২০০২ সালে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনয়শিল্পীদের জন্য দারুণ ঘটনা হয়ে ওঠে ড্যানজেল ওয়াশিংটন ও হ্যালি ব্যারির এক মঞ্চে সেরা অভিনেতা ও অভিনেত্রীর অস্কার জয়। ওয়াশিংটন বরাবরই অভিনয়ে অনন্য। এর আগে ‘গ্লোরি’ ছবির জন্য অস্কার জিতেছিলেন। তাই একাধিকবার অস্কারজয়ী কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী হিসেবে ওয়াশিংটন নাম লেখান উইলি ডি. বার্টন ও রাসেল উলিয়ামসের নামের পাশে। অস্কার আসরে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের জন্য ওয়াশিংটনের এ প্রাপ্তিটি অনন্য অর্জন বটে। ঘটনাক্রমেই কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা সিডনি পোয়েটিয়ার সে রাতে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৫৯ সালে ‘দ্য ডিফায়েন্ট ওয়ানস’ ছবির জন্য তিনি অস্কার মনোনয়ন পান, কিন্তু প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ অভিনেতা হিসেবে সেরা অভিনেতার অস্কার অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে ‘লিলিস অব দ্য ফিল্ড’ ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে।

তবে কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে প্রথম অস্কার জয়ের কৃতিত্ব কিন্তু একজন নারী অভিনেত্রীর। ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’-এর স্কারলেট ও’হারা সিনেমাপ্রেমীদের মন থেকে বিস্মৃত হওয়ার নন। তার সঙ্গে মুখ্য কৃতদাসী মামি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন হ্যাটি ম্যাকড্যানিয়েল। এ ছবিতে অভিনয়ের জন্য ১৯৪০ সালে প্রথম কোনো আফ্রো-আমেরিকান হিসেবে সেরা পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার তুলে দেয়া হয় তার হাতে।

১৯৪০ সালে দ্বাদশ অস্কার আসরটি বসেছিল ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাম্বাসেডর হোটেলে। যেখানে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রবেশের অনুমতিই ছিল না। তবে ছবির প্রযোজক বিশেষ সুপারিশ করেছিলেন তার ছবির কৃষ্ণাঙ্গ এ অভিনয়শিল্পীর প্রবেশের অনুমতির বিষয়ে। স্কটবেষ্টিত হয়ে হ্যাটি প্রবেশ করেন। কিন্তু গন উইথ দ্য উইন্ড ছবির প্রযোজক ডেভিড ও.সেলজনিক, পরিচালক ভিক্টর ফ্লেমিং, সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রীর অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত অন্য দুই শিল্পী ভিভিয়েন লেই ও ক্লার্ক গেবেলসহ অন্যান্য শেতাঙ্গ কলা-কুশলীর জন্য নির্ধারিত টেবিলে জায়গা হয় না তার। তাদের থেকে দূরে দেয়ালঘেঁষে কোনায় একটি ছোট টেবিলের পাশে হ্যাটিকে বসতে দেয়া হয়েছিল।

একসময় ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী ছিলেন অভিনেত্রী হ্যাটি ম্যাকড্যানিয়েলের পিতা-মাতা। সেদিন মঞ্চে কান্না জড়ানো কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যতের পথনির্দেশিকা হিসেবেই আজকের এ পুরস্কারকে আমি ধারণ করব। বিনীত চিত্তে আমি প্রত্যাশা করি যে সবসময়ের জন্য আমি আমার জাতি ও চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সম্মান বয়ে আনতে সক্ষম হব।’ 

বর্ণবৈষম্য, আয়বৈষম্য আর শেতাঙ্গ শিল্পীদের মতো সমান সুবিধা না পাওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো পেরিয়ে হলিউডের যে কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নিজেদের যোগ্যতা ও প্রতিভাবলে দাপটের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মরগান ফ্রিম্যান। ভারিক্কি কণ্ঠস্বর, বুদ্ধিদীপ্ত ভঙ্গি আর আচরণে সৌম্য মরগান আধুনিক আমেরিকান চলচ্চিত্রের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তিত্ব যেন। মিলিয়ন ডলার বেবি ছবিতে অভিনয়ের জন্য পেয়েছেন ২০০৪ সালের সেরা পার্শ্বঅভিনেতার অস্কার। এছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন ‘স্টিট স্মার্ট’ (১৯৮৭), ‘ড্রাইভিং মিস ডেইজি’ (১৯৮৯), ‘দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন’ (১৯৯৪) ও ‘ইনভিক্টাস’ (২০০৯) ছবিতে অভিনয়ের জন্য। দাপুটে অভিনয়ের পাশাপাশি তার অভিনীত ‘গ্লোরি’, ‘সেভেন’, ‘ডিপ ইম্প্যাক্ট’, ‘ব্রুস অলমাইটি’ বক্স অফিসে সফল ছবি হিসেবে পরিচিত।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে আরেক কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা স্যামুয়েল এল জ্যাকসনের। নির্মাতা কুয়েন্টিন টারান্টিনোর ‘পাল্প ফিকশন’ (১৯৯৪), ‘জ্যাকি ব্রাউন’ (১৯৯৭), ‘জ্যাঙ্গো আনচেইনড’ (২০১২) কিংবা ২০১৫ সালে নির্মিত ‘দ্য হেটফুল এইট’ ছবিতে জ্যাকসনের অভিনয় মনে রাখার মতো। তাছাড়া পাল্প ফিকশনের জুলেস উইনফিল্ড চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি অস্কারে সেরা পার্শ্বঅভিনেতার মনোনয়োন পেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকে ‘গুডফেলোস’, ‘জঙ্গল ফিবার’, ’প্যাট্রিয়ট গেম’, ‘ট্রু রোমান্স’ কিংবা ‘জুরাসিক পার্কে’ অভিনয় তাকে খ্যাতি এনে দেয়। ১৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন। হাল আমলের সুপার হিরোনির্ভর ছবির তরুণ ভক্তদের কাছে নিক ফিউরি নামেই জনপ্রিয় তিনি। মার্ভেল কমিকসের ১১টি ছবির পাশাপাশি টিভি সিরিজ “মার্ভেল’স এজেন্টস অব সিল্ড’’-এ অতিথি চরিত্রে হাজির হয়েছেন। জায়গা করে নিয়েছেন হলিউডের ওয়াক অব ফেমে।


‘দ্য হেল্প’ কিংবা ’ফেন্সেস’ ছবিতে ভায়োলা ডেভিসের অভিনয় মনে রাখার মতো। ফেন্সেস ছবিতে অভিনয় করেছিলেন ড্যানজেল ওয়াশিংটনের স্ত্রীর চরিত্রে। সাজানো পরিপাটি সংসারেও যে সম্পর্কের স্পর্শকাতর টানাপড়েন শুরু হতে পারে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ ছবিটি, যেখানে রোজ ম্যাকসন চরিত্রে দুর্দান্তভাবে উতরে গেছেন ভায়োলা। প্রাপ্য হিসেবে জয় করেছেন সেরা পার্শ্বঅভিনেত্রীর অস্কার।

প্রথম কৃষাঙ্গ নারী হিসাবে সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জয় করা হ্যালি বেরিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। “মনস্টার’স বল’’ ছবিটি দিয়ে ২০০২ সালে সেরা অভিনেত্রীর অস্কার নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি। এ বন্ড গার্লের কাছে সৌন্দর্য কেবল শারীরিক বিষয় নয়। বরং মানুষ কীভাবে জীবন কাটিয়েছে এবং কিসের পক্ষে দাঁড়িয়েছে তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। শূন্য দশকে হলিউডের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত অভিনেত্রীদের মধ্যে অন্যতম তিনি। নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি আফ্রিকান-আমেরিকান অনেক অভিনেত্রীকে অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়েছেন হলিউডে।

দাপটের সঙ্গে হলিউড শাসন করে বেড়ানো কৃষ্ণাঙ্গদের তালিকায় রয়েছেন নির্মাতা ও প্রযোজক টাইলর পেরি। মোট সম্পদের পরিমাণ ৬০০ মিলিয়ন ডলার এবং এখন পর্যন্ত তাকে সবচেয়ে সফল আফ্রিকান-আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে ধরা হয়। ছবি নির্মাণের পাশাপাশি তিনি চিত্রনাট্য লেখেন, অভিনয়ও করেন। হলিউডের মতো প্রতিযোগিতার বিশ্বমঞ্চে টাইলর এসেছিলেন একেবারেই শূন্য হাতে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলোয় তিনি যখন তার প্রথম মঞ্চনাটকটিতে অভিনয় করছেন, তখন থাকার জায়গা ছিল না বলে গাড়িতেই ঘুমাতে হতো। পেরির ভাষায়, তার বাবা ছিলেন ভীষণ মারকুটে। অল্প কারণেই ক্ষেপে গিয়ে চড়াও হতেন। পেরি বুঝে উঠতে পারতেন না যে বাবা তার ওপর এত ক্ষেপে যেতেন কেন? হলিউডের আরেক প্রভাবশালী কৃষ্ণাঙ্গ নারী অপরাহ উইনফ্রের অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, জীবনে একটা সময় অর্থাৎ ১২ বছর ও ২২ বছর বয়সে দুবার করে নিজেকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। বড় হয়ে অনেক পরে পেরি যখন তার ডিএনএ টেষ্ট করেন, জানতে পারেন যে লোকটা তার বায়োলজিক্যাল পিতা নন। পেরির ধারণা, বাবা এটা জানতেন বলেই ক্ষেপে যেতেন তার ওপর। ছাত্র ভালো ছিলেন, তবু স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কারণ স্কুলের কাউন্সিলরের সঙ্গে তুমুল তর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন, যা কিনা শেষ পর্যন্ত বাজেভাবে সমাপ্ত হয়। অথচ আজ পেরির নামের পাশে জুড়ে দেয়া হয় হলিউড স্টুডিও মোগল শব্দটি। ২০০৬ সালে আটলান্টায় টাইলর পেরি নামে তিনি যখন নিজের স্টুডিও প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষত্কারে বলেছিলেন, ‘নারী থেকে শুরু করে বর্ণবাদের শিকার হয়ে যে মানুষগুলো তাদের প্রাপ্য পাচ্ছেন না তাদের ক্ষমতায় থাকতে হবে। আটলান্টায় আমি ঠিক এ কাজই করেছি। নিজেকে ক্ষমতাবান করে তুলেছি, যেন বর্ণবাদের শিকার হওয়া লোকগুলোকে নিয়োগ দিতে পারি, বহুসংখ্যক নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারি এবং বৈচিত্র্যের দ্বার উন্মুক্ত করতে পারি।’


দাপিয়ে বেড়ানো আফ্রিকান-আমেরিকান অভিনেতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় বুঝি উইল স্মিথের নাম। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৫০ মিলিয়ন ডলার। ফোর্বসের (২০১৯) হিসাবে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত সেরা ১০ অভিনেতার তালিকায় ছিলেন। সে হিসেবে গত বছর তার আয়ের পরিমাণ ৩৫ মিলিয়ন ডলার। অভিনয়ের পাশাপাশি র্যাপার ও গীতিকার হিসেবে সুনাম রয়েছে। ২০০৭ সালে আমেরিকান নিউজউইক ম্যাগাজিন তাকে হলিউডের সবচেয়ে ক্ষমতাবান অভিনেতা হিসেবে আখ্যায়িত করে। চারবার গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন, অস্কারে মনোনীতো হয়েছেন দুবার। ২০১৪ সালে উইল স্মিথ অভিনীত ২১টির মধ্যে ১৭টি চলচ্চিত্রের প্রতিটিই বিশ্বব্যাপী ১০০ মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে এবং পাঁচটি পৌঁছে যায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ঘরে। সে বছরই ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে সবচেয়ে সফল ও আয় তুলতে সক্ষম তারকা হিসেবে অভিহিত করে। হাইস্কুলে পড়ার সময় ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পড়ার জন্য স্কলারশিপ অবধি জুটে যায়, কিন্তু ভবিষ্যতে র্যাপার হবেন বলে সুবর্ণ সে সুযোগের দিকে ফিরেও তাকাননি তিনি।

হলিউডে নিজের নামের স্বাক্ষর রেখে চলা কৃষ্ণাঙ্গ অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে নাম আসে ফরেস্ট হোয়াইটেকার, মার্টিন লরেন্স, জেমি ফক্স, অক্টাভিয়া স্পেনসার, কেরি ওয়াশিংটন, জেনিফার হাডসন কিংবা কিউবা গুডিং জুনিয়রসহ আরো অনেকের। ২০১২ সালে ‘দ্য হেলপ’ ছবির সুবাদে সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনেত্রীর অস্কার পান অক্টাভিয়া স্পেনসার। তার নামের পাশে সহজে জায়গা করে নেয় ‘হিডেন ফিঙ্গারস’, ‘সেলফ মেড’ ছবিগুলো। অভিনয়, প্রযোজনার পাশাপাশি লেখালেখির অভ্যাসও আছে তার। তিনি মনে করেন, জাতিগত সংখ্যালঘু অভিনয়শিল্পীরা এখনো হলিউডে রীতিমতো লড়াই করছেন।

কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে হলিউডে নিজের অবস্থান ও অর্জনে এগিয়ে থাকা অভিনেতাদের মধ্যে আলাদা করে জেমি ফক্সের নামটা বলতে হয়। ২০০৪ সালে ‘রে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতার অস্কার, বাফটা, গিল্ড, ক্রিটিক চয়েজ, গোল্ডেন গ্লোব অর্জন করেন। একই বছর তিনি সেরা পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতা হিসেবে অস্কার মনোনয়ন পান ‘কলাট্রল’ চলচ্চিত্রের জন্য। সংগীতের জন্য পেয়েছেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। তার সম্পর্কে আর কিছু না বললেও চলে।

তবে পরিশেষে জেনিফার হাডসনের নামটা আলাদা করে বলতেই হয়। ২০০৭ সালে এ অভিনেত্রী ও গায়িকা ‘ড্রিমগার্লস’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্বচরিত্রের অস্কার পান। বিষয়টিতে রীতিমতো আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। কারণ ড্রিমগার্লস দিয়েই অভিনয়ের খাতা খোলেন তিনি।

 

রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক