নাদের শাহর ভারত আক্রমণের পেছনে সাম্রাজ্য বিস্তারের কোনো ইচ্ছা কাজ করেনি। তিনি কেবল ‘সমৃদ্ধ মোগল ভারত’ থেকে সম্পদ নিতে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল তার। নিয়ে গিয়েছিলেন তত্কালীন ভারতের অন্যতম সেরা সব সম্পদ। লুটের তালিকায় ময়ূর সিংহাসন, কোহ্-ই-নূর থেকে শুরু করে সাধারণ তৈজসপত্রও ছিল। নিজের সেনাবাহিনীর বেতনাদি পরিশোধে নাদের এ লুণ্ঠন চালান।

ভারত থেকে ফিরে যাওয়ার সময় লুণ্ঠিত সম্পদ নিতে নাদেরের আদেশে একটি তাঁবু বানানো হয়। তাঁবুর মধ্যভাগে ছিল ময়ূর সিংহাসন। নাদের শাহর দলে থাকা আবদুল করিম এ যাত্রা ও তাঁবুর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ময়ূর সিংহাসনের দুই পাশে একটি করে পর্দা রাখা হয়েছিল। এ পর্দার ওপর বিভিন্ন মূল্যবান পাথর দিয়ে অঙ্কিত ছিল দুজন দেবদূতের প্রতিমূূর্তি। তাঁবুর ছাদের অংশটি ছিল সাতটি খণ্ডের। আর স্বর্ণ দিয়ে তৈরি তাঁবুর খুঁটিগুলো পরিবহন করতে পাঁচটি হাতি প্রয়োজন হতো। তাঁবুটি নাদেরের মৃত্যু পর্যন্ত দিওয়ানখানায় রাখা ছিল।’

নাদেরের লুটে নেয়া মহামূল্যবান সম্পদগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে ময়ূর সিংহাসনের নাম। শাহজাহানের পরিকল্পনা ও সম্পদে তৈরি হয়েছিল ময়ূর সিংহাসন। মণিমুক্তা ও মূল্যবান পাথরখচিত এ সিংহাসনের বর্ণনা দিয়েছেন ইতিহাসবিদ আবদুল হামিদ লাহোরী, এনায়েত খান, বার্নিয়ার ও তাভেরনিয়ে। এর মধ্যে তাভেরনিয়ে আওরঙ্গজেবের দরবার চাক্ষুষ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার বর্ণনামতে ময়ূর সিংহাসনটি ৬ ফুট বাই ৪ ফুট। এর চার পায়ার সঙ্গে চারটি আনুভূমিক পোলের সঙ্গে ১২টি কলাম ছিল, যা এর ছাউনি ধরে রাখত। প্রতিটি কলামে একটি চুনিপাথরকে কেন্দ্র করে চারটি পান্না সাজিয়ে একটি নকশা করা ছিল। পুরো সিংহাসনে খচিত ছিল ১০৮টি চুনি (প্রতিটি ১০০-২০০ ক্যারেট) ও ১১৬টি (৩০-৬০ ক্যারেট) পান্না। মূল সিংহাসনটি ছিল পুরোপুরিভাবে স্বর্ণের তৈরি। এমনকি ছাউনির ভেতর ও বাইরের দিকে হীরা-মুক্তা দিয়ে নকশা করা হয়েছিল।

কোহ্-ই-নূরও লুট করেছিলেন নাদের শাহ। কথিত আছে, মুহম্মদ শাহ তার পাগড়ির ভাঁজে হীরাটি লুকিয়ে রেখেছিলেন। হীরা হস্তগত করতে নাদের শাহ মোগল বাদশাহকে আমন্ত্রণ করে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পাগড়ি বদল করেন। ভাঁজ খুলে হীরাটি দেখে তিনি আনন্দে কোহ্-ই-নূর (আলোর পর্বত) বলে চিত্কার করে ওঠেন। অন্য বয়ানে পাওয়া যায় দিল্লিতে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করার মূল্য হিসেবে নাদের শাহ কোহ্-ই-নূর দাবি করেছিলেন এবং মোগল বাদশাহ তা দিতে বাধ্য হন।

ওরলফ নামে আরেকটি হীরাও ছিল লুটের সম্পদের মধ্যে। হীরাটির আকার ছিল ডিম্বাকৃতির, তবে একটি ডিমের অর্ধেক। এটি পরে রাশিয়ার অভিজাত ব্যক্তি গ্রেগরিভিচ ওরলভের হাতে আসে এবং তিনি তার প্রেমিকা গ্র্যান্ড ডাচেস ক্যাথরিনকে তা উপহার দেন। মোগল কোষাগারে থাকা শাহ হীরাও নাদেরের হস্তগত হয়। আরেকটি হীরা গ্রেট টেবল ডায়মন্ড নামে পরিচিত। তাভেরনিয়ের মতে, এটি অন্তত ৪০০ ক্যারেটের এবং হীরাটি ময়ূর সিংহাসনে বসানো ছিল। নাদেরের পর আহমদ শাহ আবদালী ক্ষমতায় এলে তিনি নাদেরের কোষাগারে কোহ্-ই-নূরের সঙ্গে একটি বড় চুনি দেখতে পান। ৩৬১ ক্যারেটের চুনিটি পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা পাঞ্জাবের মহারাজা দিলীপ সিংয়ের কাছ থেকে পায়।

নাদেরের লুট করা সম্পদ নানাভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। তার মৃত্যুর পর পরই ময়ূর সিংহাসন থেকে মূল্যবান পাথর খসিয়ে ফেলা হয়। সিংহাসন ভেঙে গলিয়ে ভাগ বাটোয়ারা করা হয়েছিল। নাদেরের মৃত্যুর পর কোহ্-ই-নূর গিয়েছিল আবদালীর হাতে। পরবর্তী সময়ে রণজিৎ সিং হীরাটি হস্তগত করেন। এর বাইরে লুটেছিলেন আরো অনেক সম্পদ। ধরন অনুসারে তার লুটের সম্পদের মূল্যমান অনেকটা এমন—

*  বাদশাহ ও আমিরদের কাছ থেকে নেয়া সম্পদ: ২৫ কোটি রুপি

*  ময়ূর সিংহাসন-সংলগ্ন নানা উপকরণ, অস্ত্রের হাতলে থাকা রত্নাদি: ৯ কোটি রুপি

*  স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা: ২৫ কোটি রুপি

*  স্বর্ণ ও রৌপ্যর থালনাবাসন (গলিয়ে পরে নাদের মুদ্রা তৈরি করেন): ৫ কোটি রুপি

*  মূল্যবান বস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ: ২ কোটি রুপি

*  আসবাব ও গার্হস্থ্য দ্রব্যাদি: ৩ কোটি রুপি

*  অস্ত্র ও অন্যান্য: ১ কোটি রুপি

 

আলী আমজাদ: লেখক