ফ্যাশনের ব্ল্যাক
উইডো হিসেবে
আলোচিত হয়েছেন
প্যাট্রিজিয়া রেজানি।
বলা বাহুল্য
যে আর
দশজন নারীর
মতো ছিলেন
না তিনি।
সাবেক স্বামীকে
হত্যায় যুক্ত
থাকার অভিযোগে
গ্রেফতার করে
যখন তাকে
কারাগারে নেয়া
হচ্ছে তখনো
তিনি ফ্যাশনেবল
বেশেই যেতে
সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
চোখে দিলেন
কালো রঙের
সানগ্লাস, গায়ে
চড়ালেন ফারের
কোট। ‘আমি
তাকে বললাম,
দেখুন, যাচ্ছেন
তো কারাগারে,
সেখানে এই
ফারের কোটটা
একেবারেই বেমানান
দেখাবে’—বলেছিলেন
সে সময়ের
পুলিশ কর্মকর্তা
কারমিন গাল্লো।
‘তারপর
তিনি কোটটা
তার মায়ের
কাছে রেখে
যেতে সম্মত
হলেন এবং
আমি তাকে
আমার সবুজ
জ্যাকেটটা দিলাম।
তিনি জ্যাকেটটা
ফেরত দিয়ে
দেবেন বলে
কথা দিলেন।’
গাল্লো আর
কখনো নিজের
সেই জ্যাকেট
চোখে দেখেননি।
অবশ্য এ
নিয়ে তার
মধ্যে কোনো
ক্ষোভ ছিল
না। ১৯৯৭
সালে জানুয়ারির
কনকনে শীতের
ভোরে গাল্লো
হাজির জন
সেন্ট্রাল মিলানে
প্যাট্রিজিয়ার বিলাসবহুল
বাড়িতে। কারণ
তাকে দায়িত্ব
দেয়া হয়েছিল
প্যাট্রিজিয়াকে গ্রেফতার
করার। অভিযোগ,
তিনি তার
সাবেক স্বামী
বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন
হাউজ গুচির
প্রধান মিরজিও
গুচিকে হত্যা
করিয়েছেন। দুই
বছর আগে
৪৬ বছর
বয়সী ভিয়া
পালেস্ত্রোতে তার
অফিসের সামনে
গুলিবিদ্ধ হয়ে
নিহত হন।
পুরো ইতালিকে
স্তম্ভিত করে
দেয় এ
ঘটনা।
কারমিন গাল্লো
ছিলেন পুলিশের
অপরাধ দমন
বিভাগের একটি
ইউনিটের প্রধান।
তিনি হঠাৎ
একদিন একটি
ফোন পেলেন।
অন্য পাশে
থাকা কলার
জানালেন, তিনি
মরিজিও গুচির
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে
তথ্য দিতে
চান। ‘সেদিনের
আগ পর্যন্ত
গুচির ঘটনাটা
আমি কেবল
পত্রিকায় পড়েছি।
আমার কাজের
ক্ষেত্র ছিল
মূলত দুর্নীতি;
খুনোখুনি নিয়ে
কখনো কাজ
করিনি। সেই
অজ্ঞাত মানুষটি
আমাকে যা
বলেছিল তা
বিশ্বাস করা
কঠিন ছিল,
কিন্তু বলতেই
হবে, আমি
কৌতূহলী হয়ে
উঠেছিলাম।
সেই তথ্যদাতা নিজেকে গ্যাব্রিয়েল নামে পরিচয় দিয়েছিল। ইতালি ছেড়ে বহুদিন ধরে সে আবাস গেড়েছিল দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানে তার দিন কাটছিল কর্মহীন অবস্থায়। মাথা গোঁজার ঠাঁইও ছিল না। ইতালিতে ফিরে মিলানের প্রান্তসীমায় সস্তা এক হোটেলে উঠেছিল সে। এখানে তার পরিচয় হয় আইভানহো স্যাভিয়োনি নামে এক কুলির সঙ্গে। আইভানহো একদিন কথায় কথায় গ্যাব্রিয়েলকে জানায় যে গুচির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক আছে। গাল্লোর স্মৃতিচারণ, ‘গ্যাব্রিয়েল বলে, টাকা পেলে সে আরো তথ্য দেবে। আমি টাকার বিষয়টি মানা করি দিই। বলি, আমরা তাকে কাজ ও একটা আবাস খুঁজে দিতে পারি, যদি তার দেয়া তথ্য সত্য হয়।’
গ্যাব্রিয়েল আবার
স্যাভিয়োনির সঙ্গে
আড্ডায় বসে
এবং গুচির
হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গটি
তোলে। পুরো
আড্ডা সে
রেকর্ড করে
রাখে। স্যাভিয়োনি
জানায়, নেপলসের
এক পুরনো
বন্ধু পিনা
অরিয়েম্মা হঠাৎ
একদিন তাকে
বলে, মরিজিও
গুচিকে হত্যা
করতে পারে
এমন কারো
সন্ধান সে
দিতে পারবে
কিনা। অরিয়েম্মা
ছিল প্যাট্রিজিয়ার
ভবিষ্যৎ বক্তা।
ততদিনে মরিজিওর
সঙ্গে প্যাট্রিজিয়ার
বিবাহ বিচ্ছেদ
হয়ে গেছে
এবং মরিজিও
থাকছেন আরেক
নারীর সঙ্গে।
‘অরিয়েম্মা
স্যাভিয়োনিকে বলেছিল
যে রেজানি
তার সাবেক
স্বামীর নানা
রকম নিপীড়নে
অতিষ্ঠ হয়ে
উঠেছিলেন। মরিজিও
চাইছিলেন প্যাট্রিজিয়ার
নাম থেকে
গুচি টাইটেলটি
মুছে দিতে।
প্যাট্রিজিয়া তার
সাবেক স্বামীকে
ঘৃণা করতেন
এবং চাইতেন
তার মৃত্যু
হোক। অরিয়েম্মা
যদি মরিজিও
গুচিকে হত্যার
জন্য কোনো
কিলার খুঁজে
দিতে পারে
তাহলে প্যাট্রিজিয়া
সেজন্য যা
টাকা-পয়সা
লাগবে তা
দিতে প্রস্তুত
ছিলেন—গাল্লো
বলেন।
স্যাভিয়োনি যান
ঋণগ্রস্ত বেনেদেত্তো
সেরাওলো ও
ওরাজিও সিকালার
কাছে। শেষমেশ
এই সেরাওলো
১৯৯৫ সালের
২৭ মার্চ
মিরজিওকে তার
অফিস চত্বরে
হত্যা করেন।
সেখানে ঝাড়ু
দিতে থাকা
জিউসেপ্পে ওনোরাটো
আহত হন।
সেরাওলো যে
গাড়িতে চেপে
এ হামলা
করেন সেটা
চালাচ্ছিলেন সিকালা।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে
জড়িত এ
চারজনের কোনো
অতীত অপরাধের
রেকর্ড ছিল
না।
মরিজিওর হত্যার
ঘটনা যে
পুলিশ কর্মকর্তা
তদন্ত করছিলেন
তার ধারণা
ছিল গুচিতে
নিজের শেয়ার
আরব ব্যাংকের
কাছে বিক্রি
করে দেয়ার
কারণে কোনো
আন্তর্জাতিক চক্র
তাকে হত্যা
করেছিল। তাই
গাল্লো যখন
তার নতুন
আবিষ্কারের কথা
তাকে বললেন
তখন তিনি
তা হেসে
উড়িয়ে দেন।
কিন্তু গাল্লো
অবশ্য এতে
থেমে যাননি।
‘ঘটনাটির
বিবরণ যখন
আমি প্রথম
পড়ি, তখনই
একটি বিষয়
আমার চোখে
পড়েছিল। সেটা
হলো ঝাড়ুদারের
আহত হওয়া।
খুনিরা পেশাদার
হলে শুধু
মরিজিওর সঙ্গে
এ ঝাড়ুদারকেও
হত্যা করত,
যেন হত্যাকাণ্ডের
কোনো প্রত্যক্ষদর্শী
না থাকে—বলেন
গাল্লো।
এ পর্যায়ে
ঘটনা আরেক
রোমাঞ্চকর মোড়
নেয়। পুলিশ
যে ঘটনা
অনুমান করে
ফেলেছে তা
সেরাওলো ও
সিকালা টের
পেয়ে যায়
এবং রেজানি
তাদের নাম
বলে দিতে
পারে এমন
আশঙ্কায় তারা
তাকে হত্যার
পরিকল্পনা করে।
এ দুজনকে
জালে আটকাতে
গাল্লো এক
পুলিশ কর্মকর্তাকে
এক কলম্বিয়ান
হিটম্যান সাজিয়ে
তাদের কাছে
পাঠান। শেষমেশ
সেরাওলো খুনের
ঘটনা স্বীকার
করেন এবং
প্রকাশ করেন
যে প্যাট্রিজিয়া
রেজানি তাদের
এ কাজে
নিযুক্ত করেছিল।
রেজানিকে গ্রেফতার
করতে গিয়ে
পুলিশকে দরজা
ভেঙে ঢুকতে
হয়েছিল। কারণ
তিনি ডোরবেল
শুনতে পাননি।
তিনি পুলিশকে
দেখে একটুও
ঘাবড়াননি। তিনি
পুলিশকে বলেন,
গুচিকে মারার
বিষয়টি তিনি
অরিয়েম্মাকে বলেছিলেন
ঠাট্টা করে।
সঙ্গে বলেছিলেন,
‘কয়জন
স্ত্রী তাদের
স্বামীকে হত্যা
করতে চাইবে?’
বিচার চলাকালে
ইতালির গণমাধ্যমে
প্যাট্রিজিয়া রেগানিকে
‘ব্ল্যাক
উইডো’ খেতাব
দেয়। অন্যদের
সঙ্গে তারও
সাজা হয়।
তাকে মোট
২৯ বছরের
কারাদণ্ড দেয়া
হয়। তাকে
কারাগারে থাকতে
হয় ১৬
বছর।
প্যাট্রিজিয়া রেজানির বয়স এখন ৭২ বছর। এ বছরের শুরুর দিকে এক সাক্ষাত্কারে তিনি প্রথমবারের মতো সাবেক স্বামীকে হত্যার বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতার কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন। তিনি সে সময় যাকে-তাকে ধরে বলছিলেন যে কেউ মরিজিও গুচিকে খুন করতে পারবে কিনা। এমনকি এক স্থানীয় দোকানদারকেও। প্যাট্রিজিয়া বলেন, তিনি কারাগারে তার সময় ভালোই উপভোগ করেছেন। কারাগারে তার একটা পোষা ফেরেট ছিল। বাগানে কাজ করতেন আর কারাগারে থাকা নারীদের চুল কিংবা নখের যত্ন নিতে সাহায্য করতেন।
কারাগারে থাকার
সময় ভালো
ব্যবহারের স্বীকৃতিস্বরূপ
২০১৪ সালে
সাজা শেষ
হওয়ার আগেই
মুক্তি পান
তিনি। তার
সাজার সময়সীমা
কমানোর ক্ষেত্রে
অবশ্য একটি
শর্ত ছিল:
তাকে কোথাও
চাকরি করতে
হবে। তার
উকিল তাকে
একটি কস্টিউম
জুয়েলারি শপ
বোজার্টে খণ্ডকালীন
চাকরি জুটিয়ে
দিয়েছিলেন। বোজার্টের
মালিকদের একজন
মরিজিও মানকা
বলেন, ‘এটা
একই সঙ্গে
আশীর্বাদ ও
অভিশাপ দুটোই
ছিল। অনেকে
আমাদের নিন্দা
করছিল যে
আমরা একজন
ঘাতককে চাকরি
দিয়েছি।’ রেজানি
দুই বছর
এখানে কাজ
করেন। তিনি
তাদের জুয়েলারি
ডিজাইন নিয়ে
পরামর্শ দিতেন
এবং তাদের
ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের
দেখাশানো করতেন।
এটাই তার
জীবনে করা
প্রথম চাকরি।
এখানে ঘটেছিল
কিছু মজার
ঘটনা। প্যাট্রিজিয়া
কম্পিউটার খুলতে
কিংবা বন্ধ
করতেও জানতেন
না। পাঠাতে
পারতেন না
ই-মেইল।
এসবই বোজার্ট
কর্তৃপক্ষ তাকে
ধৈর্য ধরে
শিখিয়েছিল। তার
পোষা টিয়াও
দোকানে নানা
ঝামেলা পাকাত।
মরিজিও মানকা
বলেন, প্যাট্রিজিয়া
মাঝে মাঝে
বলতেন যে
তিনিই শেষ
সত্যিকার গুচি।
এ নামের
প্রতি তার
ছিল রীতিমতো
অবসেশন। তিনি
পুলিশের বিভিন্ন
দলিলে রেজানি
নামে স্বাক্ষর
করতে অস্বীকৃতি
জানিয়েছিলেন। তিনি
গুচি নামটিই
লিখতে চান।
পুলিশ কর্মকর্তা
গাল্লো মনে
করেন, গ্যাব্রিয়েল
তথ্য না
দিলে হয়তো
এ মামলা
কখনই সমাধান
হতো না।
কাজের প্রতিদানস্বরূপ
গাল্লো তাকে
একটি চাকরির
ব্যবস্থা করে
দেন। গাল্লোর
কথায়, ‘ধন্যবাদটা
গ্যাব্রিয়েলেরই প্রাপ্য।
সে না
থাকলে এ
রহস্য উন্মোচন
হতো না।’
সম্প্রতি প্যাট্রিজিয়া
ও মরিজিওর
জীবনকাহিনি নিয়ে
চলচ্চিত্র নির্মাণ
করেছেন পরিচালক
রিডলি স্কট।
ছবিতে প্যাট্রিজিয়ার
চরিত্রে অভিনয়
করেছেন লেডি
গাগা। ছবিটি
নির্মিত হয়েছে
২০০১ সালে
প্রকাশিত দ্য হাউজ
অব গুচি:
আ সেনসেশনাল স্টোরি অব
মার্ডার, ম্যাডনেস, গ্ল্যামার অ্যান্ড গ্রিড
অবলম্বনে।
এসএম রশিদ: লেখক





