(১৯১৭-১৯৮৪)

তার নামের মাঝখানের প্রিয়দর্শিনী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যোগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ঠিক চার বছর পর ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম।

জহরলাল নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরার জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯১৭, ভারতের এলাহাবাদে। তার বাবা স্বাধীনতার পর থেকে টানা ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ইন্দিরা ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের হাতে নিহত, ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক সময়ে প্রধানমন্ত্রী।

ইন্দিরার পড়াশোনা বাড়িতেই। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশনের পর তিনি বিশ্বভারতীতেও পড়াশোনা করতে যান। এক বছর পরই অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়াতে ইউরোপে চলে যান। এরপর অক্সফোর্ডের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবার কৃতকার্য হননি, দ্বিতীয়বার তাকে বসতে হয়। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ফিরোজ জেহাঙ্গিরের সঙ্গে তার প্রেম। ফিরোজকে এলাহাবাদ থেকেই চিনতেন। ফিরোজ জরাথ্রুস্টবাদী পারসিক। এ বিয়েতে নেহরু পরিবার রাজি ছিল না। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ফিরোজের নতুন নামায়ন ফিরোজ গান্ধী করে ইন্দিরার বিয়ের মধ্যস্থতা করেন। তিনি দুই সন্তান রাজীব ও সঞ্জয়ের জননী হন।

শুরু থেকেই ইন্দিরা বাবার সঙ্গে— প্রধানমন্ত্রীর শেফ অব দ্য স্টাফ, কার্যত তিনিই একান্ত সচিব। ইন্দিরা রাজনীতিতে যোগ দেন। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৬৪ সালে নেহরুর স্বাভাবিক মৃত্যুর পর লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তিনি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হন।

১৯৬৬ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর পর মোরারজি দেশাই দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শক্তিশালী দাবিদার। জ্যেষ্ঠদের মধ্যে কুমারস্বামী কামরাজও তরুণদের সমর্থনে মোরারজির বিরুদ্ধে প্রার্থী হন এবং বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে দলীয়প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৭১-এর মার্চের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আবার সরকার গঠন করেন ইন্দিরা— এ পর্বে তার প্রতিশ্রুতি ‘গরিবি হটাও।’

১৯৭১ সাল ইন্দিরার জন্য ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ ও চরম সাফল্যের বছর। তিনি তখনকার পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা প্রায় ১০ মিলিয়ন শরণার্থী সামলেছেন, এটাকে পুঁজি করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সমর্থন করে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও আস্থা অর্জন করেছেন। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানকে নাস্তানাবুদ করে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডকে আত্মসমর্পণে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন স্বাধীন দেশ হয়ে যাওয়ায় সৈন্য মোতায়েনের ক্ষেত্রে কেবল পশ্চিম সীমান্তেই গুরুত্ব রয়ে যায়। ইন্দিরার এ সাফল্য অসামান্য; স্বল্পতম সময়ে সব শরণার্থীকে ফেরত পাঠিয়ে প্রমাণ করেছেন শরণার্থী পুনর্বাসনে নয়, সাফল্য প্রত্যাবাসনে এবং নিজ দেশের ওপর থেকে উটকো বোঝা মানবিকভাবে অপসারণে।

অটল বিহারি বাজপেয়ি, ইন্দিরাবিরোধী নেতা তাকে বলেছেন, ভারতের দেবী দুর্গা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় সর্বভারতীয় ‘ইন্দিরা ওয়েভ’ সৃষ্টি করে। চুয়াত্তর থেকে এ ঢেউয়ের তোড় কমতে থাকে। ইন্দিরার কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয়ের অভ্যুদয় ঘটে এক অশুভ গ্রহের মতো— বাধ্যতামূলক ভেসেকটমির অর্থনৈতিক ও জনমিতিক গুরুত্ব যত ভালোই হোক, সঞ্জয়ের এ ধরনের হঠকারী পরিকল্পনা জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। সঞ্জয়কে ঘিরে একটি কায়েমি স্বার্থবাদী দুষ্ট চক্রও গড়ে ওঠে— দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের অনেক নজিরের কথা উল্লেখ করা য়ায়।

১৯৭১-এর নির্বাচনে রায়বেরেলি আসনে নির্বাচনবিধি ভঙ্গসহ কারচুপির অভিযোগে ইন্দিরার বিরুদ্ধে রাজ নারায়ণের মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারক জগমোহনলাল সিনহা ইন্দিরার লোকসভা সদস্যপদ বাতিল করে দেন এবং পরবর্তী ছয় বছর তাকে নির্বাচন থেকে সরে থাকার আদেশ দেন।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানায়। পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে ওঠে। ইন্দিরা জরুরি অবস্থার আশ্রয় নেন। সঞ্জয় ও তার বন্ধুদের অন্যতম বংশীলাল সে সময় কার্যত ভারত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়ে নেন।

একটি অনানুষ্ঠানিক ডিনারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছেলে সঞ্জয়ের হাতের চড়ও খেয়েছেন বলে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিনিধি উল্লেখ করেছেন।

পরে বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের মৃত্যু হলে কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে।

ইন্দিরা গান্ধী অস্থিতিশীল অবস্থা ও বিরোধিতার মুখে তার শেষ কার্ডটি খেললেন। ভারতীয় সংবিধানের ৩৫২ অনুচ্ছেদের আওতায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব পাঠালেন ২৫ জুন ১৯৭৫; রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলী আহমেদ জরুরি অবস্থা জারি করেন। নাগরিক স্বাধীনতা ও অধিকার কর্তন করা হলো, চারটি রাজনৈতিক দল আনন্দমার্গ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, নকশাল ও জামাত-ই-ইসলামী-ই হিন্দ নিষিদ্ধ হলো। জরুরি অবস্থা জারির প্রথম ৪০ দিনে অন্তত ৫০ হাজার মানুষকে কারাগারে পাঠানো হলো। জরুরি অবস্থা প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধীকে অসীম ক্ষমতাধর করে তুলল।

সে সময় জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছিলেন, তারা এমনিতেই ইন্দিরাবিরোধী; জরুরি অবস্থা বিরোধীদের ঐক্য আরো সংহত করে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেপি— সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ। তার পাশে ছিলেন জর্জ ফার্নান্দেজ, মোরারজি দেশাই, নানাজি দেশমুখ, সুব্রামানিয়াম স্বামী, অটল বিহারি বাজপেয়ি, রামকৃষ্ণ হেগাড়, এইচ ডি দেব গৌড়া, এম করুণানিধি, জেবি পট্টনায়েক, জ্যোতি বসু, মধু দান্দাভাতে, লালু প্রসাদ যাদব, শরৎ যাদব এবং আরো অনেকে।

১৯৭৭-এর নির্বাচনে ইন্দিরা ও কংগ্রেসকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করে। ইন্দিরাসহ কংগ্রেসের বহু রাঘব বোয়াল স্বল্প পরিচিত বিরোধী প্রার্থীর কাছে পরাস্ত হন। জগজীবন রাম, হেমবতী নন্দন বহুগুণা ও নন্দিনী শতপথীর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা ইন্দিরার কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু আপ্রাণ পরিশ্রম করে ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা আবার বিপুল ব্যবধানে জিতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

অপারেশন ব্লু স্টার শিখ নেতা ভিন্দ্রানওয়ালেসহ স্বর্ণমন্দির ধূলিসাৎ করে দেয়। বহু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই মন্দিরের ঘণ্টা শোনা গেলেও অশ্রুত থেকে যায় ইন্দিরার মৃত্যুঘণ্টা।

প্রধানমন্ত্রী অবস্থায় দুই বছরের ব্যবধানে তাকে দুটো গুরুত্বপূর্ণ মৃত্যু দেখতে হয়েছে। ১৯৭৩-এ সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হন চিলির প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট। বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আয়েন্দের জীবন নাশ করেছে সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থান— এতে চারদিকে একটি ‘শকওয়েভ’ ছড়িয়ে পড়ে এবং ইন্দিরা গান্ধী বিচলিত বোধ করতে থাকেন বলে মনে করা হয়। তিনি আতঙ্কিতও হন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা ও গোলযোগ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কাজ বলে বিশ্বাস করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করাই এর উদ্দেশ্য।

রাষ্ট্রপতি ভবনে অধিষ্ঠিত প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থে ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে যথেষ্ট সম্মানজনক ও সংযত মন্তব্য করেছেন:

১. সেনাবাহিনী দিয়ে যখন স্বর্ণমন্দিরে আক্রমণ চালানো হলো, আমার স্পষ্ট মনে আছে মিসেস গান্ধী আমাকে বলেছেন: ‘প্রণব, এর পরিণতি কী আমি জানি।’ তিনি পরিস্থিতি ভালো করেই বুঝেছেন এবং তার কাছে স্পষ্ট হয়েছে সামরিক সমাধান ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।

প্রণব লিখছেন, ‘স্বর্ণমন্দিরে সামরিক আক্রমণ এড়ানো যেত— এটা বলা সহজ কিন্তু কীভাবে সংকটের সমাধান হতো কারো জানা নেই।’

২. ঘাতকের হাতে ইন্দিরার গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর কলকাতা থেকে অনেক দূরে রাজীব গান্ধী ও প্রণব মুখার্জির কাছে পৌঁছেছে, রাজীব পিএমওকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা শোনলাম ১৬টি গুলি তার শরীরে ঢুকেছে। ভিআইপিদের রক্ষায় যে গুলি ব্যবহার করা হয়, তা কতটা শক্তিশালী? পিএমও বললেন, খুব শক্তিশালী। রাজীব তখন আমাদের দিকে ফিরে খুব আবেগময় কণ্ঠে বললেন, ‘এ গুলিগুলো কি তার প্রাপ্য ছিল?’ আমরা স্তব্ধ ও নির্বাক হয়ে বসে রইলাম।

রাজীব গান্ধীসহ প্রণব মুখার্জি কলকাতা থেকে দিল্লি এসে পৌঁছলেন বেলা ৩টায়; ৩টা ২৫ মিনিটে পৌঁছলেন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সার্ভিসেসের নয়তলায় অপারেশন থিয়েটারের সামনে। রাজীব অরুণ নেহরুর সঙ্গে আগেই এসে পৌঁছেছেন। প্রণব সেখানে যাদের পেলেন: পিভি নরসীমা রাও, পি শিবশঙ্কর, বি শঙ্করানন্দ, এন ডি তিওয়ারি, জেবি পট্টনায়েক, ভজন লাল, শিব চরণ মাথুর; প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব পি সি আলেকজান্ডার, ইন্দিরা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ জি পার্থসারথী এবং পরবর্তীকালে ইন্দিরার জীবনীকার পুপুল জয়কার।

৩১ অক্টোবর ১৯৮৪

১২ নভেম্বর ১৯৮৪ টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রচ্ছদে তার ছবির ঠিক পেছনে মুদ্রিত ছিল ৩০ অক্টোবর ওড়িষার জনসভায় দেয়া ভাষণের একটি পঙিক্ত: ‘আমি যদি আজ মারা যাই, আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু জাতিকে উজ্জীবিত করবে।’ তিনি পরদিনই নিহত হলেন।

৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ সালের ঘটনাটি উইলিয়াম ই স্মিথের লেখা থেকে খানিকটা সংক্ষেপে তুলে ধরছি। তিনিই প্রচ্ছদ কাহিনীটির রচয়িতা—

বুধবার সকাল ৯টা ৮ মিনিট, ইন্দিরা গান্ধী দু’হাত জোড় করে তার অফিসের পথে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন প্রহরীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নমস্তে’, এটাই ছিল তার শেষ কথা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত হয়ে উঠল ১৯৪৭-পরবর্তী সবচেয়ে সহিংস জাতিগত দাঙ্গার আখড়া, নিহতের সংখ্যা যখন হাজার ছাড়িয়ে গেল, প্রশ্ন জাগল অনভিজ্ঞ নতুন প্রধানমন্ত্রী উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক জোড়াতালি দিয়ে জাতিগত ও ধর্মীয় অনুভূতিতে বিচ্ছিন্ন ৭৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে সামাল দিতে পারবেন তো?

নয়াদিল্লির ১ নম্বর সফদর জং রোডে উজ্জ্বল মনোমুগ্ধকর সকালে উঁচু তেঁতুল গাছের নিচে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন— দুটো বাংলো, একটিতে আবাসিক অফিস, অন্যটিতে প্রধানমন্ত্রীর বসবাস। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকেন তার ছেলে রাজীব ও বৌমা সোনিয়া আর তাদের সন্তান রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি জাতীয় নির্বাচন, তারই প্রস্তুতি ও প্রচারণায় রাজীব তখন পশ্চিমবঙ্গে। একমাত্র জীবিত সন্তান রাজীবই তার উত্তরাধিকারী। ৬৬ বছর বয়সী ইন্দিরার শরীর ও স্বাস্থ্য চমত্কার, পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তিনিও পঞ্চমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বিয়ন্ত সিং প্রধানমন্ত্রীর প্রিয়জনদের তালিকায় একজন। ১০ বছর ধরে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর প্রহরায় রয়েছেন। মাত্র দুই মাস আগে তাকে বলা হয়েছে গোল্ডেন টেম্পলে অপারেশন ব্লু-স্টার চালানোর পরও তিনি তার শিখ প্রহরীদের বিশ্বাস করেন কিনা? তিনি বিয়ন্ত সিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এ রকম শিখ যখন আমার পাশে আছে, ভয়ের কিছু থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’

জুলাইয়ে ভারতের গোয়েন্দাপ্রধান তাকে বললেন, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাকারীদের মধ্য থেকে শিখদের প্রত্যাহার করে নেয়া দরকার। তিনি তা করতে দিলেন না। বললেন, তাহলে আমরা কিসের ধর্মনিরপেক্ষতা দাবি করি?

ইন্দিরা গান্ধী যখন করজোড়ে নমস্তে বললেন, তার কাছ থেকে দুজন শিখ প্রহরীর দূরত্ব ৭ ফুটের বেশি নয়।

বিয়ন্ত সিং তার পয়েন্ট থ্রি এইট বোরের রিভলবার বের করে ইন্দিরার পেট বরাবর তিনটি গুলি করল, তিনি মাটিতে পড়ে যাওয়া মাত্র সত্যবন্ত সিং তার অটোমেটিক  স্টেনগান থেকে তার কুঁচকে যাওয়া শরীরে ৩০ রাউন্ড গুলি ছুড়ল, এর অন্তত সাতটি গুলি তার পেটের ভেতর ঢুকে যায়, আর একটি সরাসরি হূদপিণ্ডে। ততক্ষণে প্রধানমন্ত্রী মৃত।

দুজন শিখ শান্তভাবে তাদের বন্দুক মাটিতে রেখে দেয়। অন্য প্রহরীরা তাদের ঘেরাও করে ফেলে। বিয়ন্ত সিং তাদের বলল, ‘আমার যা করার কথা ছিল, আমি করেছি। এখন তোমাদের যা করার করো।’

তাদের গার্ড হাউজে নেয়ার পর হঠাৎ বিয়ন্ত সিং আর একজন অনুগত প্রহরীর স্টেনগান ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে আর সত্যবন্ত সিং তার পাগড়ি থেকে ছুরি বের করে। সে সময় অন্য প্রহরীরা দুজনকে গুলি করে। বিয়ন্ত সিংয়ের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু হয় এবং সত্যবন্ত সিং গুরুতর আহত। পরে সত্যবন্ত চিকিৎসকদের বলে সে যে ষড়যন্ত্রের অংশ, তাতে ঊর্ধ্বতন অনেক সামরিক কর্তা ও রাজীব গান্ধীও তাদের টার্গেট।

নিচে গুলির শব্দ শুনে সোনিয়া দ্রুত ওপরতলা থেকে নিচে নেমে আসে— ‘মাম্মি, ওহ মাই গড, মাম্মি!

গার্ডরা ইন্দিরা গান্ধীকে তোলার চেষ্টা করছে, তার কমলা রঙের শাড়ি রক্তে ভিজে গেছে। তার ব্যক্তিগত সহকারী আর কে ধাওয়ান ও অন্যরা তাকে সাদা রঙের ভারতীয় অ্যাম্বাসেডর গাড়িতে তোলেন; ইন্দিরা গান্ধীর মাথাটা সোনিয়ার কোলে। গাড়ি ছেড়ে দেয়, কাছাকাছি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে।

বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ইন্দিরার মৃত্যুর প্রথম বুলেটিন: ‘মিসেস গান্ধী ইজ ডেড’।

পাদটীকা: জন্মশতবর্ষে ইন্দিরা গান্ধীর জন্য অশেষ শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে তার অসামান্য অবদানের কথা বিস্মৃত হলে চলবে না।