অনুবাদ: রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী
নিউইয়র্কের জন্য কবরলিপি
বলছি আবারো বলছি:
আমার কবিতা হলো গাছ, আর শাখায় শাখায়,
পাতায় পাতায়, আছে শুধু গুঁড়ির মাতৃত্ব।
বলছি আবারো বলছি:
কবিতা হলো হাওয়ার গোলাপ। হাওয়া নয়, বরং ওই স্থান
যেখানে বয় সব হাওয়া। ঘূর্ণি নয়, বরং বৃত্তের গণ্ডি।
তাই আমি খারিজ করে দিই নিয়ম, প্রতি মুহূর্তে নিয়ম গ্রহণের জন্য।
তাই আমি কাছে আসি এবং বের হই না।
বের হয়ে আর ফিরে আসি না।
যাই সেপ্টেম্বরের কাছে, যাই ঢেউয়ের কাছে।
তাই,
আমি কাঁধে বয়ে বেড়াই কিউবাকে
এবং নিউইয়র্কে শুধোই: কখন আসবে ফিদেল কাস্ত্রো?
এবং অপেক্ষায় থাকি দামাস্কাস ও কায়রোর মধ্যে,
পথের মাঝে বসে থাকি...
(চে গেবারা মুক্তি খুঁজে পেয়েছিল। মুক্তির সঙ্গে ডুব দিয়েছিল
সময়ের বিছানায় এবং ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙে জেগে উঠে খুঁজে পায়নি মুক্তিকে
এরপর আর না ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করল।)
আমি অপেক্ষা করি বার্কলেতে, বেইরুতে, অন্য সব চাকে
যেখানে সবকিছু জড়ো হয়
যেকোনো কিছু হওয়ার জন্য।
তাই,
রাতের পর্দায় বয়ে নেয়া
গাঁজায় ঝুঁকে থাকা এক মুখের মাঝে,
হিম সূর্যের বয়ে নেয়া
আইবিএমে ঝুঁকে থাকা এক মুখের মাঝে,
আমি লেবাননকে ছেড়ে দিয়েছি যেন ভাসতে পারে, ক্রোধের এক নদীর মতো,
এর দুকূল ছাপিয়ে
যার এক পারে জিবরান, অন্য পারে আদুনিস।
(ফেদেরিকো আর্বোস অনূদিত ‘এপিতাফিয়ো পারা নুয়েবা ইয়র্ক’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া মুক্তছন্দে লেখা গদ্য কবিতার অংশটি ১৯৭১ সালে প্রকাশিত মূল আরবিতে রচিত ‘কবর মিন আসলি নিউইয়র্ক’ বইয়ের অন্তর্ভুক্ত। এস্পানিওল ভাষায় অনূদিত বইটির প্রকাশক মাদ্রিদের নোর্দিকা লিব্রোস।)
একালের শোকগাথা
দেশান্তরী ট্রাকেরা
সীমান্তের পর সীমান্ত পেরোয়
নির্বাসন আর হু হু আগুনের
গানের মধ্য দিয়ে।
হাওয়া আমাদের প্রতিকূলে আর যুদ্ধের ভস্ম ঢেকে রাখে পৃথিবীকে। আমরা দেখি আমাদের আত্মা ধারালো অস্ত্র ও হেলমেটের বাঁকে ঝলক মারে। শারদীয় নুনে-জাড়ানো ঝরনা আমাদের জখমকে নোনা করে।
ইতিহাসের মুখ ধরে ঘষটাতে ঘষটাতে টান মারে সর্বনাশ— আতঙ্কের সুঁই-সুতো দিয়ে সেলাই করা আমাদের ইতিহাস, এক বুনো কাঁটাঝোপ।
কোন নোনা গাঙে আমরা এ কাহিনীকে ধুবো, হজ করে আসা থুবড়ি মেয়ে আর বিধবাদের গন্ধে বাসি? কোন নোনা গাঙে দরবেশের কোমরের ঘামে বিবর্ণ আমাদের এ ইতিহাসকে ধুবো, যার বসন্তকাল পঙ্গপালের পার্বণ?
রাত গহিন হয় এবং একটি নতুন দিন মৃত চড়ুইদের ওপর হামাগুড়ি দেয়। দরজায় খটর খটর শব্দ হয়, কিন্তু খোলে না। আমরা চিত্কার করে উঠি আর স্বপ্ন দেখি কান্নার, কিন্তু চোখ অশ্রুহীন।
আমার দেশ রোদে তপ্ত এক নারী, লালসার এক সেতু। ভাড়াটেরা ওকে পেরিয়ে যায়, ডেলাবাঁধা বালুর তারিফে। দূরের ব্যালকনি থেকে আমরা দেখি যা দেখার আছে: শিশুদের কবরখানায় জবাই হয় পশু; পবিত্রাত্মা সন্তদের জন্য ধোঁয়া ওঠা ধুনুচি; কবরের স্মৃতিস্তম্ভের কালো পাথর। মাঠভর্তি হাড়গোড় আর শকুন। বীর মূর্তিরা নরম লাশ।
তাই আমরা যাই, বুক উদোম করে সাগরে। আমাদের জবানের তলে পুরনো বিলাপেরা ঘুমায় আর আমাদের শব্দেরা হয় উত্তরাধিকারহীন।
আমরা পাড়ি দিই ভিনদেশী দ্বীপের দিকে, সাগরের অতলে এক কুমারী বিস্ময়ের ঘ্রাণ নিয়ে। বন্দরে আমাদের জাহাজের দুঃখকর আহাজারি শুনি আমরা। দুঃখ: এক নতুন চাঁদ ওঠে, কুর শৈশব। নদীরা নিঃসৃত হয় মৃত সাগরে, যেখানে রাতের কোলে জন্ম নেয় বিয়ে: সাগরের ফেনা আর বালুর, পঙ্গপাল আর বালুর।
তাই আমরা যাই আর ভয় আমাদের কাস্তে দিয়ে কাটে, পঙ্কিল ঢালে চিত্কার ছুড়ে। আমাদের চারপাশে পৃথিবীর রক্তপাত। সাগর এক সবুজ দেয়াল।
(রবিন ক্রেসওয়েল অনূদিত গদ্য কবিতাটি গত বছর বেরিয়েছিল ‘দ্য প্যারিস রিভিউ’ ম্যাগাজিনে।)
আমাদের কালের এক গুরু
আমাদের শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যব্যক্তিত্বের একজন হলেন আদুনিস। অসামান্য তার প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টি। তার কবিতা মহিমান্বিত। তার বলিষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তিক স্বর, তার মর্মভেদি ও জ্ঞানগর্ভ কবিতার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা, যা আরব দুনিয়ার মহৎ প্রাচীন সভ্যতার প্রতিফলন ঘটায়। পরিবর্তনশীল এ আরব দুনিয়া, যেখানে আদুনিস সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, যার খোঁজ তিনি প্রতিনিয়ত করেন আর যাতে তার অগাধ বিশ্বাস। তাকে চিনতে পেরে ও পাঠ করতে পেরে আমি খুবই খুশি ও গর্বিত। আমার এ বন্ধুটির বিশ্বজনীন অন্তর্দৃষ্টি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পাঠ্য হওয়া উচিত, যারা মনুষ্যত্বের পক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমার কাছে আদুনিস হলেন একজন গুরু, আমাদের কালের গুরু।
—ভি.এস. নাইপাল
(লন্ডন থেকে প্রকাশিত বানিপাল ম্যাগাজিন থেকে নেয়া)






