এক

একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কি বিপুল সম্পদের প্রয়োজন? প্রয়োজন হলে তা ঠিক কতটা? আজ থেকে ১৩৫ বছর আগে লেভ তলস্তয় হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্পে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছিলেন। তারপর এত বছর পরে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্গত মানুষ যেন নিজের জীবনে সেই কাহিনীটিরই নানা পর্যায়ে অবস্থান করে এবং দুঃখজনকভাবে গল্পের বিষাদময় পরিণতির দিকে ধাবিত হয়।

১৮৬১ সালে দ্বিতীয় অ্যালেক্সান্ডার রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথা বাতিল করার ২৫ বছর পরে, ১৮৮৬ সালে লেভ তলস্তয় হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্পটি রচনা করেন। ভূমিদাসবৃত্তি বন্ধ হওয়ায় তখন ২ কোটি ৩০ লাখ দাস স্বাধীন হয়। রাশিয়ার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি সে সময়ে নতুন এক মোড় প্রত্যক্ষ করছে। বহু বছরব্যাপী যারা দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল এবং যাদের নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ ছিল না, তারা তখন সম্পদ ও ভূমির মালিকানা পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু সমাজে তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল এতই কম যে জীবিকানির্বাহ তখনো ছিল এক নিরন্তর সংগ্রাম। অন্যদিকে, ভূমির মালিক, উচ্চশ্রেণীর লোকদের আইন করে মুক্ত হওয়া দাসদের কাছে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হতো। সরকার বিনিময়ে তাদের বন্ড দেয়, যার উচ্চহারের করের কারণে ধনীরা বস্তুত জমির বিপরীতে তেমন কিছুই পায় না। এ প্রক্রিয়া চলতে চলতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ক্রমেই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। সমাজের নিম্নশ্রেণীর উত্থানের মধ্যে দিয়ে পরিবর্তন এলেও সর্বত্র এক হাহাকার বিদ্যমান থাকে। ক্রমান্বয়ে পুরো সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। তলস্তয়ের কালজয়ী গল্পটি এমনই এক পটভূমিতে লিখিত কিংবা গল্পটি এ সামাজিক পরিস্থিতি থেকেই উদ্ভূত।

হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্প সম্পর্কে জেমস জয়েস তার কন্যাকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘পৃথিবীর সাহিত্য জগতে যত কাহিনীর আবির্ভাব ঘটেছে, তার মধ্যে এ গল্পই শ্রেষ্ঠ।’ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বলে, আজকে এত বছর পরে যখন পুঁজিবাদী সমাজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সর্বত্র তার জোয়ার স্পর্শ করেছে, একমাত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন সমাজের উন্নতির পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ১৩৫ বছর আগে রচিত গল্পটি অবিশ্বাস্যভাবে হয়েছে আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক।

দুই

গল্পের শুরুতে দেখা যায় ১৯ শতকের রাশিয়ায় নাম না জানা প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে গল্পের দুই চরিত্র, দুই সহোদরা আলোচনা করে—গ্রামে বাস করা ভালো নাকি শহরে। আলোচনার সূত্র ধরে মূল চরিত্র, পাহোমের মনে এক চিন্তার উদয় হয়, সে বলে যে তার যদি যথেষ্ট জমিজমা থাকত তবে খোদ শয়তানকেও সে ভয় পেত না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত শয়তান তার এ ঔদ্ধত্য প্রকাশকারী চিন্তার কথা জেনে ফেলে। যা-ই হোক, পাহোম ছিল সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর একজন, যে কিনা উদয়াস্ত নিজের সম্পদ বৃদ্ধির নেশায় ছোটে। যেভাবে যেখান থেকেই পারুক জমি কিনতে চেষ্টা করে। এভাবেই একদিন এমন একজন বিক্রেতার নাগাল পায়, যে একটি পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে বলে যে পাহোম সূর্যাস্তের আগে যতদূর অবধি ঘুরে আসতে পারবে ততটুকু জমি সে তাকে দিয়ে দেবে। পাহোম তার কোদাল হাতে রওনা দেয়। প্রখর রোদে সে পাঁচ মাইলেরও বেশি জায়গা হেঁটে আসে। তাপে আর ক্লান্তিতে আর চলতে পারে না। দূরের সমতলে পাহোমের পায়ের কাছে সূর্য ডুবে গেলেও পাহাড়ের চূড়ায় দিগন্ত রেখার দিকে তখনো সূর্য দৃশ্যমান। অসহনীয় আবহাওয়ায় তীব্র পরিশ্রমে পাহোম তখন পড়ে যায় প্রায়। কিন্তু ভাবে পাহাড়ে যেখানে জমির মালিক দাঁড়িয়ে, সেখানে যখন সূর্য ডোবেনি, তাহলে সে আরো খানিকটা ঘুরে আসতে পারে, যাতে তার জমির পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু পরিশ্রম আর তৃষ্ণায় কাতর পাহোম যখন আরো খানিকটা জমি ঘুরে মালিকের কাছে উপস্থিত হয়, তখন জমি দাবি করার বদলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তখন তারই কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে তাকে সেখানে কবর দিয়ে দেয়া হয়। গল্পের নামের মধ্যে নিহিত প্রশ্নের উত্তর মেলে তখন— প্রকৃতপক্ষে মানুষের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুঁতে রাখার জন্য যেটুকু জমির দরকার, শুধু সেটুকুই তার প্রয়োজন।

এ গল্পের ব্যবচ্ছেদ ঘটালে কিছু বিশেষ বিষয় সামনে আসে, যে ধারণা বা বাস্তবতার ওপরে গল্পটি দাঁড়িয়ে আছে।

প্রথমত, আর্থসামাজিক উন্নয়নজনিত অকার্যকর পরিস্থিতি। দরিদ্র কৃষক, পাহোম যখন নিজে জমি কেনার অনুমতি পায়, তখন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তার জীবনে সামাজিক পরিবর্তন আসে। সে সমাজের উচ্চশ্রেণীর মাধ্যমে শোষিত ও ব্যবহূত হওয়ার কাল অতিক্রম করে। কিন্তু সম্পদ সংগ্রহের জন্য তাকে আগের মতোই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। তার প্রচুর দেনা হয়, শতশত মাইল সে হেঁটে পাড়ি দেয়, পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা ঘটে, সে তার আদর্শ ও নীতি থেকে বিচ্যুত হয় এবং সবশেষে ক্লান্তি ও অবসন্নতায় ভুগে মৃত্যুবরণ করে। পাহোম যখন তার পরিণতিতে পৌঁছে, তখন তলস্তয় এটুকু প্রমাণ করতে সমর্থ হন যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল অযথা প্রচেষ্টাই নয়, বরং অনেকটাই তুচ্ছ, অপ্রয়োজনীয় বিষয়।

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাহীনতা। দাস ও স্বাধীন ভূমি-মালিক— দুই হিসাবেই পাহোম ক্ষমতার অভাব বোধ করে। দাসপ্রথার বিচিত্র পরাধীনতা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে পাহোম স্বাধীন হতে চায়। কিন্তু পরে স্বাধীনভাবে একাধিক জমির মালিক হলেও সে আরো বেশি জমির মালিক হতে চায়। কারণ তখনো সে নিজেকে যথেষ্ট স্বাধীন ও স্বনির্ভর মনে করে না। জমির মালিকানার মাধ্যমে সে স্বাধীনতা চায় কিন্তু যখনই নতুন কোনো জমির মালিক হয়, তখনই আরো জমি কিনতে পারে না বলে নিজের ভেতরে গুমড়ে মরে। এভাবে ক্রমাগত সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সে বিষয়-আশয়ের জালে বন্দি এক মানুষ হয়ে পড়ে। কারণ সাধ্যের মধ্যে তৃপ্তির চূড়ান্ত বিন্দুতে সে কখনই পৌঁছতে পারে না। এভাবে স্বাধীনতাকামী মানুষটা কেবলই পরবর্তী লক্ষ্যের জালে বন্দি হয়। এ পর্যায়গুলোর মাধ্যমে তলস্তয় ক্রমাগত উন্নয়নকে স্বাধীন হওয়ার এক দিবাস্বপ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তৃতীয়ত, বিধাতা ও শয়তানের উপস্থিতি। গল্পটিতে তলস্তয় দেখিয়েছেন যে মানুষের জীবন ধর্মবিশ্বাসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। গল্পে সশরীরে উপস্থিত না হলেও, বিধাতা এবং শয়তান, উভয়েই গল্পের চরিত্রের মতো অবস্থান করে। শয়তান পাহোমের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ক্ষমা করতে চায় না এবং তাকে পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করে। অন্যদিকে বিধাতা যদি চান তবে পাহোম শয়তানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে বলে ধরে নেয়া হয়। বিধাতা তখন তাকে শয়তানের মোকাবেলা করার ক্ষমতা প্রদান করবেন। কিন্তু তার পরেও যদি শয়তান পাহোমের ক্ষতি করতে পারে, তবে ধরে নেয়া হবে বিধাতার ইচ্ছায় পাহোম নরকে যাবে। যেমন পরিণতিতে এসে পাহোমের উপলব্ধি হয় যে বিধাতার ইচ্ছায় তার মৃত্যু হতে যাচ্ছে। ধর্ম তথা বিধাতা ও শয়তানের প্রসঙ্গ এনে তলস্তয় প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে অতিরিক্ত উচ্চাশা ও সম্পদের আকাঙ্ক্ষা পুষে রেখে লাভ নেই। কারণ মানুষ বাইরের কিছু বিষয়ের প্রভাবে জীবনযাপন করে, যার ওপরে মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সেগুলোর প্রভাবে মানুষের সামাজিক জীবনের অর্জন চোখের পলকে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে।

চতুর্থত, শ্রেণীবৈষম্য ও উচ্চশ্রেণীর স্বার্থসিদ্ধি। যে সমাজে অর্থনৈতিকভাবে স্পষ্ট শ্রেণীবিভাগ থাকে এবং ধনী ক্রমাগত আরো ধনী হতে থাকে, সেখানে নিম্নবিত্ত মানুষ ক্রমাগত বিত্তহীন হয়। গল্পের চরিত্র, পাহোম যেহেতু নিম্নবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, সমাজের উপরের তলায় ওঠার সংগ্রাম তার চিরন্তন। অন্যদিকে, নিম্নশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত থাকার সময়ে তার উপরে উচ্চশ্রেণীর প্রতিনিধি যে উপায়ে শোষণ করে, নিজে সম্পদের মালিক হয়ে যাওয়ার পরে নিজের অধীনস্ত নিম্নশ্রেণীর প্রতিনিধিকে পাহোম তার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে। আদর্শ আর নীতির চেয়ে সম্পদ সংগ্রহের নেশা তখন তার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। এভাবেই বৈষম্য আর অমানবিকতার যে চক্র সে একদিন ধ্বংস করতে চেয়েছিল, স্বেচ্ছায় সেই চক্রে অবস্থান করে তাকে জিইয়ে রাখে।

পঞ্চমত, লোভ। এ গল্পে টলস্টয় লোভকে এমন ভয়ংকর শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যা কারো বোধশক্তি ঘায়েল করে তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষে পর্যবসিত করতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গল্পের চরিত্র, পাহোম এমন কিছু নেই যা করে না। কিন্তু লোভের কারণে তার উন্নতির শিখর কখনই ছোঁয়া হয় না। সম্পদ হাতে এলেই সে পরবর্তী সম্পদের লক্ষ্যে ছোটে, সে পথে ন্যায়-অন্যায়, পরিবার-দায়িত্ব, সবকিছুই তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। এভাবে লোভের চরম ছোবলে এক পর্যায়ে সে মৃত্যু পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

তিন

গল্প নিছক গল্প নয়। কল্পকাহিনী বস্তুত বাস্তব জীবনের ছায়া। লেখক যে সময়ে পৃথিবীতে বিচরণ করেন, সাধারণত সে সময়টা তার রচনায় প্রতিফলিত করেন। লেভ তলস্তয় তার হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্পে হয়তো তার সুনির্দিষ্ট কালকেই প্রতিফলিত করতে চেয়েছেন। তবে কৌশলী ও প্রথিতযশা সাহিত্যিকের হাতে একটি সমসাময়িক বিষয় চিরন্তন হয়ে ওঠে। কারণ যুগ থেকে যুগান্তরের মানুষের জীবনের পটপরিবর্তন তিনি নিশ্চিত কল্পনার দৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে সুস্পষ্ট অবলোকন করতে পারেন। তাই তো পরবর্তী কালের পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, ফলে মানুষের বদলে যাওয়া দিনলিপি, সম্পদ সংগ্রহের তাড়নায় আদর্শ-বিচ্যুতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত লোভের কারণে দেশ ও জাতির ক্ষতিসাধন, শ্রেণীবৈষম্য বৃদ্ধির দুর্দমনীয় প্রচেষ্টা, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষকে শোষণ, এবং সর্বোপরি ক্রমেই সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার লোভ—এ সবকিছু বহু যুগের আগের রচনায় মেলে। আজকের সমগ্র পৃথিবীর দিকে তো বটেই, খোদ বাংলাদেশের দিকে তাকালে বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে।

একদিকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফুলে-ফেঁপে উঠছে, আরেকদিকে ক্রমাগত অর্থনৈতিক সংকট লেগে আছে। দেশের মধ্যেকার চরম শ্রেণীবৈষম্য আর লোভ ও অসততার চিত্রটি কিছু হিসাবের মাধ্যমে তুলে ধরলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। সাম্প্রতিক কালের এ চিত্র লেভ তলস্তয়ের হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্পের অন্তর্গত ধারণাসহ মূল সুর প্রতিষ্ঠিত করে বলেই এ আলোচনার অবতারণা।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিনটি মূল অঙ্গীকার ছিল, যাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলা হয়—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর সমাজে অর্থনৈতিক ও মানবিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করার কথা। অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে শ্রেণীবৈষম্য প্রকটভাবে থাকার কথা নয়। সে রকম ক্ষেত্রে উচ্চশ্রেণীর মাধ্যমে সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণীকে উপর্যুপরি শোষণ ও অত্যাচারের সম্ভাবনাও কমে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন নীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক বিপজ্জনক অবস্থায় উপনীত হয়েছে, যা তলস্তয়ের কল্প-গল্পের মূল ধারণা থেকে ভিন্ন কিছু নয়।

বিশ্বের বুকে তুলনামূলকভাবে অতি ক্ষুদ্র দেশ হয়েও বাংলাদেশের সবচেয়ে বিত্তবান মানুষদের বিত্তের পরিমাণ এত বেশি বেড়েছে, যা পৃথিবীতে নজিরবিহীন। আমেরিকার ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক অতিধনী ও তাদের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ওয়েলথ-এক্স কোম্পানির সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সালের গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী বাংলাদেশের অতিধনী, যাদের সম্পদের পরিমাণ অন্তত ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১২-১৭ পর্যন্ত তাদের সংখ্যা ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী ওই সময়ে এ বৃদ্ধি পৃথিবীর অন্যসব দেশের অতিধনী বৃদ্ধির তুলনায় পৃথিবীতে প্রথম। দেশের মধ্যে অল্প কয়েকজন অতিধনী মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ার সময়ে চীন, আমেরিকা, ভারত, হংকং ইত্যাদি দেশের সম্পদ বৃদ্ধির হারকে অনায়াসে পেছনে ফেলে শীর্ষে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে যাদের সম্পদের পরিমাণ ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১০-১৯, এ ১০ বছরে তাদের সম্পদের পরিমাণ এত বেশি হারে বেড়েছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। এ পরিস্থিতির পরে তাই ২০২০ সালের মে মাসে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশ পৃথিবীতে সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল অতিধনীর দেশ, যা অতিধনীদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে চীন, আমেরিকা, ফিলিপাইন, থাইলান্ড, নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে।

কভিড লকডাউনে যখন আয়ের অভাবে মানুষের হাতে টাকা ছিল না, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী তখন খোদ বাংলাদেশে ১ কোটির বেশি টাকা জমা রাখা অ্যাকাউন্ট প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। বাংলাদেশের ৫ শতাংশ অতিধনী, ৫ শতাংশ সবচেয়ে নিম্নবিত্ত মানুষের তুলনায় ৩২ গুণ বেশি সম্পদের অধিকারী ছিল ১০ বছর আগে। আর আজ স্বাধীনতার ৫০তম বছরে তারা ২২১ গুণ বেশি সম্পদের অধিকারী হয়েছে।

যা-ই হোক, ছোটো একটা দেশে এ রকম অর্থনৈতিক বৈষম্য রাতারাতি হয়নি। যুগ যুগ ধরে এ ধনের পাহাড় একটু একটু করে গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একের পর এক দলীয় সরকারের আখের গোছানো নিয়মকানুনের কারণে এ রকমটা একটু একটু করে তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যবিত্তরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, কর, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, বিদ্যুৎ-পানি, ইত্যাদি সব প্রয়োজনীয় খাতে বৃদ্ধির কষাঘাতে, এবং শেষ পর্যন্ত করোনার লকডাউনে কর্মহীন, আয়হীন থেকে রীতিমতো নিম্নবিত্ত শ্রেণীতে নাম লেখায়। তাই সহজভাবে বলতে গেলে, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ উচ্চহারে সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি ও নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছে, যা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যেকার দূরত্ব অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে। এ রকম দূরত্ব ও অযৌক্তিক আয় বা সম্পদ বৃদ্ধি যেকোনো দেশের উন্নয়নের পথে বাধা।

চার

সমাজে দুটো শ্রেণীর মধ্যে যদি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক দূরত্ব বেশি হয় তবে সেখানে নানা বৈষম্যমূলক আচরণ, তথা উচ্চশ্রেণীর স্বার্থসিদ্ধির মতো বিষয় ঘটে। সমাজের আইন-আদালত, বিচার তখন কেবল অর্থ-সম্পদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ধনীরা এতটাই ধনী যে তাদের মধ্যে কেউ অপরাধী হলেও তাদের আস্তানা পর্যন্ত কারো হাত পৌঁছে না। অন্যদিকে, দরিদ্ররা এতটাই দরিদ্র যে এমনিতেই দুর্বল, প্রয়োজনের সময়ে মুখ ফুটে দুটো কথা বলার অধিকারও অর্জন করতে পারে না।

তবে ধনীরা আরো ধনী হতে আর দরিদ্ররা ‘নিম্নবিত্ত’ তকমা থেকে বেরোতে নানা উপায় খোঁজে। ধনীরা মূলত দখলের মহোৎসব চালায়। রাতারাতি মাঠ দখল, আগুনে পুড়িয়ে বস্তি দখল, বড় প্রকল্পের নামে বন দখল, গ্রাম দখল, কথায় কথায় জলাশয় দখল—এ যেন দখলের খেলা। এ দখল প্রক্রিয়ায় মাঠ পর্যায়ে নিম্নবিত্ত মানুষই ধনীদের হয়ে কাজ করে। কারণ সেও এ সুযোগে নিজস্ব সম্পদের মালিক হতে চায়। এ প্রক্রিয়ায় খাল-বিল ভরে ওঠে, নদীমাতৃক দেশের সব নদী একে একে হয় নিখোঁজ। এ দখল প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে মানুষ অংশগ্রহণ করে, অংশগ্রহণ করে সমাজের ক্ষমতাধর মানুষ। এভাবে ভূমিদস্যু বিশাল কারবারি বনে যায়, তার সামনে দাঁড়াতে বুক কাঁপে। কাঁপে কারণ, জাগতিক নিয়মে সম্পদের চেয়ে বড় কোনো শক্তি নেই। তাই তাদের আরো চাই, তারপর সেটুকু পেলে আরো চাই। সে যা-ই হোক, তলস্তয়ের গল্পের ক্রমাগত সম্পদ আহরণের কারণে ক্ষমতাহীনতার অনুভূতি, উন্নয়নে ধর্মের ব্যবহার, অনিয়ন্ত্রিত লোভ, দরিদ্রের উপরে ধনীর স্বার্থসিদ্ধি, সব উপাদানই আমাদের আশপাশে বিদ্যমান।

তবে শক্তিধরের কাছেও প্রাকৃতিক নিয়মে একদিন মৃত্যু আসে। এই তো গত বছর দেড়েকে করোনা কত সহজে মানুষকে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে মৃত্যু কত সাধারণ। লেভ তলস্তয়ের হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড গল্পেও মূল সুরটি তাই, মানুষ যেকোনো উপায়ে যত উপরেই উঠুক না কেন, আছড়ে তাকে পড়তেই হবে। তলস্তয় সহজ ভঙ্গিতে বলে গেছেন, মৃত্যুকে কেউ পাশ কাটাতে পারবে না, অবধারিত পরিণতির স্বাদ সবাইকে নিতে হবে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে ধনীর ধন বৃদ্ধি, দরিদ্রের ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, ধনী-দরিদ্রের ফারাক বৃদ্ধি এবং সামাজিক মূল্যবোধের ব্যাপক অবনতি একই সঙ্গে ঘটছে। ঠিক যেন তলস্তয়ের গল্পের প্রথম অংশ মঞ্চে অভিনীত হচ্ছে। তবে গল্পের শুরু থাকলে তার শেষও থাকে। তাই সব অবক্ষয় একদিন সমাপ্তিতে পৌঁছবে। বহুকাল আগে হুমায়ুন আজাদ যথার্থই বলেছিলেন, ‘উন্নয়নের অর্থ হলো ঊর্ধ্বমুখে পতন।’ অতি দ্রুত উন্নয়নশীল সমাজে মানুষের যে উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয় তা অনেকাংশে পতনের সঙ্গে তুলনীয়। আর বাংলাদেশের ধনীর উন্নয়ন তো পৃথিবীর সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে!

জেমস জয়েসের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলা যায়, হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ আ ম্যান নিড সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কল্পকাহিনী। একটি কাহিনী তখনই শ্রেষ্ঠত্বের গুরুত্ব পায়, যখন তা হয় নিরবচ্ছিন্নভাবে জীবনঘেঁষা, তাতে জীবনের চলন্ত ছায়া দেখা যায়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির খানিকটা উল্লেখ এখানে উদাহরণমাত্র। অতিধনী বৃদ্ধির হার এমন সৃষ্টিছাড়া না হলেও বহু জায়গায়ই এ গল্পের বাস্তব প্রয়োগ লক্ষ করা যাবে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর গল্প যে কেবল গল্প নয় তা সংশ্লিষ্ট সমাজের মানুষ তার ভোগান্তি ও পরিণতি দিয়ে উপলব্ধি করবে।

 

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক