ভারতীয় উপমহাদেশে পারস্য সম্রাট নাদের শাহকে একজন লুণ্ঠনকারী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়ে আসছে, এতে অবশ্য মিথ্যা কিছু নেই। তবে নাদের শাহর চরিত্র বিশ্লেষণ করলে একজন সফল ও উচ্চাভিলাষী সেনানায়কের চরিত্র ফুটে উঠবে। সমরবিদ্যা নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের জন্য নাদের শাহর উত্থান ও বিকাশ আকর্ষণীয় হিসেবে দেখা দেবে।

১৭৪৩ সালের বসন্তে অটোমান নিয়ন্ত্রিত ইরাক অভিযানে গেলেন নাদের শাহ। এ সময় তার সেনাদলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার। অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয় বাহিনীর হাতেই ছিল তখনকার অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র গোলাবারুদ। গোলন্দাজ বাহিনীর হাতে ছিল ৩৫০টি কামান ও মর্টার দাগানোর যন্ত্র। শুধু সংখ্যায়ই নয়, নাদের শাহর বিশাল ওই সেনাবাহিনী ছিল খুবই সুশৃঙ্খল ও সুসজ্জিত। তাদের দেয়া হতো পর্যাপ্ত বেতনাদি ও খাবার। নাদের শাহর ওই সেনাদলে ছিল ভারত ও মধ্য এশিয়ায় অভিযানে যোগ দেয়া অভিজ্ঞ অনেক সেনা।

তখন পর্যন্ত বিশ্ব ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় সেনা সমাবেশ। এর আগেও প্রতাপশালী অটোমানদের পরাজিত করেছেন নাদের শাহ। ইরাকের মসুল ও কিরকুক দখলেও তারা সফল হবে তা সহজেই অনুমেয়। নাদের শাহ সৈন্যদল গঠন ও ব্যবস্থাপনায় যে পরিবর্তনের সূচনা করেন তা পারস্যের ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি ও যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করতে পারত। দারিয়ুস ও জারক্সেস যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, নাদের শাহ সেখানে সাফল্যের পরিচয় দিতে পেরেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডি এটাই যে ৩ লাখ ৭৫ হাজার সেনাবাহিনী গঠনের মাত্র চার বছরের মাথাতেই মারা যান তিনি। আলেক্সান্ডার, জুলিয়াস সিজার, মোহাম্মদ বিন কাশিমের মতো স্বল্পায়ু বিজেতা নাদের শাহ। সব মিলিয়ে ১৫ বছর শাসন করার সময় পেয়েছেন নাদের শাহ।

আমাদের এখানে পশ্চিমা যুদ্ধবাজ, দখলদার আলেক্সান্ডার, নেপোলিয়ন ও জুলিয়াস সিজারদের ‘গ্রেট’ হিসেবে সমীহ করা হয়। আবার একই কাজের জন্য তৈমুর লং, বাবর কিংবা নাদের শাহকে বহিরাগত, লুটেরা, দস্যু হিসেবে চিহ্নিত করতে চান অনেকে। জাতি রাষ্ট্র গঠনের আগে যেভাবে শক্তিশালী রাজ্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাজ্যকে দখল করে নিত, লুট করে নিত তার সম্পদ—নাদের শাহ ওই নীতির বাইরে যাননি। ইতিহাসের নির্মোহ পাঠের ক্ষেত্রে সময় বিবেচনায় তার কার্যক্রম বিবেচনা করা যায়। সমরবিদ্যার দিক থেকে নাদের শাহ আকর্ষণীয় সমরনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হবেন।

সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন পণ্ডিত নাদের শাহ চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে ভালো ভালো গবেষণা করেছেন। সাফাভি (পারস্যের শিয়া শাসকগোষ্ঠী) পর্বে কোনো কোনো ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ পারস্যের যুদ্ধবিদ্যায় প্রভাব রেখেছে এ নিয়ে চমত্কার একটি আর্টিকেল লিখেছেন রুডি মাথি। ‘আনওয়ালড সিটিজ অ্যান্ড রেস্টলেস নোম্যাডস: ফায়ারআর্মস অ্যান্ড আর্টিলারি ইন সাফাভি ইরান’ শিরোনামে ওই নিবন্ধে তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে আফগান বিদ্রোহ ও নাদের শাহর উত্থানের ওপর আলোকপাত করেন।

ষষ্ঠদশ শতাব্দীর শেষ ও সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে সম্রাট শাহ আব্বাসের শাসনকালে মাসকেটিয়ার ও আর্টিলারির একটি বিশেষ কোর প্রতিষ্ঠিত হয়। নাদের শাহ ব্যাপকভাবে আধুনিক সমরাস্ত্র গ্রহণের বেশ আগে থেকেই অল্প পরিসরে তার সূচনা করেছিলেন সাফাভি রাজবংশের শাসকরা।

১৭২২ সালে আফগানদের কাছে সাফাভি সাম্রাজ্য যে পরাজয়ের মুখোমুখি হয় তার জন্য সামরিক সরঞ্জাম কিংবা সেনাস্বল্পতা দায়ী নয়। যুদ্ধে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। আফগানরা যদি জয়ী হয়, তাহলে তা তাদের সমন্বিত এবং সুশৃঙ্খল সেনাদল ও নেতৃত্বের জন্য। বিপরীতে সাফাভিদের পরাজয়ের পেছনে দায়ী তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা। ভালো জেনারেল পরাজয়কে জয়ে রূপান্তরিত করতে পারেন। সেখানে দুর্বল জেনারেল নিশ্চিত জয়কেও বাগে নিতে পারেন না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পতনের পর যেমন অ্যাডলফ হিটলারের মতো শক্তিশালী নেতা ও জেনারেলের আবির্ভাব হয়, তেমনি সাফাভি সাম্রাজ্যের লজ্জাজনক পরাজয়ের সময়টাতেই উত্থান ঘটে নাদের শাহর মতো সফল বিজেতার।

অটোমান ইরাক, ভারত, মধ্য এশিয়া ও ককেসাস অঞ্চলে নাদের শাহর সেনা অভিযানের বর্ণনা এ লেখার মূল আলোচ্য বিষয় নয়। ১৭৪০-এর দিকে সেরা সময়ে নাদের শাহর সেনাবাহিনীর শক্তি, সক্ষমতা বিচার এখানে আলো পাবে।


নাদের শাহর এক বেতনভুক্ত কর্মচারীর লেখায় অটোমান ইরাক অভিযানের আগে তার সেনাদলের সৈন্যসংখ্যার উপাত্ত পাওয়া যায়। মোহাম্মদ কাজেম মারভি ইয়াজদির আল-আরা-ই নাদেরিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, ১৭৪৩-এর সামরিক অভিযানের আগে অঞ্চলভেদে সেনাবাহিনীকে বিভক্ত করা হয়। ১৭২৯ সালে মাত্র ২৫ হাজার সেনা নিয়ে আফগানদের পরাজিত করার পর থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে নাদের শাহর সৈন্যসংখ্যা। ওই সময়ে বড় সেনাদল গঠনে যে দুটি বিষয় প্রধান ভূমিকা রাখে উচ্চাভিলাষী ও দক্ষ সেনানায়ক এবং সেনাদলের জন্য পর্যাপ্ত রেশন; তা নিশ্চিত করতে পারতেন নাদের শাহ।

১৭৪৩ সালে নাদের শাহর বেতনভুক্ত সৈন্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে খুবই নগণ্য অংশ ছিল স্থানীয় শিয়া জনগোষ্ঠী। ওই কর্মচারীর বর্ণনায় পাওয়া যায়, নাদের শাহর সেনাদলের ৬০ হাজার ছিল তুর্কি ও উজবেক, ৭০ হাজার ছিল আফগান ও ভারতীয়, ৬৫ হাজার খোরাসানি, ১ লাখ ২০ হাজার ছিল পারস্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান, হামাদান, লোরেস্তান, বাখতারান, ফার্স ও খুজিস্তানের। এছাড়া ৬০ হাজার ছিল আজারবাইজান ও ককেসাসের।

নাদের শাহর ওই কর্মচারীর লেখায় সত্যতা থাকলেও কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। ওই সময়ে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তাদের অধীনে থাকা ব্যক্তিগত সহাকারী ও কর্মচারীদের বেতনও যেত নাদের শাহর রাজকোষ থেকে। এখন ওই ৩ লাখ ৭৫ হাজার সেনার মধ্যে কতজন ওই ধরনের কর্মচারী ছিলেন তা স্পষ্ট নয়।

তবে নাদের শাহ ওই সময়ে যে সেনাদল বানিয়েছিলেন, তা সমকালের সবচেয়ে বড় বাহিনী ছিল। ইউরোপের ওই সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুই সাম্রাজ্য অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া মিলেও নাদের শাহর সেনাদলের সমান ছিল না। নাদের শাহর পিক টাইমের পরবর্তী দশকেই ইউরোপে সেভেন ইয়ার্স ওয়ার বা সাত বছরের যুদ্ধের সূচনা করেছিল অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া। ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় সাত বছরের যুদ্ধকে।

জোনাস হ্যানওয়ে নামে এক ইউরোপীয় ভদ্রলোকের লেখায় নাদের শাহর সেনাবাহিনীর স্পষ্ট রূপ পাওয়া যায়। ১৭৪৪ সালের শেষের দিকে নাদের শাহর তাঁবুতে গিয়েছিলেন তিনি। নাদের শাহর সেনাদলের মূল বাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে তার বয়ানে। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে নাদের শাহর সৈন্য ছিল দুই লাখের মতো। বিভিন্ন ইউনিট বা বিভাগে কতজন করে সেনা ছিল তার উপাত্তও পেশ করেন। অবশ্য বেশ কয়েকটি ইউনিটের আলাদা উপাত্ত দেননি হ্যানওয়ে। নাদের শাহর সেনাবাহিনীতে গার্ড ক্যাভালরি বা রক্ষী অশ্বারোহী ছিল ১৩ হাজার, নাদের শাহর নিজ আফশার গোষ্ঠীর ছিল ২০ হাজার অশ্বারোহী সেনা। এছাড়া আফগান অশ্বারোহী ছিল ৫০ হাজার, জাজায়ের্চিজ ১২ হাজার ও সাধারণ মাস্কেটিয়ার ৪০ হাজার। পদাতিক সেনা হিসেবে ছিল ১৮ হাজার তুর্কি, উজবেক ও বেলুচ সেনা।

হ্যানওয়ে জানান, নাদের শাহর বেশির ভাগ সৈন্যের হাতে ছিল মাস্কেট (বন্দুক) ও স্যাবার (বাঁকা তলোয়ার)। তবে উজবেকদের হাতে থাকত একটি অস্ত্র। হয়তো বা তা একটি বল্লম, গদা, তীর-ধনুক, পিস্তল কিংবা তলোয়ার। নাদের শাহর বাহিনীর মধ্যে আফগানদের সবচেয়ে সাহসী যুদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেছেন হ্যানওয়ে। অন্যদিকে গার্ড ট্রুপ বা রক্ষী বাহিনী ছিল সবচেয়ে ভদ্র সেনাদের অংশ। জাজায়ের্চিজ কোর নাদের শাহ স্বয়ং গঠন করেছেন। তারা পরিপাটি পোশাক পরত, সঙ্গে থাকত বড় আকারের বন্দুক। হ্যানওয়ের বর্ণনায় জাজায়ের্চিজদের পদাতিক সেনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু নাদের শাহর ভারত অভিযানের সময় অশ্বারোহী হিসেবেও যুদ্ধ করেছে ইউনিটটি। নাদের শাহর বিশ্বস্ত এ ইউনিট যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব পালনে সবসময় প্রস্তুত থাকত। প্রায়ই তাদের নাদের শাহ নিজে আদেশ দিতেন।

মোহাম্মদ কাজেম কিংবা হ্যানওয়ে কারও লেখায় আর্টিলারির স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়নি। কিন্তু অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া যায়, নাদের শাহর সেনাদলে অন্তত ৫০০ বা ৭০০ জাম্বুরাক ক্যামেল গানের একটি ইউনিট ছিল। তারা হালকা কামান নিক্ষেপ করত। জাম্বুরাক আর্টিলারির নিক্ষেপ করা কামানের ওজন ছিল এক বা দুই পাউন্ডের। আকারে ছোট হওয়ায় কামানটি সহজেই উটের পিঠে করে বহন করা যেত। পর্বতময় ও উঁচু-নিচু ভূমির দেশটিতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেখা গিয়েছে ঘোড়ার কিংবা উটের পিঠে করে সহজেই বহন করে নিয়ে যাওয়া যেত সময়ের সবচেয়ে আধুনিক ওই সমরাস্ত্রটি। ১৭৪০-এর দিকে আর্টিলারির আরো দুটি ইউনিট চালু করেন নাদের শাহ, যারা প্রতিপক্ষের প্রাচীর প্রতিরক্ষা ভেঙে দিতে সক্ষম ছিলেন। একটি ইউনিটের ঘাঁটি ছিল পারস্যের পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহতে। অন্যটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মার্ভ অঞ্চলে। ১৭৪৩ সালে অটোমান ইরাক অভিযানে প্রাচীর যুদ্ধের জন্য একটি শক্তিশালী আর্টিলারি ইউনিট নিয়ে যান। তাদের হাতে ছিল ১১৬টি ভারী কামান ও ২৩০টি মর্টার। ভারী কামানের গোলা দিয়ে প্রতিপক্ষের দেয়ালে ফাটল ধরানো হতো এবং মর্টারের গোলায় প্রাসাদ কিংবা প্রতিপক্ষের সেনাঘাঁটির অভ্যন্তরে ক্ষয়ক্ষতি করা হতো।


শেষের দিকে আর্টিলারির সক্ষমতা বৃদ্ধি হলেও নাদের শাহ তার আগের অভিযানে এ বিভাগের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। ভৌগোলিক প্রতিকূলতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকার কারণে নেতৃত্ব ও সেনা সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করেছেন তিনি। অবরুদ্ধ প্রাসাদ কিংবা সেনাঘাঁটিতে যুদ্ধ করার সময় সাধারণত তিনি দুটি নীতি অনুসরণ করতেন। প্রথমত, প্রতিপক্ষকে প্রাসাদ কিংবা ঘাঁটি থেকে বের করে এনে মুখোমুখি যুদ্ধ করা কিংবা প্রতিপক্ষের রসদ সরবরাহ ও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া। এতে খাবার ও জরুরি সহায়তা আটকে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই প্রতিপক্ষকে মরণপণ লড়াইয়ে নামতে হতো কিংবা পরাজয় স্বীকার করতে হতো।

১৭৪৩-এর দিকেই কেবল প্রতিপক্ষকে অবরুদ্ধ করার মতো আর্টিলারি গড়ে তুলতে সক্ষম হন নাদের শাহ। ততদিনে নাদের শাহর বিজয় রথের সূর্যও প্রায় অস্তমিত। আফগানদের বিরুদ্ধে নাদের শাহর শুরুর দিকের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল তার গোলাবারুদ। কিন্তু অটোমানদের পেছনে জয়ে ভূমিকা রেখেছে তার কৌশলগত দক্ষতা। অটোমানদের চেয়ে অনেক দক্ষ ছিল পারসিক অশ্বারোহী। এছাড়া আফগান অশ্বারোহী ইউনিটও শত্রুদলে ভয় ধরিয়ে দিতে পারত। ইস্তানবুল থেকে মাঝেমধ্যেই অটোমানদের দুর্ধর্ষ জানিসারি ইউনিটকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নাদের শাহর বিরুদ্ধে তারা তেমন সফলতা পায়নি। বরং তারা অটোমান সেনা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে দেখা গিয়েছে। এ জায়গায়ই নাদের শাহ এগিয়ে ছিলেন অটোমানদের বিরুদ্ধে। নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দ্রুত নির্দেশনা পৌঁছানোর ওপর জোর দিতেন নাদের শাহ। এছাড়া প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নিতে নাদের শাহর ছিল দক্ষ গুপ্তচর বাহিনী। অনেক যুদ্ধ জয়ের পেছনে প্রতিপক্ষের দুর্বলতার তথ্য গুপ্তচরের মাধ্যমে আগেভাগে পাওয়ার ফলে সহজে জয় নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন তিনি। অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমা করে দিতেন নাদের শাহ, কিন্তু দায়িত্বে অবহেলা কিংবা তার নির্দেশনা লঙ্ঘনের শাস্তি ছিল কঠোর।

সবসময় প্রতিপক্ষের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য সেনা সাজাতেন না নাদের শাহ। শত্রুপক্ষকে অপ্রত্যাশিত কিংবা আকস্মিক আক্রমণে ভড়কে দিতেন নাদের শাহ। যে সেনাপতির কৌশল প্রতিপক্ষ সহজেই অনুমান করতে পারে সে দীর্ঘদিন সাফল্য ধরে রাখতে পারে না। নাদের শাহ বিষয়টি ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন। ১৭৩৫ সালে ‘বাঘাওয়ার্ড’ বা ‘মোরাদ তাপেহ’ যুদ্ধে সরাসরি মুখোমুখি হামলা না চালিয়ে ছোট্ট একটি ইউনিট নিয়ে নাদের শাহ স্বয়ং অটোমানদের আর্টিলারিতে আঘাত হানেন। আর্টিলারি পুরোপুরি কাবু হয়ে যাওয়ায় ওই যুদ্ধে অটোমানরা আর সুবিধা করতে পারেনি। ১৭৩৮ সালের নভেম্বরে খাইবার পাসে মোগলদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও এ কৌশল অনুসরণ করেছিলেন নাদের শাহ। মোগলদের বিরুদ্ধে ব্যবহূত হামলার কৌশলকে ‘যুদ্ধ ইতিহাসের একটি মাস্টারপিস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন রুশ জেনারেল কিশমিশেভ। ঊনবিংশ শতাব্দীর রুশ জেনারেলরা নাদের শাহর এ যুদ্ধকৌশল বিশেষ মনোযোগ সহকারে পাঠ করত।

পারস্যে ও ইরাকে শিয়া-সুন্নি বিভেদ খুবই তিক্ত থাকলেও উভয় সম্প্রদায় থেকেই সৈন্য নিয়েছেন নাদের শাহ। উভয় গোষ্ঠী থেকে সৈন্য নেয়ার মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন যে সেনাদল কিংবা সাম্রাজ্যকে শেষ করে দিতে সে ব্যাপারে সচেতন ছিলেন নাদের শাহ। বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী থেকে আসা সৈন্যদের নিজ নিজ ইউনিটে রাখতেন এবং এক ইউনিটকে অন্য ইউনিটের মধ্যে একটি সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিতেন। এজন্য শিয়া, সুন্নি কিংবা বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী থেকে আসা সৈন্যরা সংঘাতে না জড়িয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো।

নাদের শাহর শাসনকাল যদি আরেকটু প্রলম্ভিত হতো এবং তিনি যোগ্য উত্তরসূরির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যেতে পারতেন, তাহলে তার সেনাবাহিনী আরো ভূখণ্ড জয় করতে পারত এবং পারস্যের দাপট আরো দীর্ঘায়িত হতো বলে মনে করেন ‘দ্য সোর্ড অব পার্সিয়া’র লেখক মাইকেল অ্যাক্সওর্থি। ওই সময়ে শক্তিশালী সেনা শাসক শুরুতে অভিযানে জোর দিলেও সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ ও শাসন ব্যবস্থায় সুন্দর পরিবর্তনের সূচনা করতে পারত। হয়তো পরবর্তী শতকে ঔপনিবেশিক শক্তির খেলার পুতুলে পরিণত হতে হতো না পারস্যের। এমনটা হলে ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নাদের শাহ হতেন রাশিয়ার পিটার দ্য গ্রেটের মতো চরিত্র। কিন্তু নাদের শাহর জীবনের শেষ পাঁচ বছরে আধুনিকায়নের সূচনার পরিবর্তে মরুভূমি হতে শুরু করে পারস্য। বিশাল সেনাবাহিনী পালনে প্রজাদের কাছ থেকে বড় অংকের খাজনা আদায়ের ফলে অনেকেই পারস্য ছেড়ে প্রতিবেশী রাজ্যে চলে যাওয়া শুরু করেছিল। এতে নাদের শাহর পতনের পাশাপাশি তার রাজবংশের ভবিষ্যতও নির্ধারিত হয়ে যায়।

 

সাবিদিন ইব্রাহিম: লেখক ও সাংবাদিক