পলা ফ্রিযানু। অনুবাদ: শওকত হোসেন

এক ঝলমলে মুহূর্তের জন্য রাশিয়ান নারী হওয়ার মানে হয়ে দাঁড়িয়েছিল যৌন স্বাধীনতা ও বৈপ্লবিক সাম্য। এর আগে বা পরে যা আর দেখা যায়নি।

 

‘সোভিয়েত ইউনিয়নে আমাদের যৌনাতার কোনো ব্যাপার নেই, আমরা এর ঘোরতর বিরোধী,’ ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জনৈকা হোটেল ম্যানেজার এ কথা বলার সময় স্টুডিওর দর্শকরা হেসে উঠেছিলেন। এ কথাটি অচিরেই সরকারি বয়ান ও লক্ষণীয়ভাবে কম নিখাদ বাস্তবতার ভেতর ফারাক ফাঁস করে একটা বুলিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আজকের দিনেও অব্যাহত থাকা রাশিয়ার রক্ষণশীল আত্মপরিচয় ইতিহাসের আরো কৌতূহলোদ্দীপক ও অবহেলিত একটা সময়কে আড়াল করে রাখে: ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব-পরবর্তী প্রথম দশকে কমিউনিস্ট পার্টির উঁচু পদের নারীরা একগামিতা ও নিউক্লিয়ার পরিবারের মতো বিভিন্ন ‘বুর্জোয়া’ প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি অর্জনের আশায় রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ফ্রি-সেক্সের পক্ষে ওকালতি করছিলেন।

কিন্তু যৌন বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি বেশি দিন টেকেনি। ১৯২০-এর দশকে জোসেফ স্তালিন ক্ষমতায় আসার পর ঠিক উল্টো ধারণারই প্রসার ঘটিয়েছেন তিনি— নিউক্লিয়ার পরিবার ও কোনো ধরনের যৌন স্বাধীনতা নয়, এটাই ছিল সমাজতন্ত্রের মূল ভিত্তি। এ রাজনৈতিক উল্টো যাত্রার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? এ পর্বটি কি তবে বেছে নেয়া হয়নি এমন একটি রাজনৈতিক পথকে তুলে ধরে, নাকি সরকারের মুক্তির পক্ষে অবস্থান রাশিয়ান ইতিহাসের এক ধরনের বৃহত্তর আরো নিপীড়ক বাঁকের মধ্যবর্তী অবস্থা ছিল?

পশ্চিমে আমাদের ঐতিহাসিক নজর সরিয়ে আনলে দেখব, ১৯২০-এর দশক নাগাদ ‘সাফরাজেট’রা বহু পাশ্চাত্য নারীর পক্ষে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন (যুক্তরাজ্যে ২১ বছরের বেশি বয়সী নারীরা কেবল ১৯২৮ সাল থেকেই ভোট দিতে পারছিলেন)। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নে নারী অধিকার ঢের বেশি ঢালাও ছিল। সর্বজনীন ভোটাধিকারের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা ও সমান মজুরির অধিকার ছিল তাদের। কারখানা শ্রমিকদের জন্য বিশ্বে প্রথম এবং বিনাপয়সায় প্রাপ্য অ্যাবরশনকে বৈধতা দেয়া হয়েছিল। বৈবাহিক সম্পর্কের ভেতরে বা বাইরে জন্ম নেয়া বাচ্চাদের আইনের চোখে সমান মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। বিয়ে হয়ে গিয়েছিল সেকুলার, তালাককে সহজ ও দক্ষতর করে তোলা হয়, বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যৌন সম্পর্ককে সংস্কারমুক্ত করার পাশাপাশি পুরুষদের সমকামিতাকে বৈধতা দেয়া হয়।

এ বিপ্লবী পরিবর্তনের বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল কোত্থেকে? ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে রাশিয়ায় অভিজাত বুর্জোয়া ও সমাজতান্ত্রিক নারীদের অধিকার আন্দোলন সমান্তরালে বিকশিত হচ্ছিল। ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ান উইমেন’স মিউচুয়াল ফিল্যানথ্রোপিক সোসাইটির মতো সংগঠনগুলো কর্মক্ষেত্রে নারীদের সমতা ও উন্নত কর্মপরিবেশের পাশাপাশি দরিদ্র ও কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-নার্সারি ও ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লড়াই করেছে। দ্য হাউজ অব ডিলিজেন্স গভর্নেসের কাজ পেতে নারীদের সহায়তা দিয়েছে এবং সোসাইটি টু অ্যাসিস্ট ইয়াং গার্লস শিক্ষিত, বিশেষত শ্রমিকশ্রেণীর নারীদের ‘জীবনের নৈতিকভাবে ক্ষতিকর অবস্থা থেকে রক্ষার প্রয়াস পেয়েছে,’ ইতিহাসবিদ ক্যাথি পোর্টার জীবনীগ্রন্থ আলেক্সান্দ্রা কলোন্তাইতে যেভাবে লিখেছেন। একই সময়ে নারীরা বেশি করে কর্মক্ষেত্রে পা রাখছিলেন। ১৯০৪ ও ১৯১০ সালের মাঝামাঝি রাশিয়ায় শিল্প শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৪১ হাজার বৃদ্ধি পায়, তাদের ৮০ শতাংশের বেশিই ছিলেন নারী।

বিপ্লবী সাম্যের প্রতিশ্রুতিতেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের শেকড় থাকায় সোভিয়েত সমাজের কোনো কোনো পর্যায়ে বিভিন্ন লিঙ্গের ভেতরও সাম্যকে যুক্ত করতে চাওয়ার পেছনে যুক্তি ছিল। কার্ল মার্ক্স মত প্রকাশ করেছেন যে, নারী কর্মীরা দ্বিগুণ নিপীড়িত ছিলেন— কলকারখানায় এবং ঘরে ও পরিবারে। ‘সামাজিক অগ্রগতি যৌন সমতার (কৃিসতগুলোসহই) বিচারেই পরিমাপ করা যেতে পারে,’ ১৮৬৮ সালের এক চিঠিতে কিছুটা পরিহাসের সঙ্গেই লিখেছেন কার্ল মার্ক্স। তবু অক্টোবর বিপ্লবের আগে সমাজতান্ত্রিক সংগঠনগুলোর ভেতর নারীদের মর্যাদা নিয়ে উদ্বেগকে সাধারণত বুর্জোয়া বিচ্যুতি হিসেবে নাকচ করে দেয়া হতো। সমাজতান্ত্রিক সনাতনপন্থীরা শ্রেণী সংগ্রাম আপনাআপনি এর চলার পথে কর্মজীবী নারীদেরও মুক্তি দেয়ার বিশ্বাসই প্রকাশ করেছে।

একমাত্র ১৯১২ সালের পরই বলশেভিকরা— রাশিয়ায় রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তারের লক্ষ্যে লড়াই করা বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক উপদলের অন্যতম, যেটি শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়— নারী প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক এজেন্ডার একটি প্রধান অংশ হিসেবে দেখে। এ পর্যায়ে তারা বিভিন্ন বিক্ষোভে সক্রিয়ভাবে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে, তাদের পত্রিকা প্রাভদায় নারী প্রশ্নের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা বরাদ্দ করে এবং ১৯১৪ সালে রোবোনিৎসা নামে নারীদের একটি পত্রিকা বের করে।

উপরে উল্লেখ করা আলেক্সান্দ্রা কলোন্তাই— ক্রেমলিন সরকারের প্রথম কমিসার অব সোস্যাল ওয়েলফেয়ার ও সবচেয়ে দাপুটে নারী— এ প্রজন্মের অন্যতম প্রধান কর্মী ছিলেন। কলোন্তাই ছিলেন যৌন স্বাধীনতার মূল আদর্শিক। ১৮৭২ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গের এক অভিজাত পরিবারে জন্ম নেয়া কলোন্তাই তরুণ বয়সেই সাতটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তিনি ‘ভালো পাত্রী’ হওয়ার বুর্জোয়া আদর্শকে আলিঙ্গন করবেন বলেই আশা করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দিতে মা-বাবার অস্বীকৃতিকে উপেক্ষা করে শিক্ষকতার জন্য সনদ নিয়েছিলেন তিনি। চাচাতো ভাই প্রকৌশলী ভ্লাদিমিরের সামান্য আয়ে সহযোগিতা করাই ছিল তার উদ্দেশ্য— যাকে তিনি বিয়ে করেন এবং কয়েক বছর পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। “আমার স্বামীকে আমি এখনো ভালোবাসি, কিন্তু গৃহিণী ও স্ত্রীর সুখী জীবন আমার পক্ষে ‘খাঁচা’য় পরিণত হয়েছিল,” ১৯২৬ সালে অটোবায়োগ্রাফি অব আ সেক্সুয়ালি ইমানসিপেটেড কমিউনিস্ট উইম্যান-এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি। ‘আমার সহানুভূতি, আমার আগ্রহ বেশি করে রাশিয়ার বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর দিকে যাচ্ছিল।’

বিবাহিত অবস্থাতেই ১৮৯৬ সালে কলোন্তাই কর্মজীবী নারীদের শিক্ষা দিতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন কলকারখানায় দূষিত বাতাস পরিষ্কারের লক্ষ্যে ফিল্টার স্থাপনে সহায়তা জোগান। কিন্তু শ্রমিকরা দিন-রাত যেখানে কাটান, সেই আবর্জনাময় অবস্থা দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে, দানখয়রাত দিয়ে খুব বেশি করার সুযোগ নেই। নারীবাদী অ্যাক্টিভিজমের অধিকতর অভিজাত অবস্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে কলোন্তাই আরো মৌলিক স্তরে অর্থনৈতিক সম্পর্কেরই পরিবর্তন ঘটানোর কথা ভাবতে শুরু করেন— অন্য কথায়, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ভেতর দিয়েই নারীদের অসাম্যের ফয়সালা করা সম্ভব।

সমাধানের খোঁজে কলোন্তাই স্বামী ও চার বছরের সন্তানকে ছেড়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করতে জুরিখে চলে যান। রাশিয়ায় ফিরে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে কর্মজীবী নারীদের জন্য প্রথমবারের মতো আইনি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন, বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন, অসংখ্য নিবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেন, কর্মী জীবন, দ্য নিউ উইম্যান এবং দ্য সোস্যাল বেসিস অব দ্য উইমেন’স কোয়েশ্চেনের মতো শিরোনামে যৌনতা ও মাতৃত্ব নিয়ে গোটা ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা দেন।

এটা ছিল নারীদের একগামিতা ও পরিবারের দাসত্ব থেকে মুক্তিদানের ব্যাপার।

১৯০৮ সালে গ্রেফতার এড়াতে রাশিয়া থেকে পালান কলোন্তাই এবং লেনিনের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। লেনিন তখন সুইজারল্যান্ডে নির্বাসিত ছিলেন। জারের সিংহাসন ত্যাগ এবং বিপ্লবের কালে কলোন্তাইয়ের প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পেত্রোগার্দ সোভিয়েত (অথবা কাউন্সিল অব ওয়ার্কার্স) নির্বাচিত হন এবং শেষ পর্যন্ত পিপল’স কমিসার অব সোস্যাল ওয়েলফেয়ারের দায়িত্ব লাভ করেন। নিয়োগের দুই বছর পর ১৯১৯ সালে নারীদের উন্নয়ন ও শিক্ষার লক্ষ্যে একটি সরকারি দপ্তর ঝেনোতদেল (বা আমরা যাকে মহিলা দপ্তর বলতে পারি) প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেন কলোন্তাই।

কলোন্তাইয়ের কাছে যৌন বিপ্লব ছিল প্রধানত নারীদের একগামিতার প্রত্যাশা ও পারিবারিক দাসত্ব থেকে মুক্তি দান। কখন বাচ্চা নেয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হলে, যুুক্তি দিয়েছেন তিনি, রাষ্ট্রই তাদের ভরণ-পোষণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকলে, সেটা তাদের পড়াশোনা, কাজ ও নিজেদের রাষ্ট্রীয় কাজে জড়ানোর সুযোগ করে দেবে। এসব পরিবর্তন ‘অস্তিত্বর/দৈনন্দিন জীবনের (নোভি বিত) একটা নতুন উপায়’ এবং ‘নারী মানুষ’ সৃষ্টি করেবে বলে আশা করেছিলেন তিনি।

কলোন্তাই ভালোবাসার সামাজিক প্রাধান্য কীভাবে লিঙ্গের ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকে বাড়িয়ে তোলে, সেদিকে গুরুত্বারোপ করেছেন। ‘কোনো নারীর সব আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে তার জীবনকে ভালোবাসার আবেগে বন্দি করা,’ ১৯১১ সালে এক নিবন্ধে লিখেছেন তিনি। ‘সময় হয়েছে নারীদের ভালোবাসাকে জীবনের ভিত্তি হিসেবে না নিয়ে একটা ধাপ হিসেবে গ্রহণের শিক্ষা দেয়ার, তার প্রকৃত সত্তাকে উন্মুক্ত করার একটা উপায় হিসেবে দেখার।’ নতুন ‘ধরনের নারী,’ লিখেছেন কলোন্তাই, জানবেন যে, ‘ভালোবাসাতেই জীবনের সব সম্পদ ফুরিয়ে যায় না।’

১৯২০-এর দশকের দিকে এ ধরনের পরিবর্তন সক্রিয় ছিল বলে মনে হয়। ১৯২৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত কলোন্তাইয়ের উপন্যাস রেড লাভ (১৯২৩) কমিউনিজমের অধীনে কর্মরত ও জীবন কাটানো এক অবিবাহিতা তরুণীর কাহিনী বলেছে। ইংরেজি তর্জমার ভূমিকায় কলোন্তাই উল্লেখ করেছেন, সোভিয়েত সমাজ ‘নারীকে তার সদ্গুণের জন্য নয়, বরং তার দক্ষতা, নিজের শ্রেণী, দেশ ও সামগ্রিকভাবে মানবতার প্রতি দায়িত্বের প্রতি সম্মানবোধের কারণে সম্মান দেখাতে শুরু করেছে।’

রোমান্সের বাইরে নারীদের আত্মসংজ্ঞায়িত করার লক্ষ্যে মুক্ত করার পাশপাশি কালোন্তাই আরো সমতাভিত্তিক সম্পর্কের মডেল হিসেবে বন্ধুত্বকে পুনর্বাসিত করতে চেয়েছেন। ‘মেক ওয়ে ফর উইংড ইরোস: আ লেটার টু ওয়ার্কিং ইয়ুথ’ (১৯২৩) ভালোবাসার এক ধরনের রাজনৈতিক ইতিহাস। প্রাগৈতিহাসিক আমলে, বলেছেন তিনি, মানুষ ভাইবোন ও চাচাতো ভাইবোনের ভেতর এক ধরনের স্বগোত্রীয় মমতা হিসেবে ভালোবাসাকে কল্পনা করেছে। সামন্তবাদী বিশ্ব নাইটের আধ্যাত্মিক ভালোবাসাকে আদর্শে উন্নীত করে ভালোবাসাকে বিয়ে থেকে বিচ্ছিন্ন করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্তশ্রেণীর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বুর্জোয়া নৈতিকতায় ভালোবাসার বিষয়টি ‘সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন পারিবারিক অংশের সম্পদ বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে তত্পর’ বিবাহিত দম্পতির ভেতর ভালোবাসায় পরিণত হয়। প্রলেতারীয় আদর্শেও বন্ধুত্বমূলক সংহতির চেতনায় বিভিন্ন লিঙ্গের ভেতর এক ধরনের ‘ভালোবাসার অংশীদারিত্ব’ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেতে হবে— গ্রেকো-রোমান মডেলের কাছাকাছি প্রতীয়মান এক ধরনের আদর্শ।&dquote;&dquote;

বিপ্লব-পরবর্তী গোড়ার দিকের বছরগুলোয় নারীদের তখনো বহু ধরনের সমস্যা অবশ্যই ছিল। নারী বেকারত্ব ছিল চড়া, যৌন সহিংসতা বজায় ছিল এবং কিছু কিছু পর্যবেক্ষক নতুন যৌনতার নীতি নিবিড় সঙ্গীদের পরস্পরকে ব্যবহারের পর ছুড়ে ফেলার সুযোগ করে দেয়ার সমালোচনা করেছেন। ‘পুরুষরা অতিসম্প্রতি নতুন করে চালু করা ৪০ শতাংশ ভদকা পানের ক্ষেত্রে তাদের উৎসাহের মতোই স্ত্রী বদলাতে শুরু করেছে,’ ১৯২৬ সালে দি আটলান্টিকে বলেছেন এক সমালোচক।

কিন্তু বহু নারীর জীবনই নাটকীয় এবং সুখকরভাবেই পাল্টে গিয়েছিল। গ্রিক লেখক নিকোস কাজান্তজাকিস তার ভ্রমণকাহিনী রাশিয়া: আ ক্রনিকল অব থ্রি জার্নিজ ইন দ্য আফটারমাথ অব দ্য রেভল্যুশন (১৯২৮)-এ মস্কোয় তার সঙ্গে দেখা হওয়া নারীরা তাকে বিয়ের চেয়ে সমাজতন্ত্র নির্মাণেই তাদের উদ্বেগের কথা জানানোর উল্লেখ করেছেন। ২২ বছর বয়সী বেলা গ্রিগোরিভনা কাজান্তজাকিসকে বলেছেন: ‘কোনো পুরুষকে পাওয়া নয়, বরং কাজের ভেতর দিয়ে নিজেকে পরজীবী না ভাবাই আমার আসল আনন্দ। অবশ্য ভালোবাসাতেও, আমি তো সন্ন্যাসী নই। তবে স্রেফ ভালোবাসার কথায় সময় নষ্ট নয়।’ এ আদর্শগুলো সোভিয়েত রাশিয়ার সীমানাও অতিক্রম করে গেছে। রোমানিয়ায় বৈবাহিক সম্পর্কবহির্ভূত যৌনতার ক্ষেত্রে কলোন্তাইয়ের পক্ষপাতিত্ব কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারকারীদের পক্ষে যুক্তি ছিল, যুদ্ধকালে কমিউনিজম আলিঙ্গনের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। (এখানে আজকের দিনে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সমকামিতাকে সর্ববিষয়ে পাশ্চাত্যের বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার প্রতিধ্বনি দেখতে পারে কেউ— উদাহরণস্বরূপ ‘ইভরোপা’র বদলে ইউরোপের সাধারণ বর্ণনা হিসাবে ‘গেরোপা’)।

বলশেভিকদের নেতা লেনিন ভালোবাসার বুর্জোয়া ধারণার সমালেচনার অংশীদার ছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, বিয়ে সম্পর্কিত সর্বগ্রাসী ধারণা বাতিল করা হলে তাতে শ্রেণী সংহতি জোরালো হবে এবং কর্মীদের একটি সমাজতান্ত্রিক সমাজ বাস্তবায়নে সামনে এগিয়ে দেবে। কিন্তু দলের কিছু প্রবীণ সদস্যের মতো তার নিজস্ব সংশয় ছিল। ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে বিপ্লবী নেতা ইনেসা আর্মান্দকে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, ভালোবাসাকে বৈবাহিক ও আর্থিক উদ্বেগ ও হিসাব-নিকাশ থেকে আলাদা রাখা উচিত। তবে সন্তান মানুষ করে তোলার চেয়ে অবাধ ভালোবাসা ও আভাসে ব্যভিচারকে উৎসাহিত করা ‘বুর্জোয়াবাদ, প্রলেতারীয় দাবি’ নয়।

ব্যাপারটা ছিল এমন, আর্মান্দও লেনিনের প্রেমিকা ছিলেন। ফরাসি বংশোদ্ভূত সমাজতন্ত্রী আর্মান্দ পাঁচ বছর বয়সে দাদি ও ফুপুর সঙ্গে রাশিয়ায় চলে আসেন। ১৯ বছর বয়সে এক টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির ধনী মালিক আলেক্সান্দার আর্মান্দকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। নয় বছর পর তার চেয়ে বয়সে ১১ বছরের ছোট ভাই বিপ্লবী ও ছাত্র ভ্লাদিমিরের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিয়ের অবসান ঘটান।

বিপ্লবের পর আর্মান্দ লেনিন ও তার স্ত্রীর সঙ্গে ক্রেমলিনে চলে আসেন।

আর্মান্দের কাছে যৌন অভিব্যক্তির স্বাধীনতা ছিল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নারীবাদী সারবস্তু। কলোন্তাইয়ের মতো দাতব্য তত্পরতার ভেতর দিয়েই অ্যাক্টিভিজম শুরু করেছিলেন তিনি। প্রথম বিয়ের সময় কৃষকদের সন্তানদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন, নারীদের অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে মস্কো সোসাইটি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা দিয়েছেন এবং এর প্রধান ছিলেন। এ প্রতিষ্ঠান শ্রমজীবী নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি সাবেক পতিতাদের পুনর্বাসনের কাজ করত। নারীদের জন্য পত্রিকা বের করা এবং রোববারের স্কুল প্রতিষ্ঠার পরবর্তী প্রয়াস জার সরকার বন্ধ করে দেয়।

সম্ভবত এখানেই আর্মান্দ সত্যিকারের সামাজিক পরিবর্তনের জন্য বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যান। প্রথম স্বামীকে ত্যাগ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ১৯০৩ সাল নাগাদ তিনি রাশিয়ান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন। এরপর অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করতে ব্রাসেলসে যান আর্মান্দ। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পক্ষে গোপনে কাজ করার জন্য তিনি রাশিয়া ও ফ্রান্সের ভেতর যাতায়াত করতে থাকেন। ১৯১১ সালে প্যারিসে লেনিনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। বিপ্লবের পর লেনিন ও তার স্ত্রী নাজেজদা ক্রুপসকায়ার সঙ্গে ক্রেমলিনে চলে আসেন। লেনিন ও আর্মান্দের এক সন্তান ছিল। মনে হয়, ক্রুপসকায়া এ সম্পর্কের কথা জানতেন।

আর্মান্দ কলোন্তাইকে নারীদের স্বার্থ রক্ষাবিষয়ক বোর্জ ঝেনোতদেল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সহায়তা দেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম হয়ে যাচ্ছে ভেবে উদ্বিগ্ন লেনিন ১৯২০ সালে আর্মান্দকে ককেশাসে অবকাশে যাওয়ার কথা বলেন। সেখানে পৌঁছার অল্প পরই আর্মান্দা কলেরায় আক্রান্ত হন এবং এক মাসেরও কম সময়ের ভেতর মারা যান। তার মৃত্যুতে বিচলিত লেনিন তাকে ক্রেমলিনেই বিপ্লবের অন্য শাহাদতবরণকারীদের পাশে সমাহিত করার নির্দেশ দেন।

আর্মান্দ ও কলোন্তাই যেখানে যৌন স্বাধীনতাকে প্রধানত বিয়ে ও সাংসারিক কাজকর্ম থেকে মুক্তি মনে করতেন, সেখানে লেখক, সমাজবাদী ও চিত্র পরিচালক লায়লা ব্রিক অবাধ স্বাধীনতার আরো প্রবল ও পদ্ধতিগত ভাষ্যকে আলিঙ্গন করেছিলেন— পলিঅ্যামোরি। ওই সময় সোভিয়েত কবি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির প্রেমিকা এবং ‘ধ্যান’ ও পড়াশোনাকে উৎসাহিত করা রাশিয়ান শিল্পী আলেক্সান্দার রদচেনকোর সৃষ্টি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পোস্টারের মুখ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন ব্রিক।

১৯১৫ সালের জুলাইয়ে ব্রিকের আয়োজিত এক সাহিত্য সভায় মায়াকোভস্কি ও ব্রিক পরিচিত হন। সে সময় লায়লার স্বামী ওসিপ ব্রিক মায়াকোভস্কিও কবিতা ‘ক্লাউড ইন দ্য ট্রাউজার্স’ শুনে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা প্রকাশের প্রস্তাব করেন। তিন বছর পর মায়াকোভস্কি ব্রিকদের সঙ্গে তাদের ফ্ল্যাটে উঠে আসেন এবং তারপর তিনজনই একসঙ্গে একটা কান্ট্রি হাউজে বাস করতে চলে যান।&dquote;&dquote;

এ-জাতীয় অপ্রচলিত সংসারের একটি নিয়ম হলো, প্রত্যেক সদস্যকে অবশ্যই অন্যদের স্বাধীনতা দিতে হবে। অবশ্য ১৯২৫ সাল নাগাদ লায়লা ব্রিক সফররত মায়াকোভস্কিকে লেখা একটা চিঠিতে বলেন: ‘আমার মনে হচ্ছে, আমাকে এরই মধ্যে কম ভালোবাসছ তুমি এবং আসন্ন বিচ্ছেদেও খুব একটা কষ্ট পাবে না।’ পরের কয়টি বছর যদিও তারা তিনজনই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সফর করেছেন, ১৯৩০ সালে নতুন প্রেমিকা অভিনেত্রী ভেরোনিকা পলোনস্কায়ার সঙ্গে ঝগড়ার পর মায়াকোভস্কি আত্মহত্যা করার আগ পর্যন্ত তাদের সবারই যোগাযোগ ছিল। সুইসাইড নোটে মায়াকোভস্কি লেখেন: ‘কমরেড গভর্নমেন্ট, লায়লা ব্রিক, মা, আমার বোনরা ও ভোরোনিকা ভিতোলদোভনাকে নিয়েই আমার পরিবার।’ তিনি তার কবিতার অর্ধেক স্বত্ব লায়লা ব্রিক এবং বাকি অর্ধেক মা ও বোনদের দিয়ে যান।

নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তোলেন ব্রিক। ইভস সেন্ট লরেন্ট, পাবলো নেরুদা, মার্ক শাগাল ও মায়া প্লিসেতসকায়াদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়েন তিনি ও তাদের অনুপ্রাণিত করেন এবং মস্কোয় সক্রিয় থাকার অনুমাতি পাওয়া একমাত্র ‘বুর্জোয়া’ সাহিত্য সভায় নেতত্ব দেন।

স্তালিন শিশুশিক্ষাকে ‘মায়েদের সম্মানজনক সামাজিক দায়িত্ব’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

১৯২০ সালে আর্মান্দের মৃত্যুর পর কলোন্তাই ঝেনোতদেলের একক নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার প্রভাব সত্ত্বেও কলোন্তাই সরকারে তার সতীর্থদের চেয়ে অনেক বেশি বিপ্লবী ও বিতর্কিত ছিলেন— যদিও নারী ও যৌনতা সম্পর্কে তার ধ্যানধারণা শেষ পর্যন্ত তাকে পার্শ্বরেখায় ঠেলে দেয়নি। ১৯২১ সালে স্বৈরাচার ও দলের অভ্যন্তরে নারীদের প্রতিনিধিত্বের অভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ শ্রমিক বিক্ষোভের আয়োজন করেন তিনি। কিন্তু সমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হন। দলীয় শৃঙ্খলার অভাবের কারণে বহিষ্কারের হুমকি দেওা হতে থাকে তাকে। ১৯২৪ সালে অসলোয বাণিজ্য চুক্তির পর কলোন্তাইকে ফিনল্যান্ডে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। (ডায়ানা আবগারকে জাপানে আর্মেনিয়ার রাষ্ট্রদূত করে পাঠানোর পর বিংশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় নারী রাষ্ট্রদূত ছিলেন তিনি।)

১৯৩৪ সালে শেষমেশ স্তালিন ভেঙে দেয়ার আগ পর্যন্ত পরের দশকে কোনো না কোনোরূপে ঝেনোতদেলের কমকাণ্ড অব্যাহত থাকে। তিনি কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণকে পছন্দ করলেও সেজন্য সংসার বা যৌন সমতার দরকার আছে বলে মন করতেন না। সত্যিকার অর্থে, এ ধরনের চিন্তাকে বুর্জোয়া বলে মনে করা হয়েছে। স্তালিন গর্ভপাতকে অবৈধ ঘোষণা করেন, তালাকের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম আরোপ করেন, সমকামিতাকে মানসিক রোগ ঘোষণা করেন এবং একটি ‘বাৎসল্যে’র রাষ্ট্রীয় আদর্শ জোরালো করে তোলেন। ১৯৪৯ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সোভিয়েত রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে স্তালিন শিশুদের শিক্ষাকে ‘মায়েদের জন্য সম্মানজনক সামাজিক দায়িত্ব’ হিসেবে তুলে ধরেন। রাষ্ট্র বিনামূল্যে সন্তান পালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে যদিও, তাই বলে পুরুষদের তাদের ঘরে স্ত্রীদের দায়িত্বের সঙ্গে তাল মেলানো প্রত্যাশিত নয়। স্তালিনের চোখে শরীরের ওপর নারীদের অধিকার তার ভাবিত হওয়ার মতো কিছু ছিল না।

১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর পেন্ডুলাম আংশিক যৌন উদারীকরণের দিকে হেলে পড়ে। নতুন কমিউনিস্ট পার্টি নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ স্তালিনবাদমুক্ত করার এক কর্মসূচি হাতে নেন। গর্ভপাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কলোন্তাই এ প্রতিশোধ দেখে যেতে পারেননি, কারণ স্তালিনের মৃত্যুর এক বছর আগেই তিনি মারা যান। কিন্তু রাশিয়া আর কখনই গোড়ার দিকের এ নারীবাদী বিপ্লবীদের প্রতিশ্রুতির নাগাল পায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্যাংক ড্রাইভার, আততায়ী, পাইলট ও নার্স হিসেবে নারীদের অংশগ্রহণ সরকারি ভাষ্যে অবহেলিত হয়েছে; যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল জায়গা থেকে বর্জন করা হয় এবং মাতৃত্বকেই তাদের মূল দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়। যৌন নিপীড়নকে অনেকাংশেই উপেক্ষা করা হয় এবং একান্তে নারীরা বেশির ভাগ সন্তান পালন ও গৃহস্থালি কাজ করবে বলেই আশা করা হয়। এমনকি আজো কলোন্তাই ও আর্মান্দ যে যৌন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন, সেটা সোভিয়েত ইতিহাসে সবচেয়ে অবেহেলিত পর্ব হয়ে আছে।

সম্প্রতি রাশিয়ান পার্লামেন্টে বিতর্ক যেসব নারীর সন্তান নেই, তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে তারা পেশাগত জীবনে বিনিয়োগের বদলে সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত হয়। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দাম্পত্য নিপীড়নকে আইনি বিষয়ের বদলে ‘একান্ত’ বিষয় ঘোষণা করে আইন পাস করা হয়েছে। মনে হয়, ১৯২০-এর দশকের গোড়ার দিকের প্রগতিশীল ধ্যানধারণা আবার রাশিয়ান রাজনৈতিক ডিসকোর্সে প্রবেশের আগে কিছু সময় লাগবে, যদি আদৌ তা ঘটে।