আমি যখন মায়ের পেটে এসেছি, তখন মায়ের বয়স ১৯-২০। ব্রোমাইড জ্বলে যাওয়া লালচে ছবি থেকে নেমে এসে রোদে দগ্ধ হওয়ার জন্য দেয়া মসলামাখা কাঁচা জলপাই একে একে মা খেয়ে ফেলেছিল এক সের। বাজারে ওঠা সবুজ টমেটোর চাটনি রেঁধে দিত নানি তার অন্তঃসত্ত্বা কন্যাদের। সেই বাড়িটায় আম্মা এলে চেয়ারে পা তুলে বসে মুড়ি খেত দুধ আর আম দিয়ে চটকে, মাখা সন্দেশ বা প্যাঁড়া দিয়ে। অন্যত্র মা ছিল সংরক্ষিত সিদ্ধান্ত গ্রহণক্ষমতাধারী দাসী, গৃহকর্মে ক্রমাগত নিজের উপযোগিতা প্রমাণ করা ছাড়া যার গন্তব্য নেই। এই প্রমাণের কাজটুকু সে নিজেই ঘাড়ে নিয়েছে নাকি কেউ ঘাড়ে করে দিয়েছে, তা জানা যায় না। অনুমান করা যায়।
মায়ের বুদ্ধি ছিল প্রখর এবং সহজাত, সেই বুদ্ধিই ছিল তার ঢাল, কেউ তাকে তেমন ঘাঁটাতে সাহস করত না, মা একবার অপাঙ্গে তাকিয়েই টের পেয়ে যেত। তবে আমি বড় হতে হতে দেখেছি, এই প্রখর বুদ্ধির জোরে যা একঝলক তাকিয়েই আম্মা বুঝতে পারে, সেটা অশান্তিকর বলে মা বিশ্বাস করে না, অর্থাৎ মায়ের হূদয়ের কাছে তার বুদ্ধি পরাজিত হয়। যা-ই হোক, এমন ক্ষুরধার বুদ্ধি এবং প্রত্যুত্পন্নমতিত্ব থাকলেও আম্মা ছিল কেবল আম্মাই, সাংসারিক পরিচয়গুলোই ছিল তার প্রতিষ্ঠিত পরিচয়। আম্মা ছিল পরিবারের এবং বিবাহসূত্রে প্রাপ্ত পরিবারের মাতৃসদন, শিশুসদন, বৃদ্ধাবাস এবং মুশকিল আসান। অথচ মায়ের উদয়াস্ত পরিশ্রমের এবং পরিশ্রমের সঙ্গে মেধার প্রাত্যহিক সংযোগের মৌখিক স্বীকৃতিও ছিল না। মাঝে মাঝে কিছু শূন্যগর্ভ তোয়াজ জুটত মায়ের বরাতে, সেটিও অদূর ভবিষ্যতে মায়ের পিঠে আরো কিছু ভার দেয়ার আগের নান্দীপাঠ। বুদ্ধিমান মানুষটি সেটা বুঝত, কিন্তু বিরক্তি ছাড়া, অভিমান ছাড়া আর কিছু অভিব্যক্ত হতো না। আম্মা নিজের জন্য শোক করত না, ‘আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক’।
ছোটবেলায় বাসাবোর বাড়িতে দেখতাম— শিলপাটায় বাটা মসলার স্তূপগুলো থেকে পিতলের খুন্তির আগা দিয়ে নিখুঁত ভাগ করে দিত আম্মা, মসলা নয়, ওটা যেন রঙের প্যালেট আর আম্মা চিত্রকর। মা একেকটা তরকারির মসলা এভাবে আলাদা আলাদা করে ভাগ করে দেয়ার পর রহিমা চলে যাচ্ছে রান্নাঘরে। মা এখন রান্নায় বসবে না, পড়তে বসিয়েছে আমাদের দুই ভাইবোনকে, মধ্যবিত্তের খোপ থেকে ছানাদের বের করার অদম্য প্রয়াস এই পড়াশোনা— খাইখোরাকির চেয়ে ঢের জরুরি। রহিমাকে পাব পরে, ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে অন্ধকার হয়ে গেলে... কত শোল্লক শোনাবে সে, ‘আমি থাকি বিলে আর তুমি থাকো জলে/ তোমার লগে দেখা হইবে মরিবার কালে’... ‘হাত্তির দাঁত কদমের পাত/ এই শোল্লক যে না ভাঙ্গায় সে গাধার জাত’। তালপাখা দিয়ে মশা তাড়াতে তাড়াতে সত্তরের দশকের শেষ দেখতে দেখতে অন্ধকারে শোল্লক বলে যাচ্ছে রহিমা, মাথার পেছনে আঁট করে বাঁধা হাতখোঁপা, গায়ে ডুরে শাড়ি। তার কণ্ঠের হাতছানিতে বন থেকে সোনার টোপর মাথায় দিয়ে বেরোচ্ছে টিয়ে। রহিমা একবার পুষেছিল ডাহুকের ছা, বাঁচেনি সেটা। খেলতে গিয়ে ধুলোবালিতে প্রচুর কাচের চুড়ির টুকরো খুঁজে পেতাম, কে জানে কী তার পেছনের গল্প... উত্পীড়নের না প্রেমের, সেগুলো এনে রহিমাকে দিলে সে চিমটেয় ধরে আগুনে পুড়িয়ে ভাঙা চুড়ির দুধার বাঁকিয়ে শিকলি বানাত, ভারি সুন্দর হতো সেই বিনিসুতোর মালা। রহিমার গল্পের পর হবে পারুলের গল্প। বিয়ে হওয়ার আগেই— কন্যা জন্মানোর আগেই— কন্যাসন্তান পেটে ধরার দুঃখ নিয়ে যে বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদত আর গাইত ‘কালো ম্যায়া আমার ঘরে
পড়লাম বিষয়ম দায়/ ছ্যাইল্যার বাবা কয় না কথা সাইকোল— ঘড়ি চায় এ এ’। মায়ের অসুখের সময়, হাসপাতালবাসের সময় এই পারুল বুয়া আমাদের অবিকল মায়ের হাতের রান্না করে দিত, অবিকল তেমনি শাসন করে ভাত খাওয়াত, ভাতের দানা এঁটো করলে একেকটা দানা রোজ কেয়ামতে একেবারে ওহুদ পর্বতের সমান হয়ে বিচার নিয়ে আসবে— এইসব বলত আর পড়াতে বসাত।
অন্য সময় মা এলেবেলে গজা বানাত, খাস্তা নিমকি বানিয়ে কাচের বৈয়মে রেখে দিত। নিমকপারা কাটার একটা পিতলের চাকা ছিল আম্মার, সেটা হারিয়ে গেছে অনেক পরে। বাড়িতে মেহমান এলে হাতে তৈরি নাশতা দেয়াটা মায়ের জন্য গরিমার ছিল, চানাচুর বা বেকারির বিস্কুট আসত না বাড়িতে তখনো। পাউরুটির ধার সযত্নে কেটে বানানো ফিনফিনে চিকেন স্যান্ডউইচ, পাউরুটির সোনালি পরাগরেণু সমান করে আস্তর দেয়া আলুর চপ, এগরোল। আম্মার রান্না নুডলসে লেসের মতোন করে কাটা বাঁধাকপি, পোলাওয়ে ঝিরিঝিরি করে কাটা আলুর বেরেস্তা, ছিটপিঠা নামে যা উঠে এসেছে আর্দ্র কড়াইয়ের গা ছেড়ে সেই ছিটপিঠা দিয়ে ড্যাফনি দ্যু মরিয়রের ‘রেবেকা’র স্বচ্ছ রাত্রিবাস তৈরি হতে পারে। পুর ঠেসে ভরা আস্ত ফুলকপির রোস্টটার সবদিক সমানভাবে ভাজা হয়েছে। একেবারে নিরামিষ বলতে যা রাঁধা হতো, তাতে ঢেঁড়সটা থাকত প্রগাঢ় সবুজ, কুমড়া থাকত নিবিড় কমলা, ঝিঙে থাকত ফিকে সবুজ, বেগুন তেলচকচকে বেগুনি, মা কেমন করে এই অসাধ্য সাধন করত জানা নেই। স্মৃতি থেকে লিখছি বলে ক্যালাইডোস্কোপ সব বর্ণিল করে দিচ্ছে এমন ভাবার কারণ নেই। কুদ্রুমের জেলি হতো আমাদের বাড়িতে, যার ইংরেজি নাম রোজিলা... শুনলে মনে হয় রৌদ্রসোহাগী তন্বী কেউ... অথচ এরই আরেক নাম টেপারি বা মেষ্টা, সুন্দরীদের ছেলেবেলার নামও যেমন করে ‘বুঁচি’ হতে পারে। কোনো এক সকালে আব্বা এক কুলা মেষ্টা এনে দিত বা শরতের গদগদে পাকা পেয়ারা। সেসব কাচের মতো চকচকে, মেরুন জেলিতে পরিণত হতো। আম্মা বাসায় টমেটো সস বানাত, সারা বছরের আমের কাশ্মীরি আচার বানাত— সেই আচারের শুকনা মরিচগুলো কাঁচি ধরে কাটা আর সঙ্গে ফুল কাটা আদা। আমের মোরব্বাও একেবারে খাসগেলাসের তৈরি এমন চকচকে আর স্বচ্ছ জলযান, চিনির জলে আধডোবা চাঁদবণিকের ডিঙা। জলপাই আর রাঁধুনি বাটা দিয়ে নতুন শীতের পহরে মা রাঁধত খোলাপানির মলাডেলা মাছের চচ্চড়ি, কচি লাউ দিয়ে কালবাউশ মাছের মাথাভাঙা ঘণ্ট, শীতকাল শব্দটার সঙ্গে যে সুবাস থাকে তার সমার্থক এসব। পটোল ভাজার গায়ে বঁটির শত শত আঁচড়, যেন চিরুনি অভিযান। যা যা বানাচ্ছে মা সব অসামান্য যত্নে গড়া। এত যত্নে এমন পেরিশেবল্?কে গড়াটা নিয়ে আমার আপত্তি ছিল, আশাপূর্ণা দেবীর গল্পের সেই মৃিশল্পীর মতো— যে লোকটা এমন প্রতিমা গড়তে চাইত না, যেটা বিসর্জিত হবে। (অবশ্য পরে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দেখেছি সব প্রযত্নই জলে যায়, শেষ পর্যন্ত। ভালোবাসার মানুষকে যা কিছু নিবেদিত হয়, তা এক আশ্বিনেরই। ১০৮টা নীলপদ্ম অবধি তাই।)
সেই সব অন্তহীন আয়োজনের গতি হওয়ার সময় কী কী হতো নীল-সাদা ফুলকারি করা টেবিলটার চারপাশে? কেউ কি আম্মাকে ধন্যবাদ দিত? মুখোমুখি বসে খাওয়ার ৩০ হাজার ৬৬০টি দৃশ্য আমি দেখেছি যতদিন দেশে ছিলাম, তার একটিতেও আব্বাকে ধন্যবাদ দিতে দেখিনি। বরং কোনটা কেমন হলো, লবণ কম না ভাজা কম না তেল কম— এসব নিয়ে মন্তব্য করতে দেখেছি, অনবরত। এ নিয়ে আমি অসন্তোষে-অসহিষ্ণু মুখে টেবিল ছাড়তাম, পরের দিকে বলতামও মুখ ফুটে। আব্বাকে বদলানো যায়নি, যে কাল লিঙ্গনির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসা-ত্যাগস্বীকার-সহিষ্ণুতা-যত্ন এসবকে স্বীকার করে, সেই কাল আব্বার নয়। ভালোবাসার মুদ্রা নির্লজ্জ সম্ভোগী ভালোবাসার মানুষ অবধি পৌঁছায় না, হয়তো ঈশ্বরের কাছে যায় কিংবা গরঠিকানায় যায়।
রমজান মাসে সন্ধ্যার আগ দিয়ে বরফ কেনার ধুম পড়ে যেত, পলিথিনে করে বরফ নিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়াত উপোসী মানুষ। আম্মা সকাল থেকে ইফতারির ছোলা সিদ্ধ করত, ডাল ভেজাত, নতুন কোনো মিষ্টিপদ বানাতে সিদ্দীকা কবির ঘাঁটত। সিয়ামসাধনা বলতে আমরা বুঝতাম পেটপূজা, একটু বিরতি দিয়ে। ইফতারি সামনে সাজিয়ে অপলক তাকিয়ে বসে থাকতে হবে, এতে নাকি সহিষ্ণুতার পরিচয় পাওয়া যায়, আল্লাহতাআলা বান্দার ধৈর্যের তারিফ করেন। চাচ্চুরা ও মামারা রাস্তার ভাজা খেসারির ডালের পেয়াজু খেয়ে এসে আহ-উহু করত, কিন্তু আম্মা ছিল অনড়, বাইরের ভাজাভুজি ঘরে ঢুকত না, খেসারি তো নয়ই। মা জানত খেসারি খেলে লেথারিজম হয়। মায়ের দুনিয়া খুব সাদা-কালো ছিল এবং সেই ছক মেলানো সাদা-কালোয় মিলে এশারের ছবির মতো কোনোকিছু ঊর্ধ্বগামী হতে হতে আবার নিম্নগামী... এমনটা হতো না, সুসমতল একঘেয়ে সাদা-কালো বিভাজন ছিল সেই পৃথিবীতে, যা উচিত তা সাদা, যা উচিত নয় তা কালো, একটি খোপও ধূসর হয়ে উঠত না। এমন মানুষ আমি জীবনে আর দু-একটি দেখেছি কেবল।
আচ্ছা, সৌন্দর্যপ্রীতি মায়ের স্বভাবের খুব বড় দিক ছিল। গ্রাম থেকে আসা ছোট ছোট গোল আলুর নাম আম্মা শিখিয়েছিল ‘ললিতা আলু’ (আমার দাদুমণি এই আলু দিয়ে কষিয়ে কবুতর রাঁধতেন আর আমি পালাতাম), ‘শ্রীচন্দন’ ছিল গাঢ় সবুজে সাদা রেখা দেয়া সবজি। অসভ্য ভঙ্গি, অশালীন কথা একেবারে সইতে পারত না আমার আম্মা, কথায়-কাজে সুন্দর অভিব্যক্তি ভালোবাসত। প্রতিদিন ‘প্যাকড লাঞ্চ’ দিত আমার মা যাকে আমরা টিফিন বলে ডাকতাম, পরিষ্কার টুকটুকে টিফিন বক্সে নিটোল পাতার গড়নের চপ-কাটলেট, ভেতরে সুসিদ্ধ সুরন্ধিত পুর। মাকে আমি কোনোকিছু হেলাফেলা করে করতে দেখিনি, ডিটেইল ছাড়া করতে দেখিনি। বাজারের ফর্দটাও লিখছে মুক্তার হরফে (হাতের লেখা খারাপ করতে নেই, বানান ভুল হতে নেই), বহু দূরসম্পর্কের আত্মীয়ার মেয়ে হয়েছে তার ফ্রক বানানোর বোতামটি ঠিক ফুলের গড়নের হওয়া চাই বলে ছুটছে নিউমার্কেট। আচার ঘোলা হতে পারবে না, চপ থ্যাবড়ানো হতে পারবে না। এখন কেউ যদি এসে বলে— এ হচ্ছে হোম মেকারের নিশ্ছিদ্র অবসরের বিলাস, সময় এবং স্পৃহার অপচয়, আমি তার অর্বাচীনতায় হাসব। কার কিসে স্পৃহার পরিপ্লুতি, কার কোন পথ ধরে শিল্পীর উদ্যমের রন্ধ্রপথ, কার কোথায় উপশম আর কিসে আনন্দ, কোন কাজের সম্পাদনা তাকে আন্তরিক মহিমা দেয়, তার বিচার এত সহজ নয়। অনেক কিছুই তো লোকে বাধ্য হয়ে করে না, আপনা থেকে করে। সামাজিক চাপ নয়, নিজেই তার নিজের ওপর কাজের মান চাপিয়ে দিয়েছে উঁচুতে— সেখান থেকে নেমে আসা সম্ভব নয় আর। মায়ের ওপর যে বিষয়গুলোয় পারিবারিক বা সামাজিক চাপ আছে টের পেতাম, সেগুলো নিয়ে আমি বিরক্ত হতাম। অনেক পরে টের পেয়েছি এই চাপের বাইরেও মা অনেক কিছু করে, যেসব তাকে কেউ করতে বলেনি সেই সব কাজ, সেই ডিটেইলিং তার একান্ত মর্যাদার জায়গা, সেখানে সে শিল্পী, সে জায়গাটুকুতে আর কারো চাপ বা অনুমোদন বা শংসা কিছুই কাজ করে না। আমি আমার মায়ের মতো নই। উদ্যমের যেকোনো অমর্যাদায় নিরভিমান থাকা আমার পোষায়নি, পোষায় না।
কেউ আশপাশে না থাকলে মা গাইত ‘ভরা থাক স্মৃতিসুধায় হূদয়ের পাত্রখানি’ কিংবা ‘দূরদেশী সেই রাখালছেলে’ কিংবা ‘যমুনাকিনারে শাজাহানের স্বপ্ন শতদল/ শ্বেতমর্মরে মরমের ব্যথা বিরহীর অশ্রুজল’। আম্মার শাড়িতে দেশী মুরগির কষানো মসলার গন্ধ থাকত, সঙ্গে ভাতের মাড়ের গন্ধ, নীলকাচা কাপড়ের গন্ধ। আম্মা একসময় জলচৌকিতে বসে রাঁধত, পরে দাঁড়িয়ে। শীতকালে কচি দুপুরে ভাত ফুটার ঘ্রাণে ভরে যেত আমাদের অপরিসর ঘর, বারান্দা থেকে আসত মসলামাখা জলপাইয়ের গন্ধ। বড় ছুটিগুলোয় আমাদের স্কুলে বাড়ির কাজ ছিল স্ক্র্যাপবুক বানানোর। একবার দেয়া হলো বিষয় ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতা’, ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার প্রতিটি লাইন ভাবসম্প্রসারণ এবং ছবি আঁকা। এসব করতে করতে কান পাততাম, কে গাইছে রান্নাঘর থেকে ‘দহনবেলাতে আমি প্রেমের তাপসী/ বরষাতে প্রেমধারা শরতের শশী/ রচি গো হেমন্তে মায়া শীতেতে উদাসী/ হয়েছি বসন্তে আমি বাসনাবিলাসী’। মায়ের পুরনো ডায়েরির পাতায় মুক্তার মতো অক্ষরে লেখা গান ‘পিঞ্জর খুলে দিয়েছি/ যা কিছু কথা ছিল ভুলে গিয়েছি/ যা রে যাবি যদি যা’, আমার মায়ের বিয়ের আগের ডায়েরি, সুন্দর হাতের লেখার নিদর্শনস্বরূপ আব্বা এই ডায়েরি নানাবাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে, মায়ের ডায়েরি আব্বাকে পড়তে দিল কে? কিংবা মা কাকে পিঞ্জরমুক্ত করে উড়িয়ে দিয়ে সংসার করতে এল? আমার পাশে মা বসে থাকত গানের ক্লাসে, কবি গোলাম মোস্তফার ছেলেমেয়েদের ‘হিন্দোল সংগীত একাডেমি’, সুরভোলা সর্পিণীর মতো দুলতাম আমি, ‘ব্রিজ ম্যায় ধুম মাচায়ে কানহা’ শুরু করেছে অন্য ক্লাসের মেয়েরা, ব্রিজকে আমরা ধীরলয়ে গাইতাম ‘বিরজ’, আমরা শুরু করেছি ভীমপলশ্রীতেই ‘যা যা রে আপনি মন্দিরভা, শুন পাওয়েগি মোরি সাঁসু ননদিয়া’, মা সদারঙ্গ কে জানে না আমিও না, মা হারমোনিয়াম বেলো করছে, কারণ আমার ছোট ছোট হাত পৌঁছবে না আর আমি বাজাচ্ছি। আমাদের শেখানো হচ্ছে সর্বরোগহরা রাগ ইমন, পিয়া বিনা এরি মোহে নিঁদ নহি আয়ে, প্রিয়তম ছাড়া ঘুম আসবে না কেন, প্রিয়জনসঙ্কাশে তবে ঘুম উড়ে যায় না? অন্তরাতে এসে ‘কা সে কাহু ম্যায় বিরহা কি বাতিয়া’তে আমি মনে মনে অনুবাদ করে গাইতাম, ‘কাকে বলি এই বি-র-হের যাতনা’, যাতনা কি বলার জিনিস? এ যাতনাই বা কেমন, যার কথা কেবল রোদনভরা বসন্তদিনের গানে আছে, মায়ের কাছে নেই, মা তো বসন্তে বাসনাবিলাসী। মা কিনে আনছে রুপালি জরিদার গাঢ় সবুজ ওড়না— মাথামুড়ি দিয়ে আমরা বিটিভিতে গিয়ে গাইব ‘নিখিলের চির সুন্দর সৃষ্টি আমার মুহম্মদ রসুল/ ক্বুল মখলুকাতের গুলবাগে যেন একটি ফোটা ফুল’। মায়ের পরিয়ে দেয়া বাসন্তী শাড়ি আর ঢেউখেলানিয়া লেস বসানো ব্লাউজ পরে গায়ে হলুদে নাচছি— ‘সাজিয়ে দে মা ভালো করে, নেচে নেচে করব খেলা পাশের ঐ ফুলবনে’। প্রফুল্ল বিকালে অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন কেরিয়ারের বাটি চুলায় বসিয়ে মা দেখাচ্ছে কত যত্নে চিনি পুড়িয়ে ক্যারামেল বানাতে হয়, সেই গলন্ত চিনির খাম্বাজে কেমন করে হাত ঘুরিয়ে ছাড়তে হয় সামান্য জলের ছিটে। কেন টমেটো দিলে দেরিতে সিদ্ধ হয় মাংস, বেশি ধনে কেমন করে মাংসের স্বাদ নষ্ট করে, কেন এই এতটুকু গরম মসলা চাই বড় মাছের তরকারিতে, কেন করল্লার দাঁত ভেঙে নিয়ে তারপর রাঁধতে হয়, কেন একটু ছোট ধনিয়া দিতে হয় মাছ ভাজার ব্যাটারে কিংবা ফুলকপির বড়ায়। সরু তুলি ধরে দেখিয়ে দিচ্ছে কতটা সরু করে দেয়া যায় জলরঙে আঁকা বউয়ের আনারপাড় কাতান শাড়িতে সোনালি চক্র। আর এসবের বাইরে আমার ডাকাতিয়া মায়ের একটু সরু সেন্স অভ হিউমার ছিল। ধরা যাক, আম্মা একদিন কোঁকড়া চুলে দুই বিননি করে আয়না দেখছে। আমি এসে মায়ের দুই গাল টেনে দিয়ে বলতাম, ‘খোঁখি তোমি সসুরবাড়ি যাবিস?’ মা হেসে বলত, ‘হামি সসুরকে মারিবে!’
আমার নানি কখনো দই পাততো বিশেষ উপলক্ষে, আমরা খেয়ে উঠে গেলে নির্বিকার নানি, আম্মা উঠতে গেলেই বলত, ‘অই হাসু, তর লিগা দই পাতছি খাবি না?’ আমরা দ্বিবিধ কারণে চমকে তাকাতাম, একে তো দোর্দণ্ডপ্রতাপ মাকেও কেউ এইভাবে নাম ধরে ডাকতে পারে, দই আমরা সবাই খেয়ে উঠলাম কাউকে নানি ঘরে-পাতা দই সাধল না তো! মা দই ভালোবাসত বরাবরই। ভেলানগর ছোট চাচ্চুর বিয়েতে গেছিলাম আমরা, গ্রামের বিয়ে, অজস্র মানুষের কোলাহল, শরমিন্দা এবং অধমর্ণ ভঙ্গির মেয়েপক্ষ, বরপক্ষের নির্ণিরোধ প্রতাপ... সে বিয়েতে আমরা খুব আনন্দ করে গামছাপাতা দই খেলাম, সে কী মজার দই। কনে ভারি ফর্সা, ফাউন্টেন পেনের নিবের মতো মুখের গড়ন, পাপড়ির মতো গড়নের চোখ, সেই পদ্মপলাশলোচনার চোখের মণি সোনারঙ। লবঙ্গ নেলপলিশে চুবিয়ে তার ভ্রূসঙ্গমে ফোঁটা ফোঁটা বিন্দু আঁকা হলো, পাউডারে পালিশ করা হনুতে লিপস্টিকে হাত বুলিয়ে সেই হাত ঘষে ব্লাশ করানো গেল কনেকে। কনের বাহারি কোনো ভালনাম ছিল, সেটা আমি ভুলে গেছি— ‘ভাবের সমাধি মাঝে/ নামের মুরলি বাজে/ শুভ শতদলসম ধুলাতে লুটায়’— আমরা ঘোলা রোদে ধূলিময় উঠানে পাতলা রঙিন কাগজের মালা টানাটানি করে খেললাম। এসব বিয়েতে দুরন্ত শিশুরা অনেক সময় পুকুরে পড়ে যায়, সেবার কেউ পড়ে গেল না। বিয়ে চুকে গেলে বউকে নিয়ে বাড়ি এল বরযাত্রীরা, অজস্র ভাঁটফুল ছড়িয়ে ফুলশয্যা গড়া হয়েছে সাবেকি পালঙ্কে। ভাঁট সংগ্রহ করতে গিয়ে ঝোপের আড়ালে দেখেছি গণিত শিক্ষিকার মতো বদরাগী চেহারার বিশাল গোসাপ, তার চোখ মুদতে দীর্ঘ সময় লাগে। আমাদের দাদি ঝোপের গোসাপের মতো নির্লিপ্ত আধ-ক্রুদ্ধ চেহারা করে জিজ্ঞেস করতে লাগল, বরযাত্রীদের মেহমানদারি-খাতিরদারি ঠিকঠাক হয়েছিল কিনা। রাতের খাবার আবার ঘেঁটে যাওয়া পোলাও (গ্রামের মানুষ পোলাও এত ভালোবাসত), কালো মাংস আর লাকড়ির ধোঁয়াগন্ধী জোলো দুধের ফিরনি। (সেই নিভাননা বা নিব-আননা চাচি আমাদের সেই খড়ের চাল ছাওয়া ঢেঁকিঘর— বচ্ছরকার পাটকাঠি রাখা লাকড়িঘর— শুকিয়ে যাওয়া নালা— নালার পাড় ধরে বান্দরলড়ির নতমুখী হলদে ফুলের ঝাড় এসবের ভেতরে ঠিকঠাক ফিট করে গেল, অথবা আঁট হয়ে বসে যাওয়া ছাড়া তার সামাজিক গত্যন্তর ছিল না। তার গল্প আরেক দিনের।) বিয়ে বাড়িতে ফোল্ডিং চেয়ারে বসার সময়ের বিভ্রাট মনে আছে আমার, বসতে গেলেই যে চেয়ার ষড়যন্ত্র করে আমাদের ফেলে দিত। পোলাও পাতে আসার আগে পিরিচে করে আসত ঢাকাই পনির— একচাক টমেটো— একখানা সবুজ কাঁচামরিচ। প্রথম আসত মোরগের রোস্ট, তার মসলার সঙ্গে রেজালার স্বাদের বেশ একটা যুদ্ধ ছিল। মনে আছে আম্মার মুখ সরু করে সস্তার বুদ্বুদ ওঠা কাচের সবুজ গ্লাসে চুমুক দেয়া, ভেতরের আধেয় টক বমিগন্ধী বস্তু ছিল একটি, যার নাম বোরহানি— দইয়ের ডেরিভেটিভ। মা এমন কিছু তীব্রগন্ধী খাবার ভালোবাসত, যেমন কয়েতবেল ভর্তা। মা কিছু অদ্ভুত টেক্সচার ভালোবাসত, যেমন মাংসের ভেতরের তরুণাস্থির, মাছের তুলাপেটির।
কখনো জানতাম না চল্লিশোত্তীর্ণদের গাল কেমন করে সোনালি রোমশ হয়ে আসে, চোয়াল কেন নাশপাতির গড়ানো অংশের মতো ভার, গলার আওয়াজের রিনরিনে ভাব চলে যায়... বদলগুলো দেখতাম, হাসতাম, আম্মাও হাসত। বয়স নিয়ে হাসতে পারা কত বড় মনোবলের পরিচয়! কদিন আগে ইনগ্রিড বার্গম্যানের ‘গুডবাই, এগেইন’ দেখলাম। বার্গম্যানের পরের দিকের ছবি। পর্দায় দুজন দুঁদে অভিনেতা, তার ভেতর একজন কিনা অ্যান্থনি পারকিন্স, অথচ কেউ যেন পর্দায়ই নেই, ফার্স্ট ব্র্যাকেটের ভেতর শুধুই পরাক্রমশালী ইনগ্রিড বার্গম্যান। শেষ দৃশ্যে পারকিন্সকে ফিরিয়ে দিতে দিতে সিঁড়িঘরে দাঁড়িয়ে বার্গম্যান অস্থির হয়ে চিত্কার করে বলে— ‘আই অ্যাম ওল্ড!’ আর চিত্রনাট্য যে লিখেছে তাকে আর কাস্টিং এজেন্টকে আমার একখানা করে চড় কষাতে ইচ্ছে করে। বার্গম্যানের চরিত্রের বয়স মাত্র ৪০। তার ওপর তিনি বার্গম্যান, ৮০ বছর হলেও বার্গম্যান। অথচ চরিত্রের মেয়েটি ফিরিয়ে দিচ্ছে একাগ্র প্রেমিককে, কারণ প্রেমিকের চেয়ে তার বয়স বেশি। আর ফিরিয়ে নিচ্ছে চরিত্রহীন বিশ্বাসঘাতক পূর্বতন প্রেমিককে, কারণ তার সঙ্গে সামাজিকভাবে তাকে মানায়— মেনে নিচ্ছে বিবাহপরবর্তী দ্বিচারণ। মানুষী বার্গম্যানকে নিয়ে সুকন্যা ইসাবেলা রসোলিনি লিখেছিলেন, “মা কখনো ‘আহা বেচারা আমি’ করে ভাবত না, যতই দুঃখ পাক জীবনে, নিজেকে করুণা করত না, পরিতাপ করত না কিছু নিয়ে।” এই একই কথা আমি আমার মাকে নিয়ে ভাবি। নিজেকে বেচারা ভাবতে বা বিনষ্ট কোনো সম্ভাবনার কারণে একদিনের জন্য সন্তাপ করতে আমি আম্মাকে দেখিনি।
বিবিধ ত্যাগ আর পরিত্যাগের গাথার নাম আম্মা, কত অনায়াসে, কত বিনামূল্যে বিকিয়ে গেল মায়ের যৌবন, তেমন কোত্থাও না গিয়ে, তেমন কিছুই না আস্বাদ করে, কেবল একবার সমুদ্রসৈকতে সাগর কলমিলতাগুলোর মাঝে সবজেটে শাড়ি পরে থেবড়ে বসে ছবি তুলে ফুরিয়ে গেল (জানা গেল না বালুকাবেলায় কোনো একটি নাম মায়েরা লিখেছিল, সাপ্তাহিক নাটকে তখন বাসরকক্ষে ঢুকেই স্বামী জিজ্ঞেস করত, ‘আমাকে পেয়ে তুমি সুখী হয়েছ তো?’, আস্বাদ না করতে দিয়েই স্বাদলাভের স্বীকারোক্তি-আদায়ের কাল তখন।), আকাশ অন্ধকার করে আসা বৃষ্টির দিনে স্কুলগেটে রুচিহীন নাইলন-জর্জেট (সহজে শুকায়, গন্ধ হয় না) শাড়ি পরে ছাতা মাথায় যারা দাঁড়িয়ে থাকত, তাদের সবার মুখ কেন এত ঝাপসা? হুড়কো দেয়া কাঠের বাক্সের ভেতরকার সাদা-কালো টিভি থেকে গোল আয়নার ড্রেসিং টেবিলের আয়না থেকে অ্যানালগ ফোন হয়ে কোনো এক দিকাভিমুখে তারা কোথাও যাচ্ছিল কি, নাকি শুধু একটি হস্তান্তর প্রক্রিয়াকেই তারা জেনে গেল চরিতার্থতা হিসেবে?






