বৃহত্তর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে করা অপরাধের শাস্তি হিসেবে দেয়া হয় কারাদণ্ড। অপরাধীকে এজন্য কারাগারে রাখা হয় যে দ্বিতীয়বার যেন তার দ্বারা একই অপরাধ না ঘটে। এভাবে কয়েদখানা একটি সর্বজনীন শাস্তিতে পরিণত হয়েছে। আর কয়েদখানার ব্যবস্থাপনার জন্য রাষ্ট্রকে মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত জনবলের। তারা বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে অপরাধীর দূরত্ব নিশ্চিত করতে নিয়োজিত থাকত। কেবল পাথরের দেয়ালই তো আর কারাগার না; তার সঙ্গে সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দুঃখজনকভাবে, ঔপনিবেশিক যুগের নথিপত্রে কারাগারের অপরাধী এবং আইনি সংস্কার নিয়ে ঢের আলোচনা থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে সে অর্থে আলোচনা আসেনি। 

১৮৩৮ সালের আগে বাংলার কয়েদখানায় বন্দিরা ছিল ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে। তারা আবার দায়িত্ব সামাল দিতেন কলকাতার নিজামত আদালতের বিচারকের অধীনে। কয়েদখানার নীতিমালার ওপর নজরদারি এবং বন্দিদের দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল নিজামত আদালতের কাঁধে। ১৮৪৪ সালের আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, বাংলার কারাগারের পূর্ণ দায়িত্ব চলে যায় ম্যাজিস্ট্রেট ও যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে। তখন থেকেই তারা বন্দিদের পরিবহন, নির্বাসনের স্থান নির্ধারণ এবং বিভিন্ন নীতিমালা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিতে থাকেন। ম্যাজিস্ট্রেটরা ছিলেন অন্যান্য অনেক কাজে ব্যস্ত, ফলে কারাবন্দিদের দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়ার না সময় থাকত, না শক্তি। কারাগার ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসা হয় চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে। ১৮৪৬ সালে আগ্রায় প্রথম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থাপিত হয়। বেরেলি ও এলাহাবাদে কারাগার স্থাপিত হয় ১৮৪৮ সালে। এরপরে ক্রমে লাহোর, মাদ্রাজ, বোম্বে, আলিপুর, বেনারস, ফতেহনগর ও লখনৌতে কারাগার তৈরি করা করা হয়। কয়েদখানা নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল সেখানকার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রতি প্রদেশে ইন্সপেক্টর জেনারেল নিয়োগ দেয়া।

বাংলায় প্রথম ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেয়া হয় ১৮৫৩ সালে। ১৮৫৬ সালে তার অধীনে আনা হয় আসাম, আরাকান ও ছোট নাগপুর। কিন্তু কয়েদখানায় মৃত্যুর ঘটনা প্রশাসনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত বিষয়ও দেখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। ১৮৬২ সাল থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে জেলা পরিষদের কয়েদখানাগুলোয় সিভিল সার্জন নিয়োগ দেয়া হয় সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে। ক্রমে আলাদা হয়ে যেতে থাকে বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা। পদক্ষেপের সফলতা স্পষ্ট হলে ১৮৬৪ সালে সব প্রদেশের জন্যই সিভিল সার্জন নিয়োগ দেয় ব্রিটিশ সরকার। বাড়তে থাকে কারা ব্যবস্থাপনার প্রতি মনোযোগ। তার ধারাবাহিকতায় ১৮৭৬ সালে বিস্তৃত পরিসরে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় কারা ব্যবস্থাপনা নিয়ে। প্রথমবারের মতো দায়িত্ব স্পষ্ট করে সজ্জিত করা হয়। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। প্রস্তাব আসে একজন সুপারিনটেনডেন্ট, একজন মেডিকেল অফিসার, একজন জেলার এবং কয়েকজন অধীন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার।

ঔপনিবেশিক আমলের গোড়ার দিকে নির্বাহী কর্মীরা দুটি ভাগে বিভাজিত ছিলেন। ওপরের স্তরে ছিলেন জেলার, ডেপুটি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার। তারা সাধারণত প্রাদেশিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন। নিচের স্তরে ছিলেন কয়েদখানায় বন্দিদের দেখাশোনার জন্য ওয়ার্ডার। নিয়ন্ত্রণের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই কয়েদখানাকে কেন্দ্রীয় কারাগার এবং জেলা কারাগার হিসেবে বিভাজন করা হয়। কেন্দ্রীয় কারাগারে নিযুক্ত থাকতেন একজন সুপারিনটেনডেন্ট, একজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট, দুই-তিনজন জেলার, পাঁচ-সাতজন ডেপুটি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার। পাশাপাশি থাকতেন একজন সেবিকা, কারাগারের আকার ও সক্ষমতা অনুযায়ী কয়েকজন ওয়ার্ডার, একজন নারী ওয়ার্ডার, দুজন মেডিকেল অফিসার ও একজন কম্পাউন্ডার। জেলা কারাগারগুলো সেদিক থেকে কিছুটা পৃথক। সেখানকার দায়িত্বে থাকতেন একজন সুপারিনটেনডেন্ট, একজন জেলার, এক-দুজন ডেপুটি জেলার, এক থেকে তিনজন অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার, সক্ষমতা অনুসারে ওয়ার্ডার, একজন নারী ওয়ার্ডার, একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট মেডিকেল অফিসার এবং একজন কম্পাউন্ডার। 

কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে সাধারণত নিয়োগ দেয়া হতো ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গদের মধ্য থেকে। বেতনও ছিল তুলনামূলক বেশি। ঊর্ধ্বতন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন, সুপারিনটেনডেন্ট, মেডিকেল অফিসার, জেলার, ডেপুটি এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার ছিল ঊর্ধ্বতন পদ। ১৮৫৩ সালে হেনরি লোচ বাংলার প্রথম ইন্সপেক্টর অব প্রিজনস হিসেবে নিযুক্ত হন। মাত্র দুই বছর দায়িত্বে থাকলেও তিনি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন। ১৮৫৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এফ জে মুয়াট নিযুক্ত হন বাংলার মেডিকেল ইন্সপেক্টর জেনারেল। সে সময় কারাগারে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা সম্ভব করতে সেনাবাহিনী থেকেও কর্মী নিয়োগ দেয়া হতো। ইন্সপেক্টর জেনারেল কারাগারের সব কর্মীর দায়িত্ব পালন করাটা নিশ্চিত করতেন। কয়েদির সংখ্যা থেকে শুরু করে সব রকম তথ্য তার কাছে থাকত। কয়েদখানার বাজেট ও সেখানকার কাজকর্মের হিসাবও তার হাত হয়েই আসত অধস্তন দায়িত্বশীলদের ওপর। এমনকি কারাগারের কোনো কর্মীর ভুলের জন্যও তার দায় এড়ানোর উপায় ছিল না। লর্ড কর্নওয়ালিস ভারতীয়দের বিশ্বাস করতেন না। একই অভিমত ছিল লর্ড থমাস মেকলের। ফলে বছরের পর বছর ধরে ব্রিটিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতীয়দের এড়িয়ে চলেছে সরকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় কর্মীদের সংকট তৈরি হওয়ায় আর্মিতে অবস্থানরত কর্মীদের জন্য একটা সুযোগ দেয়া হয় ইন্সপেক্টর জেনারেল পদের জন্য। 

কলকাতার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজনসের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল দায়িত্ব পালন করতেন। সাধারণ সময়ে ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল ওপর থেকে আসা আদেশ-নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতেন। এজন্য তাকে জেল পরিদর্শন করতে হতো। জেলা কারাগারগুলোর দায়িত্বে থাকাদের নির্বাচন করত কেন্দ্রীয় সরকার। সেখান থেকেই নিযুক্ত হতেন জেলা পরিষদের কারাগারগুলোর সুপারিনটেনডেন্ট। ফলে সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন মূলত দুই রকম। প্রথমত, কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট এবং দ্বিতীয়ত, ডিস্ট্রিক্ট কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট। ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজনসের অনুমতি ক্রমে সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগ দিতে পারতেন জেলার, ডেপুটি জেলার এবং অন্য সব কর্মকর্তাকে। সেক্ষেত্রে সুপারিনটেনডেন্টের নির্দেশনা মান্য করতে হতো সবাইকে। কোনো কর্মকর্তা তার অধস্তন কর্মী নিয়োগ বা বরখাস্তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। সুপারিনটেনডেন্টের ওপর দায়িত্ব মোটেই কম ছিল না। তাদের কাজের সহযোগিতার জন্যই তৈরি করা হয় ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্টের পদ। রÅাংক অনুসারে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট জেলারের ঠিক ওপরের পদ। ১৮৮৯ সালের কমিটিতে কয়েদখানার দক্ষতা বৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল করার উদ্যোগ নেয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল কয়েদখানা থেকে আয় বৃদ্ধি। এটা নিশ্চিত করতে বাংলার কেন্দ্রীয় জেলে চারজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। 

জেলার নির্বাহী প্রধান ছিলেন জেলার। সুপারিনটেনডেন্টের ঠিক নিচের পদ এটি। সব ধরনের অভিযোগ নেয়া এবং আইন প্রয়োগ করার দায়িত্ব ছিল তার ওপর। আর তার জন্য প্রতিদিন জেল পরিদর্শন করতে হতো তাকে। জেলারের প্রধান দায়িত্ব ছিল স্টাফ ও কয়েদিদের নিয়ন্ত্রণ। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন রাখতেন তিনি। ১৮৮৯ সালের কমিটিতে একজন জেলারের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, স্থানীয়দের সঙ্গেও যোগাযোগের সক্ষমতা এবং শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারার মতো যোগ্যতাকে শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার পেত ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ নাগরিকরা। জেলারের নিচে থাকতেন ডেপুটি জেলার। ডেপুটি জেলারদের কেবল কেন্দ্রীয় জেল কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে নিযুক্ত করা হতো। পূর্ব অভিজ্ঞতায় অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিই কেবল ডেপুটি জেলারের দায়িত্ব পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতেন। জেলার কিংবা ডেপুটি জেলারের অধস্তন পদ ছিল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলার। তিনি মূলত জেলারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার ক্ষেত্রে জেলারকে সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। 

জেলার, ডেপুটি জেলার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট জেলারের নিচেও বিভিন্ন ধরনের পদবি ছিল। তাদের মধ্যে ছিল বরকন্দাজ, জমাদার, দফাদার, সিপাহি, পাহারাওয়ালা, কনস্টেবল, গার্ড, নাইট গার্ড, ওয়াচম্যান। পদগুলোকে নিচু হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বাংলা অঞ্চলে ওয়ার্ডারদের দায়িত্ব ছিল অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় বেশি। জেলারের অধীনে চিফ ওয়ার্ডার জেলের নজরদারি নিশ্চিত করতেন। জেলারের কাছে প্রতিদিন প্রতিবেদন জমা দিতে হতো। সিনিয়র হেড ওয়ার্ডার ছিলেন অস্ত্র, ইউনিফর্ম এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির দায়িত্বে। যেসব কারাগারে নারী কয়েদি রাখা হতো, সেখানে থাকত সেবিকা ও নারী ওয়ার্ডার। ঔপনিবেশিক আমলে সাধারণত অধস্তন পদগুলোর জন্য স্থানীয়দের বাছাই করা হতো। সাধারণ নিয়মিত কয়েদিদের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে হয়, এমন পদবিগুলোতে নিয়োগ পেতেন স্থানীয়রা। তাদের স্যালারিও ছিল তুলনামূলক কম। তার জন্য এসব পদে দুর্নীতিও ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। গরিব কয়েদিরা প্রায়ই ঘুসের আশ্রয় নিত। ১৯২৭ সালে বেঙ্গল জেল ইনকোয়ারি কমিটির পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেখানে একজন ওয়ার্ডারের বেতন ১৬ থেকে ২০ রুপি পর্যন্ত ছিল। একই সময়ে প্রধান ওয়ার্ডারের বেতন ছিল ৩০ রুপি পর্যন্ত। এছাড়া বরাদ্দ ছিল বিশেষ ধরনের সুবিধা। ওয়াচম্যান ও গার্ডের দায়িত্ব পেতেন কয়েদিরাও। তবে তার জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হতো। একজন কয়েদির জন্য সর্বোচ্চ পদ ছিল ওয়ার্ডার। সাধারণ একজন ওয়ার্ডারের মতো হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ ছিল কারাগারের চৌহদ্দির ভেতরেই। তাদের নির্বাচন করা হতো মেধা ও যোগ্যতার মধ্য দিয়ে। আর নির্বাচন ও নিয়োগের দায়িত্বটা পালন করতেন সুপারিনটেনডেন্ট নিজে। এছাড়া দণ্ডপ্রাপ্ত গার্ড, আরদালি ও সুইপারের পদও তারা নিতে পারত। কিন্তু কোনো কয়েদিকে কেরানিসুলভ কাজে নেয়া হতো না। তার প্রধান কারণ জেলের গোপন তথ্য থেকে সতর্কতা। 

ঔপনিবেশিক সরকার নিয়োগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সৎ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার জন্য আন্তরিকতা দেখায়নি। বরং সবসময়ই ভারতীয়দের প্রশাসনের বাইরে রাখতে চেয়েছে। তাছাড়া বাঙালি ভদ্রলোকের কাছেও তাদের ঘোষিত বেতন আকর্ষণীয় মনে হয়নি। তাদের নীতিগত দুর্বলতার কারণেই সংশোধনের ভূমিকা পালন না করে দুর্নীতির স্থানে পরিণত হয়েছিল কয়েদখানাগুলো।

আহমেদ দীন রুমি: লেখক