যুদ্ধ শেষে জন নিকলসন যখন ভারত ফিরছিলেন, তখন তিনি ক্লান্ত, অবসন্ন। সৈন্যদের অবস্থাও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতোই। তার মতো তাদেরও তাড়া করে ফিরছে রক্তাক্ত রণক্ষেত্র আর বন্দিত্বের স্মৃতি। অথচ ১৮৩৯ সালে তারা যখন অভিযানে বের হয়েছিলেন, তখন এমন পরিণতির কথা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি। কাবুলে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বে হস্তক্ষেপের সূত্র ধরে ভারত থেকে এগিয়ে যায় ব্রিটিশ শক্তি। জন নিকলসন ও তার রেজিমেন্ট সে অভিযানের অংশ হিসেবেই আফগানিস্তান যান। প্রথমিকভাবে কাবুল দখল করে নেয় ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু হঠাৎ নজিরবিহীন অভ্যুত্থানের কারণে মেজর জেনারেল এলফিনস্টোন কাবুল থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। ১৮৪২ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ বাহিনী সাক্ষী হয় তাদের সামরিক ইতিহাসের সবচেয়ে অসহায় অবস্থার। আফগান যোদ্ধাগোত্রগুলোর তোপে প্রায় ১৬ হাজার সৈন্য নিহত হয়। অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন উইলিয়াম ব্রাইডন নামের মাত্র একজন ইউরোপীয় ও কয়েকজন ভারতীয় সিপাহি জীবিত ফিরতে সক্ষম হন। বন্দি অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় শতাধিককে।
বন্দি হওয়া সৈন্যদের মধ্যে ছিলেন জন নিকলসন। তাদের উদ্ধার করতে একই বছরের নভেম্বরে নতুন বাহিনী প্রেরিত হয় আফগানিস্তানে। প্রতিশোধবশে বিপুল ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করে ব্রিটিশ বাহিনী। আগুনে পোড়ে কাবুল। জয় তারা পায় বটে, কিন্তু ততদিনে কাঠখড় কম পোড়াতে হয়নি। প্রথম অ্যাংলো-আফগানি যুদ্ধে কমবেশি ৪০ হাজার সৈন্য হারায় ব্রিটিশরা। ৪ নভেম্বর মুক্ত হয়ে খাইবার পাস ধরে তারা ফিরতে থাকে নিকলসনকে নিয়ে। নভেম্বরেই নিকলসন খাইবার গিরিপথের পশ্চিম ধারে নিরাপদে পৌঁছলেন। সেখানেই দীর্ঘ চার বছরের ব্যবধানের পর মিলিত হলেন ছোট ভাই আলেকজান্ডারের সঙ্গে। ভাইয়ের অনুসরণ করেই তিনি ব্রিটিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। পরে নোঙর করেন ভারতের উদ্দেশে। জন নিকলসনসহ বন্দিদের উদ্ধারের জন্য যে বাহিনী এগিয়ে যান, সৌভাগ্যবশত তিনিও তাতে অন্তর্ভুক্ত হন। যদিও এ সাক্ষাৎ দীর্ঘ হয়নি। মাত্র দুদিন পরেই আলাদা হয়ে যান তারা। বেশ হাসিমুখেই বিদায় নিয়েছিলেন সে সময়। ততক্ষণ পর্যন্ত তারা কেউ-ই জানেন না, এটাই তাদের শেষ কথা বিনিময়। পরে যখন দেখা হবে, তখন একজনের মুখে থাকবে আহাজারি। দ্বিতীয়জন থাকবেন নিথর, নিস্তব্ধ।
আলেকজান্ডার ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করেন খাইবার পাস হয়ে। দুদিন পর জন নিকলসন যাত্রা করেন রিয়ারগার্ডের সঙ্গে। ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীর যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এল। দুই বছরের যুদ্ধ ও বন্দিত্ব শেষে ৩০ মাইলের দীর্ঘ গিরিপথের সামনে বিশ্রামের সুযোগ পান। অপ্রশস্ত ও বেশি উচ্চতার কারণে যুদ্ধের সময় পুরোপুরি বদলে যায় এর চিত্র। খাইবার অঞ্চলে বসবাসকারী পাঠানরা দুঃসাহসিকতার কারণে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে ইতিহাসে। বিভিন্ন যোদ্ধা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও তারা শ্রেষ্ঠত্ব হাজির করেছে। তার একটা কারণ পাঠানদের সক্ষমতা। যেকোনো সময় শত্রুকে মোকাবেলায় গিরিপথ বন্ধ করে দিতে পারত তারা। আর অতর্কিত এমন সিদ্ধান্ত শত্রুপক্ষের জন্য হয়ে উঠত ধ্বংসাত্মক। তারা শিগগিরই হতাশ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ত। পাঠানরাই পাহাড়ের ওপরে দুর্গ তৈরি করেছিল গিরিপথ ধরে চলাচল করা মানুষের ওপর নজরদারির উদ্দেশ্যে। সেখানে পাহারাদার নিযুক্ত করার মাধ্যমে শত্রুর গতিপথ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পারত সহজেই। আর পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে ওপর থেকেই তারা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য উচ্চারণ করত হুঁশিয়ারি বাক্য।
নিকলসন ও তার অনুসারীরার ফেরার সময় রাস্তা ভালো করে খেয়াল করে। পরিবর্তনগুলো তাদের চোখ ফাঁকি দেয় না। কালক্রমে রাস্তাটিকে আরো প্রশস্ত করা হয়েছে। পাথুরে দেয়ালগুলোকেও সরানো হয়েছে কিছুটা পেছনে। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়ি ও নজরদারির জন্য চৌকির তৎপরতা কমেনি। স্থানটির সৌন্দর্য ও গিরিপথের সামনের উন্মুক্ত আকাশ প্রায়ই প্রতারণাপূর্ণ আচরণ করে। এভাবে খোলা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ দেখা যেতে পারে পথ বন্ধ। সামনে এগোনোর আর কোনো উপায় নেই। এ প্রতারণাপূর্ণ পরিস্থিতি সবচেয়ে প্রমাণ নিকলসন পেয়েছিলেন গিরিপথের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত আলি মসজিদের কাছে পৌঁছলে। হঠাৎ নাটকীয়ভাবে রাস্তাটি সেখানে ৫০০ ফুট উঁচুতে উঠে সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে গিরিপথটির সবচেয়ে সুরক্ষিত অবস্থান রয়েছে আলি মসজিদটি। মাত্র কয়েকজন স্নাইপার বসলেই নিচে গিরিপথের গোটা একটা বাহিনীকে নাকানিচুবানি খাইয়ে দিতে পারবে। নিকলসন ও তার বাহিনী বিষয়টি নিয়ে কিছুটা শঙ্কিত থাকলেও অমন কোনো বিপত্তির মুখোমুখি হননি। তবে সঙ্গী এনসাইন জুলিয়াস ডেনিসকে নিয়ে তিনি যখন সংকুচিত পথ ধরে আলি মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছলেন, তখনই নজরে আসে এক ইউরোপীয় সৈন্যর মরদেহ।
নিকলসনকে প্রধান সড়ক ছাড়তে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিল শক্তভাবে। কিন্তু তিনি সে বিধান উপেক্ষা করেই এগিয়ে গেলেন। মরদেহ একটা থাকার অর্থ আশপাশে নিশ্চয়ই আরো আছে। আর এর অর্থ এটাও যে নিশ্চয়ই এখানে কোনো ব্রিটিশ ইউনিটকে অ্যামবুশ করা হয়েছে। মরদেহটির অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। খুব কাছাকাছি গিয়ে থমকে গেলন নিকলসন। মরদেহটা আর কেউ নয়; আলেকজান্ডারের। নিকলসনের ছোট ভাইয়ের। আফগান যোদ্ধাগোত্রগুলোর স্থানীয় নীতি অনুসারে মরদেহকে বিকৃত করে রাখা হয়েছে। জন নিকলসনের তখন কেমন অনুভূতি হয়েছিল, তা কেউ লিখে রেখে যাননি। তবে ছোট ভাইয়ের ক্ষতবিক্ষত মরদেহের সামনে কেমন বোধ হতে পারে, সেটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। প্রচণ্ড ক্রোধ আর আক্রোশ নিয়ে জন তার ভাইকে খাইবারেই কবর দেন। পরে জন নিকলসন ব্রিটিশ বাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ১৮৫৭ সালের প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় নিহত হন তিনিও। ভাই আলেকজান্ডার সে সুযোগটাও পায়নি।
ব্রিটিশ শাসনামলে খাইবার গিরিপথ ছিল রীতিমতো আতঙ্কের নাম। কৌশলগত দিক থেকে এটা ভারতের প্রবেশপথ। এখানকার সাম্রাজ্যগুলো কৌশলগত কারণেই সতর্ক থাকত গিরপথ নিয়ে। এখানকার সুরক্ষা মানেই উপমহাদেশের ভেতরকার সাম্রাজ্যগুলোর সুরক্ষা। সেদিক বিবেচনায়ই বিশেষ অবস্থান দখল করে রেখেছে খাইবার গিরিপথ। ভৌগোলিক গুরুত্বের দিক থেকে একে জিব্রাল্টার ও সুয়েজ খালের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সামরিক কৌশলের দিক থেকে একে উপেক্ষা করার পরিণতি ইতিহাসজুড়েই ছিল ভয়াবহ। ব্রিটিশ আমলে উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মিশেলে খাইবার নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা কাল্পনিক কথা ও কিংবদন্তি। যেন যেকোনো মূল্যেই তাকে রক্ষা করতে হবে। তার চেষ্টাও চলেছে সবসময়। গিরিপথের পশ্চিম প্রান্ত আফগানিস্তানে হলেও পূর্বপ্রান্ত চলে এসেছে পাকিস্তানের পেশোয়ারে। তবে এর সঙ্গে কেবল পাকিস্তান জড়িয়ে নেই, জড়িত পুরো উপমহাদেশের নিরাপত্তা। ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এটা হলো সম্মুখভাগ। ফলে অঞ্চলটি ব্রিটিশ, আমেরিকাসহ পশ্চিমা জাতিগোষ্ঠীর জন্য বেশ সংকটপূর্ণ অঞ্চল বলেই প্রতীয়মান হয়েছে বারবার। বিশেষ করে সেখানকার তালেবানদের সঙ্গে সংঘাতের সময় বড় পরিসরে প্রতিবন্ধকতা উঠে আসে। খাইবার গিরিপথটা যেন বিদেশীদের জন্য ধাঁধায় ভরা। তোরখাম নগরী থেকে শুরু হয়েছে গিরিপথটি। নগরীর ছোট বাড়িগুলো যেন সেনাচৌকির মতো। পথের দক্ষিণ দিকটায় অকস্মাৎ উপরে উঠে গেছে পাহাড়। শীতের মৌসুমে এখানকার পাথরগুলো তুষারে ঢেকে যায়। অন্য সময়ে তুষারবিহীন লালচে পাথর নজরে এলেও এ সময়ে তুষার জমে সাদা হয়ে যায় পুরো অঞ্চল।
গিরিপথের উত্তর পাশটা দক্ষিণের মতো অতটা এবড়োথেবড়ো নয়। ব্রিটিশ আমলে সেখানে রেলপথ বসানো হয়েছিল; যদিও এখন তা ব্যবহার হয় না। রেলপথটি সীমান্তের কাছে এসে হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আফগান অঞ্চলে এটা বন্ধুর পার্বত্য অঞ্চল ধরেই এগিয়েছে। ফলে খাইবার পাস কেবল সীমান্ত হয়েই স্থির থাকেনি। মানচিত্রে খচিত একটা দাগের চেয়ে অনেক বেশি কিছু নিয়ে হাজির হয়েছে। এটা যেন সবসময়ই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্রন্ট। অতিপ্রাচীন কাল থেকেই বিতর্ক আর প্রতিযোগিতাপূর্ণ অঞ্চল। কখনই পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি খাইবারে। প্রতিটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য একে নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রমাণ দিতে চেয়েছে স্বীয় সক্ষমতা আর শৌর্যের। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যও কখনো খাইবারকে পুরোপুরি কবজায় রাখতে পারেনি। তাদের কাছে বন্দুক কেবল সঙ্গে নিয়ে ঘোরা কিংবা দেখানোর বিষয় না। গোত্রগত সংঘাত তো রয়েছেই। পাশাপাশি রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ এমনকি বাইরের শক্তির সঙ্গে নিত্যকার সংঘাত। ফলে এখানকার জনগণের জন্য যুদ্ধ গড়পরতা প্রাত্যহিক বিষয়। বাড়িগুলো যেন শক্ত প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত ও সুরক্ষিত দুর্গ একেকটা। খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন আত্মীয় বসবাস করে পাশাপাশি। পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি করা হয় ঘর। নিরাপত্তার জন্য জানালায় তাক করা থাকে রাইফেল। বাইরে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা নেই। নেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে কোলাহল। খাইবারের জীবন যেন প্রতিরক্ষা প্রাচীরের পেছনে সুরক্ষিত।
আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর খুব কমই পরিবর্তন এসেছে খাইবার পাসে। অবশ্য প্রাচীনকালের তুলনায়ও খুব বেশি বদলায়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানকার যে ভঙ্গুর পরিস্থিতি, তারই ফলাফল চারপাশে দৃশ্যমান। এ পথ ধরে সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিয়েছে বিভিন্ন বীর বিভিন্ন সময়। এ পথ ধরেই এক সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়ে গিয়ে মিশেছে অন্য সংস্কৃতিতে। খাইবার পাস যেন তার দুপাশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেছে। পৃথিবীর আর কোনো গিরিপথ, রাজপথ ও জলপথ এতটা বিচিত্র গল্পের আঁচর নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। মৌর্য, পারসিয়ান, শিখ, পাঠান দখল করেছিল প্রাচীনকালে। গ্রিক, সিদিয়ান, কুষাণ, শ্বেত হুন, তুর্কি, মোঙ্গল, মোগল আফগানের জন্য প্রধান সড়কপথ ছিল খাইবার পাস। এ পথ ধরেই তারা প্রবেশ করেছে ভারতে। এ পথ দিয়ে কতজন বাইরে গেছে, তাদের হিসাবও বেশুমার। খাইবার পাসের দিকে তাকালে পৃথিবীর ইতিহাস হাজির হয় ভিন্নভাবে। স্পষ্ট হয় সাম্রাজ্যগুলোর অবিরাম উত্থান ও পতনের চিত্র। অভিযানকারীরা আসছে, রাজ্য তৈরি করছে, ধসে পড়ছে। একইভাবে তাদের পরাজিত করে সাম্রাজ্য গড়ছে নতুন আগন্তুক। খাইবারে তাই একীভূত হয়ে গেছে সাংস্কৃতিক, সামরিক, ক্ষমতার লেনদেনের বিচিত্র সব বোঝাপড়া।
আহমেদ দীন রুমি: লেখক





