আমেরিকার
গানের উৎসখনি
আমেরিকার কিংবদন্তি আফ্রো-আমেরিকান গায়ক পল রবসন তার আত্মজীবনী ‘হিয়ার আই স্ট্যান্ড’-এ লিখেছিলেন, ‘আমেরিকায়
অনেকেই আছেন যারা নিগ্রো সংগীতের শুধু সমাদরই করেননি, তা আত্মসাৎও করেছেন—অথচ এই সংগীতের স্রষ্টাদের প্রতি চূড়ান্ত অবজ্ঞা দেখাতে ছাড়েননি।’ রবসনের এই খেদমাখা উক্তি যেমন আফ্রো-আমেরিকান গায়কদের হাহাকারকে ফুটিয়ে তোলে, তেমনি তা আমেরিকান সংগীতজগতের মূলধারার দিকেও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সংগীত-সংস্কৃতির খোঁজে কার্যত দিশা খুঁজে না পাওয়া দেশ আমেরিকাকে পথ দেখিয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের আফ্রিকী সংগীতের অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট সংগীতের ঐতিহ্য। কিন্তু
তথাকথিত ‘সুসভ্য’ সংখ্যাগুরু শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান সাংগীতিক ঐতিহ্য থেকে কোনো রকমের ঋণস্বীকার ছাড়াই বহু সুর বা ছন্দ গ্রহণ করলেও তাদের অবহেলা কি তাচ্ছিল্য করতে ছাড়েনি। কিন্তু এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা সম্ভব নয় যে আজকের মার্কিন সংগীতজগতের প্রায় পুরো পাটাতনটাই গড়ে দিয়েছে আফ্রো-আমেরিকান সংগীত-ঐতিহ্য।
ওয়ার্ক
সং: বিদ্রোহ
থেকে আধ্যাত্মিকতায়
আফ্রো-আমেরিকান সংগীতের আদিতম নিদর্শন কোনটি? নিঃসন্দেহে তা হলো কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবী ও দাসদের কণ্ঠে উঠে আসা ‘ওয়ার্ক সং’ বা শ্রমগীতি। সতেরো শতকে প্রথম বিস্তার পাওয়া শ্রমগীতির এই ধারা প্রভাবিত করেছিল আমেরিকার মূলধারার লোকসংগীতকেও। মাঠে ফসল কাটতে কাটতে বা কামারশালায় লোহা পেটাতে গিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকেরা কণ্ঠে তুলে নিতেন গান। সেই গানগুলোর বেশির ভাগই রচিত হতো সংলাপের ভঙ্গিতে। শ্রমিকদের দলনেতা কখনো সওয়াল-জবাবধর্মী গানের প্রশ্নের অংশটুকু গাইতেন, বাকিরা উত্তর জানিয়ে কোরাস গাইত। শ্রমগীতি যেমন খেটে খাওয়া কালো মানুষের হাড়ভাঙা শ্রমের ছন্দোবদ্ধ প্রকাশকে চিহ্নিত করে, তেমনি তা ক্রমে ক্রমে হয়ে ওঠে কৃষ্ণাঙ্গদের বিদ্রোহ ও ক্ষোভ প্রকাশের প্রধান মাধ্যমও। এমনকি একটা সময়ে এসে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগুরুরাও কৃষ্ণাঙ্গদের শ্রমসংগীতকে আর উপেক্ষা করতে পারছিলেন না। আমেরিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলোপ হয় ১৮৬৫ সালে, তার দুই বছর পর—১৮৬৭ সালে তিন শ্বেতাঙ্গ গবেষক মিলে ‘স্লেভ সংস অব ইউনাইটেড স্টেটস’ নামে কৃষ্ণাঙ্গদের ১৩৬টি শ্রমগীতির এক সংকলন প্রকাশ করেন।
উনিশ শতকের গোড়ায় প্রোটেস্ট্যান্টপন্থী খ্রিস্টীয় আন্দোলনের জোয়ারে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ সমাজও আলোড়িত হয়। দাসপ্রথা বিলুপ্তির পর নির্দয় পরধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আনন্দে যখন কৃষ্ণাঙ্গরা গান বাঁধতে শুরু করে, তখন আবশ্যিকভাবে জনপরিসরে ঘটে যাওয়া ধর্মীয় পুনর্জাগরণের আঁচও কৃষ্ণাঙ্গদের গানে পরিলক্ষিত হয়। ওল্ড টেস্টামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোর কথা তাদের গানে উঠে আসতে থাকে। বিশেষত মোজেস ও দানিয়েলের কথা। কারণ, এই দুই চরিত্র ঈশ্বরের ইচ্ছায় ভয়ানক সব অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের সম্মুখীন হয়েও ধৈর্য ধরে রেখেছিলেন, পরে দুজনই ঈশ্বরের করুণায় কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পান। দাসপ্রথার কারণে বন্দিদশায় থাকা কৃষ্ণাঙ্গরা তাই প্রেরণা নিতে চাইছিলেন বাইবেলীয় আখ্যান থেকে, তার অন্তর্গত মুক্তির ধারণা থেকে। উনিশ শতকে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া বেশ কয়েকটি শ্রমগীতির কথায়ও নজরে আসে বাইবেলীয় আখ্যানের আধ্যাত্মিকতা। ‘রোল জর্ডান রোল’, ‘উই উইল ওয়াক থ্রু দ্য ভ্যালি’, ‘দ্য ওল্ড শিপ অব জিয়ন’—এ ধরনের কয়েকটি বহুল প্রচলিত বাইবেলীয় আখ্যাননির্ভর কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমগীতি। উদাহরণ হিসেবে একটি গানের কথা তুলে ধরা যাক। ‘উই উইল ওয়াক থ্রু দ্য ভ্যালি’ গানটির বাণীতে পাই যিশুর প্রতি আনুগত্য রেখে জীবনসংগ্রামে নেমে পড়ার প্রেরণা:
‘আমরা হেঁটে যাব উপত্যকার মধ্যিখান দিয়ে
মৃত্যুর ছায়া মাড়িয়ে
যদি স্বয়ং প্রভু যিশু হন দলপতি আমাদের
শান্তিতে হেঁটে যাব উপত্যকার মধ্যিখান দিয়ে
নিশ্চয়ই আমাদের ভাইদের সঙ্গে দেখা হবে সেখানে
নিশ্চয়ই আমাদের ভাইদের সঙ্গে হবে দেখা সেখানে
যদি স্বয়ং প্রভু যিশু হন দলপতি আমাদের
শান্তিতে হেঁটে যাব উপত্যকার মধ্যিখান দিয়ে
সেখানে থাকবে না কোনো কান্নার রোল
সেখানে কোনো কান্নার সুর থাকবে না
যদি স্বয়ং প্রভু যিশু হন নেতা আমাদের
শান্তিতে হেঁটে যাব উপত্যকার মাঝ বরাবর\
ব্লুজ:
নীলকণ্ঠ সুরের
পেয়ালা
আফ্রো-আমেরিকান সংগীতবলয়ে ব্লুজ ঘরানার আবির্ভাব অনেকটা ভিন্নতার স্বাদ নিয়ে এসেছিল। আফ্রো-আমেরিকান লোকমানসে ‘ব্লুজ’ ঘরানার বিষণ্নতার ছোঁয়া লাগা আবহের আগমন কীভাবে ঘটল, তা নিয়ে একটি কিংবদন্তি-কথা বা ইতিহাসের টুকরো গল্প প্রচলিত আছে। উনিশ শতকের অন্যতম কৃষ্ণাঙ্গ নারী অধিকারকর্মী ও শিক্ষিকা শার্লট ফর্টেন ১৮৬২ সালের ১৪ ডিসেম্বর, দিনটা ছিল রোববার, প্রার্থনা শেষে চার্চ থেকে ফিরে নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন যে তার আশপাশের সবাইকে হাসিখুশি ও আনন্দিত দেখাচ্ছিল—কিন্তু তিনিই শুধু ফিরে এলেন মনে নীল রঙের বেদনা নিয়ে: and yet I came home with the blues. বেদনার প্রতীক হিসেবে আফ্রো-আমেরিকান অনুভবে ‘ব্লুজ’ শব্দের প্রকাশ ঘটল সেই প্রথম। দীর্ঘ তপ্ত দিনগুলোয় কঠোর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের মনে যে বেদনা জন্মে, সেই অনুভূতিকে যেন এক শব্দে পয়লাবারের মতো ধরে রাখা সম্ভবপর হলো।
এ তো গেল উৎসভূমির কথা। কিন্তু প্রকাশ্যে ব্লুজ ঘরানা সুনির্মিতরূপে শ্রোতার সামনে এল কখন? সময়টা বিশ শতকের শুরু। উইলিয়াম ক্রিস্টোফার হার্ডি নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ কম্পোজার নিজের সুর-কথায় হাজির হলেন এক ভিন্ন ধরনের গান নিয়ে, ‘সেন্ট
লুইস ব্লুজ’। সেই শুরু। আপাত ঘোর লাগা মোহময় ছন্দের কোথায় ঈষৎ বিষণ্নতার আভা সেই গানে। ব্লুজ ঘরানার সেটিই প্রথম আবির্ভাব কিনা, তা নিয়ে তর্ক আছে। তবে হার্ডির ‘সেন্ট লুইস ব্লুজ’-ই ব্লুজ ঘরানার সেই গান, যা কিনা প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে শ্রোতার সামনে এসেছিল। ব্লুজ ঘরানার জয়যাত্রার আরম্ভ হলো তখনই। হার্ডিও কিছুদিনের মধ্যে ‘ফাদার অব দ্য ব্লুজ’ বলে আখ্যা পেয়ে গেলেন। হার্ডির মনে কী করে এই মনোমুগ্ধকর সুর জন্ম নিয়েছিল, তা তিনি পরে নিজেই বলেছিলেন এভাবে: ‘এক
রাতে ন ঘণ্টা দেরি করেছে এমন একটা ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি, টুটউইলার স্টেশনে (আমেরিকার আলাবামা অঙ্গরাজ্যের মধ্যেকার একটি ছোট বসতি)। এমন সময় ভাগ্যের বদান্যতায় তিনি দেখা পান এক পাগলাটে শীর্ণকায় কৃষ্ণাঙ্গ গিটারিস্টের। যে কিনা তার হাওয়াইয়ান গিটারের তারগুলো একটা ছুরি দিয়ে চেপে ধরে তাতে সুর তুলছে। আর গানের একটা লাইনই পরপর তিনবার গাইছে। হার্ডির মাথায় সেই নাম না-জানা গিটারিস্ট ও তার গায়নভঙ্গিমা গেঁথে গেল মুহূর্তেই। পরে ‘সেন্ট লুইস ব্লুজ’ গানটি নির্মাণের সময় তিনি ওই দিন দেখা পাওয়া সেই হারিয়ে যাওয়া অচেনা গায়কের থেকে ষোলআনাই অনুপ্রেরণা নিলেন। শুধু গাইবার সময় এক লাইনের তিনবার পুনরাবৃত্তি না করে দুবার পুনরাবৃত্তি হবে, এমনটাই ঠিক করলেন। অতঃপর, জন্ম হলো এক নতুন সাংগীতিক ঘরানার, যা কিনা পুরো মার্কিন সমাজকে তো বটেই, মাতিয়ে তুলল বিশ্বের সংগীত অনুরাগী সবাইকে।
জ্যাজ:
একের মধ্যে
অনেক
ব্লুজ বা ওয়ার্ক সং-এর মতো জ্যাজ ঘরানার সংগীতকে সংজ্ঞায়িত করাটা দুষ্কর। কারণ এর মধ্যে বহু সাংগীতিক ঘরানা এসে মিশেছে। বলা চলে, পূর্বতন সব আফ্রো-আমেরিকান সংগীত ঘরানা থেকেই জ্যাজ যেমন নিয়েছে, তেমনি তা ক্ষণে ক্ষণে সময় ও স্থানভেদে পাল্টে বহু রূপ ধারণ করেছে। জ্যাজের এই দ্রুতগামী পরিবর্তনশীল চলনের কারণে জ্যাজ ঘরানার জনক যে আসলে কে ছিলেন, তা-ও হলফ করে বলা যায় না। তবে কোনো কোনো জ্যাজ গবেষক নিউ অরলিন্সের কৃষ্ণাঙ্গ কর্নেট-বাদক ও কম্পোজার বাডি বোল্ডেনকে জ্যাজ ঘরানার আদি স্রষ্টা বলে স্বীকৃতি দিতে চান। উনিশ শতকের শেষার্ধ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকজুড়ে বাডি বোল্ডেন নিউ অরলিন্সের নানা জায়গায় তার ব্যান্ডসমেত সংগীত পরিবেশন করে গেছেন। কিন্তু বাডির নাম ছাপার হরফে উঠেছিল তার মৃত্যুর দুই বছর পর, ১৯৩৩ সালে। বেঁচেছিলেন মাত্র ৪৪ বছর। কোনো রেকর্ড ডিস্কে নিজের কাজ রেখে যাওয়ার সৌভাগ্যও হয়নি বাডির।
কিন্তু স্বল্পায়ু জীবনেই একটি গান তৈরি করে গিয়েছিলেন তিনি, যাকে কিনা জ্যাজ-বিশারদ টেড গিওয়া বর্ণনা করেছেন জ্যাজ গানের আদি প্রতিনিধি হিসেবে। এক স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বিচারক ও আরো কয়েকজন মোড়ল কিসিমের ব্যক্তিকে ব্যঙ্গ করে লেখা গানটি সাধারণ শ্রোতাদের কাছে পরিচিত ছিল একাধিক নামে। যেমন ‘ফাঙ্কি বাট’, ‘বাডি
বোল্ডেনস স্টোম্প’ বা ‘আই থট আই হেয়ার্ড বাডি বোল্ডেন সে’ ইত্যাদি। ব্যঙ্গাত্মক লিরিক ও আকর্ষণীয় সুরের কারণে গানটি জনপ্রিয় হয়েছিল। কোনো জায়গায় কেউ গানটির মাত্র এক লাইন গেয়ে উঠলেও তাকে পুলিশ ধরে জেলে পুরত। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই গানে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল বলে কথা! যদিও প্রায় সময়েই ভিড়ের মধ্যে কেউ গানটি গাওয়া শুরু করলে বাকিরাও কোরাস ধরত সরবে। পুলিশের তখন গণহারে লাঠিচার্জ করা ছাড়া উপায় থাকত না।
হিপহপ:
কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের
বিশ্বমুখীন স্বপ্ন
বিশ শতকের সত্তর দশকে এসে বিশ্বজোড়া নানা অভিঘাতে দুনিয়াটা হঠাৎই পাল্টে গেল। ওয়ার্ক সং-এর আবেদন, গসপেল মিউজিকের প্রসন্ন আধ্যাত্মিকতা বা জ্যাজ-ব্লুজের জনপ্রিয় ধারার পাশাপাশি তখনকার মার্কিন সমাজের কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক বলয়ের তরুণ-তরুণীরা নিজেদের ব্যতিক্রমী ভাব-ভাষা প্রকাশের জন্য খুঁজছিলেন সংগীতের নতুন ফর্ম।
যা কিনা হবে রীতিমতো তেজি-টগবগে আর একই সঙ্গে চূড়ান্ত অভিনব। এই সময়েই, নিউইয়র্ক শহরে বীজ বোনা হলো হিপহপ ঘরানার। নিউইয়র্কের অন্যতম ঘনবসতি কাউন্টি ব্রঙ্কসে অভিজ্ঞ ডিস্ক জকি কুল হার্কের আয়োজনে বেশ কিছু ‘হাউজ পার্টি’তে হিপহপ ঘরানার উন্মাতাল গান নিয়ে চর্চা চলছিল ওই সময়। পরে জোসেফ স্যাডলারের মতো নিউইয়র্কের অভিজ্ঞ অপরাপর ডিস্ক জকিও এই নতুন ঘরানা নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ওই সময়ে যারা হিপহপ গানের চর্চা করছিলেন, তাদের জন্য এক বড় প্রেরণা ছিলেন কিংবদন্তি বক্সার মোহাম্মদ আলী। সমাজের অবহেলার অতল থেকে উঠে আসা ক্যাসিয়াস ক্লের বিশ্ববিখ্যাত মোহাম্মদ আলী হয়ে ওঠাটা বিক্ষুব্ধ তারুণ্যকে ভরসা-আশা জোগাত প্রচণ্ডভাবে। হিপহপ গানও তাই হয়ে ওঠে বিস্ফোরক স্পর্ধামাখা দ্রুতগামী সুর ও চটুল অথচ লক্ষ্যভেদী লিরিকে পরিপূর্ণ বিদ্রোহের ইশতেহার। আফ্রো-আমেরিকান তারুণ্যের মাধ্যমে হিপহপের চর্চা শুরু হলেও তা পরে দ্রুতই সংযোগ খুঁজে নেয় আমেরিকার জ্যামাইকান ও লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের মধ্যেও। বস্তুত, এই তিন তরফই তখন অবধি মূলধারার মার্কিন গোঁড়া শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর কাছে ‘অপর’ বলে গণ্য হতো। হিপহপের মাধ্যমে তাই বিদ্রোহের বেলায় তিন তরফের তারুণ্যই এক আদর্শিক জোট যেন গঠন করল।
হিপহপের ক্ষেত্রেও তৈরি হলো বহু রকমের বৈচিত্র্যপূর্ণ ঘরানা। নিজের মতো করে বাঁচতে গিয়ে তথাকথিত এস্টাবলিশমেন্টের চোখে যারা ‘অপরাধী’ ও ‘সমাজচ্যুত’ বলে পরিগণিত হয়েছে, সেসব কৃষ্ণাঙ্গ তরুণের জীবনধারা তুলে ধরার জন্য তৈরি হলো ‘গ্যাংস্টার র্যাপ’। নব্বইয়ের দশকে এল হিপহপের স্বর্ণযুগ। স্নুপ ডগ বা অ্যাকনের মতো বিশ্বখ্যাত আফ্রো-আমেরিকান হিপহপ তারকাদের
উত্থান ঘটল এই নব্বইয়ে এসেই।
আফ্রিকাই
সুর দিয়েছে
আমেরিকাকে
গ্র্যামিজয়ী বিয়নসে নোয়েলস, যিনি পারিবারিক সূত্রে একজন আফ্রো-আমেরিকানও, সম্প্রতি ‘লায়ন কিং’ সিনেমার জন্য গাইতে গিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে তার সংগীতচর্চা কার্যত আফ্রিকান এক ‘স্পিরিট’-এরই উদ্্যাপন। এর প্রাণশক্তি, এর মধ্যকার উচ্ছলতা, এর বৈচিত্র্য—সবই তাকে শিল্পী হিসেবে তুমুলভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। বিয়নসের কথাটা কার্যত আমেরিকার সংগীতজগতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আফ্রো-আমেরিকানদের থেকে পাওয়া সুর-সম্ভার পুাঁজ করেই কার্যত মার্কিন জনপ্রিয় ধারার সংগীতের বাজার তৈরি হয়েছে। হালের হিপহপ বা আগেকার জ্যাজ-ব্লুজ সবই তো কৃষ্ণাঙ্গদের হাতে পরশপাথরের মতো জ্বলে উঠেছে।
তথ্যসূত্র:
দ্য কেমব্রিজ কম্পানিয়ন টু ব্লুজ অ্যান্ড গসপেল মিউজিক—অ্যালান মুর (২০০২)
দ্য স্টোরি অব দ্য ব্লুজ—পল অলিভার (১৯৯৭)
দ্য হিস্ট্রি অব জ্যাজ—টেড গিওয়া (১৯৯৮)
হিপহপ আমেরিকা—জর্জ নেলসন (২০০৫)
যে পথে দাঁড়িয়ে—পল রবসন; দীপেন্দু চক্রবর্তী অনূদিত (২০১২)
মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক





