আজ নীলার বিয়ে। বরের বাড়ি থেকে নীলার জন্য একটা লাল টুকটুক শাড়ি এসেছে। নীলা লাল টুকটুক শাড়িটা পরেনি। সে পরেছে হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি। তাকে দেখতে নীল প্রজাপতির মতো লাগছে।
বিয়ের দিন কনেকে চেহারার মধ্যে একটু বিষাদ বিষাদ ভাব ফুটিয়ে তুলতে হয়। কিন্তু নীলার চেহারায় বিষাদের কোনো রেখা নেই। সে নীল প্রজাপতির মতোই সারা বাড়িতে উড়ে বেড়াচ্ছে। নীলার এই উড়ন্ত মুগ্ধমূর্তি বাড়িতে আমন্ত্রিত বয়স্কা অতিথিদের কারো কারো চোখে অশ্লীল ঠেকছে। তারা মনে মনে ভাবছে, মেয়েটা একদম নির্লজ্জ। বিয়ের দিন এভাবে কেউ নেচে বেড়ায়!
নীলার পুঁচকি ভাইটাও উড়ছে। নীলা যে তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে— এই ব্যথাটা এখনো তার মনের ভেতর বেজে ওঠার ফুরসত পায়নি। সে বিয়ের আনন্দে মেতে আছে। উচ্চ ভলিউমে হিন্দি গান ছেড়ে দিয়েছে— মেরে পিয়া ঘার আয়ে-গা ও রামজি...
হিন্দি গানে নীলার ভীষণ অ্যালার্জি। গান কানে ঢুকতেই সে উড়তে উড়তে পুঁচকির রুমে এসে হাজির হলো। রুমে ঢুকতেই রাফির চোখে চোখ পড়ল তার। রাফি নীলার দূর সম্পর্কের কাজিন। নীলাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করছে। দুজনই ইংরেজি সাহিত্যে পড়ছে ঢাবিতে। এবার তাদের ফাইনাল ইয়ার।
রাফি যে পুঁচকির রুমেই আছে— এটা অবশ্য নীলা জানত। চোখ দ্রুত সরিয়ে নিয়ে পুঁচকির মাথায় টুক করে একটা টোকা মেরে বলল, ‘অ্যাই বান্দর হিন্দি গান বন্ধ করে রবীন্দ্রসংগীত চালু কর।’
পুঁচকি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কি আপু সারাক্ষণ শুধু রবীন্দ্রসংগীত রবীন্দ্রসংগীত করো। বিয়ের দিন কেউ কখনো রবীন্দ্রসংগীত বাজায়। মিনমিন সুরে বাজবে। এগুলো কারো কানেই ঢুকবে না।’
নীলা উত্তরে কিছু বলল না। পুঁচকির মাথায় আগের চেয়ে একটু স্বাস্থ্যবান শব্দে টোকা মেরে নিজেই হিন্দি গানের লাগাম টেনে ধরল। হিন্দির তিরোধানে এবার রবীন্দ্রসংগীত সরব হয়ে উঠল মৃদুমধুর মন্দ্রে— তুমি মোর পাও নাই, পাও নাই পরিচয়...।
নীলা যেন রাফিকে তার মনের কথা বিশেষভাবে জানানোর জন্যই ইচ্ছে করে রবীন্দ্রনাথের এই গানের শরণাপন্ন হলো। রাফির সাথে তার সম্পর্কটা বেশ ছিল। কিন্তু মাঝখানে প্রেমের হাওয়া ঢুকে সেটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে। দুই মাস আগের কথা। নীলা একদিন ক্যাম্পাসে রাফিকে আড়ালে ডেকে বলল, ‘আমার বিয়ের জন্য বাড়িতে যে খুব তোড়জোড় চলছে, সেটা কি বুঝতে পারছিস?’
রাফি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘হ্যাঁ পারছি। ক্যান তুই কি বিয়ে করতে চাস না?’
‘হ্যাঁ চাই। তবে বিয়েটা আমি অন্য কাউকে না তোকেই করতে চাই।’
কথাটা বলেই নীলা দ্রুত চলে গেল। রাফিও যে তাকে ভেতরে ভেতরে ভালোবাসে— এই ব্যাপারটা তার কাছে দিনের আলোর মতোই সত্য মনে হতো। কিন্তু সত্য জিনিসটাও পরম নয়। একজনের কাছে যা সত্য মূর্তিরূপে ধরা দেয়, অন্যজনের কাছে তা সেই রূপে ধরা দেয় না। রাফির কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দই পাওয়া গেল না। নীলা রাফির এই নির্লিপ্ততায় রাগ, অভিমান আর অপমানে সংকুচিত হয়ে তার সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতে লাগল। বেচারা রাফি তার ওপর এই অবিচারের কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না।
রাফিকে ছাড়াই নীলা যে খুব সুখে থাকবে— এই ব্যাপারটা তাকে জানানোর জন্যই এত দিন বিয়েতে রাজি না হলেও এবার তার মা যখন বিয়ের কথা তুলল তখন সে কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই দ্রুত রাজি হয়ে গেল এবং আজ বিয়ের দিন সেটাই আরো জোরেশোরে প্রমাণ করার জন্য সে ইচ্ছে করে চেহারার মধ্যে প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশি আনন্দের ভাব ফুটিয়ে তুলে সারা বাড়ি মাথায় তুলে রাখল। কিন্তু তার মনের ভেতর এদিকে যে বিপরীত ভাবাবেগের স্রোত বইছে, সেটার সাথে লড়াই করতে করতে একই সঙ্গে কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়তে লাগল ভেতরে ভেতরে। রাফি যে শেষমেশ তাকে হারানোর ব্যথায় কাতর হয়ে তাকে বিয়ে থেকে ফেরাবে— এমন একটা ক্ষীণ বিশ্বাস তার মনের ভেতর আন্দোলিত হতে লাগল এখনো। কিন্তু সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এলেও রাফির সীমাহীন নির্লিপ্ততা কাটার কোনো লক্ষণ যখন সে দেখতে পেল না, তখন তার ভেতরের বেদনাবোধের বাঁধটা ভেঙে গেল। একলা ঘরের ভেতরে ঢুকে বেশ কিছু সময় দরজা বন্ধ করে রাখল। নির্জন একলা রুমে তার ভেতরের সেই বেদনাবোধ কান্নার জল হয়ে ঝরতে লাগল বেশ কিছু সময়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর যখন সে রুম থেকে বের হলো, পুঁচকির ঘরে তখনো রবীন্দ্রসংগীত বাজছে— কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে...।
নীলা ভেবেছিল পুঁচকি হয়তো তার রুম থেকে বের হওয়ার পরই গান পরিবর্তন করে দেবে। দীর্ঘসময় ধরে রবীন্দ্রসংগীত শোনার ধৈর্য যে তার নেই, এটা সে ভালোভাবেই জানে। রাফিই যে তাকে গান পরিবর্তন করতে দেয়নি, এটা তার বুঝতে আর বাকি রইল না। নীলা মনে মনে পুঁচকির রুমে যাওয়ার উপলক্ষ খুঁজতে লাগল। রবীন্দ্রসংগীত বন্ধ হলে সেই উপলক্ষে খুব সহজেই যাওয়া যেত। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত চলতে থাকায় অন্য কোনো উপলক্ষ তার মনের মধ্যে সহজে উদয় হলো না। উপলক্ষের জন্য এদিকে ধৈর্য ধারণ করা তার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠল। শেষমেশ নীলা উপলক্ষহীনভাবে পুঁচকির রুমে এসে হানা দিল আবার।
পুঁচকি নীলাকে দেখে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আপু রবীন্দ্রসংগীত চলছে তো!’
নীলা বলল, ‘জানি। তুই রুম থেকে বের হ এখন।’
পুঁচকি কোনো প্রতিবাদ না করে বের হয়ে গেল তত্ক্ষণাত্। নীলা রাফির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রাফি তুই এভাবে আমাকে দুঃখ দিলি ক্যান?’
রাফি বলল, ‘তোকে শুধু দুঃখ না সাথে মুক্তিও দিলাম। আর এই মুক্তি দুঃখের চেয়ে বড়। রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন, দুঃখের ভেতর দিয়ে যে মুক্তি আসে তা দুঃখের চেয়ে বড়।’
‘এই মুক্তি তো আমি চাইনি?’
‘কিন্তু তোকে তো বন্দিও আমি করতে পারব না।’
‘তুই কি আমাকে ভালোবেসেছিলি কখনো?’
‘এই প্রশ্নটা আজকের দিনের জন্য অনুকূল নয়।’
নীলার মুখে একটা কাঠিন্যের ভাব ফুটে উঠল। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রুম থেকে বের হতেই দরজায় তার বাবার মুখোমুখি পড়ে গেল। নীলা তার বাবার চোখে চোখ রাখার সাহস পেল না, পাছে তার বাবা সব বুঝতে পারেন।
নীলার বাবা অবশ্য সব বুঝেই ফেলেছেন। দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের দুজনের কথোপকথন শুনছিলেন তিনি। নীলার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বললেন, ‘মা, এখনো সময় আছে। বিয়েটা কি ভেঙে দেব?’
নীলা দৃঢ়ভাবে বলল, ‘না বাবা, এখন আর তার দরকার নেই।’





