সত্য ঘটনা অবলম্বনে পাওলো কোয়েলহোর লেখা দ্য স্পাই হচ্ছে কিংবদন্তি গুপ্তচর মাতা হারির গল্প। ঘটনাকাল বিশ শতকের দ্বিতীয় দশক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হচ্ছে, আমরা পরিচিত হই সুন্দরী তরুণী মার্গারেটা জেলের সঙ্গে। মার্গারেটা হল্যান্ডে তার একঘেয়ে জীবন থেকে নিস্তার পেতে বেপরোয়া। স্কুলজীবনেই এক শিক্ষক কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন, এর পর তিনি স্থানীয়দের মুখরোচক গল্পের উপাদানে পরিণত হন। বাঁচার আর কোনো উপায় না পেয়ে বিয়ে করেন নিজের চেয়ে ২০ বছরের বড় বর্বর, মাদকাসক্ত সামরিক কর্মকর্তাকে।

বিয়ের পর এ দম্পতি ইন্দোনেশিয়া চলে যান, তারপর ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ। কিন্তু যে অমর্যাদাকর পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি ঘরে হচ্ছিলেন, সেটা অব্যাহত থাকে। একজন সামরিক কর্তার স্ত্রী হিসেবে নিজের জীবনকে সুস্থির করতে চেষ্টা করেছিলেন, চেয়েছিলেন নিজের ছেলেমেয়েকে বড় করে তুলতে। আরেকজন কর্মকর্তার বেপরোয়া স্ত্রীর আত্মহত্যা মার্গারেটাকে সাহসী করে তোলে। তিনি তার স্বামী ও সমাজের নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি পেতে সাহসী হয়ে ওঠেন। “প্রেম এক ব্যাখ্যাতীত ও বিপজ্জনক বিষয়। প্রেম দুনিয়ার বুকে আপনার যা কিছু পরিচয়, সেটা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এবং আপনার প্রিয় মানুষটি যেভাবে আপনাকে দেখতে চায় সেভাবেই আপনাকে গড়ে তুলবে।’ তিনি নিজেই নিজের হয়ে উঠেছিলেন। নতুন নাম এবং নিজের পছন্দে নতুন জীবন নিয়ে নিজেকে পুনরাবিষ্কার করেছিলেন। তিনি ভিন্ন হওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন।

মাতা হারি কপর্দকশূন্য ও একাকী প্যারিসে পৌঁছেছিলেন। আইফেল টাওয়ারসহ প্যারিসের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। ‘এত সুন্দর পোশাক পরা নারীদের আমি আগে কখনো দেখিনি।’ তার মতে, তখন তার নিজের দেশকে চিহ্নিত করা হতো ভারী কাঠের জুতা (ক্লগস) ও পুরনো বায়ুকল দিয়ে।

কয়েক মাসের মধ্যে তিনি নিজেকে একজন শিল্পী, নর্তকী হিসেবে পুনরাবিষ্কার করলেন। একজন শিল্পীর লক্ষ্য হিসেবে তিনি বললেন, ‘নিজের সীমানাকে ছাড়িয়ে যাওয়া।’ তিনি সব সীমানাকে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিলেন এবং তখনকার দিনে অগ্রহণযোগ্য নগ্ন নৃত্যকে গ্রহণযোগ্য করে তুললেন। তিনি কখনই পেশাদার নৃত্যশিল্পীর প্রশিক্ষণ পাননি। কিন্তু নাচের সময় ধীরে ধীরে নিজের সব পোশাক ফেলে দিয়ে সুন্দর দেহের উন্মোচনের কৌশল সেই অভাব পূরণ করে দিয়েছে। মাতা হারি শহরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হলেন, একদিকে যেমন ছিলেন প্রশংসিত তেমনি সমালোচিত।

কিন্তু ‘স্বপ্নের মূল্য সবসময়ই চড়া।’ পিকাসো, মোদিগলিয়ানির মতো শিল্পীদের সঙ্গে সখ্য থাকার পরও ধনী ও ক্ষমতাবানদের শয্যাসঙ্গী হওয়ায় মাথা হারির জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরতে শুরু করে। ইউরোপ তখন যুদ্ধরত; ক্ষমতাবান পুরুষরা পতিতা বলে পরিচিত একজন নারীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গোপন রাখতে চান। আজকের দিনে বিষয়টিকে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাদের ‘সুনাম যেকোনো মূল্যে বজায় রাখার প্রয়োজন ছিল। এটা তখনই সম্ভব যদি মাতা হারি ফ্রান্স বা দুনিয়া থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।’

যুদ্ধ যদি প্রভাবক হয় তাহলে মাতা হারি নিজেই পর্যাপ্ত রসদ সরবরাহ করেছেন। তিনি যুদ্ধে লিপ্ত উভয় পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। প্রচলিত কথনে তিনি জার্মানি ও ফ্রান্স উভয় দেশের জন্যই গুপ্তচরগিরি করতে গিয়েছিলেন। শেষমেশ জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দণ্ডিত হন, যদিও তার কথা ছিল— তিনি গুজব আর তার শরীর ব্যতীত আর কিছু বিক্রি করেননি।

মাতা হারির মৃত্যুর বহু বছর পরে বিচারকরা বলেছেন, তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ‘এত দুর্বল ছিল যে তা দিয়ে একটি বেড়ালকেও শাস্তি দেয়া যায় না।’ মাতা হারিকে ১৯১৭ সালের অক্টোবরে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার কথায়, তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে একজন বেশ্যা হিসেবে, গুপ্তচর হিসেবে নয়!

প্রথমবার পড়ার পর কোয়েলহোর দ্য স্পাই বইটি ফিকশন নাকি নন-ফিকশন, সেটা বোঝা কঠিন মনে হবে। এটা ফিকশন কিন্তু মাতা হারির জীবন সম্পর্কে প্রচুর ঐতিহাসিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের আগে নির্জন কারাকক্ষ থেকে মাতা হারির লেখা চিঠি ও তার উকিলের চিঠিতে বর্ণিত হয়েছে পুরো বইয়ের গল্প।

বইটি পড়তে পড়তে আমরা বুঝতে শুরু করি যে, একজন স্বাধীনচেতা নারীর আত্মবিশ্বাস, তার অহংকার। তার একমাত্র অপরাধ ছিল সেকালের প্রচলিত প্রথা না মেনে নিজের হূদয় ও ইচ্ছাকে অনুসরণ করার সাহস দেখানো। বইয়ে মৃত্যুপথযাত্রী মাতা হারি তার চোখে নিজের সংক্ষিপ্ত জীবনকে ফিরে দেখেছেন, তার কথায়, ‘স্মৃতি একটি নদীর মতো, যা সবসময় পেছনের দিকে ছুটে চলে।’

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, ইতিহাসের এই পুরনো চরিত্রকে নতুন করে দেখার কী প্রাসঙ্গিকতা থাকতে পারে? তারা বইটি পড়লে বুঝতে পারবেন কোয়েলহো পুরো গল্পটিকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন মাতা হারিকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে। বইটি আমাদের দেখাচ্ছে এক শতকে আমরা কতটা এগিয়েছি এবং আর কতটা পথ আমাদের সামনে এখনো বাকি আছে।

এটি শুধু নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা একজন স্বাধীন নারীবাদীর গল্প নয়। কোনো মানুষ আমাদের প্রথাগত চিন্তা ও কাজ না করলে তাকে আমরা কতটা সন্দেহ নিয়ে দেখি এবং তার সঙ্গে কতটা সহিংস আচরণ করি, সে গল্প আছে এ বইয়ে। দ্য স্পাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বই; চমত্কারভাবে লিখিত এবং সময়োপযোগী। মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আজকের দিনে মনে হচ্ছে দুনিয়া সামনে এগোনোর পরিবর্তে পেছনের দিকে হাঁটছে, এমন পরিস্থিতিতে বইটি দুনিয়াকে সতর্ক করে কিছু বার্তা দিয়েছে।

নিউইয়র্ক জার্নাল অব বুকসে প্রকাশিত

লেখক: ব্রিটিশ সাংবাদিক, চিত্রনাট্যকার