১৯৭২-এর ফেব্রুয়ারিতে ইতালির সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসি ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাত্কার নেন। ১৯৭৬-এ প্রকাশিত ওরিয়ানার ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’ গ্রন্থে ১৪টি ঐতিহাসিক সাক্ষাত্কারের মধ্যে দুটি কেবল নারীর— ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার।
ইন্দিরার সমসাময়িক আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতারা হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড নিক্সন, সোভিয়েত ইউনিয়নের লিওনিদ ব্রেজনেভ, ফ্রান্সের জর্জ পম্পিডো, পশ্চিম জার্মানির উইলি ব্রান্ডট, যুক্তরাজ্যের এডওয়ার্ড হিথ ও চীনের মাও জে দং।
এটি একটি অসাধারণ সাক্ষাত্কার। ইন্দিরা গান্ধী আচরণগতভাবে ‘প্রাইভেট পারসন’ হলেও ওরিয়ানা প্রকৃত ইন্দিরাকে টেনে বের করেছেন। সাক্ষাত্কারটি সুখপাঠ্য এবং সেই সময়টাকে গতানুগতিক টেক্সটের বাইরে জানতে চাইলে এটি অবশ্যপাঠ্য বলে অনুবাদকের ধারণা।
সাক্ষাত্কারটি হুবহু অনূদিত হচ্ছে না, কোথাও কোথাও স্থান সংকুলানের প্রশ্নে এবং পুনরাবৃত্তি এড়াতে কিছুটা সংক্ষেপ করা হয়েছে।
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী, আপনাকে জিজ্ঞেস করার মতো আমার অনেক প্রশ্ন— ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দুই ধরনেরই। আগে আমি বুঝে নিতে চাই মানুষ কেন আপনাকে ভয় পায় এবং নিস্পৃহ, শীতল, কঠোর মনে করে, তারপর ব্যক্তিগত বিষয়ের প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করব।
ইন্দিরা: কারণ আমি একনিষ্ঠ, বেশি রকম একনিষ্ঠ। কারণ ভারতের আর সবার মতো আমি ছোট ছোট মিষ্টি কথা বলে সময় নষ্ট করি না। প্রথম আধাঘণ্টা কাটিয়ে দেয় শুধু সৌজন্য বিনিময়ে, ‘আপনি কেমন আছেন? ছেলেমেয়েরা কেমন আছে? আপনার নাতি-নাতনিরা?’ এ রকম বলতেই থাকে। আমি এ ধরনের আলাপ প্রশ্রয় দিই না। আর প্রশংসা? সেটা আমি সঞ্চিত রাখি, কাজটা শেষ হলে বলা যাবে। আমার এ আচরণ ভারতীয়রা হজম করতে পারে না।
ওরিয়ানা: আমি সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটি দিয়ে শুরু করতে চাই। আপনি যে যুদ্ধ জিতেছেন, তা জেতার চেয়ে বড়। কিন্তু আমরা কেউ কেউ আপনার এ বিজয়কে বিপজ্জনক মনে করি। আপনি যেমন আশা করছেন, বাংলাদেশ সে রকম মিত্র হবে বলে কি আপনি মনে করেন? আপনি কি আশঙ্কিত নন যে, এ বিজয় আপনার জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর বোঝায় পরিণত হতে পারে?
ইন্দিরা: দেখুন জীবন সবসময়ই বিপদে পরিপূর্ণ, বিপদ এড়িয়ে যাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি না। যা সঠিক মনে করা হয়, তাই করা উচিত, এমনকি যদি তাতে বিপদের ঝুঁকি নিতে হয়— এটাই আমার বরাবরের দর্শন। আবশ্যকীয় কাজটি করলে কী বিপদ হবে, এ নিয়ে আমি কখনো ভাবি না। যদি সে রকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তখন তা পরীক্ষা করে দেখব এবং নতুন পরিস্থিতির মোকাবেলা করব। আপনি বলছেন এটি বিপজ্জনক বিজয়। আমি সেভাবে দেখছি না, বাংলাদেশ ও আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব থাকবে। এক পক্ষীয় বন্ধু নয়। অকারণে কেউ কিছু করে না। দেয়ারও কিছু আছে, নেয়ারও কিছু আছে। আমরা যদি বাংলাদেশকে কিছু দিই, এটা তো স্পষ্ট বাংলাদেশ আমাদের কিছু দেবে। বাংলাদেশ কেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে না? অর্থনৈতিকভাবে এটি সম্পদশালী, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। রাজনৈতিকভাবে আমার মনে হয়, প্রশিক্ষিত লোকেরাই দেশ চালাবে। এখানে শরণার্থী যারা এসেছিল, ফিরে যাচ্ছে।
ওরিয়ানা: তারা কি সত্যিই যাচ্ছে?
ইন্দিরা: এর মধ্যেই দুই লাখ চলে গেছে।
ওরিয়ানা: ১০ লাখের মধ্যে দুই লাখ। তেমন বেশি নয়।
ইন্দিরা: তাদের সময় দিন। তারা দ্রুতই ফিরে যাচ্ছে। যথেষ্ট দ্রুত। আমি সন্তুষ্ট। আমি যা আশা করেছিলাম, তার চেয়ে বেশি।
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী, আমি যখন বিজয়ের বিপদের কথা বলেছি, বাংলাদেশকে বোঝাইনি। আমি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কথা বলেছি, সেখানে এখন স্বাধীনতার দাবি উঠেছে। আমি কলকাতায় নকশালবাদীদের কথা শুনে এসেছি। লেনিনের একটি বাক্য আছে, ‘বিশ্বের বিপ্লব সাংহাই ও কলকাতা হয়ে এগোবে।’
ইন্দিরা: না, তা সম্ভব নয়। কেন তা জানেন? কারণ ভারতে তো বিপ্লব চলছেই। এখানে এর মধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে— শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকভাবে। এখানে কমিউনিজমের কোনো বিপদ নেই। হতে পারত যদি আমার সরকারের পরিবর্তে কোনো ডানপন্থী সরকার থাকত। যখন মানুষ ভেবেছিল আমার দল ডানদিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখনই কমিউনিজম ভারতে শক্তি সঞ্চার করে। আর এটাই সত্য। আমার দল নিয়ে এ রকম হুমকি অনুভব করায় তাদের চরম বাম হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু এখন যেহেতু জনগণ আমাদের উদ্যোগগুলো সম্পর্কে জানছে, যখন দেখছে আমরা সমস্যার সমাধান করছি, কমিউনিস্টরা পায়ের তলার মাটি হারাতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের নকশালরা এখন পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আর বাংলাদেশের নকশালরাও নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে, কোনো সমস্যা হবে বলে আমি মনে করছি না।
ওরিয়ানা: তারা তো আপনাকে এর মধ্যেই সমস্যায় ফেলেছে, স্বাধীনতার পর ঢাকায় আমি ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড দেখেছি—
ইন্দিরা: প্রথম পাঁচদিন কিছু ঘটেছে, কিন্তু অন্যরা যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে, সে তুলনায় এটা সামান্য। এটা সত্য কিছু দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। আমরা ঠেকাতে চেষ্টা করেছি। আমরা কত মানুষের জীবন বাঁচাতে পেরেছি, তা যদি জানতেন! সব জায়গায় যাওয়া, সবকিছু দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিছু বিষয় নজর এড়িয়ে গেছে। সব সম্প্রদায়েই কিছু দুরাচার ব্যক্তি থাকে। তাদেরও আপনার বুঝতে হবে। তারা ক্ষুব্ধ ছিল, অসন্তোষে অন্ধ হয়ে ছিল। ন্যায়বিচার করতে দেখতে হবে আপনি কয়েক দিনে কী দেখেছেন আর তারা মাসের পর মাস কী দেখেছে—
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী আপনি এ অভিযোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে, ভারতীয়রাই প্রথম প্ররোচনা দিয়েছে এবং আক্রমণ করেছে।
ইন্দিরা: এটা স্বীকার করেই আমি জবাব দেব। পেছনে তাকালে দেখবেন আমরা মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করছি। আপনি যদি এটাকে শুরু হিসেবে ধরতে চান, তাহলে বলতে পারেন আমরাই শুরু করেছি। আমাদের বিকল্প কিছু করার ছিল না। আমাদের এক কোটি শরণার্থী লালন-পালন সম্ভব ছিল না। এই অস্থিতিশীল অবস্থা আমাদের পক্ষে সহ্য করাও সম্ভব ছিল না। শরণার্থীর আগমন থামত না, বরং তা বাড়তে বাড়তে একসময় বিস্ফোরণ ঘটত। শরণার্থীর স্রোত ঠেকানো আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমাদের স্বার্থেই তা ঠেকাতে হয়েছে। আমি যুদ্ধ এড়াতে নিক্সন ও অন্য নেতাদের এ কথাই বলেছি।
তবে আপনি যদি প্রকৃত যুদ্ধের শুরু থেকে দেখেন, দেখবেন পাকিস্তানই প্রথম আমাদের ওপর চড়াও হয়েছে, বিকাল ৫টায় তাদের উড়োজাহাজ আগ্রায় প্রথম বোমা বর্ষণ করে। এটা আমি আপনার কাছে প্রমাণ করতে পারব যে, ঘটনাটি আমাদের জন্য ছিল বিস্ময়কর। সপ্তাহান্তের ছুটিই হচ্ছে একমাত্র সময়, যখন আমরা দিল্লির বাইরে যেতে পারি। তখন আমাকে কলকাতা যেতে হয়েছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন পাটনায়। সেখান থেকে তার দক্ষিণে বেঙ্গালুরু যাওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রী ছিলেন বোম্বেতে, তখনই তার পুনে রওনা হওয়ার কথা। সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানও অন্য কোথাও। আমার ঠিক মনে নেই কোন জায়গায়। আমাদের সবাইকে দিল্লি ছুটতে হয়। (সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়) সেজন্য আমাদের বাহিনীকে পরদিন পাল্টা আক্রমণ করতে হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা সম্ভব হয়নি। এ কারণেই পাকিস্তান কিছু জায়গা দখল করে ফেলতে সমর্থ হয়। স্বাভাবিক কারণেই আমাদেরও প্রস্তুতি ছিল। কিছু একটা ঘটবে আমরা জানতাম। বিমান আক্রমণের কথাও আমরা আগাম আঁচ করেছি, তা না হলে পাকিস্তান আমাদের গুঁড়িয়ে দিত।
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী, আপনি বলেছেন যুদ্ধ এড়াতে আপনি ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করেছেন। কী ঘটেছে, আপনি কি সত্যটা বলবেন? নিক্সন এটাকে কীভাবে নিয়েছেন?
ইন্দিরা: সত্য কথাটা আমি স্বচ্ছভাবে নিক্সনকে বলেছি। আমি প্রধানমন্ত্রী হিথ, প্রেসিডেন্ট পম্পিডো ও চ্যান্সেলর ব্রান্ডটকে যে কথা বলেছি, সে কথাই তাকে বলেছি। কোনো শব্দের হেরফের না করে বলেছি, ১০ মিলিয়ন শরণার্থীর বোমা নিয়ে আমাদের চলা সম্ভব নয়। এ রকম বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতির উত্তাপ আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। আমার কথা হিথ, পম্পিডো, ব্রান্ডট খুব ভালো বুঝেছেন। কিন্তু মিস্টার নিক্সন বোঝেননি। আসল ঘটনা হচ্ছে, অন্যরা যে রকম বোঝেন, তিনি বোঝেন তার চেয়ে ভিন্নটা। আমি সন্দেহ করেছি তিনি পাকিস্তানপন্থী। অথবা আমি জেনেছি আমেরিকানরা সবসময়ই পাকিস্তানের পক্ষে, তারা যতটা পাকিস্তানের পক্ষে, তার চেয়ে ভারতের বিরোধী বলে।
তবে আমার মনে হয়েছে, তাদের ধারণা বদলে যাচ্ছে, তাদের পাকিস্তান ভাবাপন্নতা কমছে, ভারত বিরোধিতাও। কিন্তু এ ধারণাটিও ভুল। নিক্সনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ আর যা-ই করুক যুদ্ধ এড়াতে সাহায্য করেনি। এটা কেবল আমার কাজে লেগেছে। অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, যখন কেউ তোমার বিরুদ্ধে কিছু করে, তার কিছু না কিছু তোমার পক্ষে চলে আসে। আমি দেখেছি জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বিরোধিতা বরং আমাকে সুবিধা করে দিয়েছে। কেন আমি গত নির্বাচনে জিতেছি জানেন? কারণ জনগণ আমাকে পছন্দ করে আমি তাদের জন্য কাজ করি। কারণ বিরোধীরা আমার সঙ্গে খুব খারাপ আচরণ করেছে। আমি যুদ্ধে কেন জিতেছি জানেন? কারণ আমার সৈন্যরা সমর্থ ছিল, কারণ আমেরিকা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে।
ওরিয়ানা: আপনার কথা আমি বুঝতে পারিনি।
ইন্দিরা: আমেরিকা সবসময় ভেবেছে তারা পাকিস্তানকে
সাহায্য করছে। যদি তা না করত পাকিস্তান শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারত। যে সামরিক শাসন গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে, তাকে সাহায্য করা মানে দেশকে সাহায্য করা না। সে দেশের সামরিক শাসনই পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে। আমেরিকা সমর্থিত সামরিক শাসন। কখনো বন্ধুরা খুব বিপজ্জনক। বন্ধুদের দেয়া সাহায্যের ব্যাপারে সতর্ক হতে হয়।
ওরিয়ানা: আর চীনারা? আমি যদি ভুল না বলে থাকি, তারাও তো পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। চীন ভারতের সবচেয়ে বড়
সম্ভাবনাময় শত্রু—
ইন্দিরা: না, ভারত ও চীনকে শত্রু হয়ে থাকতে হবে বলে আমি মনে করি না। আমরা তাদের শত্রু থাকতে চাই না। শেষ পর্যন্ত হিসাব করে তারা দেখবে শত্রু হয়ে থাকলে চীনেরও লাভ নেই... । আমি মনে করি, তারা আমেরিকানদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের একটি হালকা সম্পর্ক আছে, চাইলে পাকিস্তানের জন্য চীন কিছু করতে পারত। বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর আমেরিকা পাঠিয়েছিল, চীন নয়। চীন ভুল পদক্ষেপ নেবে, এটা আমি কখনো বিশ্বাস করিনি। তৃতীয় মহাযুদ্ধ হওয়ার আতঙ্ক আমার কখনো ছিল না। যদি আমেরিকা গুলি চালাত, সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে চুপচাপ বসে থাকার বদলে কিছু করত, তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ভাবা যেত। তবে সত্যি কথা, তৃতীয় মহাযুদ্ধের ভীতি আমাকে কখনো পায়নি।
ওরিয়ানা: এটা খুব অবাক করা ব্যাপার। অহিংসার দর্শনের মধ্যে লালিত হয়ে আপনি একালের দ্বন্দ্বকে কীভাবে ধারণ করছেন!
ইন্দিরা: আপনাকে মনে রাখতে হবে, এটা আমার প্রথম যুদ্ধ নয়। আমাকে অন্যান্য যুদ্ধও মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমি আরেকটি অহিংসার কথা আপনাকে শোনাচ্ছি। ১৯৪৭-এ ভারত কেবল স্বাধীন হয়েছে, পাকিস্তান কাশ্মীর আক্রমণ করে বসল, তখন কাশ্মীরের শাসক ছিলেন একজন মহারাজা। মহারাজা পালিয়ে গেলেন। শেখ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে কাশ্মীরের জনগণ ভারতের সাহায্য চাইল। তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন বললেন, পাকিস্তান যতক্ষণ না যুদ্ধ ঘোষণা করছে, তার পক্ষে কাশ্মীরকে সাহায্য করা সম্ভব নয়। পাকিস্তানিরা যে কাশ্মীরে মানুষ জবাই করছে, এ নিয়ে তাকে উদ্বিগ্ন মনে হলো না। কাজেই ভারতীয় নেতারা নিজেরাই একটা দলিল স্বাক্ষর করে নিজেদের যুদ্ধে যেতে বাধ্য করলেন এবং অহিংসার প্রবক্তা মহাত্মা গান্ধীও তাদের সঙ্গে যুদ্ধের পক্ষে সই করলেন। যুদ্ধ তাকেও বেছে নিতে হলো, তিনি বললেন এখন বিকল্প কিছু নেই। যখন কাউকে কিংবা নিজেকে রক্ষা করতে হবে, তখন যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।
ওরিয়ানা: আমি যেখানে জোর দিতে চাই, তা হচ্ছে ‘ভাইদের মধ্যে যুদ্ধ’। আমি জেনারেল অরোরা ও জেনারেল নিয়াজিকে এ কথা বলেছি। দুজনেই বলেছেন, ‘মূলত আমরা ভাই।’
ইন্দিরা: মূলত নয়, পুরোপুরিই। ভারত ও পাকিস্তান আক্ষরিক অর্থেই ভাই। ঢাকার পতনের পর ভারতীয় ও পাকিস্তানি অফিসাররা যেভাবে করমর্দন করেছেন, তা দেখে নিশ্চয়ই অবাক হয়েছেন। ১৯৬৫ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে জেনারেল ছিলেন মায়ের পেটের আপন দুই ভাই। একই বাবা, একই মা। এক পক্ষে চাচা, অন্যপক্ষে ভাস্তে অথবা দুই কাজিন দুদিকে, এটাই সত্যি। এক সময় সুইজারল্যান্ডে ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন আপন দুই ভাই। ব্রিটিশরা আমাদের ওপর যে ধরনের দেশভাগ চাপিয়ে দিয়েছিল, তা ছিল অস্বাভাবিক। এটা কেবল পরিবার ভেঙেছে। ভয়ঙ্কর সব কাহিনী আমার মনে আছে। যারা দেশ ছেড়েছে, তারা অনেকেই তা চায়নি। মুসলমানদের অনেকেই পাকিস্তান যেতে চায়নি, কিন্তু বেশি সুযোগের প্রচারণা তাদের টেনে নিয়েছে। অনেক হিন্দু পাকিস্তানে থাকতে চায়নি, কিন্তু বিভিন্ন সম্পর্কের বন্ধনের কারণে রয়ে গেছে।
আমাদের শত্রুতা অবাস্তব বিষয়। হিন্দু ও মুসলমান একত্রে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছে। ব্রিটিশ শাসনে পরস্পর বিরোধিতা ছিল, সংঘর্ষ হয়েছে... ভাগ করে শাসন করার নীতি বিদেশীদের, এটা স্বাধীনতার পরেও অনুসরণ করা হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তান যদি একসঙ্গে থাকত, আমি কনফেডারেশনের কথা বলছি না, ফ্রান্স ও ইতালির মতো ভালো প্রতিবেশী হয়ে, তাহলে দুই দেশেরই অগ্রগতি আরো বেশি হতো। কিন্তু এই যুদ্ধ কারো স্বার্থে— কেউ পাকিস্তানকে উৎসাহ দিয়েছে ভারতকে আক্রমণ করো, কেউ অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তান আমাদের আক্রমণ করেছে।
ওরিয়ানা: ভুট্টো বলেছেন, তিনি ভারতের সঙ্গে কনফেডারেশন চান। আপনি কী মনে করেন?
ইন্দিরা: আপনি জানেন, ভুট্টো ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ নন। তিনি যখন কথা বলেন, কী বলছেন তার মানেই বোঝেন না। এবার তিনি কী বোঝাতে চাইছেন? তিনি আমাদের বন্ধু হতে চান! আমরা তো সবসময়ই চেয়েছি। পশ্চিমের গণমাধ্যমের জানাটা অসম্পূর্ণ। তারা শুধু বলে যায়, ভারত পাকিস্তানের শত্রু কিংবা পাকিস্তান ভারতের শত্রু। কিন্তু আমার দল ধর্মীয় কারণে বিরোধ যে অর্থহীন ও অবাস্তব, এটা কখনো বলছে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কখনো একটি দেশ থেকে নির্মূল করা যাবে না। বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে বসবাস করতে হবে।
ওরিয়ানা: ভিন্ন প্রসঙ্গে যাচ্ছি, মিসেস গান্ধী আপনি নিশ্চয়ই ধার্মিক নন? তাই নয় কি?
ইন্দিরা: ধর্ম বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন, এটা তার ওপর নির্ভর করে। অবশ্যই আমি মন্দিরে যাই না, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা বা সে রকম কিছু করি না। কিন্তু ধর্ম বলতে আপনি যদি ঈশ্বরের উপরে বিশ্বাসের বদলে মানবতায় বিশ্বাস বুঝিয়ে থাকেন, মানুষের মঙ্গল করার কথা, মানুষকে সুখী করার কথা বুঝিয়ে থাকেন, তাহলে আমি অবশ্যই ধার্মিক।
ওরিয়ানা: আমি আশা করি, প্রশ্নটি আপনার জন্য বিব্রতকর ছিল না।
ইন্দিরা: না, না, কেন?
ওরিয়ানা: কিন্তু এ প্রশ্নটি বিব্রতকর হবে— আপনি সবসময়ই জোট নিরপেক্ষতার নীতি প্রচার করেছেন, কিন্তু গত আগস্টে ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি করলেন, এটা আপনার ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
ইন্দিরা: না, আমি তা বলব না। জোট নিরপেক্ষ মানে কী? আপনি কোনো সামরিক জোটের সদস্য নন, যেকোনো দেশের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের অধিকার আপনার থাকবে। কোনো দেশের প্রভাবের বাইরে আপনি স্বাধীনভাবে কাজ করবেন। ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরের পরও সব শর্ত অক্ষুণ্ন রয়েছে, অন্যরা যা বলে বলুক, যা মনে করে করুক। সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে আমাদের নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
আমরা খুব ভালো করেই জানি, বিশ্বশান্তির সঙ্গে ভারতের নিয়তি জড়িয়ে আছে। আপনি বলতে চাইছেন এই চুক্তির কারণে ভারত অন্য দেশের প্রতি যতটা না, তার চেয়ে বেশি সোভিয়েতের দিকে ঝুঁকে আছে বলে মনে হয়। হ্যাঁ, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি তো কেবল এক দেশের জন্য নয়। দুই দেশের ব্যাপার। চুক্তি আছে, এটা কোনো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটায়নি। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে এ চুক্তি আমাদের বাধা দেয় না। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেব তা সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, আমেরিকা, ফ্রান্স কিংবা অন্য কোনো দেশকে সন্তষ্ট করবে, না অসন্তুষ্ট করবে, সেটা দুশ্চিন্তার কারণ হবে না। আরো শুনতে চান, চুক্তি স্বাক্ষরের পর কেউ একজন চৌ এন লাইকে এ সম্পর্কে তিনি কী মনে করছেন, তা জিজ্ঞেস করেছিলেন। চৌ এন লাই বলেছেন, এতে নতুন কী এমন হলো? এতে অবস্থার এমন কোনো পরিবর্তন তো আমি দেখছি না।
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী এবার ব্যক্তিগত প্রশ্নে আসছি। আপনার মতো একজন নারী কাদের সঙ্গে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন— পুরুষ না নারী?
ইন্দিরা: আমার জন্য একই কথা। আমি ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করি, পুরুষ বা নারী হিসেবে নয়। আপনার এটা বিবেচনা করা দরকার, আমি আমার বাবা ও মায়ের মতো মা-বাবার সন্তান এবং আমি বিশেষ ধরনের শিক্ষা লাভ করেছি। আমি ছেলেদের মতো বড় হয়েছি। আমাদের বাড়িতে যেসব শিশু আসত, তাদের প্রায় সবাই ছেলে। আমি ছেলেদের সঙ্গে গাছে চড়েছি, দৌড় প্রতিযোগিতায় নেমেছি, কুস্তি করেছি। ছেলেদের জন্য আমার ঈর্ষা কিংবা মেয়ে হিসেবে নিজেকে তাদের চেয়ে ছোট মনে করারও কোনো কারণ ঘটেনি। একই সঙ্গে আমার পুতুলও ছিল। অনেক পুতুল। পুতুল নিয়ে কি খেলতাম জানেন? আমার পুতুল বিদ্রোহ করত, সমাবেশ করত, গ্রেফতার হতো। এরা কখনো লালন-পালন করে বড় করার মতো শিশু ছিল না; এরা ব্যারাক আক্রমণ করত এবং জেলে যেত। কেবল আমার মা-বাবাই নয়, আমার মামা-চাচা-খালা-ফুপু, আমার সব ধরনের কাজিন, সবাই প্রতিরোধ আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। প্রায়ই পুলিশ এসে কোনো বাছবিচার না করে সবাইকে ধরে নিয়ে যেত। যেহেতু পুলিশ আমার মা-বাবা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচি সবাইকে গ্রেফতার করত, আমি পুরুষ ও নারীকে একই চোখে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।
ওরিয়ানা: আর জোয়ান অব আর্ক হওয়ার গল্পটা?
ইন্দিরা: এটা সত্যি। ছোট মেয়ে হিসেবে আমরা স্বপ্ন জোয়ান অব আর্ক। ১০-১২ বছর বয়সে যখন আমি ফ্রান্সে যাই, তাকে আবিষ্কার করি। কোথায় পড়েছি মনে করতে পারছি না, তবে এটা মনে আছে, তখনই তিনি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। আমিও দেশের জন্য জীবন বিসর্জন দিতে চেয়েছি। এটা বোকামি মনে হতে পারে, তবে শৈশবে যা আমাদের মনে গেঁথে যায়, তা চিরদিনের জন্য রয়ে যায়।
ওরিয়ানা: তা তো অবশ্যই। আপনি এই মিসেস গান্ধী হয়ে উঠলেন, এটা কেমন করে হলো আমি বুঝতে চাইছি। আপনার ইতিহাস কোনো সাধারণ নারীর নয়। এটা কি সত্যি যে আপনি বিয়ে করতে চাননি?
ইন্দিরা: হ্যাঁ, আঠারো বছর পর্যন্ত। তার কারণ এই নয় যে, আমি বিয়েবিরোধী। বরং ভারত স্বাধীন করার জন্য আমি আমার শক্তি বিনিয়োগ করতে চেয়েছি। আমি ধরে নিয়েছি বিয়ে আমাকে দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করবে। ধীরে ধীরে আমি বদলাতে থাকি। আঠারো বছর বয়সে বিয়ের সম্ভাবনার কথা ভাবতে থাকি। ঠিক স্বামী নয়, সন্তান থাকবে। আমি সবসময়ই সন্তান চেয়েছি, যদি আমার কথায় চলত তাহলে ১১ জন, কিন্তু আমার স্বামী চাইলেন মাত্র দুজন।
চিকিৎসক আমাকে কোনো সন্তান না নিতে বলেছেন, কারণ আমার শরীর ভালো ছিল না, গর্ভধারণে জীবন বিপন্ন হতে পারত। আমি এর মোকাবেলায় ১১ সন্তান চেয়েছি। ফিরোজ বলেছে, দুয়ের বেশি নয়।
ওরিয়ানা: হ্যানয়ে ভারতীয় দূতাবাস খোলার বিষয়টি তো পরিস্থিতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। ওদিকে আপনি ‘ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রোল কমিশন ফর ভিয়েতনাম’-এর প্রধান। তাহলে আপনার চেয়ারম্যান পদ ও ভারতের সদস্যপদ দুই-ই যাবে—
ইন্দিরা: ...ইন্টারন্যাশনাল কন্ট্রোল কমিশন কোনো কাজ করে না, কখনো করেনি। এটাতে থেকেই কি, না থেকেই কি! হ্যানয়ে দূতাবাস খোলার আগে আমি অনেক ভেবেছি, এটা এমন কোনো যন্ত্রণাদায়ক সিদ্ধান্ত ছিল না। আমেরিকার ভিয়েতনাম নীতি যা ছিল, তাই আছে। সায়গনের পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ছাড়া আর সবকিছুই বলা যায়— আমি যে এটা করতে পেরেছি, সেজন্য সন্তুষ্ট।
ওরিয়ানা: মানুষ বলছে, আপনি আপনার বাবার চেয়ে বেশি বামদিকে ঘেঁষেছেন—
ইন্দিরা: দেখুন পৃথিবীটাকে আমি ডান ও বাম, এভাবে ভাগ করে দেখি না। আর কে ডানে, কে বামে, কে কেন্দ্রে, আমার কাছে এসবেরও কোনো গুরুত্ব নেই। যদিও ডান-বাম এসব শব্দ আমরা ব্যবহার করি। আমি নিজেও করি, আসলে এসব অভিব্যক্তির অর্থ হারিয়ে গেছে। ডান বা বামের লেবেল লাগানোতে আমার আগ্রহ নেই। আমার আগ্রহ সমস্যার সমাধানে আমি কত দূর করতে পারি, তার ওপর। দারিদ্র্যের কর্কট রোগ থেকে সরিয়ে মানুষকে উন্নততর জীবনে পৌঁছে দেয়ার যে লক্ষ্য ছিল আমার বাবার, আমারও তাই; অর্থনৈতিক পশ্চাত্পদতা দূর করা। মানুষ আমার কাজকে ডানপন্থী বলুক কি বামপন্থী বলুক, কিচ্ছু আসে যায় না। যতটা সাফল্যের সঙ্গে সম্ভব আমি লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই।
ব্যাংক জাতীয়করণের ব্যাপারটাও তাই। জাতীয়করণের মিষ্টি বুলির কারণে জাতীয়করণ নয়। আর এটাই সব অবিচার মোচনের মহৌষধ, সেটাও আমি মনে করি না। আমার পার্টিতেও এক দল জাতীয়করণের পক্ষে, এক দল বিরুদ্ধে। কাজেই নিজেদের মধ্যে বিরোধ না বাড়িয়ে ব্যাংককে এক বছর সময় দিলাম, তারা সাফল্য দেখাক, প্রমাণ করুক যে জাতীয়করণের প্রয়োজন নেই। এক বছর চলে গেল, ভালো কিছুই হলো না। টাকা পেল ধনী শিল্পপতি ও ব্যাংকারদের বন্ধুরা। সুতরাং বছর পার করে আমি জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নিলাম। একে সোস্যালিস্ট বা অ্যান্টি-সোস্যালিস্ট এসব মনে করার দরকার নেই। দরকার ছিল, তাই জাতীয়করণ করেছি। জাতীয়করণ করলেই তাকে বামপন্থী-সমাজতন্ত্রী মনে করাটা আমার কাছে বোকামি ছাড়া কিছু নয়।
ওরিয়ানা: সে যা-ই হোক, আপনি তো সমাজতন্ত্র কথাটি বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছেন—
ইন্দিরা: হ্যাঁ, আমি যা করতে চাই, সমাজতন্ত্র তার কাছাকাছি। যেসব সমাজে এক ধরনের সমাজতন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট মাত্রার সামাজিক অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন তো সমাজতন্ত্রের অনেক অর্থ, অনেক ব্যাখ্যা। রুশরা নিজেদের সমাজতন্ত্রী বলে, সুইডিশরা তা-ই বলে। আমাদের ভুললে চলবে না যে জার্মানিতে রয়েছে জাতীয় সমাজতন্ত্র।
ওরিয়ানা: মিসেস গান্ধী, আপনার কাছে সমাজতন্ত্র শব্দটির মানে কী?
ইন্দিরা: ন্যায়বিচার। আমি আরো বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় চেষ্টা করে যাচ্ছি।
(সংক্ষেপিত)






