অনুবাদ ও টীকা: আন্দালিব রাশদী

ফুটবলের ‘পোয়েট লরিয়েট’ উরুগুয়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান লেখক এদোয়ার্দো গালিয়ানোকে ছাড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল।

বিশ্বকাপের সময় ফুটবল প্রেমিক এ লেখক দরজায় বোর্ড টানিয়ে দিতেন: ‘ফুটবলের জন্য বন্ধ।’ তারপর প্রায় এক মাস তিনি নিজেকে স্বেচ্ছাবন্দি রেখে ফুটবল খেলা দেখতেন। তার লেখা ‘Soccer in the Sun and Shadow’-এর সমকক্ষ ফুটবল সাহিত্য দ্বিতীয়টি নেই।

২০১৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তারিক আলী তাকে নিয়ে লিখেছেন ‘মাই হিরো এদোয়ার্দো গালিয়ানো’।

‘রোদে ও ছায়াতে ফুটবল’ থেকে কয়েকজন খেলোয়াড় নিয়ে লেখা কয়েকটি অনুচ্ছেদ ভাষান্তরিত হলো—

দিদি

গণমাধ্যম তাকে ১৯৫৮ বিশ্বকাপের খেলার সেরা সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে।

দিদিই ছিলেন ব্রাজিল দলের কেন্দ্রে। পাতলা শরীর, লম্বা গলা, নিজেই নিজের মূর্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে। মাঠের মধ্যিখানে দিদিকে দেখাত আফ্রিকান আইকনের মতো, সেখানেই তার রাজত্ব। সেখান থেকেই ছুড়তেন তার বিষের তীর।

দূরের পাস দেয়ার ওস্তাদ দিদি, একটা প্রায় গোল কখনও পেলে, গারিঞ্চার পায়ে লেগে সত্যিকারের গোলে পরিণত হতো; দিদি নিজেও নিজের গোলটি দিতেন।

দূর থেকে বলে লাথি মেরে ‘শুকনো পাতা’ দিয়ে গোলকিপারকে ধোঁকা দিতেন। বলে লাগাতেন তার পায়ের ছাপ এবং সে [গালিয়ানোর এই সে হচ্ছে ফুটবল এবং ফুটবল তার কাছে স্ত্রীলিঙ্গ, সেজন্য ফুটবলের সর্বনামে হি (He) নয়, শি (She) ব্যবহার করেছেন] মাটি থেকে উঠে উড়ন্ত অবস্থায় ঘুরতে ঘুরতে, নাচতে নাচতে বাতাস বাহিত শুকনো পাতার মতো দিক পরিবর্তন করত, যতক্ষণ না উড়ে গোলপোস্টের ভেতরে চলে যায়— এখান দিয়ে গোল হতে পারে গোলকিপার কখনো ভাবেননি।

দিদির খেলায় তাড়াহুড়ো ছিল না। বলের দিকে নিশানা করে বলতেন, সে-ই এখন দৌড়াবে। দিদি জানতেন, সে (She) জীবন্ত।

লিওনিদাস&dquote;&dquote;

তার ছিল বহুমাত্রা, গতি এবং মশার ধূর্ততা। ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে প্যারিস থেকে আসা এক সাংবাদিক গুনে দেখেছেন, মাঠে তার ছয়টি পা এবং বলেছেন, এর পেছনে কোনো ব্ল্যাক ম্যাজিক থাকবে। আমি জানি না, সেই সাংবাদিক এটা দেখেছেন কিনা। লিওনিদাসের অনেকগুলো পায়ের ছিল দৈব ক্ষমতা— কয়েক গজ বড় করে ফেলতে, গুটিয়ে নিতে পারে আবার একসঙ্গে বেঁধে রাখতে পারে। মহান ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার আর্থার ফ্রিডেনরাইখ তখন চল্লিশের কোটায়, যেদিন তিনি অবসরে গেলেন, লিওনিদাস মাঠে নামলেন। পূর্বসূরি ওস্তাদের কাছ থেকে রাজদণ্ড পেয়েছেন লিওনিদাস দ্য সিলভা। খুব বেশিদিন লাগেনি, তার নামের ব্র্যান্ড নিয়ে বাজারে এসেছে সিগারেট ও ক্যান্ডিবার। চিত্রতারকারা যত চিঠি পান, গুণমুগ্ধ চিঠি তিনি পেতেন তার চেয়ে বেশি। ভক্তরা চিঠিতে তার ছবি চাইত, অটোগ্রাফ চাইত কিংবা সরকারি চাকরি দিতে অনুরোধ জানাত।

লিওনিদাস অনেক গোল করেছেন, কিন্তু কখনো তা গুনতেন না। কিছু গোল হতো ওপর থেকে, তার পা উপরে ঘুরপাক খাচ্ছে, মাথা নিচে এবং বল চলে গেছে গোলপোস্টের ভেতরে। তার ছিল সাইকেল বাজিকরদের দক্ষতা, ব্রাজিলিয়ানরা বলত— বাইসাইকেল।

লিওনিদাসের গোলগুলো এত চমত্কার হতো যে, এমনকি গোলকিপারও উঠে এসে তাকে অভিনন্দন জানাতেন।

আন্দ্রাদে

ইউরোপ কখনো কালো মানুষকে ফুটবল খেলতে দেখেনি। ১৯২৪-এর অলিম্পিকে উরুগুয়ের হোসে লেনার্দো আন্দ্রাদে তার অনির্বচনীয় শারীরিক পারঙ্গমতা ও গতি দিয়ে দর্শকদের সবার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। মধ্যমাঠের খেলোয়াড় যেন রাবার দিয়ে তৈরি দেহের এক দানব, প্রতিপক্ষের কারো গায়ের সঙ্গে এতটুকু স্পর্শ না লাগিয়ে বলটা ঝেঁটিয়ে নিয়ে যেতেন, আর যখন আক্রমণ পরিচালনা করতেন, নিজের শরীরটাকেও আন্দোলিত করতেন এবং সবাইকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতেন। এক ম্যাচে মাথার ওপর বলটা রেখে তিনি দৌড়ে অর্ধেক মাঠ পেরিয়ে গেলেন। দর্শকরা আনন্দধ্বনি দিতে শুরু করল, ফ্রেঞ্চ গণমাধ্যম তাকে আখ্যা দিল— ‘কালো বিস্ময়’।

যখন টুর্নামেন্ট শেষ হলো, তিনি বিপথগামী বোহেমিয়ান এবং ক্যাবারের রাজ হিসেবে কিছুটা সময় প্যারিসে রয়ে গেলেন। ...পাগল করে দেয়ার জন্যই তিনি পোশাক পরতেন: সিল্কের রুমাল, লম্বা দাগকাটা জ্যাকেট, উজ্জ্বল হলুদ রঙের দস্তানা এবং সিলভার হাতলের একটি ছড়ি।

অনেক বছর পর আন্দ্রাদে মন্টেভিডিওতে মারা গেলেন। তার বন্ধুরা তাকে সাহায্য করার জন্য কয়েকটি বেনিফিট ম্যাচেরও আয়োজন করে। তাতে তিনি পার পেয়ে যাননি। যক্ষ্মায়, চরম দারিদ্র্যে তার মৃত্যু হয়।

তিনি ছিলেন কালো, দক্ষিণ আমেরিকান এবং দরিদ্র আর আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম আইডল।

ইউসেবিয়ো

জুতো পালিশ করতে, বাদাম বিক্রি করতে কিংবা পকেটমারের কাজটা করতে তার জন্ম। ছোটবেলায় সবাই তাকে বলত ‘লিনগুয়েম’— কেউ নয়, নো বডি। বিধবা মায়ের ছেলে, বস্তির হতভাগ্য তার আরো অনেক ভাইয়ের সঙ্গে ভোর থেকে শুরু করে সূর্য ডোবা পর্যন্ত একটানা ফুটবল খেলত। তার পা দুটো যখন মাঠে ছুটত, মনে হতো নিশ্চয়ই পুলিশের তাড়া খেয়ে কেউ পালাচ্ছে কিংবা দারিদ্র্য তার পায়ের গোড়ালিতে চিমটি কাটছে। এভাবে প্রবল বেগে আঁকাবাঁকা দৌড়ে তিনি ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাকে বলা হতো দ্য প্যানথার— চিতাবাঘ। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে তার লম্বা ছুট প্রতিপক্ষকে মাঠে লণ্ডভণ্ড করে ফেলছে, আর অসম্ভব কোনো এক কোণ থেকে তার দেয়া গোল দেখে দর্শকের আনন্দধ্বনি আর থামে না।

পর্তুগালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়টি আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকের। ইউসেবিয়ো: লম্বা পা, ঝুলতে থাকা হাত এবং বিষণ্ন্ন এক জোড়া চোখ।

কালো মানুষেরা

১৯১৬-এ প্রথম সাউথ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপে উরুগুয়ে ৪-০ গোলে চিলিকে তলিয়ে দিল। পরদিন চিলির প্রতিনিধি দল দাবি জানায়, খেলাটি বাতিল করে দেয়া হোক। ‘কারণ উরুগুয়ে দলে দুজন আফ্রিকান ছিল।’ তারা হচ্ছেন— ইসাবেলিনো গ্র্যাদিন এবং হুয়ান দেলগ্যাদো। চার গোলের দুটিই করেছেন গ্র্যাদিন।

গ্র্যাদিনের জন্ম মন্টেভিডিওতে, দাসদের প্রপৌত্র। তিনি ছিলেন সেই বিস্ময়কর মানুষ, যার বিস্ময়কর গতিতে বল নিয়ে ছোটা মানুষকে তার সিট থেকে টেনে তুলত— তিনি বলটা সহজভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন, যেন হেঁটে হেঁটে করছেন। নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ না দিয়ে তিনি তার প্রতিপক্ষকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেন এবং উড়ন্ত বলে গোল করতেন। তার মুখাবয়ব ছিল উৎসর্গের রুটির মতো, আর তিনি ছিলেন সেইসব মানুষদের মতো, যারা মন্দ হওয়ার ভান করলে কেউ বিশ্বাস করে না।

হুয়ান দেলগ্যাদোও একজন ক্রীতদাসের দৌহিত্র। তার জন্ম উরুগুয়ের গ্রামাঞ্চলের দিককার ছোট শহর ফ্লোরিডায়। কার্নিভালে হাতে ঝাঁটা নিয়ে মানুষকে মোহিত করার জন্য নাচতে দেলগ্যাদো যেমন পছন্দ করতেন, বল নিয়েও তা-ই মাঠে করতে ভালোবাসতেন তিনি। খেলতে খেলতে তিনি কথা বলতেন, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের টিটকারি মারতেন। বলটা উঁচুতে উঠিয়ে বলতেন, ‘আমার জন্য ওই থোকা আঙ্গুর পেড়ে দাও’ এবং গোলপোস্টে বল মেরে গোলকিপারকে বলতেন, ‘এটা ধরতে লাফ দাও বাপু, বালিটা নরম।’ সে আমলে কালো খেলোয়াড় নিয়ে গড়া জাতীয় দল একমাত্র উরুগুয়েরই।

পেলে&dquote;&dquote;

তার নামে হাজার গান। ১৭ বছর বয়সেই তিনি চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ওয়ার্ল্ড এবং ফুটবলের রাজা। তার বয়স কুড়িতে পৌঁছার আগে ব্রাজিল সরকার তাকে ‘জাতীয় সম্পদ’ ঘোষণা করল— যে সম্পদ রফতানি করা যাবে না। ব্রাজিলকে নিয়ে তিনি তিনটি বিশ্বকাপ জিতলেন আর স্যান্টোজ ফুটবল দলে থাকাকালীন দুবার। তার গোলের সংখ্যা হাজার ছুঁয়ে যাওয়ার পরও তিনি থামেননি, সংখ্যা বাড়তে থাকে। আশিটিরও বেশি দেশে তিনি ১ হাজার ৩০০-এরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন। একের পর এক হারিয়ে চলেছেন, জালে প্রায় ১ হাজার ৩০০ বল ঢুকিয়েছেন। একবার তিনি একটি যুদ্ধ থামিয়ে দিলেন: তার খেলা দেখার জন্য নাইজেরিয়া ও বায়াফ্রা সম্মিলিতভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দিল।

তাকে খেলতে দেখার জন্য যুদ্ধবিরতি দেয়া যথার্থ কিংবা আরো বেশি করা যায়। পেলে যখন জোর দৌড় দিতেন, গরম ছুরি যেমন মাখনের ভেতর দিয়ে যায়, তিনিও সেভাবে প্রতিপক্ষের ভেতর দিয়ে ছুটে যেতেন। তিনি যখন থামতেন, তার পায়ের এম্ব্রয়ডারি চলন ও প্যাঁচে প্রতিপক্ষ হতবাক হয়ে পড়ত। তিনি যখন লাফ দিতেন তখন বাতাসে এমনভাবে পা রাখতেন যেন সিঁড়ি বেয়ে উঠছেন। তিনি যখন ফ্রি-কিক দিতেন, তার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে জালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন যেন গোল দেখাটা মিস না হয়ে যায়।

দূর গায়ে হতদরিদ্র পরিবারে তার জন্ম, যেখানে কালোদের প্রবেশাধিকারই ছিল না, সেখানেই তিনি ক্ষমতা ও বৈভবের শীর্ষে পৌঁছেছেন। মাঠের বাইরে তিনি ১ মিনিট সময়ও দেননি, তার পকেট থেকে একটি মুদ্রাও খসে পড়েনি। কিন্তু ভাগ্যবান আমরা যারা তার খেলা দেখেছি, অতুলনীয় সৌন্দর্যের খয়রাতি গ্রহণ করেছি: অমরত্বের উপযোগী মুহূর্ত— যা আমাদের বিশ্বাস করিয়েছে যে অমরত্ব আছে।

পেলের গোল

১৯৬৯, মারাকানা স্টেডিয়ামে স্যান্টোস আর ভাস্কো দা গামার খেলা। প্রতিপক্ষের সবাইকে এড়িয়ে মাঠ না ছুঁয়ে এক ঝলকে পেলে মাঠ পেরিয়ে যখন গোল করতে যাচ্ছেন, তাকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়া হলো। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন।

পেলে পেনাল্টি শটটা নিতে চাইছেন না, কিন্তু হাজার হাজার দর্শক পেলের নাম ধরে চিত্কার করে তাকে বাধ্য করলেন।

মারাকানায় পেলে অনেক গোল করেছেন। বিস্ময় বালকের গোল— ১৯৬১ সালে ফুলমিনেন্সের বিরুদ্ধে সাতজন প্রতিরক্ষাকারী এবং একজন গোলকিপারকেও ধোঁকা দিয়ে বল জালের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এ পেনাল্টিটা ভিন্ন ধরনের। মানুষ ভাবছে এর মধ্যে পবিত্র একটা কিছু আছে। সেজন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে হইচই করা জনতা হঠাৎ চুপ হয়ে গেছে। যেন কোনো ঐশী আদেশে সব শব্দ মিলিয়ে গেছে: কেউ কথা বলছে না, কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে না, হঠাৎ মনে হলো, গ্যালারি জনশূন্য হয়ে গেছে, মাঠও তা-ই। রয়ে গেছেন কেবল নিঃসঙ্গ দুজন— পেলে এবং গোলকিপার আন্দ্রাদা। তারা পরস্পরের পাশে অপেক্ষা করছেন। সাদা পেনাল্টি স্পটে রাখা বিশ্রামরত বলের পাশে পেলে দাঁড়িয়ে। ১২ কদম দূরে দুই পোস্টের মাঝে কুঁজো হয়ে অপেক্ষায় আছেন আন্দ্রাদা। গোলকিপার বলটায় আঁচড় লাগাতে পারলেন বটে কিন্তু পেলে তো বলটিকে নেটের সঙ্গে সেঁটে দিয়েছেন। এটা তার সহস্রতম গোল। পেশাদার ফুটবলের ইতিহাসে আর কোনো খেলোয়াড় হাজার গোল করতে পারেননি।

তারপর হাজার হাজার মানুষের দেহে প্রাণ ফিরে এল, অতি আনন্দে দিশেহারা শিশুর মতো তারা লাফাতে শুরু করল। রাতের আঁধারকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলল।

ম্যারাডোনার গোল

সময়টা ১৯৭৩। দুটি যুব ফুটবল দল আর্জেন্টিনোম জুনিয়র এবং রিভার প্লাতের খেলা বুয়েন্স আয়ারসে। আর্জেন্টিনোমের ১০ নম্বর খেলোয়াড় গোলকিপারের কাছ থেকে বল পেলেন, রিভার প্লাতের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে ধোঁকা দিয়ে সামনে ছুটলেন। বেশ ক’জন খেলোয়াড় তার ছোটার পথে বাধা দিলেন; তিনি প্রথমজনের মাথার ওপর দিয়ে, দ্বিতীয়জনের দু’পায়ের মাঝখান দিয়ে এবং পায়ের পেছন গোড়ালি বলে চালিয়ে তিনি তৃতীয়জনকেও বোকা বানালেন। তার পরও কোনো বিরতি না দিয়ে তিনি প্রতিরক্ষা ব্যুহ নিথর করে ফেললেন, গোলকিপার বল ধরার জন্য সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, আর হেঁটে হেঁটে বলটা নিয়ে জালে ঢুকিয়ে দিলেন। মাঠে সাতজন খেলোয়াড় বিধ্বস্ত হয়ে, আরো চারজন থ হয়ে হা করে রইলেন।...

১২ বছর বয়সী বালকের অবিশ্বাস্য গোল দলের সবচেয়ে সুখী ও সবচেয়ে খাটো দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা... ম্যারাডোনা যখন বল নিয়ে ছুটছেন, তার জিহ্বা মুখের বাইরে বেরিয়ে আসছে, তার সব গোলের সময় জিহ্বা মুখের বাইরে এসে গেছে। রাতের বেলা দুহাতে বলটাকে আলিঙ্গন করে ম্যারাডোনা ঘুমাতেন, দিনের বেলা বিস্ময় সৃষ্টি করতেন।

টীকা ১: দিদি&dquote;&dquote;

ব্রাজিলের কখনো মধ্যমাঠের কখনো সেন্টারের খেলোয়াড় দিদির পুরো নাম ওয়ালডার পেরেইরা। জন্ম ৮ অক্টোবর, ১৯২৮। রাজধানী রিও ডি জেনেরিও থেকে ১৫০ মাইল উত্তরে ক্যাম্পোস নামের শহরে একটি গরিব পরিবারে তার জন্ম। মৃত্যু ১২ মে, ২০০১। তিনি ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬২-এর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলেছেন। শেষ দুটিতে ব্রাজিল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ১৯৫৮-এর টুর্নামেন্টে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে পেয়েছেন গোল্ডেন বুট।

দিদি ছোটবেলায় বাদাম বিক্রি করতেন, আর তার ফুটবল খেলার সূচনা রাস্তায়, মাঠে নয়। পায়ে ইনফেকশন হওয়ায় ১৪ বছর বয়সে তার ডান পা কেটে ফেলার অবস্থায় এসে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন, ফুটবলে নামেন, ১৯৪৯ সালে ফুলমিনেন্স ক্লাবে যোগ দেন। ১৯৫৪-এর বিশ্বকাপে তিনি মেক্সিকো ও যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে গোল করেন, আর ১৯৫৮-এর বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ‘প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’। ১৯৬২-এর বিশ্বকাপের পর তিনি কোচ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তিনিই প্রথম ফুটবলকে আখ্যা দেন— ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। ২০০০ সালে ‘ফিফা হল অব চ্যাম্পিয়নস’-এ তারা মূর্তি স্থাপিত হয়। ১২ মে ২০০১ অন্ত্রের ক্যান্সার ও নিউমোনিয়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

টীকা ২: লিওনিদাস

লিওনিদাস দ্য সিলভাকে ডাকা হতো ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’ কিংবা ‘রাবার ম্যান’। তিনি ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে বিশ্বকাপ খেলেছেন। ১৯৩৮-এর বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তার জন্ম ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩। লিওনিদাস খেলোয়াড় হিসেবে যেমন পরিচিত, পরবর্তী সময়ে ফুটবল খেলার ধারা বিবরণকারী হিসেবেও যথেষ্ট সমাদৃত হন।

বিশ্বজোড়া লিওনিদাসের খ্যাতি আরো একটি বিশেষ কারণে— তিনিই ‘বাইসাইকেল কিক’-এর উদ্ভাবক। ১৯৩২-এর ২৪ এপ্রিল তিনি প্রথম প্রায় উল্টো হয়ে সাইকেল চালানোর ভঙ্গিতে ফুটবলে প্রথম কিক করেন। ১৯৩৮-এর বিশ্বকাপে তিনি বাইসাইকেল কিক করেছেন। এ বছর তিনি ফিফা গোল্ডেন বুট লাভ করেন।

১৯৩৮-এর বিশ্বকাপের সময় সবাই তাকে দায়ামান্তে নেগ্রো— কালো ডায়মন্ড ডাকতে শুরু করে। পরের বছর ব্রাজিলের একটি বিখ্যাত চকোলেট কোম্পানি তার নামটি ব্যবহারের স্বত্ব কিনে নেয় এবং ‘দায়ামান্তে নেগ্রো’ নামে একটি চকোলেট বাজারে ছাড়ে। দারুণ জনপ্রিয় চকোলেট এটি, এখনো এ ব্র্যান্ড বাজারে টিকে আছে।

তিনি সাও পাওলো দলের ম্যানেজারও ছিলেন। তার জন্ম ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯১৩। ২৪ জানুয়ারি, ২০০৪ অ্যালঝেইমার্স রোগের জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন।

টীকা ৩: আন্দ্রাদে

উরুগুয়ের ফুটবলার। ১৯৩০ বিশ্বকাপে উরুগুয়েকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করার কারিগরদের তিনি অন্যতম প্রধান। বুদ্ধিমান ও সৎ খেলোয়াড় হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন, গোল করার পর তিনি কখনো গোল নিয়ে মাতামাতি ও উৎসব করেননি। ‘ফ্রান্স ফুটবল’ পৃথিবীর সেরা ১০০ ফুটবলারের যে তালিকা করেছে, তাতে আন্দ্রাদে ১০ নম্বরে অবস্থান করছেন।

২২ নভেম্বর, ১৯০১ হোসে লেনার্দো আন্দ্রাদের জন্ম, মা আর্জেন্টাইন। তার যখন জন্ম, আন্দ্রাদে সিনিয়রের বয়স ৯৮ বছর, তাকেই মনে করা হচ্ছে বিশ্বখ্যাত এ ফুটবলারের পিতা, যদিও আন্দ্রাদের জন্মসনদে তাকে কেবল একজন সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আন্দ্রাদে বেঁচে থাকার জন্য রাস্তায় জুতো পালিশ করতেন, দৈনিক খবরের কাগজ বিতরণ করতেন; কার্নিভাল মিউজিশিয়ান হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। তিনি ড্রাম, বেহালা ও তাম্বুরিন বাজাতেন। তিনি ড্রাম কোরের নেতৃত্বও দিয়েছেন। ১৯২৪-এর অলিম্পিক ফুটবলে স্বর্ণপদক বিজয়ী দলের সদস্য। অলিম্পিক ফুটবলে তিনিই প্রথম কালো আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলোয়াড়। কালো হওয়ার কারণে বুয়েন্স আয়ার্সে মাঠে দর্শক তার দিকে পাথর ছুড়ে মেরেছে।

তাকে নাম দেয়া হয়েছে ‘কালো বিস্ময়’ ও কালো মুক্তো’, যা পরবর্তীকালে পেলের ওপর আরোপ করা হয়েছে।

এক পর্যায়ে তিনি সিফিলিসে আক্রান্ত হন। ১৯৫০-এ উরুগুয়ে যখন দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয় করল, অসুস্থ আন্দ্রাদেকে অতিথি হিসেবে আনা হয়েছিল।

৫ অক্টোবর, ১৯৫৭ তিনি কপর্দকহীন অবস্থায় একটি মানসিক হাসপাতালে মারা যান।

টীকা ৪: ইউসেবিয়ো

ইউসেবিয়ো দ্য সিলবা ফেরেইবা পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলের স্ট্রাইকার। তাকে বলা হতো ব্ল্যাক প্যানথার। পেশাগত ফুটবল জীবনে তিনি ৭৪৫ ম্যাচে ৭৩৩ গোল করেছেন।

তিনি পর্তুগালের সবচেয়ে বিখ্যাত খেলোয়াড়। কারো কারো মতে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের একজন। ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন সর্বাধিক গোলদাতা। ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন স্বীকৃত ফুটবল অ্যাম্বাসেডর।

ইউসেবিয়োর বাবা ছিলেন অ্যাঙ্গোলার অধিবাসী, মা মোজাম্বিকের। চরম দারিদ্র্যে ডুবে থাকা পরিবারের চতুর্থ সন্তান ইউসেবিয়ো স্কুল পালিয়ে খালি পায়ে রাস্তায় ফুটবল খেলতেন। রেল সড়ক শ্রমিক বাবার মৃত্যু হয় টিটেনাসে, তার বয়স তখন আট বছর।

পর্তুগাল লিগ ও ইউরোপিয়ান কাপে দাপটের সঙ্গে খেলেছেন তিনি।

৫ এপ্রিল, ২০১৪ হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। তিনি এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, পর্তুগাল সরকার তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে।

টীকা ৫: পেলে ও ম্যারাডোনা

কালো মানিক পেলে এবং একদা বিস্ময় বালক ম্যারাডোনা এতটাই পরিচিত যে, আপাতত তাদের নিয়ে পৃথক টীকা লেখার প্রয়োজন নেই।