আলাস্কার ব্রেভিগ মিশন
আলাস্কার
পশ্চিমে বেরিং
প্রণালির কাছাকাছি
ছোট্ট একটি
গ্রাম ব্রেভিগ
মিশন। বছরের
অধিকাংশ সময়
বরফের নিচে
ঢাকা থাকে।
১৯৫১ সালে
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া
ইউনিভার্সিটির একদল
তরুণ গবেষক
গ্রামের কাউন্সিলে
হাজির হয়ে
সমুদ্রতীরবর্তী একটি
গণকবরে খননকাজের
অনুমতি চাইলেন।
১৯১৮ সালের
নভেম্বরে এক
মহামারীতে মাত্র
পাঁচদিনের মধ্যে
মৃত্যুবরণ করেছিল
গ্রামের প্রায়
সব মানুষ।
৮০ জন
বাসিন্দার মধ্যে
মাত্র আটজন
সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে
গিয়েছিল। মৃতদের
যথাযথ সত্কার
করার উপায়
ছিল না
বলে সবাইকে
সমুদ্রতীরের একটি
গণকবরে সমাহিত
করা হয়েছিল।
৩৩ বছর
পর আইওয়া
ইউনিভার্সিটির পিএইচডি
গবেষক ২৬
বছর বয়সী
জোহান হাল্টিনের নেতৃত্বে
তরুণদের দলটি
এসেছে সেই
মহামারীর ঘাতক
জীবাণুটির সন্ধানে।
কবর খোঁড়ার
অনুমতি পেয়ে
জোহানের দল
কাজ শুরু
করে এবং
একটি শিশুর
শরীরের ফুসফুসের
টিস্যুর নমুনা
সংগ্রহ করতে
সক্ষম হয়।
নমুনাটি খুবই
সংবেদনশীল। তাপমাত্রার
হেরফেরে নষ্ট
হয়ে যেতে
পারে। এটাকে
দ্রুততম উপায়ে
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে
নিয়ে যেতে
হবে। কিন্তু
যোগাযোগ ব্যবস্থার
সেই পশ্চাত্পদ
যুগে ছোট
বিমানে ফেরার
সময় বারবার
থেমে রিফুয়েল
করতে হয়েছিল
এবং টিস্যুটিকে
অবিকৃত রাখার
জন্য যে
তাপমাত্রার প্রয়োজন,
সেটা পাওয়া
সম্ভব হয়নি।
ফলে সেই
নমুনাটি যখন
গবেষণাগারে পৌঁছে,
তখন সেটি
অক্ষত ছিল
না। একটি
মুরগির ডিমের
ভেতর জীবাণুটির
বংশবিস্তারের চেষ্টা
করা হয়েছিল।
কিন্তু সে
চেষ্টা সফল
হয়নি, যে
কারণে সেখানেই
গবেষণাটি পরিত্যক্ত
হয়েছিল।
উনিশ শতকের
ভয়াবহতম মহামারী ‘স্প্যানিশ ফ্লু’
যে
জীবাণুর সন্ধানে
জোহান হাল্টিন
আলাস্কার সেই
অখ্যাত গ্রামে
ছুটে গিয়েছিলেন,
সেটি বিশ
শতকের সবচেয়ে
ভয়াবহ মহামারীর
সৃষ্টি করেছিল।
‘স্প্যানিশ ফ্লু’
নামে পরিচিত
মহামারীটি ১৯১৮-১৯
সালে সমগ্র
পৃথিবীর ৫-১০
কোটি মানুষের
প্রাণহানি ঘটিয়েছিল।
দুই বিশ্বযুদ্ধে
নিহত মানুষের
যোগফলও এর
চেয়ে কম
ছিল।
রোগটি প্রথম
ধরা পড়েছিল
আমেরিকার কানসাসের
এক সামরিক
দুর্গে। প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে
১৯১৮ সালের
মার্চে আমেরিকা
যখন জার্মানির
সঙ্গে বিশ্বযুদ্ধে
জড়িয়ে পড়ে,
তখন সারা
দেশ থেকে
তরুণদের সৈন্য
দলে ভর্তি
করানোর প্রক্রিয়া
শুরু হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে
ইউরোপে পাঠানোর
উদ্দেশে বেশকিছু
প্রশিক্ষণ ক্যাম্প
নির্মিত হয়
আমেরিকার বিভিন্ন
রাজ্যে।
কানসাসের তেমন
একটি সৈনিক
নিবাস ক্যাম্প
ফানস্টোন, যেখানে
৫০ হাজার
সৈন্যের আবাস
ছিল। ১৯১৮
সালের শুরুতে
কানসাসের হাসকেল
কাউন্টির এক
ডাক্তার স্থানীয়ভাবে
অজ্ঞাতনামা এক
রোগের অস্তিত্বের
কথা জানিয়েছিলেন।
এর দুই
মাস পরই
৪ মার্চ
১৯১৮ ক্যাম্প
ফানস্টোনের এক
বাবুর্চি হঠাৎ
জ্বরে আক্রান্ত
হলেন। আলবার্ট
গিচেল নামের
সেই বাবুর্চির
নিবাস ছিল
হাসকেল কাউন্টিতে।
দেখা গেল,
একই দিনে
মাত্র কয়েক
ঘণ্টার মধ্যে
ক্যাম্পের ৫২২
জন একই
রোগে আক্রান্ত
হয়েছে। পরবর্তী
সপ্তাহের মধ্যে
আরো অনেক
সৈন্য অসুস্থ
হয়ে পড়তে
লাগল। কিন্তু
যুদ্ধের ভয়াবহতার
কাছে এসব
জ্বরজারি তেমন
পাত্তা পায়নি
শুরুতে। সৈন্যদের
প্রশিক্ষণ ও
প্রেরণের কাজ
চলতে থাকে
সারা দেশেই।
ফলে এপ্রিলে
ওই ক্যাম্প
থেকে যেসব
আমেরিকান সৈন্য
ইউরোপে পৌঁছল,
তাদের অনেকেই
সেই ভাইরাসটি
বহন করছিল।
সৈনিকদের সঙ্গে
স্প্যানিশ ফ্লু
আটলান্টিক পাড়ি
দেয় এবং
ইউরোপ মহাদেশে
ছড়াতে শুরু
করে।
স্প্যানিশ ফ্লু
এতই ভয়ংকর
ছিল যে
কোনো কোনো
আক্রান্ত মানুষ
চিকিৎসা নেয়ার
আগেই দ্রুত
মৃত্যুবরণ করত।
এমন ঘটনাও
শোনা গেছে
যে কেউ
একজন ঘুম
থেকে উঠে
দেখল, তার
জ্বর এসেছে
এবং ডাক্তারের
কাছে যাওয়ার
পথেই মৃত্যুবরণ
করেছে। অসুখের
লক্ষণগুলো ছিল
এ রকম—প্রথমে
জ্বর আসে,
সেই সঙ্গে
শ্বাসকষ্ট। অক্সিজেনের
অভাবে মুখমণ্ডল
নীল বর্ণ
ধারণ করে,
ফুসফুসে রক্ত
জমে যায়,
নাক-মুখ
দিয়ে রক্ত
বেরিয়ে আসে।
অন্যান্য ফ্লু
জ্বরের মতো
এটা শিশু
ও বৃদ্ধদের
আক্রমণ করার
মধ্যে সীমাবদ্ধ
থাকেনি। এর
হাত থেকে
তরুণ বয়সীরাও
নিস্তার পায়নি। এতে
আক্রান্ত ব্যক্তি
যখন হাঁচি
বা কাশি
দেয়, তার
সঙ্গে অন্তত
৫০ লাখ
জীবাণু ছড়িয়ে
পড়ে আশপাশের
মানুষের দেহে।
ব্যারাকের হাজার
হাজার সৈন্যের
মধ্যে এভাবেই
ভাইরাসটি দ্রুত
ছড়িয়ে পড়েছিল।
কেন স্প্যানিশ ফ্লু?
জন্ম
আমেরিকায় হলেও
নামের সঙ্গে
স্পেন যুক্ত
হলো কেন?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের
সময় সারা
দুনিয়ায় সংবাদপত্রের
ওপর কড়াকড়ি
সেন্সরশিপ চলছিল।
সেই সেন্সরের
জালে আটকে
পড়ে মহামারীর
খবরটি। এতে
আতঙ্ক ছড়াতে
না পারলেও
রোগটি যুদ্ধের
চেয়ে দ্রুতগতিতে
ছড়িয়ে পড়তে
শুরু করে
এবং নির্বিচারের
প্রাণহানি ঘটাতে
থাকে। সংবাদ
সেন্সরের ক্ষেত্রে
ব্যতিক্রম ছিল
স্পেন। বিশ্বযুদ্ধে
নিরপেক্ষ দেশ
হওয়ায় স্পেনে
সংবাদপত্রের ওপর
নিষেধাজ্ঞা ছিল
না। তার
ওপর স্বয়ং
স্পেনের রাজা
এ রোগে
আক্রান্ত হয়েছিলেন।
ফলে স্প্যানিশ
সংবাদ মাধ্যমেই
খবরটি প্রথম
প্রকাশ হয়।
সেখান থেকে
সারা বিশ্বে
ছড়িয়ে পড়ে
মহামারীর সংবাদ।
স্পেন থেকে
সংবাদটি ছড়ানোর
কারণেই রোগটি
সারা বিশ্বে
স্প্যানিশ ফ্লু
হিসেবে প্রচারিত
হয়। প্রকৃত
অর্থে রোগটি
ছিল আমেরিকান
ফ্লু।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে
মহামারীর ঘটনা
প্রাচীনকাল থেকেই
ঘটে আসছে।
খ্রিস্টপূর্ব বারো
শতকের মিসরীয়
মমিতে গুটিবসন্তের
আভাস পাওয়া
গেছে। ষষ্ঠ
শতকে প্লেগ
মহামারী সমুদ্র
বাণিজ্যের পথ
বেয়ে এশিয়া,
আফ্রিকা ও
আরব দেশের
আড়াই কোটি
মানুষের প্রাণহানি
ঘটিয়েছিল। আরো
আট শতক
পর ব্ল্যাক
ডেথ বলে
পরিচিত প্লেগ
মহামারী ইউরোপের
৬০ শতাংশ
জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন
করেছিল। ষোলো
ও সতেরো
শতকে ইউরোপীয়রা
যখন আমেরিকায়
বসতি গড়ে,
তাদের মাধ্যমে
সেখানে গুটিবসন্ত,
ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম
ইত্যাদি রোগ
আদিবাসীদের মধ্যে এমনভাবে
ছড়িয়েছিল, যাতে
৯০ শতাংশ
লোকের মৃত্যু
ঘটেছিল। স্প্যানিশ
ফ্লুর আদি
উত্পত্তিস্থল হিসেবে
চীনের দিকে
আঙুল তুলেছিলেন
কোনো কোনো
বিশেষজ্ঞ। যদিও
পরবর্তীকালে সেটিকে
সঠিক হিসেবে
প্রমাণ করা
যায়নি।
বিশ্বজুড়ে মরদেহের সারি
ভাইরাসটি
দ্রুত ছড়ানোর
পেছনে বড়
কারণ হিসেবে
কাজ করেছিল
বিশ্বযুদ্ধ। সারা
বিশ্বে সৈন্য
চলাচলের কারণে
মহাদেশ থেকে
মহাদেশে ভ্রমণ
করে প্রাণহানি
ঘটিয়ে গেছে
ভাইরাসটি। যুদ্ধের
ট্রেঞ্চ ও
ক্যাম্পের ঠাসাঠাসি
ভিড় ভাইরাসটির
প্রধান বাহক
হয়ে উঠেছিল।
সৈন্য দলের
সঙ্গে ভাইরাসটিও
চতুর্দিকে ছড়িয়ে
পড়ছিল। কানসাসের
সেই প্রাথমিক
সংক্রমণ কেটে
গিয়েছিল অল্প
সময়ে। কিন্তু
মাস ছয়েক
পর ভাইরাসটি
ভয়ানক রূপ
ধরে মরণ
কামড় বসাতে
থাকে। এক
হিসেবে দেখা
গেছে, ১৯১৮-এর
সেপ্টেম্বর ও
ডিসেম্বরের মধ্যে
এটি সবচেয়ে
মারাত্মক আকার
ধারণ করে।
শুধু অক্টোবরেই
১ লাখ
৯৫ হাজার
আমেরিকান মৃত্যুবরণ
করেছিল। আমেরিকায়
মোট প্রাণহানি
ঘটে ৬
লাখ ৭৫
হাজারজনের। অথচ
প্রথম মহাযুদ্ধের
সময় সমগ্র
আমেরিকায় ১
লাখ ১৬
হাজার সৈন্য
নিহত হয়েছিল।
আমেরিকানদের কাছে
এ মহামারী
ছিল ইতিহাসের
সবচেয়ে বড়
ধাক্কা। এত
বিপুলসংখ্যক মানুষ
আমেরিকার ইতিহাসে
এর আগে
মৃত্যুবরণ করেনি।
আমেরিকানদের কাছে
তাদের সংখ্যাটি
যতই বড়
মনে হোক,
স্প্যানিশ ফ্লু
কিন্তু সবচেয়ে
ভয়াবহ আক্রমণটি
করেছিল অরক্ষিত
ভারতবর্ষে। প্রথম
বিশ্বযুদ্ধ শেষে
দেশে ফিরতে
থাকা সৈনিকদের
হাত ধরেই
ভারতে প্রবেশ
করে স্প্যানিশ
ফ্লু। বাতাসের
সঙ্গে ছড়িয়ে
পড়ে ঘনবসতি
অঞ্চলে এবং
হাজারে হাজারে
মানুষ মারা
পড়তে থাকে
প্রতিদিন। বছর
গড়াতে সংখ্যাটি
কোটির ঘর
পেরিয়ে যায়। সারা
বিশ্বে এ
মহামারীতে মৃত্যু
হয়েছিল ৫-১০
কোটি মানুষের।
এর মধ্যে
ভারতবর্ষেই মারা
গিয়েছিল দেড়
কোটির বেশি
মানুষ। দুই
ধাপে ভারতবর্ষকে
গ্রাস করেছিল
স্প্যানিশ ফ্লু।
প্রথম ধাপে
এর প্রভাব
ছিল অপেক্ষাকৃত
মৃদু, কিন্তু
দ্বিতীয় ধাপে
ভয়ংকর আকার
ধারণ করে
এবং সমগ্র
ভারতবর্ষে ছড়িয়ে
পড়ে মহামারী।
বিশ শতকের
সবচেয়ে ভয়াবহ
রোগটি প্রথমে
ভারতের পশ্চিম
অংশে আক্রমণ
করে। সেখান
থেকে ক্রমেই
ছড়িয়ে পড়ে
সবখানে। পূর্ববঙ্গ
এ মহামারী
থেকে অনেকখানি
রক্ষা পায়
অনুন্নত যোগাযোগ
ব্যবস্থার কারণে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে
এ অঞ্চলে
তেমন সৈন্য
চলাচল ঘটেনি।
সে কারণে
রোগটা ছড়াতে
পারেনি এদিকে।
প্রাণহানির সংখ্যায়
ভারতের পর
ছিল চীনের
অবস্থান। চীনে
৪০-৯০
লাখ মানুষের
মৃত্যু ঘটেছিল।
ইরানে মৃত্যুবরণ
করেছিল ১০-২৪
লাখ মানুষ।
ইন্দোচায়না বা
ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে
মৃত্যুবরণ করেছিল
১৫ লাখ।
জাপানে মৃত্যুবরণ
করেছিল অন্তত
চার লাখ।
ব্রাজিলে তিন
লাখ, ব্রিটেনে
আড়াই লাখ
ও ফ্রান্সে
চার লাখ
মানুষের মৃত্যু
হয়। এগুলো
বড় বড়
হিসাব। এর
বাইরে এশিয়া-আফ্রিকা
প্রশান্ত মহাসাগরীয়
অঞ্চলের আরো
শতাধিক দেশে
আক্রান্ত হয়েছিল
লাখ লাখ
মানুষ।
ফেরারি এক
খুনি
১৯১৯
সালের পর
থেকে গবেষকরা
খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন
মহামারী সৃষ্টিকারী
প্রাণঘাতী ভয়ংকর
সেই জীবাণুটির
ইতিবৃত্ত। কিন্তু
এরপর রোগটা
আর কোথাও
ছড়ায়নি, যেন
বেমালুম উধাও
হয়ে গেছে।
আশঙ্কা করা
হচ্ছিল, জীবাণুটি
ভোল পাল্টে
নতুন চেহারায়
অন্য কোথাও
আক্রমণ করে
বেড়াচ্ছে। তাই
দশকের পর
দশক ধরে
গবেষকরা জীবাণুটির
সন্ধান করে
গেছেন। জোহান
হাল্টিন ছিলেন
সেই গবেষকদের
একজন, যিনি
১৯৫১ সালে
ব্যর্থ হয়েছিলেন।
সেই ব্যর্থতাকে
তখন তিনি
মেনে নিতে
বাধ্য হলেও
মন থেকে
মুছে ফেলেননি।
তার প্রমাণ
পাওয়া যায়
৪৬ বছর
পর ১৯৯৭
সালে এসে।
১৯৯৭ সালে
তিনি একদিন
Science ম্যাগাজিনে
প্রকাশিত জেফেরি
টাওবেনবার্গার নামে
জার্মান বিজ্ঞানীর
লেখা একটি
নিবন্ধ পড়ে
জানতে পারলেন,
সেই ভাইরাসটি
নিয়ে এখনো
গবেষণা চলছে।
জেফেরি লিখেছেন,
তিনি ১৯১৮
সালে সাউথ
ক্যারোলাইনার ফোর্ট
জ্যাকসনে স্প্যানিশ
ফ্লুর আক্রমণে
নিহত ২১
বছর বয়সী
এক মার্কিন
সৈন্যের ফুসফুসের
টিস্যু থেকে
সংগৃহীত ওই
ভাইরাসের জিনের
খণ্ডাংশ নিয়ে
গবেষণা করছেন।
সেই সৈনিকের
মরদেহের টিস্যু
সংরক্ষণ করা
হয়েছিল ভবিষ্যতের
গবেষণার জন্য।
সেই টিস্যুর
আরএনএ বিশ্লেষণ
করে জেফেরি
ও তার
দল ভাইরাসটির
গতি-প্রকৃতি
সম্পর্কে আংশিক
তথ্য উদ্ঘাটন
করেছেন। পরিপূর্ণ
ডিএনএ তথ্যের
অভাবে জিনোম
সিকোয়েন্স সম্পূর্ণ
করা সম্ভব
হয়নি। তবু
রোগটি সম্পর্কে
মোটামুটি একটা
পরিষ্কার ধারণা
পাওয়া গেছে।
তারা বলছেন,
জীবাণুটি ছিল
নভেল ইনফ্লুয়েঞ্জা।
বিজ্ঞানের ভাষায়
A (H1N1) নামে
পরিচিত। এটি
মানুষ ও
শূকরের মাধ্যমে
ছড়ায়, পাখির
মাধ্যমে নয়।
তবে তখনো
অনেক গবেষণার
বাকি ছিল।
নিবন্ধে বলা
হয়েছে, যদি
কোনোক্রমে একটি
পরিপূর্ণ ডিএনএর
সন্ধান পাওয়া
যেত, তাহলে
জীবাণুটির জিনোম
সিকোয়েন্স সম্পূর্ণ
করে তার
চরিত্র সম্পর্কে
পুরোপুরি ধারণা
পাওয়া যেত।
অবশেষে আলাস্কাতেই
জেফেরির
নিবন্ধ পড়ে
জোহান হাল্টিন
উৎসাহিত হয়ে
উঠলেন নতুন
করে। অর্ধশতক
আগে অসমাপ্ত
থাকা কাজটি
এবার শেষ
করার চেষ্টা
করা যেতে
পারে। তখন
সেই জীবাণুর
খোঁজ পেয়েও
তিনি সফল
হননি। আবারো
কি চেষ্টা
করা যায়
না? ১৯৫১
সালের ব্যর্থতা
ঘুচিয়ে দেয়ার
সুযোগ এসেছে
হয়তো। তিনি
জেফরির সঙ্গে
যোগাযোগ করলেন।
তাকে বললেন,
জেফরি যদি
চান তাহলে
তিনি আবারো
আলাস্কায় গিয়ে
সেই পুরনো
সমাধিস্থল থেকে
মরদেহের টিস্যু
সংগ্রহ করে
আনতে পারেন।
কয়েকদিন পর
জেফেরি তাকে
ফোন করে
সানন্দ সম্মতি
জানালেন, তিনি
আগ্রহী। সম্মতি
পেয়ে প্রস্তুতি
নিতে শুরু
করলেন তিনি।
এক সপ্তাহ
পরই আলাস্কার
উদ্দেশে উড়াল
দিলেন ৭২
বছর বয়সী
জোহান হাল্টিন
। ৪৬
বছর পর
নতুন করে
সেই পুরনো
অনুসন্ধান। বয়স
তাকে দমিয়ে
রাখতে পারেনি।
খোঁড়াখুঁড়ি করার
জন্য এবার
তিনি সঙ্গে
নিলেন তার
স্ত্রীর বাগানের
কাজে ব্যবহূত
কাঁচিটা।
ব্রেভিগ মিশনে
পৌঁছে তিনি
গ্রামের কাউন্সিলের
অনুমতি চাইলেন
আবার। কাউন্সিল
অনুমতি দিলে
তিনি একজন
স্থানীয় সহকারীকে
নিয়ে সেই
কবরখানায় গিয়ে
কাজ শুরু
করলেন। টানা
পাঁচদিন খোঁড়াখুঁড়ি
করার পর
তিনি পেয়ে
গেলেন, যা
খুঁজেছিলেন বহুবছর
আগেও। সাত
ফুট গভীরে
গিয়ে তিনি
ইনুইট উপজাতির
এক তরুণীর
দেহের ফুসফুসের
টিস্যু সংগ্রহ
করলেন। বরফের
নিচে চর্বির
আচ্ছাদনে ফুসফুসের
টিস্যুগুলো এত
বছর পরও
সম্পূর্ণ ধ্বংস
হয়নি। টিস্যুটি
সংগ্রহ করে
বিশেষভাবে নির্মিত
পাত্রে করে
পাঠিয়ে দিলেন
জেফরি ও
তার সহকর্মীদের
কাছে।
কয়েকদিন পরই
তাকে টেলিফোন
করে জানানো
হলো বহুল
কাঙ্ক্ষিত সুসংবাদটি।
লুসির ফুসফুসের
টিস্যু থেকে
সেই ভয়ংকর
ভাইরাসের সম্পূর্ণ
জিন উদ্ধার
করা সম্ভব
হয়েছে। এত
যুগ ধরে
যাকে খুঁজে
বেড়াচ্ছিলেন সারা
দুনিয়ার বিজ্ঞানীরা।
আক্রমণের প্রায়
৮০ বছর
পর শনাক্ত
করা গেল
ভয়ানক এক
খুনে জীবাণুকে।
দেরিতে হলেও
এ উদ্ঘাটন
খুব গুরুত্বপূর্ণ
ছিল। কারণ
ভাইরাসটির জিন
গবেষণা করে
তার প্রতিষেধক
তৈরি করা
যাবে, যা
ভবিষ্যতের পৃথিবীকে
এ ভাইরাসের
বংশধরের কাছ
থেকে রক্ষা
করবে।
মহত্প্রাণ এ
গবেষক কারো
কোনো সাহায্য
ছাড়া নিজের
পকেট থেকে
৩ হাজার
২০০ ডলার
খরচ করে
অনুসন্ধানকাজটি সমাপ্ত
করেছিলেন। বলা
বাহুল্য, তার
অর্থ ব্যয়
বৃথা যায়নি।
২০২০ সালে
বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯
বা করোনাভাইরাসের
প্রাদুর্ভাব ঘটার
পর এটিকে
১০০ বছর
আগের স্প্যানিশ
ফ্লুর সঙ্গে
তুলনা করা
হচ্ছে। করোনাভাইরাসে
আক্রান্ত হয়ে
বিশ্বব্যাপী এখন
পর্যন্ত ৭
হাজার ১০০
জনের মৃত্যু
হয়েছে। চীন
থেকে যাত্রা
করে এশিয়ার
সীমান্ত পেরিয়ে
ইউরোপ-আমেরিকায়ও
ছড়িয়ে গেছে।
প্রতিদিন আক্রান্ত
ও মৃতের
সংখ্যা বেড়ে
কোথায় দাঁড়াবে,
কেউ জানে
না এখনো।
যদিও করোনাভাইরাস
এখনো স্প্যানিশ
ফ্লুর মতো
প্রাণঘাতী হতে
শুরু করেনি
উন্নততর চিকিৎসা
সুবিধার কারণে।
তবু মানুষের
বুকে আশঙ্কা
জেগেই আছে।
শতবছর আগের
আতঙ্ক যেন
আবার নতুন
করে হানা
দিতে শুরু
করেছে। করোনাভাইরাসের
বিরুদ্ধে এখনো
প্রতিরক্ষা কবচ
তৈরি হয়নি।
হয়তো অন্য
কোনো জেফেরি
বা জোহান
একদিন ঠিক
আবিষ্কার করে
ফেলবেন যথাযথ
প্রতিষেধক। কিন্তু
তার আগে
কত মানুষের
প্রাণ সংহার
হবে, এখনো
বলা যাচ্ছে
না। মানবজাতি
স্প্যানিশ ফ্লুর
মতো মহামারী
আর কখনো
দেখতে চায়
না।
হারুন রশীদ: প্রাচীন সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক





