কারিকে বলা যেতে পারে সবচেয়ে বৈশ্বিক ডিশ। ইংল্যান্ড থেকে অ্যান্টার্কটিকা, চীন থেকে পূর্ব ইউরোপ— দুনিয়ার এমন কোনো প্রান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কারির অস্তিত্ব নেই। কারির জন্ম ভারতবর্ষে, পরবর্তীতে ইউরোপীয়দের হাত ধরে পশ্চিমে তার যাত্রা হয়। কারি মানে আমাদের বাংলায় তরকারি।
কারি বলতে কী বোঝায়? সংজ্ঞাটি কিছুটা জটিল ও বিতর্কিত। সাধারণত কারি হচ্ছে মসলাদার মাংস, মাছ বা সবজির ঝোল; যা ভাত, রুটি বা অন্য কোনো শর্করার সঙ্গে খাওয়া হয়। সহজ কথায় আমরা যাকে তরকারি বলে জানি, তা-ই কারি। কারির জন্য মসলা বেটে পেস্টের মতো করে বা গুঁড়ো কিংবা একেবারে রেডিমেড মিক্সার ব্যবহার করা যায়। এখনকার দিনে বাটা মসলার চেয়ে প্যাকেটজাত রেডিমেড মসলার ব্যবহারই বাড়ছে।
কারির সংজ্ঞাটা একটা ছাতার মতো, যে ছাতার তলে দুনিয়ার অনেক খাবারই জায়গা করে নিয়েছে, যেমন— ব্রিটিশ আমলের ক্ল্যাসিক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কারি; থাইল্যান্ডের গায়ং, ক্যারিবীয় অঞ্চলের জনপ্রিয় কারি রাইসু, জাপানের জনপ্রিয় খাবার, ইন্দোনেশিয়ার গুলাইস, মালয়েশিয়ার সুস্বাদু নোনইয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার বানি চোও অ্যান্ড বোবোটি, মৌরিতানিয়ার ভিনডেইলে ও সিঙ্গাপুরের স্ট্রিট ফুড।
কারির আরেকটি সংজ্ঞাও আছে। কারি এমন একটি পদ, যা শুষ্ক বা তরল দুই-ই হতে পারে, যা কারি পাউডার বা রেডিমেড মিশ্রণ দিয়ে তৈরি। এসব মসলার মধ্যে আছে হলুদ, জিরা, ধনিয়া, মরিচ (সঙ্গে কারি ট্রি নামের একটি গাছের পাতা যুক্ত হতে পারে আবার নাও পারে। মূলত দক্ষিণ ভারতে এ পাতা ব্যবহার হয়)। এ ক্যাটাগরিতে অনেক বৈচিত্র্যময় খাবার কারির মর্যাদা লাভ করে, যার মধ্যে আছে— জার্মানির হাইব্রিড ডিশ কারিভ্রুস্ট , সিঙ্গাপুরের নুডলস, কারি কেচাপের সঙ্গে ডাচ ফ্রাই ও আমেরিকান চিকেন সালাদ কারি।
কারি শব্দটির উদ্ভব অনেক আজগুবি ও হাস্যকর। সম্ভবত দক্ষিণ ভারতীয় ভাষা থেকেই কারি শব্দটির উদ্ভব, যেখানে কারিল বা কারি মসলাদার মাছ, মাংসকে বোঝানো হয়। পর্তুগিজরা কারিল বা কারি শব্দটি ব্যবহার করত ‘ভাতের সঙ্গে মাখন, বাদাম, বিভিন্ন মসলা, লবঙ্গ, আদা, ফল এবং আরো অনেক কিছু মিশিয়ে তৈরি করা’ ঝোল বোঝাতে। কারিল থেকেই ইংরেজি কারি শব্দটির উদ্ভব। উনিশ শতকের প্রসিদ্ধ অভিধান হবসন-জবসনে কারির পরিচয় হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘পর্যাপ্ত পরিমাণ মসলা, হলুদ দিয়ে রান্না করা মাংস, মাছ, সবজি, যা অনেকটা ভাতকে সুঘ্রাণ দেয়।’ কারি শব্দটা ভারতীয়রা ব্যবহার করে না। তারা সংশ্লিষ্ট ডিশগুলোকে আলাদা আলাদা নামে ডাকে— কোরমা, রোগান জোস, মোলি, ভিন্দালু, দোপেয়াজা প্রভৃতি।
বিশুদ্ধতাবাদীরা জোর দিয়ে বলেন যে, সত্যিকার কারি তৈরি হয়েছে আঠারো শতকের শেষ দিকে ব্রিটিশ ভারতে। এ ক্ল্যাসিক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কারি তার গৌরবের শীর্ষস্থানে পৌঁছেছিল কর্নেল কেনি-হারবার্টের রেসিপির মাধ্যমে। এতে কারি তৈরির জন্য পেঁয়াজ তেলে ভাজতে হবে, সঙ্গে যোগ করতে হবে মাছ বা মাংসের টুকরো। এরপর হালকা আঁচে পানি, টমেটো বা নারকেলের দুধের মিশ্রণে তাপ দিতে হবে। পানি ফোটা শুরু হলে তাজা গুঁড়ো মসলা বা রেডিমেড মিক্স মসলা মিশিয়ে দিতে হবে।
কারি ব্রিটেনে দারুণ জনপ্রিয়। দেশটিতে কারি সপ্তাহও পালিত হয়। এক কথায় এটি এখন ব্রিটিশদের জাতীয় ডিশ। দেশটির প্রায় নয় হাজার ভারতীয়, বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় কারি বিক্রি হয়।
অক্সফোর্ড কম্পেনিয়ন টু ফুড-এ অ্যালান ডেভিডসন লিখেছেন, ‘প্রচলিত হওয়ার পর থেকে কারির অর্থ বদলে গেছে। এটি এখন বিশ্বব্যাপী একটি খাবারের মেন্যুর নাম হিসেবে প্রচলিত হয়ে গেছে।’ কারি একসময় শুধু ভারতীয় খাবারের ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো, কিন্তু এখন তা দুনিয়াজুড়ে বৈচিত্র্যময় নানা ডিশের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়, তবে একটি জিনিস সাধারণ তা হলো, এসব খাবার অবশ্যই মসলাদার। ব্রিটেনের কারি সপ্তাহ পালনকারীদের এক মুখপাত্রের মতে, কারি দুনিয়ার যেখানেই খাওয়া হোক, তার কিছু নিজস্ব স্বকীয়তা আছে। ১৯৩০-এর দশকে একটি ইংরেজি রান্নার বইয়ে সব গরম খাবারকেই কারি নামে অভিহিত করা হয়; ফরাসি শব্দ কুরি অর্থ রান্না করা। তবে অ্যালান ডেভিডসন লিখেছেন, কারি নামটি এসেছে তামিল শব্দ কারি থেকে। তামিল ভাষায় মাংস, মাছের জন্য বা এমনিতে তৈরি করা মসলাদার পাতলা ঝোলকে কারি বলা হয়। ইউরোপীয়রা তাদের যেকোনো তরল রান্নাকেই কারি হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। ইউরোপীয় জাতি হিসেবে পর্তুগিজরাই কারিকে জনপ্রিয় করতে সর্বপ্রথম ভূমিকা রাখে। ১৭ শতকে পর্তুগিজ রান্নার বইয়ে কারির রেসিপির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে কারিকে নিজেদের করে নিয়ে দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ইংরেজিতে কারির রেসিপি প্রকাশ করেন হ্যানা গ্লাসেস, সময় ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দ। তার এ বইয়ে তিনি ‘ভারতীয় পদ্ধতিতে কারি তৈরির পদ্ধতি’ বর্ণনা করেছিলেন।
ভারতেও এখন প্রাথমিক কালের কারির চেহারা বদলে গেছে। কারিতে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আসা মরিচ যুক্ত হয়েছে। কারিতে মরিচ যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি বৈশ্বিক চেহারা ধারণ করে।
কারি খাওয়া হয় সাধারণত ভাতের সঙ্গে। আর এর সঙ্গে থাকে শসা, টমেটো, আচার, চাটনি, নারকেল প্রভৃতি। শুরুতে কারি ছিল ব্রিটিশ অভিজাতদের পদ, ধীরে ধীরে এটা মধ্যবিত্ত ও শেষমেশ শ্রমজীবীদের খাবার টেবিলে পৌঁছে যায়। ১৯৫০, ১৯৬০ এমনকি সত্তরের দশকের শেষ পর্যন্ত দাওয়াতে কারি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। উনিশ শতকে বাণিজ্যিকভাবে প্যাকেটজাত কারি পাউডার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ পাউডার ব্রিটেনের রাঁধুনিদের কারি রান্না সহজ করে দেয়।
ব্রিটিশ কুকবুক, অভিবাসী ও কর্মকর্তাদের মাধ্যেমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে কারি পৌঁছে যায়। ইংরেজ রেসিপির কারি উনিশ শতকের আমেরিকা, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার রেস্তোরাঁগুলোয় আদর্শ এক খাবার হয়ে ওঠে। অস্ট্রেলিয়ার একজন ঔপন্যাসিক কারিকে জাতীয় ডিশের মর্যাদা দেয়ার দাবি তুলেছিলেন। কারি তাদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া নিজস্ব খাদ্যতালিকার অংশ। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে ভারতীয় বণিক ও বৌদ্ধ মিশনারিরা ভারতে তেঁতুল, রসুন, পেঁয়াজ, আদা, হলুদ, মরিচ প্রভৃতি এ অঞ্চলে নিয়ে আসে। অষ্টম শতকে আরব বণিকরা কাবাব, কোরমা, বিরিয়ানির মতো মাংসনির্ভর পদগুলো ভারতে নিয়ে আসে।
পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে পর্তুগিজরা মসলার বাণিজ্যের দখল নিয়ে নেয়। তারা পারস্য উপসাগর, মালাক্কা প্রণালি, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের বণিজ্য কেন্দ্র গড়ে তোলে।
পর্তুগিজদের এসব কেন্দ্র পশ্চিমা দুনিয়া, আফ্রিকা, ওশেনিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে ফল, সবজি, বাদাম ও অন্যান্য গাছপালার বৈশ্বিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মরিচ। এটা দ্রুতই স্থানীয় অনেক খাবারে মিশে যায় এবং কারির অপরিহার্য উপাদান হয়ে ওঠে। সপ্তদশ শতকে পর্তুগাল এর সাম্রাজ্যের বেশির ভাগ অংশ ব্রিটিশ ও ডাচদের হাতে হারায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারত, শ্রীলংকা, বার্মা, মালয়, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, উত্তর আমেরিকার বেশির ভাগ অঞ্চল, ত্রিনিদাদ, গায়ানা, ফিজি, মরিশাস ও আফ্রিকার অনেকটা অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ডাচরা পায় ইন্দোনেশিয়া, সুরিনাম, শ্রীলংকার অংশবিশেষ, দক্ষিণ আফ্রিকা। কারির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হওয়া এবং ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে দাসত্ব প্রথা নিষিদ্ধ হওয়া। দাসদের মুক্ত করে দেয়ার পর তাদের জায়গায় কাজ করতে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ১০ লাখের বেশি শ্রমিক আনে ব্রিটিশরা। এ শ্রমিকদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকা, মালয়েশিয়া, মরিশাস, শ্রীলংকা ও ফিজির প্লানটেশনে কাজে লাগানো হতো। এদের উপস্থিতিতে খাবারের আদান-প্রদান শুরু হলো। ডাচ কলোনিগুলোতেও এ ঘটনা ঘটেছিল।
আধুনিক ব্রিটেনে হাজারো রেস্তোরাঁ ও কারি হাউজের মেন্যুতে কারি একটি অন্যতম নাম। অনেক রেস্তোরাঁয় বিশেষ ‘কারি নাইট’ অনুষ্ঠিত হয়। কারি সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে। সময় ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মতো জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, জলবায়ু ও খাদ্য বৈচিত্র্য দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। সিন্ধু ও গঙ্গা নদীর উর্বর সমতলে, বাংলার বদ্বীপে, মালাবার উপকূলে মসলার বাগানসংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলো কৃষিতে আশীর্বাদপুষ্ট। কৃষির এ আশীর্বাদ এখানকার সমৃদ্ধ খাবার তালিকাকে সমৃদ্ধ ও লোভনীয় করেছে। তবে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের খাবারের আধিপত্য। এখানে কোনো একক প্রাধান্য বিস্তারকারী খাবার নেই।
প্রাগৈতিহাসিক আমল থেকেই ভারত তার ভৌগোলিক অবস্থান ও সম্পদের কারণে আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। নতুনরা নানা ধরনের খাদ্যোপাদান, খাবারের পদ ও রান্নার পদ্ধতি নিয়ে এসেছে। এতে ভারতীয় খাবারে আরো অনেক নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে। তবে এ বিনিময় একতরফা ছিল না। ভারত থেকেই অনেক কিছু দুনিয়ার অন্য প্রান্তে গিয়েছিল, যার মধ্যে আছে মসলা, আম, আখ, চা, কারিসহ আরো অনেক কিছু।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, এ উপমহাদেশের প্রাথমিক কালের বাসিন্দারা ভাত, যব, মসুর, কুমড়া, নারকেল, কাঁঠাল, আম, লেবু প্রভৃতি খেয়ে জীবন ধারণ করত। জঙ্গলের পাখিকে ভারতেই প্রথম পোষ মানানো হয়েছে। স্থানীয় মসলার মধ্যে ছিল হলুদ, আদা, তেঁতুল ও মরিচ। কারির উৎস খুঁজতে গেলে বৈজ্ঞানিকরা আমাদের চার হাজার বছর পেছনে যেতে বলেন। তারা জানিয়েছেন, সিন্ধু সভ্যতায় ভারতীয় কারির আদি রূপ পাওয়া যায়। নৃতত্ত্ববিদরা দিল্লির দক্ষিণে প্রাচীন ফারমানা শহরে মানুষের দাঁত ও রান্না করার পাত্রের নমুনা খুঁজে পেয়েছেন। এসব নমুনায় খাদশস্যের সঙ্গে রান্না করা হলুদ ও আদার সন্ধান পাওয়া গেছে। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক অরুনিমা কাশ্যপ ও স্টিভ ওয়েবারের এ আবিষ্কার প্রকাশিত হয়েছিল জার্নাল সায়েন্সে। তারা জানিয়েছেন, হলুদ ও আদার রান্না করার এ নমুনা ২৫০০ থেকে ২২০০ বছর পুরনো। মসলা ব্যবহারের এটাই প্রাচীনতম নমুনা। মিসর ও মেসোপটেমিয়ার সমান্তরালে দুনিয়ার প্রথম নগর সভ্যতাগুলোর একটি সিন্ধু সভ্যতা। আজ আমরা কারিতে যেমন ভাতের ব্যবহার করি, সেটা এ সিন্ধু সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া গেছে। গবেষকরা এখানে আরো পেয়েছেন গম, যব, বাজরা, মসুর, মুগ। এ থেকে বলা যায়, কারিই হচ্ছে মানবেতিহাসের সবচেয়ে পুরনো খাবার, যা ধারাবাহিকভাবে এখনো টিকে আছে। উদ্ভবের বহু শতক পর কারিতে যুক্ত হয়েছে মরিচ। কারির আক্ষরিক বা আদর্শ সংজ্ঞা এখনো নিশ্চিত করে লেখা হয়নি। আধুনিক কালে কারি নানাভাবে তার চেহারা বদলেছে।
ঔপনিবেশিক আমলে ভারত থেকে দেশে ফিরে ব্রিটিশরা ভারতের কারি তাদের বন্ধুদের খাওয়াতে পছন্দ করত। উনিশ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ এমন কোনো ব্রিটিশ রেসিপি বুক ছিল না, যাতে কারির উল্লেখ থাকত না। আর দোকানে পাওয়া যেত কারি পাউডার। ১৮৬১ সালে ইসাবেলা বিটনের লেখা বুক অব হাউজহোল্ড ম্যানেজমেন্টে তিনি কারির একটি রেসিপি তুলে ধরেছেন। এভাবে তখনই কারি ব্রিটিশদের খাদ্যতালিকায় আনুষ্ঠানিক পদ হয়ে উঠেছে। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো এরপর কারি পাউডার তৈরি শুরু করে, এমনই একটি ব্র্যান্ড ছিল ‘দি এমপ্রেস’। শুধু লন্ডনের গৃহিণী নন, বরং ব্রিটেনে থাকা ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীরাও এ কারি পাউডারের ক্রেতা হয়ে ওঠেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে দাসত্ব নিষিদ্ধ হওয়ার পর শ্রমিক হিসেবে প্রচুর ভারতীয় কাজ করতে ইংল্যান্ডে আসেন। পরবর্তী ৮০ বছর ১৫ লাখ ভারতীয় শ্রমিক ব্রিটিশদের বিভিন্ন উপনিবেশে কাজ করেছেন। এ শ্রমিকদের চাল, ডাল ও কারি পাউডার সরবরাহ করা হতো।
আবদুল মিয়া লন্ডনের এক দক্ষিণ এশীয় রেস্তোরাঁর দ্বিতীয় প্রজন্মের মালিক। ‘আমার বাবা ১৯৫৭ সালে এখানে এসেছিলেন। পকেটে ৩ পাউন্ড নিয়ে চার রাত ঘুমিয়েছেন ট্রাফালগার স্কয়ারের বেঞ্চে।’ তিন বছরের মাথায় আবদুলের পিতা সোহোতে দ্য স্টার অব পাকিস্তান নামে একটি রেস্তোরাঁ খোলেন। ব্রিটেনে পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে পথপ্রদর্শক কারি হাউজগুলোর জন্মের গল্পগুলো অনেকটা এ রকমই। দক্ষিণ এশিয়া থেকে যাওয়া অভিবাসীরাই ব্রিটেনে কারি রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে তখন কেউ জাহাজে চেপে কেউবা বিমানে করে ব্রিটেন পৌঁছেন। ছাত্র, নাবিকসহ অন্যরা কিছু বেশি রোজগারের জন্য ব্রিটেনে পাড়ি জমাতে শুরু করেন। এর মধ্যে কারি এসে পড়ে তাদের জীবনে। বিলেতেই জমিয়ে শুরু করেন কারি রেস্তোরাঁ। এরা আর মাতৃভূমিতে ফেরেননি। বাংলাদেশ জন্মের অব্যবহিত পরেও অনেকে বিলেতে পাড়ি জমিয়েছেন। জো মনরো তার স্টার অব ইন্ডিয়া: দ্য স্পাইসি অ্যাডভেঞ্চার অব কারি গ্রন্থে বজলুর চৌধুরী নামের এক বাংলাদেশীর গল্প শুনিয়েছেন। বজলুর ২০ বছর বয়সে ১৯৬০ সালে ব্রিটেনে পাড়ি জমান। সে সময় তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক মেধাবী তরুণ দেশে সিভিল সার্ভিস, ব্যাংক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যোগ না দিয়ে কেন ব্রিটেনে বাবুর্চির কাজ করতে গিয়েছিলেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বজলুর। ‘পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে অনেক ছাত্র ব্রিটেনে চলে আসত। দেশ ভাগের পর ভারত তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ১৯৫৮ সালে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, ছাত্ররা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে। এ সময় অনেক রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং অনেক ছাত্র আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। আমার বাবা সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা বিভাগে চাকরি করতেন। আমার রাজনৈতিক কাজের জন্য তাকে কর্মস্থলে চাপে পড়তে হতো। এমনকি তার চাকরিচ্যুতিরও হুমকি পেতেন। আমরা ছিলাম ১০ ভাইবোন। তাই তার জন্য চাকরি টিকিয়ে রাখাটা জরুরি ছিল। তাই বাবা বললেন, আমি যদি তাকে সাহায্য না করতে পারি তাহলে অন্তত যেন দেশ ছেড়ে চলে যাই। সে সময় ব্রিটেনে ঢোকার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। আমার মনে হয়, ১৯৬২ সালের আগে সেখানে প্রবেশে কোনো বাধা ছিল না। আমি এবং আরো অনেকে সে সময় ব্রিটেনে চলে আসি।’
বজলুর জানিয়েছেন, সে সময় ব্রিক লেনে বাংলাদেশীদের ডজনখানেক বাড়ি ছিল। সেসব বাড়িতে নতুন যাওয়া বাংলাদেশীরা আশ্রয় পেত। বজলুর আলী নামের একজন বাংলাদেশীর কথা বলেছেন, যিনি তখন ব্রিটেনে রেস্তোরাঁর মালিক। তিনি ছিলেন এ ব্যবসার একজন অগ্রণী বাংলাদেশী। অনেক অর্থের মালিক আলী পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
সামসউদ্দিন খান লন্ডনে গিয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে। তিনি জানিয়েছেন, সে সময় লন্ডনের কারি হাউজগুলো ছিল সাধারণ মানের। খাবারের পদ বলতে ছিল চিকেন কারি বা মিট কারি। ইস্ট লন্ডনে তখন কিছু কারি হাউজ ছিল, যেগুলোয় একই সঙ্গে ভাত ও কারি পাওয়া যেত। ১৯৫৮ সালে সামসউদ্দিন খান ক্ল্যাপহ্যাম স্ট্রিটে একটি ইতালীয় রেস্তোরাঁ কিনে নেন। শুরুতে বিদেশী খাবার রান্না করেছিলেন কিন্তু ব্যবসা জমেনি। তখন এক ভারতীয় তাকে কারি তৈরির পরামর্শ দেন।
বজলুর তার প্রথম রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কারি ব্যবসার বিকাশ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন তিনি। ১৯৬৪ সালে হ্যারল্ড উইলসন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হলে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি পায়। এতদিন ভারতীয় খাবার শুধু ধনী বা মধ্যবিত্তরাই খেতে পারত। দামের কারণে শ্রমিকরা তার স্বাদ নিতে পারতেন না। কিন্তু এবার শ্রমিকদের আয় বাড়ায় তারা ভারতীয় খাবারের স্বাদ নিতে শুরু করলেন। এ সময় ব্রিটেনে ভারতীয় খাবারের রেস্টুরেন্টের সংখ্যা ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০-তে পৌঁছে।
পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশীরা কারি রান্না ও নিজেদের জন্য হালাল খাবারের অভাবে ভুগেছে। রোববার সকালে কিছু জায়গায় জ্যান্ত মুরগি বিক্রি হতো, বাংলাদেশীরা সেখান থেকে মুরগি কিনে নিজেরা জবাই করত। এভাবে রাস্তায় মুরগি বিক্রি অবৈধ ছিল। সে সময় আরেকটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। মুসলিমরা দেখতে পায়, ইহুদি কসাইদের কাছ থেকে তারা হালালভাবে প্রস্তুতকৃত মাংস কিনতে পারে। মুসলমান ও ইহুদিদের ধর্মীয় বিদ্বেষ থাকলেও তখন ব্রিটেনের অনেক মুসলমানই এ ইহুদি কসাইদের কাছ থেকেই মাংস কিনত। কারণ এই দুই ধর্মে পশু জবাইসংক্রান্ত নিয়মাবলি প্রায় একই রকম। সেই দশকেই ভারতীয় লক্ষ্মীশংকর পাঠকের মাধ্যমে দেশটির মসলা ব্রিটেনে সহজলভ্য হতে শুরু করে। ফলে কারি ব্যবসায়ও গতি আসে।
সিলেটিরা ব্রিটেনের কারি ব্যবসার অন্যতম অগ্রদূত। সিলেটিরা একসময় স্থানীয় কারি ব্রিটেনে নিয়ে গিয়েছিল আর এখন তাদের বংশধররা ব্রিক লেনের কারিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিলেটিরা তাদের কারি ব্যবসায় ব্রিটেনে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে। আর সেই অর্থের জৌলুস এখন সিলেটে দেখা যায়। জো মনরো তার বইয়ের জন্য গবেষণায় ব্রিটেনে অনেক সিলেটির সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা সিলেটে চা বাগানসহ অনেক সম্পত্তির মালিক। কারি ব্যবসা সিলেটের সমৃদ্ধিতে দারুণ ভূমিকা রেখেছে, সেটা ব্রিটেনে বসেই জো বুঝতে পেরেছেন। সিলেটিদের কাছে তাদের বাড়ি আর চা বাগানের ছবি দেখেছেন। তিনি দেখেছেন ব্রিটেনে এখনো প্রচুর সিলেটি তরুণ যাচ্ছেন, যারা কারি ব্যবসায় ক্যারিয়ার গড়ছেন। কারি তৈরি শেখার বেশকিছু স্কুলও লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
একটা সময় ব্রিটেনে কারির স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। তখন উনিশ শতকের পথপ্রদর্শক সেলিম’স কারি পেস্টের ক্যাপ্টেন ডব্লিউ হোয়াইট কারির স্বাস্থ্যগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘সহজে হজম হয়, সুস্বাদু ও পেটের জন্য ভালো।’ শুরু থেকেই কারি বিশ্বায়নের একটি পণ্য। ব্যবসায়ী, বণিক, মিশনারি, ঔপনিবেশিক শাসক, তাদের স্ত্রী, শ্রমিক, অভিবাসীরা মিলে পণ্যটিকে দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছেন। এখন মানুষ, মসলার চলাচল আরো উন্মুক্ত হওয়ায় কারি খুব সহজলভ্য একটি বৈশ্বিক ডিশে পরিণত হয়েছে।
কারি যে শুধু ভারত থেকে ব্রিটেন জয় করেছিল তা নয়, বরং ম্যাকডোনাল্ড’সের উপস্থিতি আছে, এমন দেশের চেয়ে অধিকসংখ্যক দেশে কারি খাওয়া হয়। এশীয় ডায়াস্পোরা পুরো পৃথিবীতেই ছড়িয়ে আছে। ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে মানুষ দুনিয়ার বহু দেশে বাস করছে। জাপান, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, গ্রিস, ইতালি অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রচুর মানুষ বাস করে। আর এরা যেখানে আছে, কারি সেখানে থাকবেই। কারি যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হয় আশি ও নব্বইয়ের দশকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে কারি ব্রিটেনের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। কারণ হিসেবে অনেকে মনে করেন, আমেরিকানরা মসলাদার খাবার বলতে মেক্সিকোর খাবারে অভ্যস্ত। তাই ভারতীয় মসলায় তারা সেভাবে আগ্রহ দেখায়নি।
কারির জনপ্রিয়তা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রবণতার কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত উন্নত দেশে। এসব দেশে গরম ও মসলাদার খাবারের চাহিদা বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোর অধিকতর কসমোপলিটন সংস্কৃতি এতে ভূমিকা রাখছে। ইতালিয়ান, চায়নিজ বা থাই খাবার একসময় একেবারেই নির্দিষ্ট জাতিগত খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এখন উত্তর আমেরিকা, ব্রিটেনে এসব খাবার সাধারণ হয়ে গেছে। খাদ্য বিশেষজ্ঞরা একুশ শতকের খাদ্যের ট্রেন্ড হিসেবে গরম, মসলাদার, কড়া সুবাসযুক্ত খাবারের চাহিদার কথা বলেছেন।
স্বাস্থ্যসচেতনতাও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। হাজার বছর ধরে ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়ার ওষুধবিদ্যায় মসলার ব্যবহার হচ্ছে। আজকের দিনের গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল সেন্টারের গবেষণায়ও এর সত্যতা মিলছে। রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ে যে মসলাটির সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রয়েছে তার নাম হলুদ, যা কারি পাউডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দারচিনি, রসুন, আদা ও অন্যান্য মসলারও স্বাস্থ্যগুণ আছে। ফলে কারি নামের বৈশ্বিক ডিশটি আগামী আরো বহু বছর দুনিয়ার নানা প্রান্তে মানুষের খাওয়ার টেবিলে শোভা পাবে, তাতে আর সন্দেহ নেই।
তথ্যসূত্র:
কারি আ গ্লোবাল হিস্টরি, কলিন টেলর
স্টার অব ইন্ডিয়া: দ্য স্পাইসি অ্যাডভেঞ্চার অব কারি, জো মনরো
বিবিসি, টেলিগ্রাফ






