আজকের দিনে এসে মাফিয়া শব্দটি সবার কাছে কমবেশি পরিচিত। প্রচলিত অর্থে অপরাধী হওয়া জরুরি নয়, জোটবদ্ধ ক্ষমতা কাঠামো কিংবা আগ্রাসী আচরণকেও ‘মাফিয়া’ বলা হয়। ডন, গডফাদার শব্দগুলো শাব্দিক অর্থের তুলনায় ব্যবহারিক ভিন্ন অর্থে অধিক পরিচিত। মাফিয়ার ক্ষেত্রেও এমন ঘটেছে। ইতালির দ্বীপ সিসিলি থেকে প্রচলিত হয়ে ‘মাফিয়া’ আজ সর্বত্র পরিচিত ও ব্যবহূত শব্দ। মাফিয়া শব্দ কিংবা ধারণাটির বিস্তারের পেছনে আছে দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। সে ইতিহাস একদিকে যেমন অপরাধের, অন্যদিকে রাজনৈতিক এবং কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক। এমনকি পুরো দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে কেউ বলেও বসতে পারেন, মাফিয়া সৃষ্টি ছিল সময়ের দাবি।

উনিশ শতকের সিসিলি

মাফিয়াদের আবির্ভাব মূলত উনিশ শতক। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে উনিশ শতকের মধ্যভাগে। ১৮৬০-৭৬ সালের ইতালির অবস্থা ছিল নৈরাজ্যময়। সিসিলি তখনো ইতালির সঙ্গে পুরোপুরি সংযুক্ত ছিল না। তবে দ্বীপটির অবস্থান ছিল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৬০ সালে সমুদ্রতীরবর্তী পালেরমো শহরটি ইতালির অঙ্গীভূত হয়। গ্যারিব্যাল্ডির নেতৃত্বে ইতালির সে ইতিহাস অনেকের জানা। কিন্তু অবস্থা এমন, কেন্দ্র থেকে অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণ করা সহজ ছিল না। নানা বিদ্রোহ, বিদ্বেষ, সহিংসতা এ অঞ্চলের সাধারণ চর্চা হয়ে ওঠে। ইতালির শাসকশ্রেণী ছিল দেশটির উত্তরাঞ্চলের মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা দক্ষিণে তাদের সমগোত্রীয়দের হাতে ক্ষমতা দেয়ার চিন্তা করে। এ সংশয়কালে ইতালির অধিবাসীরা প্রথম মাফিয়ার নাম শোনে বা বলা যায় ‘মাফিয়া’ সংগঠন সামনে আসে। একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো মাফিয়াদের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল লেবু বাগান থেকে।

লেবু বাগান উনিশ শতকের সিসিলির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা ছিল। উনিশ শতকে লেবু চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নাবিকদের স্কার্ভি থেকে বাঁচতে লেবু কতটা কার্যকর তা প্রকাশিত হতে না হতে এ ব্যবসায় অনেকে বিনিয়োগ করে। সিসিলির ক্ষেত্রে লেবু ব্যবসা লাভজনক ছিল, কারণ দ্বীপাঞ্চল থেকে লেবু সংগ্রহের জন্য জাহাজের কমতি হতো না। কেবল লেবু নয়, সাইট্রিক অ্যাসিড আছে, এমন সব ফল চাষ করা হতো। চাষের জন্য এ অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল উপযুক্ত। এ ব্যবসা ‘সাইট্রাস বিজনেস’ নামে পরিচিত। উনিশ শতকের মধ্যভাগে সিসিলির লেবু জাহাজে করে নিউইয়র্ক যেত। ১৮৫০ সাল নাগাদ বছরে প্রায় ২৫ লাখ কেস লেবু রফতানির রেকর্ড রয়েছে। ব্যবসায়ীরা তাই লেবু উৎপাদনের জন্য বিস্তৃত পরিসরে বাগান তৈরি করতেন। এ রকম একটি বাগান থেকেই মাফিয়ার কার্যক্রম প্রকাশ্য হয়।

গালাতির লেবু বাগান

গ্যাসপার গালাতি নামের এক শল্য চিকিৎসক অনেকটা জমির মালিক হয়েছিলেন। সেখানে তিনি একটি খামার তৈরি করেন, যার মধ্যে চার হেক্টরে ট্যানজেরিন কমলালেবুর বাগান ছিল। এ বাগানের পূর্ববর্তী মালিক ছিলেন গালাতির আত্মীয়, যিনি নানা হুমকি-ধমকি পেয়ে হূদরোগে মৃত্যুবরণ করেন। মূলত গ্যাসপার গালাতির খামারে গালাতিকে হুমকি ধামকি দেয়ার কাজটি তার খামারেরই এক কর্মচারী করত। বেনডেট্টো কারোলো নামের এ কর্মচারী নানাভাবে বাগানের তহবিল তছরুপ করে আখের গোছাত। স্টিম পাম্পের কয়লা চুরিও তার দুর্নীতির অন্যতম অংশ ছিল। গালাতির আগে তার আত্মীয় (ভায়রা) এখানকার নিয়মে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। এক্ষেত্রে দালালদের মাধ্যমে কমলা/লেবুর দাম ধরা এবং বিক্রির বিষয়টি নির্ধারিত হতো। অর্থাৎ এখানে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীর মধ্যে একটি তৃতীয় পক্ষ তৈরি হয়। এরা রীতিমতো প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।

গ্যাসপার গালাতি তার খামারের কাজ থেকে কারোলোকে ছাঁটাই করে নিজের পছন্দমতো লোক নিয়োগ দেন। ১৮৭৪ সালের ২ জুলাই লেবু বাগানে সেই নতুন কর্মচারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশের কাছে গিয়ে গালাতির ছেলে বেনডেট্টোর নামে অভিযোগ করলে তারা সে অভিযোগ অগ্রাহ্য করে খামারের অন্য দুই নির্দোষ কর্মচারীকে গ্রেফতার করে। গালাতি আবার নতুন একজন কর্মচারী নিয়োগ করেন। এ সময় থেকে তিনি হুমকির চিঠি পেতে শুরু করেন। সেখানে বলা হয়, একজন ‘ম্যান অব অনার’কে চাকরিচ্যুত করে একজন ‘স্পাই’কে নিয়োগ করে গালাতি ভুল করেছেন। ভুল সংশোধন করা না হলে আরো বর্বরোচিত উপায়ে নতুন কর্মচারীকে হত্যা করা হবে। অর্থাৎ সহজ কথায় বলতে হয়, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী চাইছিল তাদের দলের লোকজন থেকে কেউ না কেউ গালাতির লেবু বাগানের ওয়ার্ডেন বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী হোক। কেবল গালাতির নয়, এ অঞ্চলের যেকোনো ব্যক্তির বাগানের ক্ষেত্রেই এ নীতি গ্রহণ করা হতো। সংঘবদ্ধভাবে তারা ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে নিজেদের লোক নিয়োগ দিতে বাধ্য করত এবং সেখান থেকে নিজেদের মতো অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করাই ছিল তাদের কাজ।

‘মাফিয়া’ শব্দের উত্পত্তি

মাফিয়া বলতে বর্তমানে বহু অঞ্চলের সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বোঝায় কিন্তু আদতে মাফিয়াদের উদ্ভব দক্ষিণ ইতালিতে। তবে সিসিলির দক্ষিণে নয়, পশ্চিমে। ‘মাফিয়া’ শব্দটির উত্পত্তি পালেরমো অঞ্চল থেকে। সেখানকার ভাষায় ‘মাফিয়োসো’ বলতে ‘সুন্দর’, ‘দুঃসাহসী’, ‘আত্মবিশ্বাসী’ ইত্যাদি বোঝানো হতো। এসব গুণের অধিকারী ব্যক্তিদের সমষ্টিগতভাবে মাফিয়া বলে সম্বোধন করা হতো। বলা চলে আজকের দিনে ‘কুল’ (Cool) বলে যা বোঝানো হয়, সেকালে মাফিয়া সে ধরনের বিশেষণ হিসেবে ব্যবহূত হতো। জন ডিকির বিখ্যাত বই কোসা নস্ট্রায় লেখক উল্লেখ করেছেন ১৮৬৩ সালে সিসিলির আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত নাটকের I mafiusi di la Vicaria (আমি ভিকারিয়া কারাগারের মাফিয়োসি) মধ্য দিয়ে মাফিয়া শব্দটি ‘অপরাধী’ অর্থে সর্বপ্রথম ব্যবহার হয়।

কিন্তু এর মানে এমন নয়, কারাগারের অপরাধীদের বৃত্তান্ত ও দায়মোচন সম্পর্কিত এ নাটকের মধ্য দিয়ে মাফিয়া নামটি পরিচিত হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো যাদের মাফিয়া বলে উল্লেখ করা হয়, তারাও নিজেদের মাফিয়া বলে পরিচয় দিত না। গালাতির বাগান সম্পর্কিত আলোচনাতেই বলা হয়েছে তারা নিজেদের ‘ম্যান অব অনার’ বলে উল্লেখ করত। এখান থেকে দুটো জিনিস বোঝা যায়। প্রথমত মাফিয়ারা পালেরমোয় ব্যবহূত মাফিয়োসো শব্দটির শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করেছিল। দ্বিতীয়ত তারা নিজেদের অন্যদের তুলনায় উচ্চস্তরের মনে করত। এ প্রসঙ্গে গ্যাসপার গালাতি অবশ্য ঘৃণা ও বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, এদের মতো ঘৃণ্য অপরাধীরা নিজেদের সম্মানীয় মানুষ বলে দাবি করতে পারে না।

মাফিয়া নামটি মূলত ‘মাফিয়া’র বাইরে থেকে আসা। প্রথমত নাটকে এক ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনা দেখানো হয়েছিল। বস ও তার অধীনস্তদের নিয়ে যে কাঠামোটি দেখানো হয়, তা তত্কালীন সংঘবদ্ধ অপরাধীদের গঠনের সঙ্গে মিলে যায়। নাটকের সফলতার পর ‘মাফিয়া’ বা ‘মাফিয়োসো’ শব্দগুলো উচ্চারিত হয়। মূলত ইতালির প্রশাসন যে সময় সংঘবদ্ধ অপরাধীদের মাফিয়া বলে উল্লেখ করা শুরু করে, তখন থেকেই তারা এ নামে পরিচিত হয়। গ্যারিব্যাল্ডি পরবর্তী সময়ে সিসিলির সমাজে অপরাধ খুর স্বাভাবিক একটি প্রবণতা হয়ে উঠেছিল। দক্ষিণ ইতালির মূল ভূমিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মধ্যে সংঘবদ্ধ অপরাধ বেড়ে যায়।

উনিশ শতকের সত্তরের দশকে এ সম্পর্কে সিসিলির নতুন প্রিফেক্ট (ম্যাজিস্ট্রেট পদমর্যাদার কর্মকর্তা) মার্কিস ফিলিপ্পো অ্যান্টোনিয়ো গলেতারিয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি গোপন রিপোর্ট পাঠান। এখানে ‘মাফিয়া’ শব্দটির উল্লেখ ছিল। তিনি লেখেন, ‘কথিত মাফিয়া বা অপরাধী সংগঠনগুলো আগের তুলনায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে।’ রাজনৈতিক অবস্থার কথাও তিনি বাদ দেননি। এ বিষয়ে বলেন, ‘‘উনিশ শতকে এখানে বেশকিছু বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার কারণে ‘মাফিয়া’ তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে তাদের পেশী শক্তি ব্যবহার করার প্রস্তাব দিয়ে থাকে। ফলে সরকারের বিপক্ষে যারাই থাকে, মাফিয়া তাদের পাশে দাঁড়ায়।’’ গলেতারিয়ার এ রিপোর্ট রোমে পৌঁছলে মানুষের কাছে ‘মাফিয়া’ পরিচিত হয়ে ওঠে।

কিন্তু এ সময় ও এর পরবর্তী সময়েও শাসকদের পক্ষ থেকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বলা ভালো, আসলে নেয়া সম্ভব হয়নি। কারণ মাফিয়া গোষ্ঠীর কার্যক্রম ছিল গোছানো, ত্রাসসঞ্চারি এবং তারা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যুক্ত ছিল বা নিজেরাই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে।


মাফিয়া গোষ্ঠীর কার্যক্রম

গালাতির বাগানের ঘটনাই পর্যবেক্ষণ করা যাক। তার বাগানে নিজের দলের লোককে কাজ করানোর জন্য অপরাধী গোষ্ঠী গালাতির নিয়োগকৃত কর্মচারীকে হত্যা করিয়েছিল। মাফিয়ার কার্যক্রমের এটি ছিল একটি পদ্ধতি। তারা ভীতি সৃষ্টি করত। তাদের আগ্রহ ছিল মূলত ব্যবসা। বলা যায়, তারা ভয়কে পুঁজি করে ব্যবসা করত। কেবল গালাতির নয়, অন্যান্য বাগানেও নিজেদের প্রভাব রাখার চেষ্টা করত। এক্ষেত্রে উদিতর অঞ্চলের মাফিয়ারা নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। অ্যান্টোনি জিয়ামোনা ছিলেন এদের নেতা বা বস। এর সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গালাতি বলেছেন, লোকটি ছিল চতুর ও সতর্ক। বাগান বা ব্যবসায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করার লক্ষ্যে তারা প্রথমে হুমকি প্রদান এবং পরে খুন-খারাবি করত।

কাজের আরেকটি পদ্ধতি ছিল ব্যবসায়ীদের কাছে প্রটেকশন মানি চাওয়া। অর্থাৎ, ‘আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেব, তোমরা যদি আমাদের চাঁদা দাও।’ প্রশ্ন হলো নিরাপত্তা কাদের থেকে দেয়া হচ্ছে? মূলত অপরাধীরা নিজেরাই বাগানের বা ব্যবসার ক্ষতি করত এবং এ ক্ষতি করা হবে না বা তাদের রক্ষা করার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছে অর্থ দাবি করা হতো। দেয়া না হলে ব্যবসার ক্ষতি, গুম-খুন ছিল ডালভাত এবং অভিযোগ করেও কোনো লাভ হতো না। কেননা প্রথমত মাফিয়া এমন ভীতির রাজত্ব তৈরি করেছিল যে কেউ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সুযোগ পেত না। পুলিশ ও প্রশাসনকে তারা ঘুষের মাধ্যমে নিজেদের দলে টেনে নিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, গালাতি বারবার পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান পাননি। অন্যদিকে তিনি যখন ইনভেস্টিগেশন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাকে দেয়া হুমকি চিঠির ছয়টি তাকে পুলিশ ফেরত দেয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটি হারিয়ে গেছে বলে তারা জানায়। এমনকি দ্বিতীয় দফায় গালাতির নিয়োগ করা ওয়ার্ডেন আহত হলে গালাতি তাকে সেবা করে সুস্থ করার পর লোকটি জিয়ামোনার কাছেই আত্মসমর্পণ করে।

মাফিয়াকে ‘সংঘবদ্ধ অপরাধ’-এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ বলা হয়। দলে ঢোকার জন্য এদের রয়েছে নিজস্ব নিয়ম। এরা রীতিমতো রক্তের শপথে বাঁধা। আশ্চর্যের ব্যাপার এ ধরনের নিয়ম এখনো আছে। জিয়ামোনার দলে যোগ দিতে সদস্যদের যে আচার পালন করতে হতো, এখনো মাফিয়া সদস্য হতে সে ধরনের আচার পালন করতে হয়। মাফিয়া দলের কাঠামোয় একজন বস, একজন আন্ডার বস থাকে। ১৮৭০ সালের পুলিশ রিপোর্ট অনুসারে একজন হবু মাফিয়াসোকে এদের সামনে হাজির করা হতো এবং তাদের বাহু বা হাত কেটে সামান্য রক্ত বের করে পবিত্র ছবিতে মাখা হতো। এরপর বিশ্বাসঘাতক খতমের প্রতীক হিসেবে ছবিটি পোড়ানো হতো। সবশেষে ছাই উড়িয়ে দিয়ে কার্যক্রম শেষ হতো। উনিশ শতকের শেষ দিকে মাফিয়ার দৌরাত্ম্য, তাদের প্রতি পুলিশের আচরণ দেখে ধারণা করা হয় মাফিয়ার সঙ্গে পুলিশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। পরবর্তী সময়ে এ ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়, কেননা ইতালির শাসন কাঠামোয় মাফিয়া সরাসরি ঢুকে পড়ে।

ইতালির শাসনযন্ত্রে মাফিয়া

ইতালির শাসন কাঠামোয় মাফিয়াদের প্রভাব সরাসরি লক্ষিত না হলেও তারা যে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাবানদের পেছনে কলকাঠি নাড়ত তা নিশ্চিত। গালাতির মতো আরো অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের সঙ্গে ঘটা অপরাধ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। ১৮৬০ ও ১৮৮৬ সালের বিপ্লব এবং লেবু ব্যবসায় মাফিয়াদের ভূমিকা নিয়ে বহু সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, কিন্তু কোনো তদন্তের রিপোর্ট কখনো প্রকাশ হয়নি। দিয়েগো তাইয়ানি নামে একজন কর্মকর্তা ১৮৬৯ সালে চিফ প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তদন্তের সময় তিনি জানতে পারেন মনরিয়েল অঞ্চলে যত অপরাধ ঘটে, তা ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডারের অনুমোদনেই ঘটে। তিনি পরে পার্লামেন্টে নিজের বক্তব্যে বলেন, ‘মাফিয়া আপন শক্তিবলে বিপজ্জনক বা অজেয় না। মাফিয়া বিপজ্জনক ও অজেয় হয়ে উঠেছে, তার কারণ এটি স্থানীয় সরকারের একটি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।’

ইতালিতে সে সময় বাম ও ডান—দুই ধরনের রাজনৈতিক মতের দল কাজ করছিল। দক্ষিণপন্থী সরকারের সময় তদন্তের ফল প্রকাশ হয়নি। ১৮৭৭ সালে সরকারের পতন ঘটলে মাফিয়া সম্পর্কে যা করার ছিল তাও আর করা সম্ভব হলো না। সিসিলির অপরাধ নিয়ে বাম বা ডান কোনো দলেরই কোনো আগ্রহ আর দেখা যায়নি। কিন্তু বলা চলে, ১৮৭৭ সাল নাগাদ মাফিয়া সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্যই সরকারের হাতে এসেছিল, যদিও সরকার কোনো প্রতিকারের আগ্রহ দেখায়নি। অন্যদিকে জিয়ামোনার মতো লোকের পার্টিজান হয়ে ওঠা দেখে বোঝাই যায় শাসন ব্যবস্থায় মাফিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল।

১৮৯০-১৯০৪ সময়ে ইতালির রাজনীতিতে দুর্নীতি স্রোতের মতো প্রবেশ করে। এ সময়ের রাজনীতিবিদরা মাফিয়ার পক্ষে সরাসরিই কাজ করেছে। বিলাসবহুল জীবনের পাশাপাশি দালালি তাদের প্রিয় কাজ ছিল। এদের মধ্যে জন রাফায়েলের মতো অনেকে সরাসরি মাফিয়ার পক্ষে কথাও বলেছেন। তবে না বলে হয়তো উপায় ছিল না। মাফিয়ারা দিন দিন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এদের ব্যবসা বাড়তে থাকে। প্রটেকশন মানি বা চাঁদাবাজি দিয়ে শুরু হওয়া এদের ব্যবসা চোরাচালান ও মাদকে গিয়ে ঠেকে। এমনকি তাদের ব্যবসা ও প্রভাব আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

মুসোলিনি, ফ্যাসিবাদ ও মাফিয়া

বিশ শতকের প্রথম দশকের শেষপাদে ও দ্বিতীয় দশকে ইতালির রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। ইতালিতে এ সময় বেশকিছু শ্রমিক আন্দোলন হয়, যা গ্যারিব্যাল্ডির সময়ের পর আর কখনো দেখা যায়নি। বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে মিলানে জাতীয় ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের উত্পত্তি। পরবর্তী সময়ে ফ্যাসিস্ট স্কোয়াডগুলো উত্তর ও কেন্দ্রীয় ইতালিতে আন্দোলন এবং হরতালকারী শ্রমিক ও সমাজতন্ত্রীদের ওপর খড়্গহস্ত হয়। ফ্যাসিস্টরা এ সময় ধনী ব্যক্তিদের প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়। অন্যদিকে পুলিশরা এসব দেখেও না দেখার ভান করত। সমাজতন্ত্রীদের লাল এবং ফ্যাসিস্টদের কালো পোশাকের সঙ্গে মিল রেখে বলা হয় এ সময় লাল ও কালোর সংঘাত নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে ওঠে।

এ সময় বোলোগনার প্রিফেক্ট হিসেবে সিজার মোরি দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি লাল ও কালো উভয় বাহিনীর প্রতি খড়্গহস্ত হওয়ার কারণে ফ্যাসিস্ট পার্টি তাকে বরখাস্ত করে। পুনরায় তিনি লবিংয়ের মাধ্যমে দায়িত্বে ফেরত আসেন এবং ততদিনে মুসোলিনির পার্টি সিদ্ধান্ত নেয় ইতালিয়ান মাফিয়াকে শায়েস্তা করতে হবে।

১৯২২ সালে রাজা ইমানুয়েল মুসোলিনিকে কোয়ালিশন সরকার গঠনের অনুমতি দিলে ফ্যাসিস্ট স্কোয়াডগুলো মাফিয়ার বিরুদ্ধে লেগেছিল। মুসোলিনি জানতেন ইতালির রাজনীতিতে মাফিয়ার সরাসরি প্রভাব রয়েছে, তাই তিনি ঠিক করেন কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে চাপে ফেলাটাই হবে এখন মূল কাজ। মুসোলিনি সেভাবেই ব্যবস্থা নেন এবং সিজার মোরিকে মাফিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করার অনুমতি দেয়া হয়। সিজার মোরি তার কর্মকাণ্ডের জন্য ‘আয়রন প্রিফেক্ট’ বলে পরিচিতি পান এবং তিনি নিজেকে মৃত্যু বলে প্রচার করতেন (ইতালিয়ান ‘মোরি’ শব্দের অর্থ মৃত্যু)। তার গড়ে তোলা ‘ইন্টার প্রভিনশিয়াল অ্যান্টি মাফিয়া’ কার্যক্রমের অধীনে পুলিশ বাহিনী বিসাকুইনো, কর্লিয়নি, কন্টেসা এন্টেলিয়া নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল ঘিরে ফেলে। ডন ক্যাসিকো ফেরোকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯২৮ সালে এ প্রজেক্টের অধীনে গ্রেফতার করা ১৬৩ জনকে আদালতে তোলা হয়।

অবশ্য মোরির কার্যক্রমের পেছনে তার নিজস্ব স্বার্থ এবং জেদ কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাফিয়া নয়, এমন অনেককে মাফিয়া বলে তিনি গ্রেফতার করেছেন বা নিজের ক্যারিয়ারকে টেনে তোলার উদ্দেশ্যে মাফিয়ার ধুয়া তুলতেন। সে যা-ই হোক, ১৯৩০ সালে ফ্যাসিস্ট সরকার মোরিকে অব্যাহতি দেয় এবং বলা হয় সিজার মোরির দায়িত্ব সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, মাফিয়া সমস্যা ফ্যাসিস্ট সরকারের হাতেই সমাধান হয়েছে। কিন্তু আদতে সমাধান হয়নি। মাফিয়া বরং এ সময়ে ছড়িয়েছিল ইতালির বাইরে।


আমেরিকান মাফিয়া

আমেরকািয় মাফিয়ার উপস্থিতি উনিশ শতকজুড়ে পাওয়া যায় না। এ অঞ্চলে মাফিয়া, বিশেষত সিসিলিয়ান মাফিয়ার উপস্থিতি লক্ষ করা যায় উনিশ শতকের শেষ দশকে। সান ফ্রান্সিসকো, সেন্ট লুইস, বোস্টন ও নিউইয়র্কে এদের প্রভাব ছিল। ১৯২০-৩০-এর দশকে মুসোলিনির শাসন এবং পরবর্তী সময়ে মাফিয়ার প্রসার ঘটে। সিসিলি থেকে যাওয়া শিপমেন্টগুলো মূলত মাফিয়া দলগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে এদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল হয়নি এমন না, তবে এক কথায় সমুদ্রের এ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক ছিল সামষ্টিকভাবে ‘মাফিয়া’। মুসোলিনির সময়ে সিজার মোরির নেতৃত্বে মাফিয়ার বিরুদ্ধে কার্যক্রমের সময় বহু মাফিয়া নেতা পালিয়ে আমেরকাি গিয়েছিল। এফবিআইয়ের হিসাবে সংখ্যাটা পাঁচশর কাছাকাছি।

আমেরিকায় পৌঁছে মাফিয়ার এসব সদস্য প্রহিবিশন আইনের কারণে সম্পদশালী হয়ে ওঠে। এ সময়ে তারা আমেরিকায় চোরাচালানে নতুন করে গতি আনে। চোরাচালানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য থাকত, তবে মাদক এ সময় তাদের প্রধান পণ্য হয়ে উঠেছিল। প্রক্রিয়াজাত হেরোইন তারা এ সময়ে পাচার করা শুরু করে। একটি হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকায় পাচার করা প্রক্রিয়াজাত হেরোইনের ৭০ শতাংশ কোনো না কোনো সিসিলিয়ান মাফিয়ার মাধ্যমে আমেরিকায় আসে। এক্ষেত্রে তারা নানা ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের খেলনা, ভাস্কর্য ইত্যাদির মধ্যে ভরে এসব হেরোইন পাচার করা হতো। নিউইয়র্ক সিটিকে কেন্দ্র করে সিসিলিয়ান মাফিয়ার এ কার্যক্রম ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত পুরোদমে চলেছে।

মাফিয়ার বিশ্বায়ন ও বর্তমান

কেবল আমেরিকা নয়, মাফিয়া পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা দেশে। এফবিআইয়ের একটি রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৮ সালে কোসা নস্ট্রা, কেমোরাসহ আরো দুটি মাফিয়া সংগঠনের সরাসরি সদস্য ২৫ হাজার এবং ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ পরোক্ষভাবে এদের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে নেপলসের কেমোরার সদস্য রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। নেপলসের পাশাপাশি এরা কাসের্টায়ও কার্যক্রম পরিচালনা করে। এদের মূল ব্যবসা মাদক। অন্যদিকে এরা কনস্ট্রাকশন ফার্ম থেকে চাঁদাবাজিও করে। ২০১৮ সালের ২২ জানুয়ারি পালেরমো, কাল্টানিসেটা, কাটানিয়া প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ১৬টি মাফিয়া পরিবারের মোট ৫৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ১ ফেব্রুয়ারি আরো ৩১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। পালেরমোর মাফিয়া পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এরা সবাই অর্থ ও মাদক পাচার, অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় প্রভৃতি অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। পালেরমোর মাফিয়ার মধ্যে কোসা নস্ট্রাই সর্বাধিক পরিচিত ও জনপ্রিয় এবং এ সময়ে এসে সংগঠনটি অনলাইন জুয়া, চাঁদাবাজি প্রভৃতি করে।

ক্যালাব্রিয়ান মাফিয়ার এখনকার সদস্য প্রায় ছয় হাজার। এরা মূলত ইতালির দরিদ্রতম অংশে কার্যক্রম চালায়। সেক্রা করোনা ইউনিট নামে আরেকটি গোষ্ঠী রয়েছে, যাদের সদস্য দুই হাজারের বেশি। এসব তথ্য থেকে এটা স্পষ্ট, মাফিয়াদের কার্যক্রমের মূল সময়কাল উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে গত শতকের আশির দশক পর্যন্ত হলেও এদের কার্যক্রম এখনো বিদ্যমান। যদিও আগের তুলনায় তাদের সহিংস কার্যক্রম, টোটো রিনার মতো বিপক্ষ দলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ এখন কমে গেছে কিন্তু মাফিয়ার অস্তিত্ব বিলীন হয়নি। বরং তারা ছড়িয়ে আছে নানা কোণে। একে মাফিয়ার বিশ্বায়ন বললে ভুল হয় না। আর মাফিয়ার বিশ্বায়নের আরেকটি উদাহরণ মারিও পুজোর বই, কপোলার সিনেমা কিংবা জন ডিকির বই। মাফিয়াকে বিস্তৃতরূপে বিশ্বের দরবারে তারাই পরিচিত করিয়েছেন।

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক