২০১৮ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হয় কান চলচ্চিত্র উৎসব। সেখানে পেনিলোপি ক্রুজ, জেসিকা চ্যাসটেইন ও লুপিটা নিয়ংওর সঙ্গে ছিলেন চীনের শীর্ষ অভিনেত্রী ফ্যান বিংবিং। তখন ফ্যানের সামনে ‘দ্য থ্রি ফিফটি ফাইভ’ সিনেমা, যার গল্প তৈরি হয়েছিল কয়েকজন নারী স্পাইকে কেন্দ্র করে। ক্যারিয়ারে স্বর্ণ সময় পার করছেন। অথচ কানে হাজির হওয়ার পরই শুরু হয় নিম্নগতি। প্রথমেই তার বিরুদ্ধে এল কর জালিয়াতির অভিযোগ। নিষিদ্ধ করা হলো চীনের চলচ্চিত্র শিল্প থেকে। সরকার তাকে রীতিমতো গৃহবন্দি করে রাখল। চলচ্চিত্রবোদ্ধারা মনে করেন, এ অভিনেত্রীর ক্যারিয়ার বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে বড় কারণ ছিল কানে হাজির থাকা পর্যন্ত কার্যক্রম। সেখানে তার হাজিরা ছিল হলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীর মতো। অথচ দেশে চলছে চীনা চলচ্চিত্রের সম্প্রসারণের স্লোগান। ২০১৭ সালে রাজনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে হলিউডের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরকার চায় চলচ্চিত্রকে চীনের মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার। সেক্ষেত্রে ফ্যানের বিরুদ্ধে নেয়া সিদ্ধান্ত চীনের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে একটা জুতসই উদাহরণে পরিণত হলো।
চলচ্চিত্র গল্প বলার একটা মাধ্যম। আর প্রতিটি গল্পেরই পৃথক বয়ান থাকে। চীন তার সাংস্কৃতিক উত্থানের অংশ হিসেবেই তার চলচ্চিত্রকে বেছে নিয়েছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ জ্যাকি চ্যান। হংকংয়ের জ্যাকি চ্যানের কথা জানেন না, এমন চলচ্চিত্রপ্রেমী বিরল। ১৯৫৪ সালে জন্ম নেয়া চ্যান বেড়ে উঠেছিলেন হলিউডের কাউবয়কে আদর্শ মেনে। অনেক দিক দিয়েই তিনি অন্যান্য চীনা নায়কের চেয়ে ব্যতিক্রম। চ্যান ১৯৮১ সালে হলিউডের ‘ক্যাননবল রান’ সিনেমায় অভিনয় করেন। কিন্তু হংকংয়ে তার ছবি দেখানো হলে তিনি হন মানুষের ঘৃণা ও মশকরার পাত্র। কারণ তিনি সেখানে জাপানিজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে এক দশকের মধ্যেই রাশ আওয়ারের মতো ব্লকবাস্টার উপহার দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি পান। তখনো তিনি হংকংয়েই কাজ করেছেন। সে সময়টায় বাড়ছে চীনের চলচ্চিত্র দুনিয়া। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে হংকংয়ের পরিচালকরা ক্রমে মূল ভূখণ্ডের সংস্কৃতির সঙ্গে অভিযোজন করে নেয়ার দিকে ঝোঁকে। ফলে হংকংয়ের চলচ্চিত্রের সংখ্যাও দ্রুতগতিতে কমে এসেছে। চীনের ব্লকবাস্টার ‘দ্য মারমেইড’ ও ‘কুংফু ইয়োগা’র মতো সিনেমার পরিচালক মূলত হংকংয়ের। চীন থেকে সে সময় বেশকিছু প্রোপাগান্ডা ফিল্মও বের হয়। কুংফু ইয়োগাতেই জ্যাকি চ্যানকে আর্কিওলজিস্ট হিসেবে দেখা যায়। তার চেয়ে বড় কথা, সেখানে দেখা যায় চীনের মহাপরিকল্পনা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের কথা।
চীন ও চলচ্চিত্রের সম্পর্ক কেবল এতটুকুতেই স্থির ছিল না। গত শতকে যেভাবে আমেরিকা সফট পাওয়ারকে ব্যবহার করেছে, চীনও সেটাকেই নিয়ে নিয়েছে। ২০১৯ সালে চীন ও রাশিয়ার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘মিস্ট্রি অব দ্য ড্রাগন সিল: জার্নি টু চায়না’। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন জ্যাকি চ্যান ও আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। পরিচালক ওলেগ স্টেপশেংকো এমন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন এক সাক্ষাৎকারে। চলচ্চিত্র কেবল চলচ্চিত্র নয়, তা রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রকাশেরও একটা মাধ্যম। সিনেমাটি নির্মাণের সময়েই চীন ও রাশিয়া তাদের সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় জোরদার রয়েছে বলে দাবি করেন। দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সামরিক কৌশল বিনিময়ের সম্পর্ক আরো গভীর হয়। প্রচারণার সময়েই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে জন্মদিনের উপহার পাঠিয়েছেন। যদিও সিনেমা হিসেবে দ্য মিস্ট্রি অব দ্য ড্রাগন সিল বিস্তর সমালোচনা তৈরি করে ভারতে। বলা হয় সিনেমায় সত্যিকার প্রত্নতাত্ত্বিক বয়ানের বাইরে আরোপিত বিষয়ই প্রাধান্য পেয়েছে।
রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক দেখানোর জন্য কেবল চলচ্চিত্র না, অ্যানিমেশন সিরিজকে বেছে নেয়া হয়েছে। শিশুদের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্যই যেন তৈরি হয়েছে পান্ডা অ্যান্ড ক্র্যাশ অ্যানিমেটেড সিরিজ। সিরিজের চীনা চরিত্র পান্ডার ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাশিয়ার ক্র্যাশ। তারা দুজনে দুই দেশের সংস্কৃতি ও সম্পর্ককে তুলে ধরে নানাভাবে। শি জিনপিংয়ের চেক সফরের সময় ক্র্যাশের জায়গায় চেক চরিত্র লিটল মোলকে বসিয়েও পর্ব তৈরি করা হয়েছে। তার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের কথা। পাকিস্তানের জন্য চীনের সাংস্কৃতিক প্রবাহ তুলনামূলক নতুন। বাণিজ্যিক সিনেমা পারওয়াজ হ্যায় জুনুনের গল্প আবর্তিত হয়েছে পাকিস্তানি বিমান বাহিনীকে কেন্দ্র করে, ঠাঁই পেয়েছে চীন প্রসঙ্গ। সিনেমাটি চীনেও দেখানো হয়। এদিকে মিসরীয় কোম্পানি ভাইব্রেশন স্টুডিও চীনা নাটক ডাব করে আরবিতে প্রচার করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। ইতালিতে চাইনিজ টিভি সিরিজ চ্যাংঅ্যান প্রচারিত হয়। ইউরোপীয় বড় অর্থনীতির একমাত্র দেশ হিসেবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ ইতালি। এদিকে বলকান অঞ্চলে হুয়াহুয়া মিডিয়া দুটি চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছে পুনরায় নির্মাণ করার জন্য। তার মধ্যে একটি হলো দ্য ব্রিজ ও অন্যটি ওয়াল্টার ডিফেন্ডস সারায়েভো। দ্বিতীয় সিনেমাটিতে কমিউনিস্ট চীনের এক যোদ্ধা নাৎসি বাহিনীর মোকাবেলা করেন। ওয়াল্টার ডিভেন্ডস সারায়েভোর অরিজিনাল সিনেমাটি ছিল চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মধ্যেও অনুমতি পাওয়া বিদেশী সিনেমা। হুয়াহুয়ার প্রধান নির্বাহী ওয়াং কেফেই এর পুনর্নির্মাণ করতে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সাংস্কৃতিক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে। ইউক্রেন ও চীনের যৌথ গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা, যেখানে চীনা চিত্রকর প্রেমে পড়েন ইউক্রেনীয় এক নৃত্যশিল্পীর। অন্যদিকে চেক রিপাবলিকের সঙ্গেও যৌথভাবে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র। সেখানে দেখা যায় চীনা নায়ক চেক যান নিজের প্রেমিকাকে খুঁজে পেতে। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন জ্যাকি চ্যান। চীন তার চলচ্চিত্র শিল্প যে বাড়াতে চাচ্ছে, তার এমন দলিল বেশুমার।
২০১৪ সালে জ্যাকি চ্যানের ছেলে জেসি চ্যান গ্রেফতার হন বেইজিংয়ে। জেসি উদীয়মান অভিনেতা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল নিষিদ্ধ মাদক মারিজুয়ানা বহনের। ছয় মাসের সাজা হলেও মাত্র এক মাস পরেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয় জেল থেকে। বিপরীতে তারই বন্ধু কাই কোর পরিণাম হয় ভয়াবহ। কাই কো তখন সবে ‘মনস্টার হান্ট’-এর শুটিং শেষ করেছেন। ক্যারিয়ারের সে ঊর্ধ্বগতি হঠাৎ যেন ফিকে হয়ে গেল। ফ্যানের পরে তিনি হলেন নতুন উদাহরণ। এভাবে হলিউডে মিশে যাওয়ার চেয়ে চীনা আদর্শকেই বিক্রি করতে তৎপর চীন। তৎপর তার সংস্কৃতির বিশ্বায়ন ঘটাতে। তার সমকালীন উদারহণ ট্রান্সফরমার: এজ অব এক্সটিংকশন। সিনেমাটির সহকারী পরিচালক ছিলেন সোফিয়া শেক। তিনি হংকংয়ের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। ট্রান্সফরমার মুক্তি দেয়ার আগে যে চীনের নিরাপত্তা ইস্যুতে সিনেমার স্ক্রিপ্টে পুনর্লিখন করা হয়েছে, সেটা তিনি প্রথমে জানতেই পারেননি। কেবল ওই জায়গাটিতে কাজ করার সময় বিষয়টা চোখে পড়ে। সিনেমার শেষে দেখা যায় হংকংয়ে সংকটের কোনো সুরাহা করতে না পেরে কেন্দ্র সরকারকে জানানোর কথা প্রস্তাব করে কর্তৃপক্ষের একজন। কেন্দ্রীয় সরকার বলতে বেইজিং। সে সময় বেইজিং থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘যেকোনো মূল্যে কেন্দ্রীয় সরকার হংকংকে সুরক্ষা দেবে।’ এভাবে ট্রান্সফরমারের মাধ্যমে হংকং যেন পুরোপুরি চীনের অংশ হিসেবেই হাজির হলো।
হংকং সম্পর্কে তেমনটাই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা তিব্বত নিয়ে হয়েছে। হংকংয়ের চলচ্চিত্রেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে চীনের প্রভাব। চীন তার চলচ্চিত্রকে কেবল ফ্যান্টাসি ঘরানায়ই সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। সফট পাওয়ার হিসেবে বিক্রি করেছে তার আদর্শ, আমেরিকা যা বহু আগে থেকেই করে আসছে।
মুহম্মদ আল মুখতাফি: লেখক





