পৃথিবীতে ব্যবহৃত প্রাচীন গিরিপথগুলোর অন্যতম খাইবার গিরিপথ। এটি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ পথ। বলা হয় এটি প্রাচীন রেশমপথের অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ ছিল। এখন বলা হয় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর কথা। তবে ১৯৪৭ সালের আগে বলা হতো খাইবার থেকে কন্যাকুমারী।
খাইবার গিরিপথ নিয়ে আছে এক পৌরাণিক ইতিহাস। যার সঙ্গে যুক্ত আছে পার্সিয়ানদের উত্থান ও বিকাশ। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে যখন পারস্যের রাজা সাইরাস দ্য গ্রেট জন্মগ্রহণ করেন, তার হাত ধরেই পার্সিয়ানদের উত্থান হয়েছিল। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডটাসের মতে, পার্সিয়ানরা ছিল আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। হেরোডটাসের দেয়া বিবরণ থেকে জানা যায় রাজা অস্তাইজেসের কন্যাসন্তানের ঘর আলো করে এসেছিল সাইরাস। তবে অস্তাইজেস সর্বদাই সংকিত থাকতেন নিজ সাম্রাজ্য শাসন নিয়ে। হাজারো পারিবারিক শত্রুতা উপেক্ষা করেই সাইরাস হয়ে উঠেছিল সাইরাস দ্য গ্রেট।
সাইরাস পারস্যে আধিপত্য বৃদ্ধিতে সেনাবাহিনী গঠন করেন। তিনি সফল হন এবং নিজেকে সেনাবাহিনীর প্রধান ঘোষণা করেন। তারপর তিনি রাজধানী একবাটানার দিকে অগ্রসর হন। রাজা অস্তাইজেসের সেনাবাহিনীর সঙ্গেই যুদ্ধ বেঁধে যায়। সাইরাস তার বাহিনী নিয়ে জয়ী হন এবং এভাবে হেরোডটাসের দেয়া বর্ণনা থেকে জানা যায় কীভাবে সাইরাস দ্য গ্রেট মিডিয়ার শাসনক্ষমতা নিয়েছিলেন। এ বর্ণনায় সত্য, গুজব ও পৌরাণিক কাহিনী সবই মিশে আছে। সত্য ও কল্পনা ছিল এ গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
হেরোডটাস ছাড়াও বেশকিছু অন্যান্য সূত্র যেমন নাবোনিডাস ক্রনিকল থেকে জানা যায়, যখন অস্তাইজেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, সাইরাস পারস্যের ভাসাল রাজ্যের সিংহাসনে ছিলেন। ৫৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সাইরাস তার পিতা ক্যাম্বিসেসের উত্তরসূরি হয়েছিলেন।
রাজা অস্তাইজেসকে পরাজিত করার জন্য সাইরাস দুটি রাজ্য দখল এবং পারস্যের দুটি অঞ্চলকে একত্রিত করেছিলেন। যে রাজ্যটি আকেমেনিয়ান রাজ্য হিসেবে নামকরণ করা হয়েছিল। কারণ এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীদের আকেমেনিস বলা হতো।
একজন উচ্চাভিলাষী তরুণ ছিলেন রাজা সাইরাস। তার নতুন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুটগুলো পশ্চিমে ছিল এশিয়া, ভূমধ্যসাগর ও মিসরের পূর্বে ভারত এবং মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে এমন একটি সূত্র ছিল খাইবার গিরিপথ।
সাইরাস শুরু থেকেই সম্প্রসারণবাদী কৌশল অনুসরণ করেছিলেন। তার প্রথম লক্ষ্য ছিল ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল দখল করা এবং এর গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। বাণিজ্যিক রুটের পশ্চিম অঞ্চলে তিনি এরই মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এশিয়া মাইনরের সম্পূর্ণ আধিপত্য ও ভূমধ্যসাগরে বাণিজ্যিক আধিপত্য অর্জনের জন্য সাইরাস ইজিপ্সিয়ান সাগরকেন্দ্রিক গ্রিক রাজ্যগুলো এবং আয়োনিয়ান উপকূলে অবস্থিত গ্রিক বাণিজ্যিক উপনিবেশগুলো জয় করেছিলেন।
সাইরাস পরবর্তী সময়ে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দখল করতে গিয়ে উপজাতিদের দ্বারা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। এ বিপদ মোকাবেলায় তিনি খাইবার গিরিপথে আসেন। এবং এ পথ ধরেই তিনি হিরকানিয়া, পার্থিয়া, ড্রাঙ্গিয়ানা, আরিয়া, আরাকোসিয়া, সোগদিয়ানা ও চোরাসমিয়া জয় করেন। তার সীমানা জাক্সার্টেস নদীতে (আধুনিক সির দরিয়া নদী) নিয়ে যান। এটি কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে আধুনিক খোরাসান এবং সিস্তান হয়ে পশ্চিম ও দক্ষিণ আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
সাইরাসের মৃত্যুর পর তার ছেলে ক্যাম্বিসেস ক্ষমতায় বসেছিলেন। তবে দারিয়ুসের ষড়যন্ত্রে তার সংক্ষিপ্ত রাজত্বের সমাপ্তি ঘটেছিল। দারিয়ুস সাম্রাজ্যের প্রতিটি অংশে শাসন পুনরুদ্ধার করতে লড়াই করেছেন। সাম্রাজ্যজুড়ে খাইবার গিরিপথ পর্যন্ত অস্থিরতা দমন করতে হয়েছিল এবং দারিয়ুস নয়জন বিদ্রোহী রাজার বিরুদ্ধে ১৯টি যুদ্ধ করেছিলেন। এ সহিংসতার সময়টিই দারিয়ুস ৫২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলন ও একবাটানার মধ্যবর্তী রয়্যাল রোডের উত্তর-পশ্চিম ইরানের বেহিস্তুনে (বর্তমানে বিসিতুন) পাহাড়ের মুখে একটি শিলালিপি কেটে জয় উদযাপন করেছিলেন।
খাইবার পাসের ব্যবহার নিয়ে পার্সিয়ানরা বরাবরই সচেতন ছিল। কারণ পার্সিয়ানরা নিঃসন্দেহে ভারতের সুবিশাল সম্পদ সম্পর্কে সচেতন ছিল। দারিয়ুস হিন্দুশকে সাম্রাজ্যের বিংশতম অংশ বানিয়েছিলেন এবং এটি বিপুল পরিমাণ কর প্রদানে সহায়তা করেছিল। ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বার্ষিক প্রচুর স্বর্ণ-রুপা আসত। পার্সিয়ানরা লাভের আশায় তাদের সামাজ্য ভারতের দিকে আরো প্রসারিত করতে থাকে। এটি ছিল পারস্য ও ভারতীয়দের মধ্যে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া। খাইবার গিরিপথ হয়ে সাম্রাজ্য এবং রাজবংশের অধীনে বহু শত বছর ধরে বস্তুগত ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির সমৃদ্ধ বিনিময় হয়েছিল। এ ফলপ্রসূত লেনদেনে অংশগ্রহণের আশায় কবি, কারিগর, অভিযাত্রী ও অনুসন্ধানকারী, পণ্ডিত এবং পবিত্র ব্যক্তিরা খাইবার গিরিপথটি উভয় দিক দিয়ে অতিক্রম করেছিল। তক্ষশিলা ও গান্ধারের মতো প্রধান শহরের কাছাকাছি এর অবস্থান। বিশেষ করে বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হওয়ার কারণে ভ্রমণকারী পণ্ডিত এবং পবিত্র ব্যক্তিদের জন্য একটি গন্তব্যে পরিণত হয়েছিল।
৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুরু নামে একজন ভারতীয় রাজা হাইডাস্পেস নদীর পূর্ব তীরে দাঁড়িয়েছিলেন, যা বর্তমান পাকিস্তান। জলের ওপারে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন হাজার হাজার সৈন্য জড়ো হচ্ছে, নদী পার হয়ে তারা সেখানে রাজ্য আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। তক্ষশিলার প্রতিবেশী রাজ্য শাসকের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পুরুর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ব্যাকট্রিয়া ও সোগদিয়ানা থেকে শুরু করে সুদূর মধ্য এশিয়ার অশ্বারোহী সৈন্য এসেছে এদিকে। সেই সঙ্গে সিদিয়ান ভাড়াটে ঘোড়সওয়ার। গ্রিক ও মেসিডোনিয়ান বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। তার নেতৃত্বে যুদ্ধে মিলিত হয় ভারতীয়রাও। সৈন্যদের দ্রুত সাফল্যের সঙ্গে এশিয়াজুড়ে অভিযান চালায়।
আলেকজান্ডার বেশ কয়েক বছরের প্রচারাভিযানে তার বিজিত ভূমির প্রতিটি অঞ্চল থেকে সৈন্য নিয়ে তার সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন। হাইডাস্পেস অভিযানের আগেই তার একটি বিশাল বাহিনী ছিল। যার সংখ্যা2১ লাখ ২০ হাজার বলা হয়। অন্যদিকে পুরুর ছিল বেশ ছোট সেনাবাহিনী। সম্ভবত ৩০ হাজার পদাতিক সৈন্য এবং চার হাজার অশ্বারোহী ও ৩০০ রথ। তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার হাতি দল। যার জন্য গ্রিকরা বেশি ভয় পেত। তবে পুরু তার প্রধান প্রতিরক্ষা হিসেবে নদীটিকে ব্যবহার করার লক্ষ্য রেখেছিলেন। এ যুদ্ধে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদী পার হওয়ার জন্য আগে ব্যবহৃত নৌকা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তার মধ্য এশীয় অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে পুরুর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। ফলে পুরুর ভারতীয় দল পেছনে হটতে বাধ্য হয়। ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এশিয়ায় আলেকজান্ডার আক্রমণ শুরু করার পর বিশাল সম্পদশালী রাজ্যগুলো অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তার অধীনে চলে আসে। তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারের এক পর্যায়ে মেসিডোনিয়ান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দূরবর্তী প্রান্তে, খাইবার গিরিপথ ছাড়িয়ে যান।
এথেন্স, স্পার্টা ও পারস্যের ত্রিভুজ সশস্ত্র রাজনীতির যুগে আলেকজান্ডার আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছিল। অন্য নগর রাজ্যগুলোর দখলে প্রধান রুট হিসেবে আকৃষ্ট হয়েছিল খাইবার রুট। আলেকজান্ডারের ভারত জয়, পুরুর সৈন্যসামন্তকে হারিয়ে পরে আশপাশের বহু অঞ্চলকেই আলেকজান্ডার দখল করেছেন। প্রাচীন বিবরণগুলো থেকে স্পষ্ট জানা যায়, এ নতুন লক্ষ্যকে জয় করার জন্য ভারতের গভীরে তাকে প্রবেশ করতে হয়েছিল।
আলেকজান্ডারের ভারত ছেড়ে যাওয়ার পর মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসক চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নিজেকে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তবে তার আগে তাকে ধননন্দকে পরাজিত করতে হয়। মন্ত্রী চাণক্যের সহায়তায় চন্দ্রগুপ্ত এ মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। চন্দ্রগুপ্ত নিজেও ছিলেন সুবুদ্ধিমত্তার অধিকারী এবং অনেকের ধারণা তিনি বিশেষ ক্ষমতার অধিকারীও ছিলেন। চাণক্যের লেখা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকেই মৌর্যদের সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে জানা যায়। কৌটিল্যকে প্রায়ই ম্যাকিয়াভেলির সঙ্গে তুলনা করা হয়। বাস্তবতাকে তিনি সফলভাবে কাজে লাগিয়ে রাজ্যকে সব দিকে প্রসারিত করেছেন। শাস্ত্র বর্ণনায় আরো জানা যায় রাজ্যে স্বর্ণ, লোহা ও তামা খনন করে পাওয়া যায় এবং অন্যান্য অনেক ধাতুও ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়েছিল। এ উৎপাদনশীলতা চীন ও ব্যাবিলনের মতো দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যের যোগাযোগ বজায় রেখেছিল। সমুদ্রপথে বাণিজ্য চলত। মৌর্যরা পাটলিপুত্র থেকে তক্ষশিলা পর্যন্ত একটি প্রধান সড়কও নির্মাণ করেছিল, যা দুই হাজার বছর পরে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোডের একটি অংশ ছিল। বাণিজ্য ও সৈন্যদের থাকার জন্য রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি সরকারের জনসাধারণের কাজের মধ্যে রয়েছে কূপ উন্নয়ন, সেচ প্রকল্প ও বাঁধ এবং বাগান তৈরি ইত্যাদি।
মৌর্যদের রাজধানী ছিল গঙ্গার তীরে পাটলিপুত্রে। মূলত সব বাণিজ্য ও যোগাযোগ রক্ষায় খাইবার গিরিপথ ছিল প্রয়োজনীয় রুট। আবার গ্রিকদের দ্বারা ৩০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডারের একজন উত্তরসূরি সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের কাছ থেকে পাঞ্জাব পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় খাইবার গিরিপথ দিয়ে তার সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়েছিলেন। সাম্রাজ্যের বিভাজন নিয়ে নানা দ্বন্দ্বের মধ্যেই একটি ছিল বাণিজ্যরুটে আধিপত্য বিস্তার। সম্রাট অশোক মৌর্যের পর মৌর্য রাজবংশের পতন ছিল নাটকীয়। সাম্রাজ্যটি দুর্বল রাজাদের শাসনামলে ভেঙে যায়।
খ্রিস্টপূর্ব ২৫০ সাল থেকে মৌর্য সাম্রাজ্য পতনমুখে যখন ছিল সে সময় খাইবার গিরিপথ একটি দীর্ঘ অস্থিরতার যুগে প্রবেশ করেছিল। সে সময় রাজ্যগুলোর দ্রুত উত্থান ও পতন হচ্ছিল। ৩০০ বছর ধরে প্রতিযোগিতার মধ্যে ছিল এ জনপথ। এ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এসেছিল প্রায় সব জাতিই। নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চলেছে দীর্ঘ সময়। গ্রিক বসতি স্থাপনকারীরা আলেকজান্ডারের উত্তরাধিকারীদের থেকে নিজেদের স্বাধীন করেছিল এবং যেহেতু তাদের অনেক উৎপাদনশীল জমি ছিল তাই তারা একটি শক্তিশালী রাজ্য গঠন করেছিল। এর মধ্যেই সিদিয়ান ও পার্থিয়ান যাযাবর জাতিরা মধ্য এশিয়ার গভীর থেকে দক্ষিণে প্রবেশ করতে শুরু করে। আবির্ভাব ঘটে কুশানদের। মধ্য এশিয়া থেকে আসা জনগণের আক্রমণের তুলনায় কুশানদের আক্রমণ ছিল অনেক বেশি। বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ফলে দুর্বলরা বিতাড়িত হতো। বেরিয়ে পড়ত নতুন ভূমির সন্ধান করার জন্য, যেখানে তারা পশুপালন করতে পারবে। এমন ভাবনা থেকেই এ যাযাবর জাতিগুলোর খাইবার গিরিপথ ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশ করেছিল।
গ্রিক ও যাযাবর জাতিদের ভারতে প্রভাব ছিল এমন একটি ইঙ্গিত মহাভারতেও পাওয়া যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, কৌরব ও পাণ্ডব রাজবংশের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য লড়াই, কম্বোজের রাজা সুদক্ষিণার সেনাবাহিনীতে যবন ও শকদের সংখ্যা অধিক ছিল। এ রকম অবস্থার পরও এ সময়ের খাইবার অঞ্চলের ইতিহাস জানার জন্য প্রায় কোনো প্রামাণ্যসূত্র নেই। সে সময়ের বিভিন্ন রাজ্যের প্রতীক ও মুদ্রার ধাতব সংমিশ্রণ পরীক্ষা করলে সে যুগ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। এ যুগের রাজ্যের উত্থান ও পতনকে একত্রিত করার জন্য মুদ্রা বিশেষভাবে মূল্যবান ছিল। এ সময়ের মধ্যে সেলিউসিড রাজ্যের পূর্বদিকে পতন শুরু হয়। তারাই সাম্রাজ্য বিস্তারে এশিয়া মাইনর থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল এবং সীমান্ত প্রদেশগুলো প্রায়ই স্বাধীনতার জন্য বিদ্রোহের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।
রবাতক শিলালিপি থেকে জানা যায় কুষাণদের সম্পর্কে। খাইবার গিরিপথের স্তূপটি কুষাণ সাম্রাজ্যের যুগে নির্মিত হয়েছিল, একটি শক্তিশালী রাজ্য, যা শত শত বছর আগে চীনে রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি তিক্ষ্ণ ফলাফল ছিল।2২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নিজেকে চীনের সম্রাট বানানোর ক্ষেত্রে কিন শি হুয়াং দির সাফল্য ছিল কয়েক শতাব্দী ধরে। যুদ্ধরত বেশ কয়েকটি রাজ্যকে একত্রিত করার মাধ্যমে, যা উত্তর ভারতে কুষাণদের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার ঘটনাগুলোকে একটি শৃঙ্খলায় নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু করে। এর মধ্যেই প্রাচ্যে বৌদ্ধ ধর্মের আগমন ঘটে। আফগানিস্তানের দিকে কুষাণদের পদঙ্ক অনুসরণ করে যারা বৌদ্ধ ধর্ম তাদের জন্মভূমি থেকে সরে দক্ষিণ এশীয় প্রান্তে নিয়ে এসেছিল। আফগানিস্তানের আরাকোসিয়া ও কাবুল উপত্যকা শাসন করত একসময়ে এ কুষাণরা। তবে বাণিজ্যিক সুবিধা ও বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশের পাশাপাশি ছোট ছোট ট্রাইবের লড়াই ছিল কুষাণদের দক্ষিণ এশিয়ার পথে এগিয়ে আসার কারণ। আফগানিস্তান থেকে ভারতে আরো গভীরে প্রবেশ করে পাঞ্জাব এবং গঙ্গা উপত্যকার কিছু অংশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে। ধারণা করা হয় কুষাণরা মৌর্যদের প্রাচীন রাজধানী পাটলিপুত্র পর্যন্ত জয় করেছিলেন। সিন্ধু নদী, আরব সাগরের মুখ পর্যন্ত কুষাণদের অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে সাসানিয়ান, পার্থিয়ান ও শ্বেত হুনদেরও দেখা গেছে খাইবার গিরিপথ ধরে দক্ষিণ এশিয়ার ভারতীয় অঞ্চলগুলোয় প্রবেশ করতে। মুসলিম আগমনের আগ পর্যন্ত খাইবার গিরিপথ ধরে তাদের যাতায়াত ছিল। সিল্করোডের সফল বাণিজ্যের নিয়েও ছিল টানাপড়েন। রোমান ও বেশকিছু যাযাবর জাতির আক্রমণ ঘটেছিল ভারতীয় অঞ্চলগুলোয়। লম্বা সময়জুড়ে একাধিক জাতিগোষ্ঠীর আগমনে খাইবার গিরিপথের ছিল বিচিত্র ব্যস্ততা।
ফারিহা আজমিন: লেখক





