‘You can do anything but never go      

against the family.’

 

ডন কর্লিওনির এ সংলাপ এবং এমনকি গডফাদার সিনেমার পারিবারিক আবহটি বোধ করি যেকোনো বড় ব্যবসায়ী পরিবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একজন পিতা, যিনি ব্যবসা শুরু করে সাম্রাজ্যের সূচনা করেন। অতঃপর একাধিক উত্তরাধিকারী, উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব এবং সর্বশেষে ‘সাম্রাজ্যের পতন’। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড গুচির জন্মদাতা গুচিও গুচির পরিবার তথা গুচি পরিবারের গল্পটাও এ রকম। অবশ্য কেবল এ ফ্রেমই নয় বরং নানা উত্থান-পতন, পরিকল্পনা, বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অনেকগুলো পর্যায় নিয়ে গুচি পরিবারের গল্প বৈচিত্র্যময়। নতুন নতুন নকশার পণ্য এনে ফ্যাশন দুনিয়ায় বারবার তোলপাড় করা প্রতিষ্ঠানটি প্রচুর বিতর্কও তৈরি করেছে। গুচির প্রাথমিক সময়ে পরিবার নিয়ে নানা ‘স্ক্যান্ডাল’ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ফ্যাশন হাউজটিকে নিয়েই বেশকিছু বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদ নিয়ে প্রচুর আলোচনা চলমান। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে যখন সবাই সোচ্চার, সে মুহূর্তে গুচি থেকে এমন একটি পোশাক ডিজাইন করা হয়, যা বর্ণবাদের পরিচায়ক। ২০১৯ সালে গুচি থেকে একটি ‘ব্ল্যাকফেস’ জ্যাকেট ডিজাইন করা হয়। এককালে নিগ্রোদের চরিত্রে অভিনয় করতে শ্বেতাঙ্গ অভিনেতারা এক ধরনের মেকআপ ব্যবহার করতেন, মুখে কালো রঙের সঙ্গে ঠোঁটে লাল রং দিয়ে এই ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ সাজার ব্যাপারটি কৃষ্ণাঙ্গরা কখনো পছন্দ করেনি। কিন্তু প্রায় এ ডিজাইনেই একটি জ্যাকেট আনল গুচি। সম্পূর্ণ কালো ‘টার্টলনেক’ জ্যাকেটটির ওপরের অংশ চোখ পর্যন্ত তোলা যায়। মুখের জায়গাটি ফাঁকা কিন্তু ঠোঁটের চারপাশ গাঢ় লাল। পুরনো ‘ব্ল্যাকফেস’কে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি অনেকেরই চোখে পড়ে এবং তারা প্রতিবাদ করেন।

গুচি জ্যাকেটটির খুচরা মূল্য ধরেছিল ৮৯০ ডলার। টুইটারে জ্যাকেটের ছবি প্রকাশ হতেই বিতর্ক শুরু হয় এবং তুমুল সমালোচনা হয়। বিষয়টি ভাইরাল হয়ে গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গুচির পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। গুচির পক্ষ থেকে টুইটারে লেখা হয়, ‘বালাক্ল্যাভা জাম্পারের ঘটনার কারণে গুচি গভীরভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছে। আমরা নিশ্চয়তা দিচ্ছি পণ্যটি কোথাও প্রদর্শিত কিংবা বিক্রয় করা হবে না।’ গুচির এই দ্রুত ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে অনেকে করপোরেট চতুরতা হিসেবে দেখেন, কেননা গুচি বরাবরই এ ধরনের কাজ করে। যেমন ২০১৮ ক্রুইজিনে একটি জ্যাকেটের নকশা, ডিজাইনার ড্যাপার ড্যানের ডিজাইনের সঙ্গে মিলে গেলে এ নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়। গুচি থেকে বিষয়টি সমাধান করা হলে তখন থেকে ফ্যাশন দুনিয়ায় একটি কথা প্রচলিত হয়—ক্ষমা চেয়ে সমস্যা সমাধান করার কৌশল গুচির কাছ থেকে শেখা উচিত।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পাগড়ির ডিজাইনের কারণে গুচি সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়ে। শিখদের পাগড়ির আদলে তৈরি এ ‘ক্যাপ’ পরে মডেলরা র্যাম্পে হাঁটতে না হাঁটতে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়। শিখ ধর্মাবলম্বীরা টুইটারে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ শুরু করে। তাদের মতে, এ পাগড়ি তাদের ধর্মীয় চিহ্ন এবং তা নিয়ে ব্যবসা করা অনুচিত। তাদের অনেকের মতে, গুচি এ পাগড়ি ঠিকঠাকমতো অনুকরণও করতে পারেনি। ৭৫০ ডলারের পাগড়ি সম্পর্কে রবীন্দর সিং নামে একজন টুইটারে লেখেন, ‘গুচির এ নকল পণ্যটি ৭৫০ ডলারে কেনা আপনাদের উচিত নয়।’ তিনি এমনকি এও বলেন, কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিনামূল্যে পাগড়ি বাঁধা শেখাবেন। আসলে শিখরা সাধারণত একরঙা পাগড়ি পরে, কিন্তু সেখানে গুচি নানা রঙের সঙ্গে ‘ফ্লোরাল’ এবং অন্যান্য ডিজাইন আনার কারণে শিখরা এর বিরোধিতা করে। পাশাপাশি তারা মনে করেন গুচি ভুলভাবে একটি ধর্মীয় চিহ্নকে ব্যবসায়িক লাভের জন্য ব্যবহার করছে। বিভিন্ন যুক্তির মধ্যে আরো বলা হয়, ‘শিখ পাগড়ি সমতার চিহ্ন। শিখদের মধ্যে সবাই তা পরিধান করতে পারে। কিন্তু গুচির মতো উচ্চমূল্যে বিক্রির মাধ্যমে একে উঁচুতলার মানুষের ফ্যাশনের অনুষঙ্গে পরিণত করা হবে কেবল।’

বিতর্ক নিয়ে গুচির পথচলার ইতিহাস বহু পুরনো। সাম্প্রতিক সময়ে ব্র্যান্ডের এ বিতর্কের মতো গুচি পরিবারের নানা ঘটনাও বহুবার সংবেদন সৃষ্টি করেছে। বিলাসিতা, জনপ্রিয়তা, জ্ঞাতি সংকট, মামলা-মোকদ্দমা থেকে খুনোখুনি পর্যন্ত পরিবারটি বিতর্কিতও হয়েছে বহুবার। সাধারণ একটি বিতর্ক দিয়েই শুরু করা যাক। একটা লম্বা সময় পর্যন্ত ক্রেতারা মনে করত ইতালির বিখ্যাত মেডিচি বংশের সঙ্গে গুচি পরিবারের রক্ত সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা গুচিও গুচি নিজের পূর্বপুরুষ হিসেবে মেডিচি পরিবারের উল্লেখ করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। তবে এ কানাঘুষার কারণে গুচি আলাদা একটি সম্মান লাভ করত। কিন্তু আদপে মেডিচির সঙ্গে গুচি পরিবারের কোনো সংযোগ নেই। অন্যদিকে, গুচিও গুচির প্রতিষ্ঠান তৈরি ও ‘সাফল্যের গল্প’টি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গুচিও গুচির বাবার ব্যবসাটি ব্যর্থ হলে ১৭ বছর বয়সে তিনি সেভয় হোটেলে পোর্টারের কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু ‘হাউজ অব গুচি’র লেখক সারা গে এ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন, কেননা হোটেলের কর্মী তালিকায় তার নাম নেই। গুচিওর মেয়ে গ্রিমেলডা অবশ্য বলছেন, ‘গুচিরা ফ্লোরেন্সের একদা-অভিজাত সান মিনিয়াতো থেকে এসেছেন।’


পরিবারের অতীত বা উৎস সম্পর্কিত তথ্যাদি হয়তো ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু পরিবারের মধ্যকার অন্যান্য কিছু বিষয় কৌতূহলোদ্দীপক। যেমন এ পরিবারের বিস্তৃত ব্যবসায় নারীদের যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা হতো না। অর্থাৎ সহজ কথায় বলা চলে গুচি পরিবার নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল না। এখানেই শেষ নয়, গুচি পরিবারের কন্যারা গুচির ব্যবসায়িক সম্পদের অধিকারী হতেন না। টেরি ম্যাকনাইট তার Gucci, a House Divided বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে এ পরিবারে সম্পদ সমভাবে বণ্টিত হতো না। কোম্পানির মালিকানায় সবার অধিকার ছিল না। গুচিও গুচির সময় থেকেই সব ধরনের দায়িত্ব পুরুষপ্রধান এবং পরিবারের নারী ও শিশুরা তার অধীনস্থ হবে বলে নিয়ম জারি করা হয়। গুচিওর মৃত্যুর পর আলডো, রোডলফো ও ভাস্কো গুচির মধ্যে কোম্পানির শেয়ার সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। পিতার সম্পত্তি থেকে গ্রিমেলডা কিছুই লাভ করেননি। গুচিওর মৃত্যুর পরও তার পুত্ররা পিতার নীতিতেই অটল ছিলেন। এ সময় থেকেই একটি পারিবারিক দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। ভাইদের বিরুদ্ধে গ্রিমেলডা আদালতের দ্বারস্থ হন।

গুচি পরিবারে নিজেদের মধ্যে অসংখ্য মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। গ্রিমেলডার করা মামলাটি এর মধ্যে একটি। সম্পত্তির অধিকার দাবি করে ভাইদের বিরুদ্ধে তিনি মামলাটি করেন, কিন্তু তত্কালীন ইতালির আদালত তাকে কানাকড়িও দেননি। গ্রিমেলডার এ দাবি সে সময় ইতালিতে আলোচনার বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। অধিকার আদায়ের দাবি ও মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাবা হঠাৎই মারা গেলেন এবং আমি বুঝলাম বাবা অনেক সম্পদ রেখে গেলেও সেখানে আমার কোনো অধিকার নেই।’ পররবর্তী সময়ে অবশ্য আশির দশকে মরিজিও গুচির হাতে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এলে তিনি ফুফুকে (গ্রিমেলডা) ‘ডিজাইনার’ হিসেবে বার্ষিক ৫ মিলিয়ন লিরা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। নারীদের অধিকার না দেয়ার পাশাপাশি গুচিদের নারীঘটিত বদনামও রয়েছে। টেরি ম্যাকনাইটের মতে, গুচিও গুচি থেকেই এ স্বভাব গুচি পরিবারের পুরুষদের মধ্যে চলে আসছে। নারীঘটিত বিষয়ে পরে যাওয়া যাবে, প্রথমে কিছু আইনি এবং অর্থনৈতিক বিতর্ক দেখা যাক।

গুচিও গুচির মৃত্যু হলে তিন পুত্রের মধ্যে সম্পদ ভাগাভাগি হলো। ভাইরা ব্যবসা ভালোই টানছিলেন। ষাটের দশকে গুচি তার জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যবসাও বৃদ্ধি করে। এক্ষেত্রে আলডো গুচির যথেষ্ট অবদান ছিল। গুচিওর জীবদ্দশায়ই পারিবারিক ব্যবসায় মনোযোগী হয়েছিলেন আলডো। গুচিকে এগিয়ে নেয়ার অনেকটা অবদান তার। তিনি পশ্চিম থেকে পূর্বে গুচিকে নিয়ে গেছেন। ১৯৭২ সালে টোকিও এবং ১৯৭৪ সালে গুচির ফ্র্যাঞ্চাইজ তৈরি হয়। কিন্তু ওই দশকেই তৃতীয় প্রজন্মের একজন গুচি, পরিবারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন।

আলডোর পুত্র পাওলোর ধারণা হয় ১৯৭৪ সালে ভাস্কো গুচির মৃত্যুর পর চাচা রোডলফো ব্যবসা থেকে অধিক মুনাফা লাভ করছেন। এ সময় আলডো একটি পারফিউম ব্যবসা শুরু করেন এবং ৮০ শতাংশ শেয়ার নিজের এবং ছেলেদের মধ্যেই রেখেছিলেন। আলডোর এ সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ী মহলে বিতর্ক শুরু করে। কিন্তু পাওলো আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। গুচির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় সে বিদ্রোহ করে এবং নিজের একটি গুচি-প্রতিষ্ঠান শুরু করে। আলডো এ সময় ছেলের বিরুদ্ধে একটি মামলা করার পাশাপাশি পণ্যের কাঁচামাল সরবরাহকারীদের বলেন যেন পাওলোর সঙ্গে তারা কোনোরূপ ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষা না করে। গুচি ততদিনে জনপ্রিয় ফ্যাশন আইকন হওয়ার কারণে বাপ-ব্যাটার এ লড়াই পত্রিকার পাতার জন্য মুখরোচক খবর হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যবসায়ী মহলেও তুমুল আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু সে মুহূর্তে গুচির পরিবারের পাওলো খানিকটা মারিও পুজোর ফ্রেডোয় পরিণত হলো। ফ্রেডো তার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছিল আর পাওলো তার বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে বসল— এক নয়, একাধিক।

পাওলো তার পিতা আলডো, চাচা রোডলফো, ভাই জর্জিয়ো ও রবার্তো এবং চাচাতো ভাই মরিজিওর বিরুদ্ধে ১৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারের মামলা করেন। সঙ্গে তিনি তদন্তকারীদের এও জানান যে তার বাবা আলডো ক্রমাগত কর ফাঁকি দিয়ে চলছেন। চার বছর ধরে চলমান তদন্তে প্রমাণিত হয় যে আলডো নানা প্রক্রিয়ায় বিদেশী নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ১১ মিলিয়ন ডলার পাচার করার পাশাপাশি ৭ মিলিয়ন ডলার কর ফাঁকি দিয়েছেন। পারিবারিক কলঙ্ক যা ছিল তা ‘বড় বড় পরিবারে এমন হয়েই থাকে’ চিন্তা থেকে অনেকে ‘গসিপ আইটেম’ হিসেবে নিলেও এ পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই গুচি কলঙ্কের ভাগী হয়। আলডোকে জেলে যেতে হয়, যদিও বিশেষ জেলে তিনি আরামে ছিলেন বলেই জানা যায়।

নিশ্চিতভাবে বলা যায়, গুচি পরিবার সম্পর্কিত সবচেয়ে পরিচিত এবং বড় বিতর্কটি মরিজিও গুচির হত্যা। প্রাক্তন স্ত্রী প্যাট্রিজিয়ার ভাড়াটে গানম্যানের হাতে মৃত্যু হয় তার। বিতর্কটি এড়িয়ে একটি পুরনো বিতর্ক তোলা যাক। ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে গুচি পরিবারের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। গুচিও গুচির সঙ্গে বিবাহের পূর্বে স্ত্রী আইডা গুচির একটি সন্তান ছিল। উগো নামের পুত্রটিকে গুচিও নিজের সন্তান হিসেবে লালনপালন করেন। গুচির ব্যবসার সঙ্গে আলডোর মতো যুক্ত না থাকলেও উগোও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিরিশের দশকে জার্মানিতে হিটলারের রবরবার সময় মুসোলিনিও ইতালিতে ফ্যাসিবাদের চর্চা শুরু করেন। মুসোলিনির সরকারের সঙ্গে উগোর সরাসরি সংযোগ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই তিনি মুসোলিনির দলে যোগ দেন এবং মুসোলিনি ক্ষমতা দখল করলে উগো রিজিওনাল ওভারসিয়ারের পদ লাভ করেন। পরিবারের সঙ্গে ফ্যাসিস্টদের আর কোনো যোগযোগ ছিল কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন থাকে। যেমন চল্লিশের দশকে ফ্যাসিবাদের কারণে বিভিন্ন দেশ ইতালিতে নানা ধরনের কাঁচামাল পাঠানো বন্ধ করলেও গুচির ব্যবসা চলমান ছিল। অবশ্য চামড়া আমদনি বন্ধ হওয়ার পর গুচি বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে রেশমের নানা পণ্য তৈরি শুরু করে। কিন্তু সেখানেও ফ্যাসিবাদী সরকারের অর্থায়ন ছিল বলে অনেকে মনে করে। কিন্তু এখানে আরেকটি তথ্য উল্লেখ্য—ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গুচিও কোনো সম্পর্ক রাখতে চাননি। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে উগোকে প্রচুর অর্থ প্রদানের বিনিময়ে গুচি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা থেকে ছাড়িয়ে দেয়া হয়।

মরিজিও গুচি, তার স্ত্রী প্যাট্রিজিয়া থেকে শুরু করে রোডলফো গুচির অভিনয় জীবন এবং আলডোর সঙ্গে মার্কিন বন্ধুত্ব নিয়েও কিছু বিতর্ক আছে। তবে কোনো কিছুই স্পষ্ট না। কিন্তু মরিজিও যখন কোম্পানির হর্তাকর্তা হয়ে বসেন, তার অর্থের উৎস সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ হয়। কালোবাজার, চোরাচালান ইত্যাদি উৎস থেকে অর্থায়ন হতো বলে অভিযোগ আছে। অসম্ভব নয়, কেননা যে আলডো গুচি নিজে পরিশ্রম করেছেন, পরবর্তী সময়ে গুচির পণ্য নকল করে আলাদাভাবে তিনি বিক্রি করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয় প্রজন্মে গিয়ে পরিবার, প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তিগত লাভালাভ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখানে কালো টাকার আগমন একটি স্বাভাবিক বিষয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে প্যাট্রিজিয়ার প্রতিশোধস্পৃহা। সম্পর্কচ্ছেদের পরও মরিজিওকে হত্যা করে ক্ষান্ত হন তিনি।

অসলে বড় ব্যবসা তৈরি হওয়ার পর পরিবারের মধ্যে সংঘর্ষ হবেই। ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। গুচি পরিবারও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। তবে ফ্যাশন হাউজ গুচি, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুচি নিয়ে বিতর্ক তুলনামূলক কম। তবে গুচি পরিবারের সৃষ্ট এসব বিতর্কের প্রভাব পড়েছিল প্রতিষ্ঠানে। মরিজিও মারা গেলেন, আলডো দেউলিয়া হয়ে পিতার এমনকি নিজের স্বপ্নের গুচিকে বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলেন। বাস্তবিক, ফ্যাশন আইকন গুচির সঙ্গে গুচি পরিবারের কোনো সংযোগ রইল না। তবু বহু ঘাত-প্রতিঘাতের পর গুচি পরিবারের বিতর্কগুলো আড়াল করে প্রতিষ্ঠান হিসেবে গুচি আজও স্বনামে টিকে আছে।

 

আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক