নাদের শাহ
তার জয়যাত্রার
সূচনা থেকেই
সাফল্য পেয়ে
এসেছেন। সাফাভি
সাম্রাজ্যের পতনের
পর তিনি
দ্রুততম সময়ের
মধ্যে পারস্যে
নিজের প্রভাব
প্রতিষ্ঠা করেন।
এক্ষেত্রে নাদের
শাহর সহায়ক
হিসেবে কাজ
করেছিলেন তাহমাস্প
খান জালাইর
ও হাসান
আলী বেগ।
নাদের যে
সময়ে নিজেকে
ইরানের শাহ
বলে ঘোষণা
করতে চেয়েছিলেন
সে সময়
এদের কাছে
তিনি মতামত
চেয়েছিলেন। হাসান
আলী বেগ
নাদের শাহকে
উপদেশ দেন
তিনি যেন
রাজ্যের প্রভাবশালী
নেতাদের আহ্বান
করে বিষয়টি
উত্থাপন করেন।
এ পরিকল্পনা
অনুসারে রাজ্যের
প্রভাবশালী সামরিক
অধিকর্তা, অভিজাত
ব্যক্তি, ধর্মযাজক
স্থানীয় ব্যক্তিদের
কাছে চিঠি
পাঠিয়ে তাদের
সমর্থন চাওয়া
হয়। ১৭৩৫
খ্রিস্টাব্দে সবার
কাছে এ
আহ্বান পৌঁছে।
পরের জানুয়ারি
থেকে তারা
আসতে শুরু
করেন। নাদের
শাহর পক্ষ
থেকে চেঙ্গিস
ও তৈমুরের
ঐতিহ্য অনুসারে
একটি সভা
বসানো হয়।
‘কোরলতাই’
নামের এ
সভা থেকেই
নাদেরকে ইরানের
শাহ করার
ব্যাপারে সাবাই
সম্মত হন।
প্রাচীন রোমে
এ ধরনের
নিয়ম চালু
ছিল। সেখানে
সিনেটের মাধ্যমে
সিদ্ধান্ত গৃহীত
হতো। পুরোপুরি
গণতান্ত্রিক পদ্ধতি
না হলেও
অনেকটা সে
রূপেই ক্ষমতার
অধিকারী হয়েছিলেন
সিজার। নাদের
শাহ যেভাবে
গুরুত্বপূর্ণ ও
প্রভাবশালী নাগরিকদের
সমর্থন নিয়ে
পারস্যের শাহ
হয়েছিলেন তার
সঙ্গে সিজারের
সাদৃশ্য রয়েছে।
অন্যদিকে সিজারও
ছিলেন একজন
বড় বিজেতা।
নাদেরের জীবনও
জয়গাথায় পূর্ণ
এবং অনেকটা
একইভাবে তাদের
বিরুদ্ধে ক্ষোভ
দানা বাঁধতে
শুরু করে।
নাদের শাহ
ক্রমেই ক্রোধী
হয়ে উঠেছিলেন।
শিয়াদের প্রতি
তিনি কুপিত
ছিলেন। অন্যদিকে
করের বোঝা
বাড়ানোর কারণে
তিনি সাধারণ
মানুষেরও বিরাগভাজন
হয়ে পড়েন।
দিল্লি অভিযান
থেকে পারস্যে
ফেরার পর
নাদেরের চরিত্রে
কিছু পরিবর্তন
আসে। তিনি
ক্রমাগত তার
রাজ্যের জনগণ
থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে পড়েন।
রাজ্যের কোণে
কোণে নানা
রকম বিদ্রোহ
দমন করতে
গিয়ে নাদেরের
পক্ষে শাসনের
প্রতি নজর
দেয়া সম্ভব
হয়নি। অন্যদিকে
তিনি এসব
বিদ্রোহ দমন
করতে কঠোরহস্ত
হন। বিশেষত
১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দের
পর থেকে
এ ধরনের
বিদ্রোহ চরম
আকার ধারণ
করে এবং
নাদের শাহ
তার বিশ্বস্ত
পারিষদদের কাছ
থেকে বিচ্ছিন্ন
হয়ে পড়েন।
সিস্তান অন্তত
বছরখানেক ধরে
বিদ্রোহী ভাব
ধরে রেখেছিল।
১৭৪৬ খ্রিস্টাব্দের
মার্চে তাদের
বিদ্রোহ শুরু
হয়। সিস্তানি
বিদ্রোহীরা বালুচদের
সমর্থন পেয়ে
আরো শক্তিশালী
হয়ে উঠেছিল।
অবস্থা এমন
হয় যে
ইরানে কোনো
উৎসবও আনন্দের
সঙ্গে উদযাপিত
হতো না।
নওরোজ ইরানের
প্রধান উৎসব
হিসেবে গণ্য,
কিন্তু সে
বছর কিরমানের
বাইরে উদযাপিত
নওরোজ রীতিমতো
ভয়ভীতির মধ্যে
পালিত হয়।
এদিকে বিদ্রোহ
দমন করতে
মার্চের শেষের
দিকে নাদের
শাহ তার
দলবল নিয়ে
দুর্গম মরুভূমি
দাশত-এ-লুটের
মধ্য দিয়ে
যাত্রা করেন।
দুর্গম সে
পথে পানির
অভাব এবং
ক্ষুধা ও
রোগে প্রচুর
লোকক্ষয় হয়।
এ ক্ষতি
ও লোকক্ষয়
নাদের শাহকে
আরো ক্রোধী
করে তোলে।
মরু পার
করে তাবাসে
পৌঁছলে নাদের
তার পুত্রদের
সেখানে ডেকে
আনেন। ১৬
পুত্রের উপস্থিতিতে
তিনি বড়
তিন পুত্রকে
এক এক
করে তার
পাগড়ি গ্রহণের
প্রস্তাব করেন।
পুত্ররা একে
একটি ফাঁদ
মনে করে
পাগড়ি গ্রহণে
অস্বীকৃতি জানান।
তারা তাদের
বয়স ও
অভিজ্ঞতার স্বল্পতাকে
তাদের অযোগ্যতা
হিসেবে দেখিয়ে
পাগড়ি গ্রহণ
করতে অসম্মত
হন।
নাদের সম্ভবত
সন্দেহপরায়ণ হয়ে
পড়েছিলেন। তিনি
তাহমাস্প খান
জালাইর ও
আলী কুলি
খানকে সিস্তানে
প্রেরণ করেন।
পাশাপাশি রাজকোষে
জমা করার
জন্য তাদের
কাছে যথাক্রমে
৫০ হাজার
ও ১
লাখ তহমা
দাবি করেন।
হঠাৎ এ
ধরনের নির্দেশ
পেয়ে উভয়ই
নাদেরের প্রতি
তাদের আনুগত্য
হারিয়ে ফেলেন।
আলী কুলি
খান দ্রুতই
সিস্তানি বিদ্রোহীদের
সঙ্গে যোগ
দেন। বিষয়টি
লক্ষ করে
তাহমাস্প খান
জালাইর সতর্ক
হয়ে পড়েন।
নাদের শাহকে
উত্খাত করার
বিষয়ে আলী
কুলির পরিকল্পনা
সম্পর্কে জানার
পর তাহমাস্প
খান তাকে
বিরত করার
চেষ্টা করেন।
তাহমাস্পকে বিষদানে
হত্যা করা
হয়।
আলী কুলি
খান নিজেকে
শাহ হিসেবে
দাবি করে
সে খবর
রাজ্যময় ছড়ালে
নাদের শাহ
মাশাদ থেকে
যাত্রা করেন।
১৬ হাজার
সৈন্য নিয়ে
তিনি আলী
কুলি ও
তার কুর্দি
সহকারীদের দমন
করার মনস্থ
করেন। বলা
হয় নাদের
শাহ তার
বিরুদ্ধে চলতে
থাকা ষড়যন্ত্রের
ফলাফল সম্পর্কে
আন্দাজ করতে
পেরেছিলেন। এ
কারণে পরিবারকে
তিনি দ্রুত
ক্বালাত প্রেরণ
করেছিলেন।
নাদের শাহর
দলের মধ্যেই
বিশ্বাঘাতকতা দানা
বেঁধেছিল। নাদের
তার সামরিক
কর্তাদের মধ্যে
মুহাম্মদ কুলি
খান ও
সালিহ খানের
প্রতি নাদের
অসন্তুষ্ট ছিলেন।
এক পর্যায়ে
নাদের শাহ
তার অন্য
সেনাপতিদের ডেকে
আদেশ করেন
যেন মুহাম্মদ
কুলি ও
সালিহ খানের
দলকে শাস্তির
আওতায় আনা
হয় এবং
তাদের তরফ
থেকে বাধা
এলে যেন
কোনোরূপ দয়ামায়ার
পরোয়া করা
না হয়।
সে খবর
দুজনই জানতে
পারেন এবং
শপথ করেন
কেউ কাউকে
বিপদের দিনে
ত্যাগ করবেন
না। পাশাপাশি
সিদ্ধান্ত হয়
পরবর্তী দিন
তাদের শত্রুকে
(নাদের শাহ)
হত্যা করা
হবে।
নাদেরের এ
দুজন সেনাপতি
তাদের বিশ্বস্ত
অন্যান্য কর্মকর্তাকে
বিষয়টি জানিয়ে
দেন। সর্বসম্মতিক্রমে
সিদ্ধান্ত হয়
সালিহ খান
ও মুহাম্মদ
কুলির সহায়তায়
এরিভানের মুহম্মদ
খান কাজার,
এইরেলু আফসারের
মুসা বেগ
ও উরুমিয়ার
কোজা বেগ
গুন্দুজলু মিলে
এ হত্যাকাণ্ড
সংঘটিত করবেন।
এ পাঁচজনের
সঙ্গে আরো
অনেকে যোগ
দিয়েছিল, কিন্তু
সবাই হত্যাকাণ্ডে
সরাসরি যুক্ত
হতে পারেনি।
১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দের
২০ জুন
নাদের শাহর
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত
হয়। মুহম্মদ
হোসেন খানের
কন্যা চুকির
তাঁবুতে নাদের
সে রাতে
অবস্থান করছিলেন।
চুকির বর্ণনা
অনুসারে, বাইরে
গণ্ডগোলের শব্দ
শুনে তিনি
শাহকে ঘুম
থেকে জাগান
এবং শাহ
উঠে সালিহ
খানকে এগিয়ে
আসতে দেখেন।
তিনি (নাদের)
তার তলোয়ার
হাতে এগিয়ে
যান, কিন্তু
পায়ে তাঁবুর
একটি দড়ি
বাঁধলে তিনি
পড়ে যান।
শাহ সামলে
নিয়ে ওঠার
আগেই সালিহ
খান তলোয়ারের
কোপে নাদেরের
এক হাত
কেটে ফেলেন।
এ আক্রমণের
পর সালিহ
খান হতভম্ব
হয়ে দাঁড়িয়ে
পড়েন এবং
স্থানুর মতো
হয়ে যান।
তার এ
অবস্থা দেখে
মুহম্মদ খান
কাজাল এগিয়ে
এসে নাদের
শাহকে আক্রমণ
করে ধড়
থেকে মাথা
আলাদা করে
ফেলেন।
নাদের শাহর
হত্যাকাণ্ডের পেছনে
তার সামরিক
কর্তাদের ষড়যন্ত্রের
বিষয়টিই আলোচিত
হয়। কিন্তু
এর পেছনে
ছিল বহুদিনের
সঞ্চিত ক্ষোভ
ও ক্রোধ।
এও বলা
হয়, নাদের
শাহ সে
সময় এতটা
অসুস্থ ছিলেন
যে হত্যাকারীদের
মোকাবেলা করা
তার পক্ষে
সম্ভব হয়নি।
অন্যথায় নাদের
শাহ তাদের
প্রতিহত করতে
পারতেন। অনেকটা
প্রায় নিরস্ত্র
ও প্রতিরোধহীন
অবস্থায় তত্কালীন
অন্যতম ধনী
ও শক্তিশালী
শাসক মৃত্যুবরণ
করেন। নাদের
শাহর বহু
বছর আগে
তারই মতো
প্রবল পরাক্রান্ত
রোমান সম্রাট
জুলিয়াস সিজার
নিজের কর্মকর্তাদের
ষড়যন্ত্রে নিরস্ত্র
অবস্থায় মৃত্যুবরণ
করেন। হয়তো
সিজারের মতো
নাদেরও বলেছিলেন,
‘সালিহ,
তুমিও?’
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক





