ইরা মুখোতি
অনুবাদ: সামিয়া কালাম
একটা সময়ে
আগ্রার হারেম
সম্প্রসারণের বেশ
তত্পরতা দেখা
গিয়েছিল। খানুম
সুলতান নামে
সম্রাট আকবরের
এক কন্যা
জন্মগ্রহণ করেন
এবং তারপরে
১৫৭০ সালে
দ্বিতীয় রাজপুত্র
‘মুরাদ’
জন্মান। ১৫৭০
সালের নভেম্বরে,
বিকানারের রাও
কল্যাণমাল ও
তার উত্তরাধিকারী
কুঁয়ার রায়
সিংহ মোগল
শাসনকে মেনে
নেন এবং
মোগল সাম্রাজ্যের
অন্তর্ভুক্ত হন।
রাও কল্যাণমাল
তখন আকবরের
সঙ্গে বিবাহবন্ধনে
আবদ্ধ হওয়ার
জন্য এক
কন্যা ও
দুই ভাগ্নী,
রাজ কানওয়ার
এবং ভানুমতীকে
সম্প্রদান করেন।
একই সময়ে
জয়সালমিরের হার
রাজও আকবরের
শাসন মেনে
নেন। তিনি
তার এক
কন্যা, রাজকুমারী
নাথী বাইকে
আকবরের কাছে
বিয়ে দিতে
আগ্রহ দেখান।
অন্যদিকে হার
রাজার পুত্র,
কওর সুলতান
সিংহকে মোগল
দরবারে একজন
আভিজাত হিসেবে
গ্রহণ করা
হয়েছিল।
রাজপুত নববধূরা
যখন মোগল
হারেমে প্রবেশ
করলেন তখন
তাদের সাথে
প্রবেশ করে
পবিত্র অগ্নি
ও সুচারু
ভাষা, তাদের
ব্যস্ত দেব-দেবীরা
এবং চোখ
ঝলসানো পোশাকও।
আকবর এই
নারীদের ইসলাম
ধর্মে ধর্মান্তরিত
করার প্রয়োজন
অনুভব করেননি
এবং তাদের
নিজের বাড়িতে
যেমন ছিল
তেমনভাবেই তাদের
হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান
পালন করতে
দেয়া হয়েছিল।
তবুও এক
বিস্ময়করভাবে, ভোজবাজির
মতো এই
নারীরা যেন
মোগল দলিল
থেকে সম্পূর্ণ
অদৃশ্য হয়ে
যান। পবিত্রতা
ও সতীত্বের
অসম্ভব মানদণ্ডে
তাদের সমস্ত
স্বতন্ত্রতা অপসারণ
করা হয়।
এ নজরদারি
এত কঠোরভাবে
পালন করা
হয় যে
কেবল একটি
দলিলে স্পষ্টভাবে
পাওয়া যায়
যে বহু
আরাধ্য মোগল
উত্তরাধিকারী সালিমের
মা ছিলেন
হরখা বাই
কাছবাহা।
পূর্বনির্ধারিত বরের
প্রতি এই
যুবতীদের মিশ্র
অনুভূতির কোনো
বিবরণ পাওয়া
যায়নি। তাদের
গর্ভে সন্তান
জন্মগ্রহণের পর
তেমন রাজকীয়
কোনো আয়োজন
উদযাপিত হয়নি।
ঠিক যেভাবে
যুবরাজ মুরাদের
মায়ের নাম
উল্লেখ করা
হয়নি এবং
জন্মের পর
উদযাপনগুলোর বর্ণনায়
ছিল অবহেলা,
আনুষ্ঠানিক আর
সাদাসিদে ভাব।
তৈমুর বংশীয়
নারীদের জন্য
পর্দা প্রথার
কড়াকড়ি ছিল
না বলা
যায়। তারা
ঘোড়ায় চড়েছেন,
ভোজে বহু
মানুষের মধ্যে
অংশ নিয়েছেন,
স্বামী ও
পুত্রদের সঙ্গে
ভ্রমণ করেছেন।
কিন্তু এবার
পর্দা একটু
গাঢ় হয়ে
উঠল। এ
বিষয়টি আকবরের
নাতি শাহজাহানের
শাসনামলের দলিলে
উল্লেখ পাওয়া
যায়। নথিতে
এক জায়গায়
উল্লেখ করা
হয়েছে, ‘আকবরের
রাজত্বকাল থেকেই
এটা নির্দেশিত
ছিল যে
হারেমের নারীদের
সবার নাম
প্রকাশ্যে প্রকাশ
করা উচিত
নয়। তার
চেয়ে বরং
তাদের পরিচিতি
হওয়া দরকার
তাদের জন্মস্থানের
কোনো বিশেষণ
থেকে।’
আবদুল ফজলের
লেখা থেকে
স্পষ্ট বোঝা
যায়, হারেমকে
সুসংবদ্ধ করার
ইচ্ছা মোগলদের
মধ্যে তীব্র
হচ্ছিল। মহিমান্বিত
সম্রাটের নিজস্ব
ক্যারিশমা হিসেবেই
দেখা হবে
হারেমকে। সাধারণ
মানুষের দৃষ্টি
থেকে হারেমকে
মুছে ফেলা
হয়েছিল। এছাড়া
নির্দেশিত জায়গার
মধ্যে হারেমকে
অবরুদ্ধ রাখার
নেপথ্যে অন্য
একটি কারণ
ছিল। রাজপুত
নববধূরা তাদের
দেবতা, নর্তকী
ও খাবারের
সাথে আরো
কিছু নিয়ে
এসেছিল, যা
এ প্রক্রিয়াটিকে
অনিবার্য করে
তুলেছিল।
রাজস্থানের অশান্ত,
বিশৃঙ্খল পরিবেশে,
শাসক পরিবারগুলোর
গোষ্ঠী কাঠামো
আনুগত্যের ওপর
নির্ভরশীল ছিল।
একদিকে শাসকরা
ছিলেন তাদের
ঠিকানেদার ও
ছোট ছোট
জায়গিরদারের সাথে
সংযুক্ত, রক্ত
আর দায়বদ্ধতার
একটি জটিল
জাল তাদের
মধ্যে বোনা
ছিল, যা
ভাই-বেটা
বা সম্প্রদায়ের
নামে পরিচিত।
সম্পর্কের ও
শক্তির আরো
একটি ধরন
ক্রমেই বিখ্যাত
হয়ে ওঠে;
শ্বশুরবাড়ির পরিবার,
কলহের সময়ে
যাদের কাছে
যোদ্ধা ও
আনুগত্য প্রত্যাশা
করা হতো।
দুটি
দুর্বল গোষ্ঠীর
মধ্যে বিয়ে
আরো শক্তিশালী
প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে
লড়াই উপযোগী
গোষ্ঠী সৃষ্টি
করে এবং
শক্তিশালী বংশে
কন্যা বিয়ের
প্রস্তাব দিয়ে
তাদের সন্তুষ্ট
করার চেষ্টা
করতে পারে,
ফলে বন্ধন
ও ঐক্য
সুরক্ষিত হয়।
ফলস্বরূপ বহুবিবাহ
রাজস্থানের শাসনকেন্দ্রগুলোতে
বিস্তৃুুত হয়,
নারীরা প্রায়ই
লড়াইয়ের জন্য
সাহসী পুত্রসন্তান
জন্মদান করে
এবং এই
আশা করে
তাদের অন্তহীন
লড়াইয়ের সমাপ্তি
ঘটবে।
একটি
কার্যকর উদাহরণ
দেয়া যাক,
দেওগড়ের রাওয়াত
দুর্গা দাস
শক্তিশালী ঘোড়ায়
চড়া মহিলাদের
সাথে বিবাহবন্ধনে
আবদ্ধ হয়েছিলেন
এবং সেই
নারীদের গর্ভে
জন্মানো ছেলেদের
কাছে রেখেছিলেন
এমন আশায়
যে তারা
তাদের মায়েদের
মতোই নির্ভীক
হবে। বংশ
পরিচয় ও
ইতিহাসে রাজপুত
মহিলারা তাদের
নামের ধারা
ক্রম হারিয়েছেন,
তাদের স্বতন্ত্রতা
এখন নদীর
পাথরের মতো
মসৃণ, তাদের
পূর্বপুরুষদের বংশের
নামের পেছনে
লুকানো। শতাব্দীর
পর শতাব্দী
ধরে রাজপুতদের
বংশের জাল
বিকশিত হওয়ার
সাথে সাথে
এই অভিজাত
রাজপুত নারীদের
সামাজিক জীবন
নিয়ন্ত্রণ করা
হয়েছে এবং
তাদের সতীত্ব
বংশের সম্মানের
সঙ্গে গভীরভাবে
জড়িয়ে যায়।
বিধবা
পুনর্বিবাহ, যা
‘নাটা
বিবাহ’ হিসেবেও
পরিচিত, অভিজাত
নারীদের পক্ষে
যেটা প্রায়
অসম্ভব বলে
গণ্য হত।
কেননা তারা
ধরে নেয়
এটা তাদের
পবিত্রতায় অপরিবর্তনীয়
হস্তক্ষেপ এবং
নিশ্চিতভাবে সমস্ত
মহিলা সকল
প্রকার যৌন
বিভ্রান্তির প্রলোভনের
বাইরে থাকতেন।
একটি স্থান
নির্ধারিত ছিল,
জেনানা দেওড়ী
বা কাঁচাল,
যা রাজপুত
পুর্দাপ্রথা বলা
যায়।
একটি
রাজপুত পরিবারের
জেনানা সরাসরি
বাড়ির মূল
প্রবেশপথে হয়
না। পরিবর্তে
পার্দি হিসেবে
পরিচিত একটি
প্রাচীর মহিলাদের
বিশেষ আবাসস্থলকে
আড়াল করে
রাখত। এখানে
বসবাসরত মহিলাদের
এক ঝলক
জেনানার বাইরেও
কেউ দেখতে
পেত না।
ধীরে ধীরে
এই কাঠামোর
নিয়ম আরো
কঠোর হয়ে
ওঠে, অভিজাত
মহিলাদের পুরধা
একজন শাসকের
প্রতিপত্তি ও
শক্তির প্রতীক
হয়ে ওঠে।
অধিপতি যতই
উঁচুতে অধিষ্ঠিত
হন তত
বেশি জেনানার
দেয়াল ও
জানালা কমে
যেতে থাকে।
মহিলারা পাথরের
দেয়ালের পেছনে
বিলুপ্ত হতে
থাকে।
জেনানার
প্রবেশপথটি দেওড়ীদার
ও নপুংসক
দ্বারা রক্ষিত
থাকত। একমাত্র
পুরুষ যাকে
প্রবেশের অনুমতি
দেয়া হতো।
তাদের মধ্যে
শাসক ও
তত্কালীন পরিবার
ছাড়াও পুরোহিত
ও দাসী
যারা এই
মহিলাদের যৌতুকের
অংশ ছিল
তারাই এখানে
প্রবেশাধিকার পেত।
রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো
আলোচনার প্রয়োজন
হলে জেনানার
প্রবেশপথে বিশাল
পর্দা ঝুলিয়ে
দেয়া হতো
আনুষ্ঠানিকভাবে।
জেনানায়
সুনির্দিষ্ট ক্রম
অনুসারে শ্রেণী
বিভাগ করা
থাকত মর্যাদার।
যা নিয়ম
প্রয়োগ করতেও
ব্যবহূত হতো
এবং তাই
একজন শাসকের
স্ত্রীকে ঘুঘাঙ্গাট
বা মাথার
জন্য আলাদা
কাপড় ব্যবহার
করতে হতো,
তাদের শাশুড়ি
ও জেনানার
প্রবীণ মহিলার
সামনে। তাদের
বিয়ের পর
বছরের পর
বছর তাদের
সরাসরি কথা
বলতে দেয়া
হতো না।
এভাবেই রাজপুত
মহিলাদের মোগলদের
থেকে স্পষ্টত
আলাদা করে
রাখা হয়েছিল।
সুতরাং পর্দার (আড়ালের) ধারণাটি এই রূপে পরিণত হয়েছিল যে এমনকি রাজপুত শিল্পচর্চায়, কয়েক শতাব্দীতে পুরুষদের শত শত প্রতিকৃতি নির্মিত হয়েছিল, প্রকৃত মহিলাদের প্রায় কোনো চিত্রই তৈরি করা হয়নি, ইতিহাসবিদ মলি আইটেকেন এ অদৃশ্যতা নিয়ে বলেন, ‘এক ধরনের পর্দা যা অভিজাত পুরুষ ও অভিজাত মহিলাদের বিভিন্ন জনসমক্ষে দৃশ্যমান করার জন্য প্রচার করা হয়েছিল।’
রাজপুত
মোগলদের সংঘর্ষের
জগতে কে
কার কাছ
থেকে ঠিক
কী শিখেছে
তা নিশ্চিত
হওয়া শক্ত।
কারণ তারা
ক্রমবর্ধমান সংস্কৃতি
ও গন্তব্যগুলোকে
একাত্ম করে
ফেলে। মোগলরা
কি রাজপুতদের
এই বিচ্ছিন্নতার
ধারণা অবলম্বন
করেছিল বা
মোগলদের মুখোমুখি
হওয়ার সময়ে
রাজপুতরা তাদের
মহিলাদের অতিরিক্ত
স্তরের আচ্ছাদন
দিয়ে সাহায্য
করেছিল?
এটি কি
একটি সামন্তবাদী
সমাজে অভিজাত
আচরণ হিসেবে
প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা?
যা স্পষ্ট
তা হলো
এই চর্চায়
মোগল ও
রাজপুত উভয়ই
স্ত্রীর সতীত্ব
থেকে সম্মানের
ধারণাটি জটিল
হয়ে ওঠেনি,
আবুল ফজল
যখন আইন-আকবরীতে
কাজ শুরু
করেন, তিনি
মোগল সাম্রাজ্যের
ইতিহাসে প্রথমবারের
মতো ঘোষণা
করেছিলেন যে
মোগল মহিলারা
পর্দার লোক।
মহিলারা মহামান্য
পদবিগুলোর পেছনে
আরো লুকিয়ে
থাকত, যা
তাদের অবিচ্ছেদ্য,
হিন্দু, পার্সিয়ান
বা তুর্কি
করে তোলে।
হামিদা বানু
মরিয়ম মাকানী
ও হরখা
বাইকে মরিয়ম
উজ জামানিতে
রূপান্তর করা
হবে এবং
তাদের রেকর্ডে
মোটামুটি উলেখ
করা হলেও
তারা সর্বদা
‘পবিত্র’
ছিল।
রাজপুত
মহিলারা তাদের
সংস্কৃতি মোগলদের
দুনিয়ায় নিয়ে
এসেছিলেন এমন
আরো কারণ
ছিল। একাকীত্বের
মধ্যে তাদের
জীবন শারীরিকভাবে
বাঁধা ছিল,
তাই রাজপুত
মহিলারা প্রায়ই
সংবেদনশীল জীবনযাপন
করতেন এবং
বিনোদনের উৎস
হিসেবে ধর্মের
প্রতি প্রত্যাবর্তন
করতেন। সেখানে
প্রায় প্রতিদিনের
কাজ ছিল,
তাদের ধর্মীয়
আচার-অনুষ্ঠান
পালন এবং
এবং সমৃদ্ধ
পোশাক পরিধান।
সেখানে বসন্ত
পঞ্চমী, হোলি,
রাখি, দশেরা,
দিওয়ালি, ও
জন্মাষ্টমী ছিল
তাদের সারা
বছরের একঘেয়েমি
ভেঙে দেয়ার
উপায়, সেই
সাথে এবং
জীবনের পটভূমির
রঙ বদল।
রাজকীয়
পুরোহিতদের পাশাপাশি
ব্রাহ্মণীদেরও সেখানে
প্রবেশের অনুমতি
ছিল, যাতে
যথার্থ উদ্দীপনার
সাথে এ
অনুষ্ঠানগুলো পরিচালনা
করা হয়।
বদায়ুনি কটাক্ষ
করে বলেছিলেন,
‘মহিলা
অ্যাপার্টমেন্টে (হারেমে)
তিনি হোমের
উপাসনা চালিয়ে
যাচ্ছিলেন, যা
সূর্য উপাসনা
থেকে প্রাপ্ত
একটি অনুষ্ঠান।’
হাতে
রাখি পরার
আচারটিও সে
আমল থেকে
চলে আসা
একটি প্রচলন,
যা আকবর
দারা সমর্থিত
ছিল বলেই
ধারণা করা
হয়। বদায়ুনি
স্পষ্ট করে
বলেছিলেন, ‘দাড়ি
কামিয়ে ফেলার
পক্ষেও কিছু
প্রমাণ মিলেছিল।’
রাজপুত স্ত্রীরা
দাড়িসহ লোকদের
সাথে মেলামেশার
বিরুদ্ধে ছিলেন।
তারা আকবরের
মনকে প্রভাবিত
করেছিল এবং
তাদের ভালোবাসা
ও তাদের
সম্প্রদায়ের ভালোবাসা
অর্জনের জন্য,
তিনি তাদের
কাছে নিজের
গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে
চেষ্টা করেছিলেন।
পুরুষরা যদি
দাড়ি কামিয়ে
দেন, তবে
এটিকে তার
প্রতি বিশেষ
নিষ্ঠার চিহ্ন
হিসেবে দেখেছিলেন।
সুতরাং এটি
একটি সাধারণ
অনুশীলনে পরিণত
হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে
আকবর কখনো
দাড়ি রাখেননি,
কেবল একটি
ছোট গোঁফ
রেখেছিলেন এবং
তিনি তার
চুলও দীর্ঘ
করেছিলেন, তবে
সেটা হিন্দুদের
সংস্কৃতি অনুসরণ
করতে গিয়ে
নয়।
ইরা মুখোতি: আকবর: দ্য গ্রেট মুঘল গ্রন্থের লেখিকা





