অনুবাদ: শওকত হোসেন

[আমিন মালুফ: জন্ম বৈরুতে, ১৯৪৯ সালে। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি প্যারিস নিবাসী। সমাজবিদ্যা ও অর্থনীতিতে উচ্চতর পাঠ শেষে তিনি যোগ দেন লেবাননের দৈনিক আন-নাহারে, আর এ পত্রিকার হয়েই ঘুরে বেড়ান দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে। তিনি প্রত্যক্ষ করেন ইথিওপিয়ার রাজশাসনের পতন, সায়গানের শেষ লড়াই। লেবাননের যুদ্ধের কারণে বাধ্য হন দেশ ত্যাগে। প্যারিসে অভিবাসী হয়ে আবার সাংবাদিকতায় ফেরেন, আবার শুরু হয় বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ: মোজাম্বিক থেকে ইরান, আর্জেন্টিনা থেকে বলকান অঞ্চল। পরবর্তীতে তিনি আন-নাহারের আন্তর্জাতিক সংস্করণের সম্পাদক হন, তারপর পুরোদস্তুর লেখালেখিতে মনোযোগী হওয়ার আগে আমিন মালুফ প্রধান সম্পাদক হন সাপ্তাহিক জোনাফ্রিকের। মূলত তিনি ফরাসিতে লেখালেখি করেন। ৪০টিরও বেশি ভাষায় তার বই অনূদিত হয়েছে।

দ্য ক্রুসেড থ্রু আরব আইস, লিও আফ্রিকানাস, সমরখন্দ, দ্য গার্ডেনস অব লাইট, দ্য ফার্স্ট সেঞ্চুরি আফটার বিয়াত্রিস, দি রক অব তানিয়োস, পোর্ট অব কল, ইন দ্য নেম অব আইডেন্টিটি: ভায়োলেন্স অ্যান্ড দ্য নিড টু বিলং, বালথাজার অডিসি, লাভ ফ্রম এফার তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।]

আপনি বাড়িতে আরবিতে কথা বলে বড় হয়েছেন, অথচ লেখালেখির (অন্ততপক্ষে উপন্যাস) বেলায় বেছে নিয়েছেন ফরাসি ভাষা। গোড়ার দিকে লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার কোনো আদর্শ ব্যক্তিত্ব থেকে থাকলে তারা কারা?

আমার আদৌ কোনো আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিল কিনা, আমি নিশ্চিত নই। তবে আরবি কবিতায় বরাবরই আগ্রহী ছিলাম। আমার বাবা ছিলেন কবি ও সেক্যুলার। ধ্রুপদী আরবি কবিতার বিপুল ভাণ্ডার ছিল তার। আমাকে সাধারণভাবে আরব বিশ্বের বাইরে অজানা আল-মুত্তানবীর মতো সব মহান লেখকদের কথা শোনাতেন। এ অসাধারণ মানুষটি জীবনের সূচনায় নবী হিসেবে অনুসারী আকর্ষণে ব্যর্থ হয়ে শেষে রাজনীতিতে ঢোকার চেষ্টা করেন। পদ-পদবির আশায় নানা দরবারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। রোমাঞ্চকর ও বিভ্রান্তির জীবনের মাঝামাঝি একটা সময়ে আরবিতে বেশকিছু চমত্কার কবিতা রচনা করেন তিনি। ধ্রুপদী আরবি কবিতার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে সেসব।&dquote;&dquote;

এবং মূলত আপনার বাবাই এ ধরনের লেখকদের সঙ্গে আপনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন—

হ্যাঁ, তিনি আমাকে এ ধরনের ও ফার্সি কবি ওমর খৈয়ামের (আরবির পাশাপাশি ফার্সিতেও লিখেছেন তিনি) এবং প্রাক-ইসলামী ষষ্ঠ শতাব্দীর কবি আন্তারাহর মতো অন্য কবিদের গল্প বলতেন। আন্তারাহ ইবনে শাদ্দাদের জীবন শুরু করে শেষে যুদ্ধ ক্ষেত্রে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে যোদ্ধা-কবি ও ধ্রুপদী প্রেমিকের আদর্শে পরিণত হন— গোটা আরব জাহানে সুবিদিত তাকে নিয়ে অসংখ্য কাহিনী আছে। তবে আমি আলবেয়ার কামু ও স্তেফান সুয়াইগের মতো লেখকদেরও আবিষ্কার করছিলাম এবং কিছু সময় বাদে অরওয়েল ও হেমিংওয়েকে— এদের সবাই ঠিক আদর্শ না হলেও নিশ্চিতভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছেন। এ গোটা সময়টায় একটিমাত্র স্থায়ী প্রভাবের কথা যদি বলতে হয় তো নিশ্চয় করে স্তেফান সুয়াইগ হবেন।

আপনার উল্লিখিত বেশির ভাগ লেখকই ভবঘুরে বর্ণাঢ্য জীবন কাটিয়েছেন। তাদের এ-জাতীয় কাহিনীই কি আপনাকে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনায় টেনে নিয়ে গেছে?

হয়তো। আমার মনে হয়, অতীতের লেখকদের মুখোমুখি হওয়ার বেলায় এটা স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। তরুণ বয়সে আমি ‘মহান আদর্শে’র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট (স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধে অরওয়েল ও হেমিংওয়ের মতো) অথবা স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে সংগ্রামী লেখকদের প্রতি মন্ত্রমুগ্ধ ছিলাম। এর কারণ হয়তো আমার নিজের ঘটনাবিহীন জীবন। আমি স্রেফ একজন দর্শক, দুনিয়াটাকে বোঝার এবং ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি; আমার লেখালেখি জীবনের অভিজ্ঞতাপ্রসূত নয়।

এ অবস্থাটা কি কেবল আপনার বেলায়ই অনন্য, নাকি বেশির ভাগ লেখকের ক্ষেত্রে দর্শকের ভূমিকা স্বাভাবিক ব্যাপার?&dquote;&dquote;

না, ঔপন্যাসিকের পক্ষে এটা স্বাভাবিক নয়, আমার পটভূমি আর মেজাজের কারণেই আমার বেলায় এমন হয়েছে। সব ধরনের লেখকই আছেন। মার্শেল প্রোস্ত বলতে গেলে ঘরের বাইরে পা রাখেননি, আবার কনরার্ড সারা দুনিয়া ঘুরে ফিরেছেন; দুজনই চমত্কার লিখেছেন। কোনো লেখকেরই তার জীবনের বিষয়-আশয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। তবে তিনি কী লিখতে পারেন এবং কোনটা লিখতেই হবে, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।

আপনার আত্মজীবনী অরিজিনে আপনি আপনার পূর্বপুরুষদের দূরদূরান্তের দেশে পাড়ি জমানোর কথা লিখেছেন। ১৯৭৬ সাল থেকেই আপনি প্যারিসে থাকছেন। নিজেকে কি নির্বাসিত বলবেন? নাকি অভিবাসন স্রেফ লেবানিজ অবস্থারই একটা অংশ?

আমি নিজেকে কখনই নির্বাসিত হিসেবে বর্ণনা করিনি, তবে ওই তকমা দিলে অস্বীকারও করিনি। আপনি যেমন বললেন, এটা একটা লেবানিজ অবস্থা এবং আমি স্রেফ আমার পূর্বসূরিরা আগে যা করেছেন, তা-ই করছি। তরুণ বয়সে কখনই বিদেশে থাকার কথা ভাবিনি, কিন্তু তারপর যুদ্ধ বেধে গেল আর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলাম। সেই খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ সালে টায়ারের রাজকন্যা মেসোপটেমীয়দের সঙ্গে বিরোধের কারণে কার্থেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দেশ ছাড়ার সময় থেকে শুরু করে তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে লোকে লেবানন ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। আমাদের অসংখ্য মানুষের দেশ ছাড়ার কাহিনী শুনেই বেড়ে উঠি আমরা, তো নিজের বেলায় এটা মেনে নেয়া সহজ হয়ে যায়।

ফরাসি সাহিত্য পুরস্কার প্রি-গোকুর পাওয়া আপনার উপন্যাস দ্য রক অব তানিওস (১৯৯৩) ১৮৪০’র দশকে লেবাননের উপদলীয় সংঘাতের সময়ের ঘটনা নিয়ে লেখা। এটি লেখার সময় আপনি কি ওই সময় এবং বর্তমানের ভেতর তুলনা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন?&dquote;&dquote;

আমি বরাবরই ভেবেছি একদিন আমাকে লেবাননের সাম্প্রদায়িক বিভাজনের শুরু নিয়ে একটি বই লিখতে হবে, যখন বহু গোষ্ঠী ওই ছোট জায়গায় আশ্রয়ের খোঁজ করেছে (সাধারণত ক্রিশ্চানদের নির্যাতনের শিকার ক্রিশ্চান, অন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের হাতে নির্যাতিত মুসলিম)। টানাপড়েন ছিল, কিন্তু ১৮৪০-এর দশকের আগে তার বিস্ফোরণ ঘটেনি; দুর্ভাগ্যবশত অশান্তির ভেতর বাস করতে শেখাটা অপরিবর্তনীয়— যেকোনো যুদ্ধের পর ঘড়ির কাঁটা আর পিছিয়ে আনা যায় না। তো আমি ৪০ বছর আগে সূচিত যুদ্ধ নয়, বরং ১৫০ বছর ধরে লেবাননের অবস্থা ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছি।

আপনার শেষ নন-ফিকশন গ্রন্থ ডিজঅর্ডার ওয়ার্ল্ড আরব জাগরণের আগে রচিত। এখন জাগরণের কোনো একটা বিষয় আপনাকে বিস্মিত করে থাকলে সেটা কী এবং লিবিয়া, মিসর ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোর বেলায় ঠিক কী দেখতে পাচ্ছেন?

সবার আগে আপনার ব্যবহূত শব্দটা ‘জাগরণ’-ই সঠিক। আরব বসন্তের মতো কিছুর ব্যবহার স্বল্পদর্শী। শুরুর দিকে খুবই আশাবাদী ছিলাম আমি। তিউনিসিয়ার মতো একটা জায়গার পরিবর্তন খুবই দরকার। আমি এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা মনে করি, তিন বছর পেরোনোর পর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি বলে হতাশ বোধ করেছি। এসব দেশের নেতারা পরিবর্তন, আধুনিকতা ও উন্মুক্ত সমাজের জন্য (মূলত প্রান্তিকায়িত তরুণদের) সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিতে পারেননি। পুরনো শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় উগ্রবাদকে ঠেকিয়ে রেখেছিল কিংবা পাশ্চাত্যকে তেমন করার কথা বুঝিয়েছে, কিন্তু তারা উত্খাত হওয়ামাত্রই ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো একে তাদের সময়ও ধরে নিয়েছে... মিসরে জনগণ মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থানে এতটাই ভীত ছিল যে, তারা স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীর হাতে আবার নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছে। কিন্তু সুযোগটা এখানে হাতছাড়া হয়ে গেছে, অন্তত গোড়ার দিকে তৃতীয় বিকল্পের, সেক্যুলার বিকল্পের একটা জায়গা ছিল। এটা চরম হতাশাজনক এবং সিরিয়ায় এটা এখন হতাশাজনকের চেয়েও খারাপ। গৃহযুদ্ধের পরিণামে আমি কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি না। এবং যুদ্ধের কারণে জেগে ওঠা ঘৃণা এর সঙ্গেই ফুরিয়ে যাবে না। সিরিয়ার কোনো পর্যায়েই আমি কোনো আশা দেখছি না— এটা একটা পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাজেডি।

এরই মধ্যে এসব বিষয়ে আলোকপাত করেছে এমন কোনো বইয়ের নাম বলতে পারেন? একজন লেখকের চলমান বাস্তবতাকে তুলে ধরার বা চিত্রিত করার কোনো দায়িত্ব থাকার কথা বিশ্বাস করেন?&dquote;&dquote;

এটা বলার পক্ষে বেশি তাড়াতাড়ি হয়ে যায়, আমি সব খবর রাখছি না। তবে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই নিশ্চিত জানি, এ ট্র্যাজেডি থেকে শিল্পকলা ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেরিয়ে আসবে। কোনো জাতি যখন ধ্বংসের প্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন বিপুল শক্তির শিল্পকলা আন্দোলন দেখা দেয়।

নিজের বেলায় যাপিত অভিজ্ঞতার দরকার না থাকার কথা বললেও আপনি নিশ্চিত যে অন্যরা গুরুত্বপূর্ণ রচনায় প্ররোচিত হবেন?

অনিশ্চয়তার সময়গুলোই সাধারণত অসাধারণ সাহিত্যের জন্ম দেয়। রাশিয়ার দিকে দেখুন, পুরনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছিল কিন্তু নতুন ব্যবস্থা আসেনি, এমন একটা সময়ে গোগোল থেকে গোড়ার দিকের গোর্কি— অসংখ্য নাম; বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এটা অসাধারণ সময় ছিল। দুটি বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে ইউরোপও একই রকম ছিল— আসন্ন ট্র্যাজেডি টের পেয়ে থাকতে পারে কেউ, কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে এটা ছিল অনন্য সময়।

পেছনে যাওয়া যাক, আপনার দ্য ক্রুসেডস থ্রু দ্য আরব আইস ক্রুসেডগুলোর ঐতিহাসিক বিবরণের ভারসাম্য নিয়ে কাজ করতে চায় বলে মনে হয়। আপনার কি এমনই ধারণা, নাকি এটা আপনাকে আগ্রহী করে তোলা একটা সময়কাল মাত্র?

ক্রুসেডগুলোর বাস্তবতা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করা আমার লক্ষ্য ছিল না; বরং এটা বলা যে পুরো ঘটনাই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে। পশ্চিম ও আরব বিশ্বের ভেতর জটিল সম্পর্কের ভিত্তিমূলক ঘটনা ছিল ক্রুসেড। আমি এটা বলছিলাম না যে এভাবেই আমাদের ক্রুসেডগুলো ব্যাখ্যা করা এবং মনে রাখা উচিত, আমি স্রেফ সেগুলোকে বহুভাবে দেখা সম্ভব— এমন ইতিহাসের নজির হিসেবে ভেবেছি।

তরুণ বয়সে সাংবাদিক হিসেবে আপনি আরবিতে লেখালেখি করতেন, কিন্তু আপনার উপন্যাসগুলো ফরাসিতে লেখা। আপনি কি প্রতিটি ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন বিষয় প্রকাশ করতে সক্ষম? আরবি, ফরাসি এবং অন্যান্য ভাষার ভেতর আপনার পাঠের রুচির পার্থক্য আছে?

এটা নেহাত সহজ একটা ক্যারিকেচার। তবে আমি বলব, আমি কথা বলি আরবিতে, ফরাসি ভাষায় লিখি আর পড়ি ইংরেজিতে। ইংরেজি আমার নিষ্ক্রিয় ভাষা— এটা আমি ভালোই পড়তে পারি, মোটামুটি ভালো বলতে পারি, কিন্তু লেখার সময় অস্বস্তি বোধ করি। ইংরেজিকে আমি জ্ঞান ও শিক্ষার একটা ভাষা হিসেবে দেখি। এ ভাষায় বিপুল লেখা পড়ি আমি। মোটামুটি ৩৭ বছর ধরে মূলত ফরাসিতে লিখছি। এ ভাষাতেই সবচেয়ে সাবলীলভাবে লিখি, যদিও লেবাননে বিরল ক্ষেত্রে এ ভাষায় কথা বলি। আজো আমার স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আরবিতেই কথা বলি, কিন্তু আপনি যেমন বললেন, লেবানিজ পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে আরবি ভাষায় কাজ করতাম। আমার বিশের কোটার মাঝামাঝি বয়স অবধি কখনো লেখক হলে আরবিতেই লিখব বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, কিন্তু দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা বদলে যায় এবং আমি দৃঢ়তার সঙ্গে ফরাসিতে লিখতে শুরু করি।

সেটা কেন? আপনার ‘দৃঢ়তার সঙ্গে’ কথাটার ব্যাপারে আমি আগ্রহী...

বেশ, একজন লেখককে তার আশপাশের লোকজন বোঝে এমন একটা ভাষায় লিখতে হয়। সেটা না হলে লেখালেখি খুবই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। একপর্যায়ে একটি ইতালীয় পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতে বলা হয়েছিল আমাকে, সেটা ওরা তর্জমা করে নিত। আমি কল্পনা করতে পারি না, এমন এক শ্রোতার জন্য লেখা আমার কাছে বেশ কঠিন ঠেকেছিল।

কিন্তু আপনার বইয়ের বেলায় কী, যেগুলো এরই ভেতর তর্জমা হয়ে গেছে?&dquote;&dquote;

এটা ভিন্ন বিষয়। কলাম লেখক সাংবাদিকদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। বক্তব্য রাখার সময় শ্রোতাদের এবং তারা কী চান জানতে হয় তাকে। ফ্রান্সে আরবিতে লিখতে হলে আমার পক্ষে বাড়তি চাপ হয়ে যেত, যদিও লেবাননে ফরাসিতে লেখার কথা কখনো মাথায় আসেনি; মনে হয় দুটি ভাষাই শেখার সুযোগ পাওয়ায় ভাগ্যবান ছিলাম আমি। লেবাননে থেকে গেলে আমি হয়তো আরবিতেই লেখালেখি চালিয়ে যেতাম।

২০০৭ সালে আপনি ফ্র্যাংকোফোনি ও ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে ফরাসি ভাষার গুরুত্বের পক্ষে একটি আবেদনে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। মোটামুটি সেই একই সময়ে আপনি একাডেমি ফ্রঁসেস থেকে আপনার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। এখন আপনি এর সদস্য—

ফ্র্যাংকোফোনি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা তুলে ধরতে আমি ওই আবেদনে স্বাক্ষর করি। ওই আবেদনের কিছু বিষয়ের সঙ্গে আমি আংশিক সহমত ছিলাম, কিন্তু ফ্র্যাংকোফোনির সংজ্ঞায় মূল ধারণা থেকে বিচ্যুতি লক্ষ করেছি, সেটা ছিল সব ফরাসি ভাষাভাষী মানুষকে একটা সাধারণ ভাষার অধীনে আনা। কিন্তু শব্দটি পাল্টে গিয়ে ‘বিদেশী’ বোঝাতে শুরু করে। লোকে তির্যক কণ্ঠে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল, কেউ ‘ফ্র্যাংকোফোনি’ বা ‘ফরাসি লেখক’ হতে পারেন কিনা? প্রথমে ব্যাপারটাকে হালকাভাবে নিয়েছিলাম, কিন্তু গোউদেলোপ বা ধরুন মার্টিনিকের লেখক, যাদের পিতামহরাই ফরাসি নাগরিক ছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গ বলে তাদের ‘ফ্র্যাংকোফোনি’ তকমা দেয়া শুরু হলে একে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে শুরু করি। আমি যুক্তি দেখাই, কূটনীতি ও নীতিমালায় শব্দটি প্রয়োগ এখনো ঠিক আছে, কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে নয়; যেখানে এটি বৈষম্যের পরিভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তো লিটারেচারে ফ্র্যাংকোফোনির বদলে আমাদের লিটারেচারে দে ল্যাঙ্গুয়ে ফ্রঁসে নিয়ে কথা বলা উচিত। আপনি যেমন বললেন, আমি একাডেমিক ফ্রঁসেসের আবেদন করছিলাম, কিন্তু ফ্র্যাংকোফোনি-সংক্রান্ত আমার বিবৃতিতে কয়েকজনের কুঞ্চিত ভ্রূ দেখে (অন্য কোনো অজুহাতে) প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিই। চার বছর পরে ফের দরখাস্ত করি এবং নির্বাচিত হই।

অতীতে আপনি নিজেকে খুবই নিঃসঙ্গ মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আপনার কি কোনো বিশেষ লেখালেখির অভ্যাস বা লেখার জন্য রুটিন আছে?

নিশ্চয় অভ্যাস আছে। আমি যত্রতত্র লিখতে পারি না। দুটো জায়গায় লিখি: একটা হলো প্যারিসে আমার স্টাডিতে, যেখানে আমার বই আর কম্পিউটার রয়েছে...।

আপনি কি সরাসরি কম্পিউটারেই লেখেন, প্রথম খসড়াও?

হ্যাঁ, আমি বরাবরই কম্পিউটারে লেখালেখি করি। ৩০ বছর আগে ক্রুসেড নিয়ে কাজ করার সময় আমার প্রথম কম্পিউটারটা ছিল অ্যাপেল-২ (আমার ধারণা আসলে কম্পিউটারে লেখালেখি করা প্রথম ফরাসি লেখকদের অন্যতম ছিলাম আমি)। গ্রীষ্মের তিন কি চার মাস আমার স্ত্রীর সঙ্গে আটলান্টিকের আইল ডি’অরে কাটাই, সেখানেও আমার লেখার ঘর আছে, সাধারণত রোজ সকালে লিখি, আন্দাজ সকাল ৮টার দিকে বা যখন ঘুম ভাঙে, তখন শুরু করি। ঘড়ি আমার সহ্য হয় না। মাঝ বিকাল পর্যন্ত লিখে পরদিন সকালের আগে আর বইটার কথা না ভাবতে বাধ্য করি নিজেকে। সন্ধ্যায় পড়ি আর টেপে গল্প শুনি, খুবই ভালো লাগে। দ্বীপে থাকলে লম্বা সময়ের জন্য সাগরবেলায় হাঁটতে যাই।