১৯১৮ সালের স্প্যানিশ
ফ্লু মহামারীর
স্মৃতিচারণ করতে
গিয়ে উইলিয়াম
এইচ সার্দো
জুনিয়র বলেন,
মহামারীটি যখন
চরম পর্যায়ে
পৌঁছে গিয়েছিল,
তখন ওয়াশিংটন
ডিসিতে তাদের
পারিবারিক বাড়ির
শোয়ার ঘরে
পাইন কাঠের
অলংকারের বাক্সগুলো
গাদাগাদি করে
রাখা হয়েছিল।
তাদের বাড়িটি
ছিল ওয়াশিংটন
ডিসির একটি
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বাড়ি।
নগরীর জীবনযাত্রা
প্রায় থেমে
গিয়েছিল। স্কুলগুলো
ছিল বন্ধ।
গির্জার প্রার্থনা
সভাগুলো বাতিল
করা হয়েছিল।
ফেডারেল সরকার
তার কর্মঘণ্টা
সীমিত করে
দিয়েছিল। মানুষ
মরছিল।
সকালে যারা
অসুস্থ হচ্ছিল,
তাদের অনেকেই
মারা যাচ্ছিল
রাতে। ‘ব্যাপারটা
কত দ্রুত
ঘটেছিল এটাই
ছিল তার
চিত্র’—বললেন
৯৪ বছর
বয়সী সার্দো,
সরকারি সহায়তায়
যিনি বাস
করেন যুক্তরাষ্ট্রের
রাজধানীর ঠিক
বাইরে। সেই
মহামারীতে যারা
মারা গিয়েছিল,
তাদের স্মৃতিতর্পণ
করতে গিয়ে
তিনি বলেন,
‘পৃথিবী থেকে
তারা স্রেফ
হারিয়ে গিয়েছিল।’
সার্দো ১৯১৮
সালের মহামারীতে
বেঁচে যাওয়াদের
একজন ছিলেন।
তাদের কাহিনীগুলো
বিশ্বের সবচেয়ে
মর্মান্তিক মহামারীগুলোর
একটির বিস্মৃত
সেই অধ্যায়ে
ফিরিয়ে নিয়ে
যায়, যখন
কমপক্ষে পাঁচ
কোটি মানুষকে
হত্যা করেছিল
ভাইরাসটি, সম্ভবত
আসল সংখ্যাটা
ছিল প্রায়
১০ কোটি।
তখন মহামারীটি
‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’
নামে পরিচিত
ছিল, যাতে
যুক্তরাষ্ট্রেই মারা
গিয়েছিল ছয়
লাখ মানুষ।
অবস্থাদৃষ্টে মনে
হয়, এ
ফ্লু বিশেষ
করে প্রাণঘাতী
হয়ে উঠেছিল
তরুণ প্রাপ্তবয়সীদের
জন্য, যাদের
অনেকেই তাদের
ফুসফুসে তরল
জমে যাওয়ায়
শ্বাসরোধ হয়ে
মারা গিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ থেমে
আসতে থাকলে
কানসাসের এক
সেনাশিবিরে রোগটি
প্রথম ধরা
পড়ে। খুবই
দ্রুতগতিতে এ
ভাইরাস যুক্তরাষ্ট্রের
সেনাশিবির ও
ইউরোপের পরিখাগুলোর
সৈন্যদের ভেতরে
ছড়িয়ে পড়ে।
সারা বিশ্বে
এটি ছড়িয়ে
পড়লে অনেক
জনসমাজই স্থবির
হয়ে পড়ে।
ডিস্ট্রিক্ট অব
কলাম্বিয়ায় ১৯১৮
সালের ২১
সেপ্টেম্বর ইনফ্লুয়েঞ্জায়
প্রথম মৃত্যুর
ঘটনা নথিভুক্ত
করা হয়।
সে ছিল
২৪ বছর
বয়সী এক
রেল রোড
শ্রমিক। মারা
যাওয়ার মাত্র
চারদিন আগে
নিউইয়র্কে তার
শরীরে রোগটির
উপসর্গ দেখা
দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের
রাজধানীতে এ
ফ্লু ছড়িয়ে
পড়ে হাজার
হাজার সৈন্য
ও যুদ্ধকর্মীর
ভেতরে। এ
মহামারীর প্রকোপ
যতদিনে কমে
আসে, ততদিনে
নগরীটিতে অন্তত
৩০ হাজার
মানুষ এতে
আক্রান্ত হয়,
মারা যায়
তিন হাজার।
ফ্লু সবাইকে আতঙ্কিত করেছিল
আক্রান্তদের
ভেতর সার্দোও
ছিলেন। সে
সময় তার
বয়স ছিল
ছয় বছর।
খুব কমই
মনে করতে
পারেন তিনি
এ অসুস্থতার
কথা। তবে
তার মা
কতটা আতঙ্কগ্রস্ত
হয়ে পড়েছিলেন,
তা তার
খুব ভালো
করেই মনে
আছে।
‘তারা
আমাকে অন্যদের
কাছ থেকে
খুব ভালোভাবেই
আলাদা করে
রেখেছিলেন’, সার্দো
বললেন, যিনি
তখন তার
মা-বাবা,
দুই ভাই
ও পরিবারের
অন্য তিন
সদস্যের সঙ্গে
বসবাস করছিলেন।
তার পরিবার
বেডরুমে তাকে
তার ভাইয়ের
সঙ্গে কোয়ারান্টাইনে
রেখেছিল। তাদের
পরিবারের সবাই
তখন মুখোশ
পরত।
নগরীটির সমস্ত কার্যক্রম থেমে আসতে শুরু করেছিল। বিচলিত ফেডারেল সরকার তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে দিয়ে রাস্তায় মানুষের ভিড় ও গাড়ির সংখ্যা সীমিত করে রাখার চেষ্টা করছিল। নগরীর নজরদারিতে নিয়োজিত কমিশনাররা অক্টোবরের প্রথম দিকেই স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে বন্ধ করে দিয়েছিলেন খেলার মাঠ, নাট্যশালা, বিচিত্রানুষ্ঠানের হলগুলো এবং বিনোদনের সব জায়গা। নাচ ও অন্যান্য সামাজিক সমাবেশও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
কমিশনাররা গির্জায়
প্রার্থনা সভা
বাতিল করার
আহ্বান করেছিলেন
যাজকদের প্রতি।
মহামারী ফেডারেল
সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের
জন্য হুমকি
হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সেই সময়ের
দি
ওয়াশিংটন স্টার পত্রিকার
রিপোর্টে এমনটাই
লেখা হয়েছিল।
ধর্মযাজকেরা এর
প্রতিবাদ করেছিলেন।
‘একটি
আবেগ কাজ
করছিল যে
প্রার্থনা ছাড়া
তারা ঈশ্বরের
কাছে পৌঁছতে
পারবে না’,
সার্দো বললেন,
‘তারা চার্চে
যাওয়ার ধর্মানুভূতিটা
লালন করত,
আর তা
করতেই কিনা
তাদের নিষেধ
করা হয়েছিল!’
ফ্লু ছড়িয়ে
যাচ্ছিল এবং
নিষেধাজ্ঞা আসন্ন
হয়ে পড়ল।
‘সবাই অন্যদের
সঙ্গে দেখা
করতে যেতে
ভয় পেত’—বললেন
তিনি। ‘সমাজের
অনেক কিছুই
এ মহামারী
বদলে দিয়েছিল।
আমরা আরো
ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে
পড়েছিলাম।’
সে সময়
গুজব রটে
গিয়েছিল যে
জার্মানরা এ
রোগ ছড়িয়েছে—সার্দো
যা বিশ্বাস
করতেন না।
এ রোগ
বিস্তার রোধে
১২টি বিধানের
তালিকা করতে
গিয়ে সেনাবাহিনীর
সার্জন জেনারেল
লেখেন, ‘জনসাধারণের
উচিত অহেতুক
ভিড় এড়িয়ে
চলা। বাতাস
যখন নির্মল
তখন জানালা
খুলুন এবং
গভীর শ্বাস
নিন এবং
খাওয়ার আগে
হাত ধুয়ে
নিন।’
একটি স্লোগান
ছিল, ‘যতবারই
কাশি ও
হাঁচি দেবেন,
ততবারই মুখ
ঢেকে রাখুন।
যদি তা
না করেন,
তাহলে আপনি
এ রোগ
ছড়াবেন।’ তখন
যারা সুস্থ
ছিল, বাইরে
যাওয়ার সময়
তারা মুখোশ
পরত। যারা
সংক্রমিত হয়েছে
বলে জানা
যেত, তাদের
সতর্ক করে
জানিয়ে দেয়া
হতো যে
বাইরে দেখা
গেলে তাদের
৫০ ডলার
জরিমানা করা
হবে। সার্দো
স্মৃতিচারণ করে
বলেন, ‘পথচারীদের
থুথু থেকে
ছড়ানো জীবাণু
ধ্বংস করার
জন্য লোকজন
বালতি ভরে
ভরে জীবাণুনাশক
মেশানো পানি
ঢালত তাদের
বাড়ির সামনের
ফুটপাতে।
সেই দিনগুলোয়
সরকারি স্বাস্থ্য
কর্মকর্তারা তাদের
কাছে দায়েরকৃত
অভিযোগগুলো এমনভাবে
সাজানোর চেষ্টা
করে যেতেন,
যাতে স্কুল
বন্ধ করে
দেয়া যায়।
ভবিষ্যৎ ফ্লু
মহামারী রোধে
তখন এ
ধরনের আরো
অনেক দৃশ্যমান
পদক্ষেপ নেয়া
হয়েছিল। এক
নতুন গবেষণায়
দেখা গেছে,
১৯১৮ সালের
প্রাণঘাতী স্প্যানিশ
ফ্লু চলাকালে
গৃহীত এ
ধরনের উদ্যোগগুলো
দৃশ্যত বেশ
কার্যকর হয়েছিল।
গবেষকরা দেখতে
পেয়েছেন, সেন্ট
লুইসের মতো
নগরীগুলোয় ফ্লুর
প্রকোপ দেখা
দেয়ার কমপক্ষে
দুই সপ্তাহ
আগে জনসমাজের
ভেতরে সামাজিকভাবে
দূরত্ব বজায়
রাখার পদক্ষেপ
নেয়া হয়েছিল।
সেসব নগরীতে
ফ্লুর কারণে
মৃত্যুর হার
ফিলাডেলফিয়ার তুলনায়
অর্ধেক কমিয়ে
আনা সম্ভব
হয়েছিল। পরবর্তী
সময়ে এমন
পদক্ষেপ নেয়া
হলেও ফিলাডেলফিয়ায়
আগে এ
উদ্যোগ নেয়া
হয়নি।
দ্য হোয়্যারলউইন্ড
হিস্টোরিক্যাল প্রজেক্টের
আওতায় মিশিগান
বিশ্ববিদ্যালয় ও
ইউএস সেন্টারস
ফর ডিজিজ
কন্ট্রোল অ্যান্ড
প্রিভেনশনের গবেষকরা
৪৫টি নগরীর
নথিপত্র ও
খবরের কাগজে
প্রকাশিত রিপোর্টগুলোর
ক্লিপিং ও
অন্যান্য নথি
ঘেঁটে এসব
তথ্য উদ্ঘাটন
করেছেন।
কোনো নির্দিষ্ট
নগরীর ওপর
পরিচালিত জরিপে
দেখা গেছে,
যত বেশি
সামাজিক দূরত্ব
বজায় রাখার
উদ্যোগ কার্যকর
করা হয়েছে,
সেই নগরীতে
মহামারীর প্রভাব
পড়েছে ততটাই
কম। জনসমক্ষে
মুখোশ পরা,
দোরে দোরে
ঘুরে পণ্য
বিক্রি বন্ধ
করা, গির্জায়
প্রার্থনা সভা
বাতিল করা,
অসুস্থ লোকদের
কোয়ারান্টাইনে রাখা
ইত্যাদি পদক্ষেপ
খুবই কার্যকর
বলে প্রমাণিত
হয়েছে সেই
সর্বনাশা মহামারীকালে।
কিন্তু এ
গবেষকরা স্বীকার
করে নিয়েছেন,
তারা সবে
তাদের প্রাপ্ত
তথ্যের ওপর
বিশ্লেষণ শুরু
করেছেন এবং
এখনই স্পষ্ট
করে বলতে
চাই না,
কোন পদক্ষেপটা
সবচেয়ে বেশি
কার্যকর। এবং
তারা পরিষ্কারভাবে
এটাও বলছেন
না যে
কোন কোন
নগরী ঠিক
কী উদ্যোগ
নিয়ে মহামারীতে
মৃত্যুহার কমাতে
সক্ষম হয়েছিল।
অনেক প্রার্থনা
১৯১৮
সালের ফ্লু
মহামারী থেকে
বেঁচে যাওয়াদের
আরেকজন হচ্ছেন
৯৯ বছর
বয়সী রুথ
মার্শাল। এ
নারী বলেন,
তার দুই
বোন ও
একজন ভাই
ঠাণ্ডা লাগা
থেকে সেরে
উঠেছিলেন। এরপর
তারা জ্বরে
আক্রান্ত হন
এবং তাদের
অসুস্থতা তীব্র
হয়ে ওঠে।
ক্যাপিটাল হিলের
খুব কাছেই
বাস করতেন
মার্শাল। তিনি
বলেন, খবরের
কাগজে ইনফ্লুয়েঞ্জায়
এত মানুষের
মৃত্যুর খবর
ছিল খুব
আশ্চর্যের।
‘আমরা
কখনো ভাবিনি
যে আমরা
মরতে যাচ্ছি।
আমরা অনেক
প্রার্থনা করেছি’—বলেন
তিনি।
অন্যরা এত
ভাগ্যবান ছিলেন
না। মৃতের
সংখ্যা খুব
দ্রুত বেড়ে
যেতে থাকলে
কফিনের অভাব
দেখা দিয়েছিল।
মৃতদেহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার
বাড়িগুলো কুলিয়ে
উঠতে পারছিল
না। সার্দোর
বাবা ছিলেন
মরদেহ সত্কার
প্রতিষ্ঠান উইলিয়াম
এইচ সার্দো
অ্যান্ড কোম্পানির
মালিক। তিনি
ও আরো
একটি শব
সত্কার বাড়ির
পরিচালক মরদেহ
সুগন্ধি দিয়ে
সংরক্ষণ ও
হাজার হাজার
কবর খোঁড়ার
জন্য সেনাবাহিনীর
দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
আরেকটি মহামারীর
হুমকি নিয়ে
কথা বলার
সময় সার্দোর
ভেতর জেগে
ওঠে ১৯১৮
সালের স্প্যানিশ
ফ্লুর সেইসব
স্মৃতি। একসময়
তিনি বলেন,
প্রতি বছরই
তিনি ফ্লুতে
আক্রান্ত হয়ে
বাঁচতে থাকেন।
‘এটি আমার
ভেতর থেকে
সবসময়ই নরকের
আতঙ্ক ছেনে
বের করে
আনে’—সার্দো
বলে ওঠেন।
এপিতে
চাভি চেজের
রচনা অবলম্বনে
মনজুর শামস:
লেখক ও অনুবাদক





