বাংলার কারাগার নিয়ে বাংলার সংসদে বারবার আলোচনা হয়েছে। একদা কারাগারে ভুক্তভোগী এবং পরে সম্মানিত জনপ্রতিনিধি এমন অনেকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেছেন, ‘পৃথিবীর নিকৃষ্টতম কারাগারগুলোর অন্যতম বাংলার কারাগার’। একজন সদস্য বলেছেন, ‘পৃথিবীর নরককুণ্ড বাংলার কারাগার’।
বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির ১৯৪৩ সালের বাজেট অধিবেশনে কারাগার ও কয়েদি পুনর্বাসন খাতে বরাদ্দকৃত ৫৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকার যথার্থতা নিয়ে আলোচনা চলছে। ছাঁটাই প্রস্তাবে হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের বর্ণনায় বাংলার কারাগার, ‘সাধারণ কয়েদিদের প্রতি পশুর অধম ব্যবহার করা হয়। যে ঘরে থাকার কথা ৩০ জন সেখানে থাকে ২৫০ জন। রাতে প্রস্রাবের টব ভর্তি হয়ে উপচে পড়ে। খালি পায়ে তার ওপর দিয়ে চলাফেরা করে সব একাকার হয়। দুইখানি করে কম্বল দেয়ার কথা, এখন একখানি করেও জোটে না। জাঙ্গিয়া ও কুর্তাও বরাদ্দমতো তারা পায় না। অতি নোংরা শতচ্ছিন্ন পুরনো জাঙ্গিয়াই অধিকাংশের পরনে। যারা হাজতি তারা তো কিছুই পায় না। অনেকের পরনে মাত্র একখানি গামছাই সম্বল। মাসের পর মাস ওই একখানি গামছা পরেই তারা কাটায়। ওই ছিদ্রময় গামছায় লজ্জা নিবারণ হয় না। হাজতিদের কাপড় না থাকলে দেয়ার কথা আছে, দণ্ডিত লোকেরাই বরাদ্দ পায় না, তা আবার হাজতিরা!
প্রত্যেকের একটি করে থালা ও বাটি পাওয়ার কথা। সেই বাটিতে খাওয়া, টয়লেটের জন্য ব্যবহার করা, গোসল করা সবই। কিছুদিন হল দেয়া হচ্ছে কেবল একটি থালা। তাতেই সব সারতে হবে। এখন একটিও না। যে খাবার দেয়া হয় তা মানুষের অখাদ্য—তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অসহায় কয়েদি জেলের পাঁচিলের মধ্যে। পাবলিক অপিনিয়ন বলে কোন কিছু সেখানে নেই। লাথি, কিল, চড়, অবমাননা, লাঞ্ছনা, দুর্ব্যবহার যেন তাদের অবশ্য প্রাপ্য। অসহায় মানুষের চোখের জল, নির্যাতনে অপমানে, আত্মীয় বিয়োগব্যথায় কারান্তরালে ঝরে পড়ে, কেউ তার খোঁজ রাখে না। পৃথিবীর নরককুণ্ড বাংলার এ জেলখানা। সভ্যতার সর্বনিকৃষ্ট কলঙ্ক।’
এটা সবচেয়ে বড় সত্য কয়েদিদের জেলে পাঠানোই হয় যন্ত্রণা ও হরেক ধরনের শাস্তি ভোগের জন্য। জেলখানার স্টাফ আর মেডিকেল স্টাফের তখন প্রতিযোগিতা চলে কে কত বেশি শাস্তি দিতে পেরেছে, তারা সরাসরি নরহত্যা না করেও ঘাতকের ভূমিকাই পালন করছে। বাংলার জেলের ভেতর চলে স্বৈরাচারী সেপাইদের রাজত্ব। সেপাইরা কয়েদিদের মনুষ্য জ্ঞান করে না। তাদের সম্বোধন করে চোর, শালা, ডাকু, বদমাশ বলে। আর কয়েদিরা তাদের সম্বোধন করে বাবু কিংবা হুজুর। কয়েদিদের জন্য সে এক সন্ত্রাসের রাজত্ব। যখন খুশি ধোলাই আর বানান—মানে কয়েদিকে কম্বলে ঢেকে কয়েকজন বুট, ব্যাটন ও লাঠির আঘাতে তার জীবন বিপন্ন করে তুলবে; বাহ্যত কোনো আঘাত দেখা যাবে না। সেপাই ও চিকিৎসকদের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য কয়েদিদের আত্মহত্যার ঘটনা বিরল নয়।
ঢাকা জেলের একটি ঘটনার সাক্ষী আমার বন্ধু মাননীয় সদস্য মনোরঞ্জন ব্যানার্জি ও গিয়াসউদ্দিন আহমেদ; তারাও তখন জেলে। এক দরিদ্র অপরাধীকে ধোলাই করার পর আধ-অজ্ঞান অবস্থায় জেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে কিছুদিন থাকার পর কোমরে যন্ত্রণা রয়ে যাওয়ার কথা বললে চিকিৎসক তাকে বকাঝকা করেন এবং কোমরে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেন। শরীরে ফোস্কা পড়ে যায়। সেন্ট্রিদের অসতর্কতার সুযোগে হামাগুড়ি দিয়ে লোকটি বের হয়ে যায়, তার অভিযোগ শোনানোর জন্য জেল সুপারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সে জেলখানার ভেতর একটি গাছে উঠে পড়ে এবং উপরে উঠে আত্মহত্যার হুমকি দেয়। এ নিয়ে কয়েদিদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। জেল সুপার তাকে গাছ থেকে নামিয়ে আনার জন্য দুজন সেন্ট্রিকে গাছে তুলে দেন। সেন্ট্রি যখন তার কাছাকাছি, ধরা পড়ার পর আবার ধোলাই খেতে হবে এই আশঙ্কায় সে গাছ থেকে লাফ দেয়। এবং সেখানেই তার নির্মম মৃত্যু হয়। আমার স্মৃতি যদি আমাকে বিভ্রান্ত না করে, তখন ছিল এপ্রিলের ভয়ংকর গরম, দিনটি ছিল শনিবার। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে লোকটি যখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই জেল সুপার দাঁড়িয়ে দেখেছেন, এক ফোঁটা পানিও তার মুখে দেয়া হয়নি। আর কয়েকজন কয়েদি তখন দরকারি পাখা নিয়ে জেল সুপারকে বাতাস করছে। আমি হিজলি জেলে দেখেছি বিনা অপরাধে সব কয়েদিকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ জেলখানায় একদিকে দেয়াল নেই, গাছে কাঁটাতারের বেষ্টনী।
বিভিন্ন সময় কারাগার নিয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে তার কয়েকটি তুলে ধরছি। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল এবং বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি ইংরেজিতে পরিচালিত হতো, কার্যবিবরণীর ভাষা ইংরেজি। কাজেই এ রচনার প্রধান অংশই অনূদিত।
ইউরোপিয়ানদের সাবান: বাঙালিদের শর্ষের তেল
১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের অধিবেশন চলছে। তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন করছে কাউন্সিলের সদস্য সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী। তার যত উদ্বেগ কয়েদিদের নিয়ে। জবাব দেবেন জেলখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী প্রভাস চন্দর মিত্র। স্বরাষ্ট্রসহ অনেকগুলো বিভাগ তাকে দেখতে হয়।
প্রশ্ন: ক. রাজনৈতিক (জেল) বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কি জানেন গোসলের আগে ইউরোপিয়ান ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা গায়ে সাবান মাখে আর বাঙালিরা গোসলের আগে শরীরে মাখে তেল?
খ. ওপরের প্রশ্নের প্রথম ভাগ সত্যি হয়ে থাকলে ইউরোপিয়ান ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কয়েদিরা গোসলের জন্য সাবানের নিয়মিত সরবরাহ পেয়ে থাকেন কি?
গ. প্রশ্নের দ্বিতীয় ভাগ সত্যি হয়ে থাকলে সাধারণ বাঙালি/ভারতীয় কয়েদিরা গোসলের জন্য তেলের নিয়মিত সরবরাহ পেয়ে থাকেন কি?
ঘ. এটা কি সত্য নয় যে জেলখানাগুলোয় কয়েদিদের জন্য তেল সরবরাহ করা হয় না? তেল ব্যবহার না করার কারণে বাংলার জেলখানাগুলোয় কতজন কয়েদির চর্মরোগ হয়েছে সে পরিসংখ্যান মাননীয় মন্ত্রীর জানা আছে কি?
প্রভাস চন্দর মিত্র কেবল এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যই নন, স্যার উপাধিপ্রাপ্ত। ইউরোপিয়ান ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানরা সাবান ব্যবহার করে কিনা এ প্রশ্নটি তিনি এড়িয়ে গেলেন। প্রথম প্রশ্নটির জবাবে বললেন, সাধারণ কয়েদিদের কেউ কেউ গায়ে তেল মেখে থাকে, কেউ কেউ তেল পছন্দ করে না।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বললেন, কে তেল পাবেন আর কে সাবান পাবেন তা নির্ভর করবে কয়েদিদের কে কোন ক্লাস পেয়েছেন তার ওপর। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদি হলে তার সাবান পাওয়ার অধিকার জন্মে এবং সেভাবেই সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পরের প্রশ্নটির একেবারে সাফ জবাব। তৃতীয় শ্রেণীর হলে সাবান পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তেল মাখার সুযোগও তারা পান না। তবে চিকিৎসাগত কারণে ডাক্তার যদি তেল দিতে বলেন, কেবল তখনই সেই নির্দিষ্ট কয়েদির জন্য তেল সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
শেষ প্রশ্নের জবাব ছিল, তেল ব্যবহার না করায় কতজন কয়েদির চর্মরোগ হয়েছে তা আমার জানা নেই। এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান রাখা হয় না।
সম্পূরক প্রশ্ন নিয়ে এলেন সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী বলেন, উচ্চ শ্রেণীর কয়েদিদের সবাই তেল মাখে কিনা বলুন।
মন্ত্রী বললেন, আমি মনে করি অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। এটা অভ্যাসের ব্যাপার।
সতীশ চন্দ্র রায় চৌধুরী জিজ্ঞাসা করেন, গায়ে তেল মাখতে না পারার কারণে কয়েদিরা কি কোনো ধরনের অস্বস্তিতে ভোগেন?
মন্ত্রী বললেন, আমার ভালো জানা নেই। আমি ব্যাপারটা খতিয়ে দেখব এবং সম্ভব হলে গায়ে তেল মাখানোর ব্যবস্থা করা যায় কিনা পরীক্ষা করে দেখব।
স্যার প্রভাস চন্দর মিত্র তেলের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তবু মাননীয় মন্ত্রীকে ধন্যবাদ।
মাংসটা কি হালাল না হারাম
১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১। রাজনৈতিক (জেল) বিভাগের দায়িত্বে স্যার প্রভাস চন্দর মিত্র। হুগলি থেকে নির্বাচিত সদস্য মৌলভি আবদুস সামাদ মাংস নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন করলেন:
ক. হুগলি জেলে মুসলমান কয়েদিদের যে মাংস সরবরাহ করা হয় তা কি হালাল?
খ. মাংসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সেখানে কি কোনো ঘটনা ঘটেছে?
গ. মুসলমান কয়েদিরা তাদের জন্য সরবরাহ করা মাংস খায়নি, এ তথ্য মাননীয় মন্ত্রীর জানা আছে কি?
ঘ. আগের প্রশ্নটির উত্তর যদি হ্যাঁ হয়ে থাকে, তাহলে এ ধরনের আপত্তিকর মাংস সরবরাহ রোধ করার জন্য সরকার কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে?
ঙ. মুসলমান কয়েদিদের জন্য হালাল মাংস সরবরাহের ক্ষেত্রে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে?
মন্ত্রী সবগুলো প্রশ্নের একত্রে জবাব দিলেন। তিনি বললেন, একদিন জানা যায় যে মুসলমান কয়েদিদের আহার্য মাংস একটি হিন্দু মালিকানাধীন দোকান থেকে আনা হয়েছে। এ নিয়ে মুসলমান কয়েদিরা কোনো আপত্তি জানায়নি, তবে জেলখানার একজন স্টাফ বিষয়টি জেলারকে জানান। পরে আর হিন্দু মালিকের দোকান থেকে মাংস আনা হয়নি। মুসলমান মালিকানাধীন দোকান থেকে সরবরাহ নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর আগে ঠিকাদার যে দরে জেলখানায় মাংস সরবরাহ করত, তা বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। সেজন্য জেল সুপার ও মেডিকেল অফিসারের তত্ত্বাবধানে বাজার যাচাই করে খোলাবাজার থেকে মাংস ক্রয় করা হয়। ঘটনাচক্রে ওই দোকানটি হিন্দু মালিকানাধীন।
অন্য একজন মুসলমান সদস্য মৌলবি সৈয়দ বকশ তখন জিজ্ঞানা করলেন, মাননীয় মন্ত্রী কি নিশ্চিত যে সেই মাংসটা ভালো ছিল?
মন্ত্রী বললেন, এর বেশি কিছু আমার জানা নেই। যারা খেয়েছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন।
কারাগারে মশারি চাই
দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী স্যার স্টিফেনসন। তিনি ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য। সদস্য তারকানাথ মুখার্জি বললেন:
ক. মাননীয় মন্ত্রী কি জানেন, জেলখানার অনেক কয়েদি ম্যালেরিয়ায় ভুগছে?
খ. ম্যালেরিয়াপ্রবণ জেলগুলোর জেলখানায় মশারি সরবরাহের কোনো সিদ্ধান্ত কি সরকার গ্রহণ করেছে?
গ. এই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ হয়ে থাকে তাহলে বিষাক্ত মশার আক্রমণ থেকে নিরীহ কয়েদিদের রক্ষা করার জন্য সরকার আর কী বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে?
স্যার স্টিফেনসন বললেন, জেলখানায় কোনো কোনো কয়েদির যে ম্যালেরিয়া হয়েছে, তা তিনি বেশ ভালোই জানেন। যেসব জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রকোপ রয়েছে সেই সব জেলার জেলখানায় মশারি সরবরাহের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। তবে ম্যালেরিয়ায় ভুগলে কয়েদিদের জেল হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে। জেল হাসপাতালে মশারির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে তারা মশারির নিচে মশার ধরাছোঁয়ার বাইরে ঘুমাতে পারে। কাকে জেল হাসপাতালে পাঠানো হবে, কাকে পাঠানো হবে না, সে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন মেডিকেল অফিসার।
মন্ত্রী আরো বললেন, কেরোসিন ও অন্যান্য ওষুধ ছিটিয়ে মশার জন্মস্থানগুলো নষ্ট করা হচ্ছে। তাছাড়া কোনো কয়েদি ম্যালেরিয়া রোগী হলে এবং মেডিকেল অফিসার উপযুক্ত মনে করলে তাকে কুইনিনও খাইয়ে দিতে পারেন। চাহিদা অনুযায়ী জেলখানায় কুইনিন সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
কয়েদিদের দুঃখ-কষ্ট
৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩১। মুর্শিদাবাদের সদস্য মৌলভি আবদুস সামাদ মন্ত্রী স্যার প্রভাস চন্দর মিত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন:
ক. মাননীয় মন্ত্রী কি জানেন যে স্বাস্থ্য ও বয়সের দিকে লক্ষ না রেখে হুগলি জেলে কয়েদিদের কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়ে থাকে?
খ. এটা কি সত্যি যে প্রতিবাদ করলে তাদের মারধর করা হয় এবং আরো শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়?
সব প্রশ্নের একই উত্তর দিলেন মাননীয় মন্ত্রী। উত্তরটি হচ্ছে ‘না’।
মৌলভি আবদুস সামাদ আবার জিজ্ঞাসা করলেন, যেসব কয়েদিকে দিয়ে ঘানি টানানো হয়, জেলবিধি লঙ্ঘন করে রোববারেও তাদের বাগানে কাজ করতে বাধ্য করা হয়, এই অভিযোগ কি মন্ত্রী অস্বীকার করতে পারবেন?
মন্ত্রী বললেন, এ নিয়ে কোনো জবরদস্তি করা হয় না। যারা স্বেচ্ছায় কাজ করতে চায়, তাদেরই এ সুযোগ দেয়া হয়। আর এই সুযোগের বিনিময়ে তারা কারাবাসকালে বিভিন্ন ধরনের রেয়াতও পেয়ে থাকে।
পাদটীকা: জেল হাসপাতালে রোগীদের ঠাঁই হয় না। সুগঠিত পেশিবহুল, অর্থবহুল স্বল্পকালীন কয়েদিরা সেখানে থাকেন। কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কয়েদিরা তাদের হাত-পা টিপে ধন্য হয়।
জেলের খাবার
বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের আগস্ট ১৯২৯ অধিবেশনে ঢাকার সদস্য প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলীর একটি প্রশ্ন: এটা কি সত্য যে জেলখানায় কয়েদিদের বেঙ্গলি খাবার, বিহারি খাবার, পাঞ্জাবি খাবার, বার্মিজ খাবার ইত্যাদি হরেক রকম খাবার সরবরাহ করা হয়? এর কারণ কী?
দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য স্যার প্রভাস চন্দর মিত্রের উত্তর: আসলে দুই ধরনের খাবার দেয়া হয়। বিহারে খাবারে দৈনিক ৭ ছটাক চাল ও ৫ ছটাক আটা থাকে। বেঙ্গলি খাবারে কোনো আটা নেই, ১২ ছটাক চাল থাকে। পাঞ্জাব, যুক্ত প্রদেশ এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের কয়েদিদের বেলায় বিহারি খাবারের মধ্যেই সামান্য হেরফের করা হয়ে থাকে। পরের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, যখন বাংলা ও বিহার একত্রে ছিল সে সময় থেকেই দুই ধরনের খাবার কয়েদিদের প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখে চালানো হচ্ছে।
প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলী আবার জিজ্ঞেস করলেন, যেখানে বাংলার জেলে বার্মিজ খাবার নেই সেখানে সরকার বার্মার কয়েদিদের গ্রহণ করছে কেন?
উত্তর: কারণ তারা পাঠায়, তাই।
প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলী ৬ আগস্ট ১৯২৯ জিজ্ঞেস করেন: বাংলার জেলে বার্মার রাজনৈতিক কয়েদি রয়েছে কি? যদি থাকে তাহলে তাকে কি বার্মিজ খাবার দেয়া হচ্ছে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে কেন দেয়া হচ্ছে না?
প্রশ্নের জবাবে মাননীয় সদস্য প্রভাস চন্দর মিত্র জানালেন, ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২৪-এ ধারায় অপরাধে (রাষ্ট্রদ্রোহিতা) দোষী সাব্যস্ত হয়ে একজন বার্মিজ বাংলার জেলে অবস্থান করছেন। তার শরীর স্বাস্থ্য ভালোই আছে। তবে বিশেষ খাবার দেয়ার কোনো দরকার নেই।
ঢাকার সদস্য কিরণ শঙ্কর রায় তখন জিজ্ঞেস করলেন কয়েদি বার্মিজ খাবার খেতে চাচ্ছেন কিনা তা কি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে?
উত্তর: এ প্রশ্নের জন্য আমাকে নোটিস দিতে হবে।
তাকে আর নোটিস দেয়া হয়নি। তবে বাংলার জেলে যেন বার্মিজ কয়েদি গ্রহণ করা না হয় সে অনুরোধ জানানো হয়। মন্ত্রী কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
জেলখানার খাবারে পেঁয়াজ
৭ নভেম্বর ১৯৩২ পণ্ডিত সত্যেন্দ্রনাথ সেন লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে প্রশ্ন রাখলেন:
ক. এটা কি সত্য কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন জেলখানাগুলোয় কয়েদিদের খাবার তৈরিতে পেঁয়াজ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান?
খ. সরকার কি অবহিত যে শাস্ত্র অনুযায়ী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের পেঁয়াজ ভক্ষণ নিষিদ্ধ?
গ. জেলখানা অবস্থানকারী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের খাবারে পেঁয়াজের ব্যবহার বন্ধ করতে সরকার কি সম্মত? অথবা যাদের পেঁয়াজের ব্যাপারে আপত্তি রয়েছে, তাদের কি নিজস্ব রান্না করার অনুমতি দেয়া হবে?
স্বরাষ্ট্র এবং জেল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য এইচজি হেইগ জবাব দিলেন:
ক. পেঁয়াজ স্কার্ভি রোগ প্রতিহত করতে সাহায্য করে, সেজন্য কয়েদিদের জন্য নির্ধারিত খাবারে পেঁয়াজ মেশানো হয়, তবে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সব কারাগারে পেঁয়াজ সরবরাহ দেয়া হয় না।
খ. শাস্ত্রের যে নির্দেশনার কথা বলেছেন, আমি সে ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না।
গ. জেলখানার খাবারে পেঁয়াজ ব্যবহার নিয়ে কোনো অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই। বরং বাংলার যেসব কয়েদিকে আন্দামান জেলে পাঠানো হয়েছে, তারা খাবারে পেঁয়াজ দেয়ার দাবি জানিয়েছে।
নিজের ক্ষুরে দাড়ি কাটা
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০। বি. মুখার্জির তারকাচিহ্নিত প্রশ্ন : ক) স্বরাষ্ট্র (কারাগার) বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী অবগত আছেন কি যে:
১. ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এই প্রদেশে বলবৎ হওয়ার আগ থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদিরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পেত, কারাগারের ইন্সপেক্টর জেনারেল তার অনেকগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছেন;
২. এ রকম একটি প্রাধিকার সুবিধা নিজ খরচে নিরাপদ ক্ষুর কিনে তা ব্যবহার করার অধিকার;
৩. ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কয়েদিরা নিজেদের ক্ষুর ব্যবহার করার অনুমতি পাচ্ছেন?
খ) যদি ক ৩ প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ-বোধক হয়, তাহলে মন্ত্রী মহোদয় দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের নিজ খরচে ক্ষুর ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন কি?
দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা স্যার নাজিমউদ্দিনের জবাব:
ক) ১. না।
২. বেঙ্গল জেল কোডের বিধান অনুযায়ী এ ধরনের সুযোগ কখনো দেয়া হয়নি।
৩. আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।
খ) এ প্রশ্ন অবান্তর।
সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাসের সম্পূরক প্রশ্ন: মন্ত্রী মহোদয় বলবেন কি দ্বিতীয় শ্রেণীর কয়েদিদের কখনো নিজের ক্ষুর ব্যবহার করার সুযোগ প্রদান করা হয়েছিল কি?
মন্ত্রী বললেন, না, হয়নি। কিন্তু যা ঘটেছে তা হচ্ছে আন্দামানের কয়েদিদের সেখানকার আইনে নিজের ক্ষুর কিনে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়া হতো, যা বাংলার আইনে নেই। আন্দামান থেকে বাংলার ফিরে আসার পর আলিপুর জেলে তাদের জন্য নাপিতের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত নিজের ক্ষুর রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
মন্ত্রীর জবাবের পর শিবনাথ ব্যানার্জি প্রশ্ন করলেন, মন্ত্রী মহোদয় কি বলবেন কয়েদিদের নিরাপদ ক্ষুর রাখার অনুমতি দিতে আপত্তি কোথায়?
মন্ত্রী বললেন, কয়েদিদের কাছে ধারালো কোনো কিছু রাখার উপদেশ দেয়াটা সমীচীন বলে আমি মনে করি না।
শিবনাথ ব্যানার্জি বললেন, এমন কিছু ঘটেছে, যা আবার ঘটতে পারে বলে মন্ত্রী শঙ্কিত?
মন্ত্রী বললেন, নিরাপদ ক্ষুর ব্যবহার করে হয়তো কোনো ঘটনা ঘটেনি, কিন্তু তা ব্যবহার করে ঘটাতেও তো পারে।
এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা





