়া ভিটা-মাটি ত্যাগ করিয়া চলিয়া যাইতেছি। এই দেশে বসবাস করা আর সম্ভব হইতেছে না। সবাইকে নিয়া তোরা ভালো থাকিস।

ইতি

তোর বড়দা।

সারদা দেবীর মনটা বিষাদে ভরে গেল। তিনি অবশ্য বড়দার বাড়িতে থাকতে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছিলেন। তারপর মাস দুয়েকও পেরুল না। ছোট দুই ছেলের জন্য পাগলপ্রায় সারদা দেবী ফিরে আসার প্রত্যয়ে বড় ছেলেকে বাড়িতে রেখে জ্ঞাতি-কুটুমদের সঙ্গে সীমান্ত পাড়ি দিলেন। কিন্তু ফিরতে আর পারলেন না। জ্ঞাতি-কুটুম কেউ আর ফিরে এল না।

হরিশ কর্মকার তখন ক্লাস সেভেনে পড়ত। এ সময় তার মামার বাড়িতে বলা যায় বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল। ছোট মামি বলা নেই-কওয়া নেই, হঠাত্ বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেলেন। এই হাসেন তো এই কাঁদেন, এই ঘরে থাকেন তো এই বেরিয়ে যান। জরি-বুটি-হেকিম-কবিরাজ-ডাক্তার কোনো কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। ছোট মামা তাঁর বছর চারেক বয়সী যমজ দুই শিশু আশিস আর দেবাশিসকে নিয়ে বড্ড বিপদে পড়ে গেলেন। একদিকে বউয়ের উন্মাদনা, অন্যদিকে ছোট দুই ছেলেকে সামলানো তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। রুটি-রুজিরও তো একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে।

শেষমেশ, জ্ঞাতি-কুটুমদের চাপে এবং অনেকটা বাধ্য হয়ে শ্রীরামপুরের কল্যাণী বসাককে বিয়ে করে আনলেন। সে সময় শোনা গেল, দোষের মধ্যে একটাই, তা হলো কল্যাণী বসাক একটু ট্যারা, যদিও তার নিকটজনেরা বললেন, লক্ষ্মী ট্যারা।

মাস ছয়েক কল্যাণী বসাক সংসারে চুপ হয়ে থাকল। যখন দেখল, তার খুঁটির জোর বাড়ার সময় হয়েছে (খুঁটির জোর তো এমনি এমনি বাড়ে না, উসিলা লাগে।); সে স্বরূপে আবির্ভূত হলো।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে হরিশ সম্পর্কে নানা কথা-কুকথা বলে স্বামীর মনটা ভারী করে তুলল।

হায়রে কিশোর! বাবা হারিয়ে বলা যায়, মা-ভাইদের হারিয়ে যখন দিশেহারা-মনমরা-ছন্নছাড়া, তখন নতুন ছোট মামির গঞ্জনা, মানসিক পীড়ন, তাকে একেবারে বিষণ্ন করে তুলল। তবু চেষ্টা খাপ খাইয়ে নেয়ার, ছোট মামাতো দুই ভাই আশিস-দেবাশিসকে ঘিরে স্নেহের বলয় তৈরি করে নতুন ছোট মামির রোষানল থেকে রক্ষা পাওয়ার, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

ছেলেসন্তান হওয়ার পর নতুন ছোট মামি যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। কারণে অকারণে হরিশের ভুল-ভ্রান্তি ধরতে লাগলেন।

হরিশ একেবারে মিইয়ে গেল।

আগে তবু দু-চারদিন স্কুলে যেত, এখন আর বলতে গেলে যায়-ই না। নতুন ছোট মামির কারণে তার আর যাওয়া হয় না। একদিন যাওয়ার জন্য বইপত্র গোছানোর সময় টের পেয়ে নতুন ছোট মামি বাগড়া দিয়ে বললেন, ইস্কুলে গিয়া কিতা করতায়! জজ-বালেস্টার অইতায়নি! বালেস্টার অইলে যা আর না অইলে যাইস না।

এই প্রথম নতুন ছোট মামির সম্বোধন তুমি থেকে তুইয়ে নেমে এল।

হরিশের চোখ দিয়ে তখন দর দর করে জল পড়ছে।

অসহায় কিশোরের এই চোখের জল মনে হয় প্রকৃতিরও সহ্য হলো না। দিন দুয়েকের ভেতর উন্মাদ ছোট মামি হঠাত্ উন্মত্ত হয়ে প্রথম তাণ্ডবেই সতীন কল্যাণী বসাকের মাথা ফাটিয়ে তাকে ধরাশায়ী করলেন।

আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই ছুটে এল। খবর পেয়ে উন্মাদ নীলিমার বাবা-মা-ভাই-বোনেরাও এলেন।

সবাই বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত হলো দুটো:

১. চিকিত্সার প্রয়োজনে উন্মাদ নীলিমাকে পাঠিয়ে দেয়া হবে হেমায়েতপুরে।

২. আশিস-দেবাশিসকে আপাতত তাদের দিদিমার জিম্মায় দিয়ে দেয়া হবে।

সহসাই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে গেল।

হরিশ হয়ে পড়ল আরো একা। আগে তবু একটা অবলম্বন ছিল আশিস-দেবাশিসকে ঘিরে; এখন আর কেউ নেই। ছোট মামা বেরিয়ে যান সকালে আর ফেরেন রাতে।

হরিশকে এখন ছোট মামাতো ভাই স্নেহাশিসের হাগু-মুতুতে লেপ্টানো কাঁথা ধুতে হয়; পরিষ্কার করতে হয়। তবুও যদি নতুন ছোট মামির মন মেলে!

হরিশের এই হাগু-মুতু ধোয়া-পরিষ্কার করার কথা এক কান-দুই কান হয়ে জ্ঞাতি-কুটুমের মাধ্যমে সীমান্তের ওপারে তার মায়ের কাছে পৌঁছে গেল। সারদা দেবী খবর পাওয়া মাত্রই আর দেরি করলেন না; মেজদাকে রাজি করিয়ে পরদিন সকালে উঠে দুই ছেলে নিয়ে মেজদার সঙ্গে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরলেন।

আমাদের হরিশের তখন বেলা শেষ হয়ে গেছে।

ভোরের দিকে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে নিয়মমাফিক ওষুধ খেলেও লবণ-পানি বেরিয়ে যাওয়ায় (স্যালাইন তখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হওয়ায়) দিন শেষে ধীরে ধারে নিস্তেজ হয়ে ঘোরের মধ্যে চলে গেছে।

মা যখন পাগলের মতো তার শিয়রে ঝাঁপিয়ে পড়ে; হরিশরে, সুনা আমার বলে নাকে নাক ঘষতে লাগলেন। ঘোরের মধ্যে চলে যাওয়া হরিশের অসমাপ্ত একটা কথাই তখন শোনা গেল, মা-মা-মা আমার...।