পঙ্‌ক্তিটি কাজী নজরুল ইসলামের শেকল ভাঙা গানের। কিন্তু লেখাটি শেকল ভাঙা নিয়ে নয়, শেকলটাকে অভঙ্গুর করতে সে কালের বাংলায় যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে তা নিয়ে।

৫ এপ্রিল ১৮৩৪। ম্যাজিস্ট্রেট ও জেল সুপারিনটেনডেন্ট থমাস ডেভিড রিচার্ডসন তার প্রিয় একটি ঘোড়ায় প্রাতঃকালীন চক্কর দিয়ে আলিপুর কারাগারে এলেন। এটি তার রুটিন কাজ। সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের একটি দল কাজ করছিল। ডেভিড রিচার্ডসন এগিয়ে এলেন। হঠাৎ পেছন থেকে যাবজ্জীবন দণ্ডিত কয়েদি দৃকপাল সিং তার হাতের পেতলের থালা দিয়ে তার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করতেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। ওমনি এগিয়ে এল আরো কিছু কয়েদি। তারাও পেতলের থালা ও মুগুর দিয়ে তাকে আঘাত করতে শুরু করল। মৃত্যু হলো ভারতবর্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত আলিপুর কারাগারের প্রধান নির্বাহী জেল সুপারিনটেনডেন্ট রিচার্ডসনের। এ ঘটনা ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিল। লর্ড ম্যাকলে বললেন কারাগারগুলোতে দরকার Good machinery for the infliction of Punishment.

গঠিত হলো কারা কমিশন। গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংকের কাউন্সিল সদস্য এইচ শেকসপিয়র (বিখ্যাত নাট্যকার কবি ডব্লিউ শেকসপিয়রের বংশধর কিনা তা অজ্ঞাত) ২ জানুয়ারি ১৮৩৬ লর্ড অকল্যান্ডের কাছে কারা সংস্কার সুপারিশমালা পেশ করলেন। তার অন্যতম সুপারিশ ছিল অপরাধীদের নৈতিক শিক্ষা আর ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে লাভ নেই, এতে তারা একটুও বদলাবে না। তার চেয়ে সশ্রম কারাদণ্ড বৃদ্ধি করে কারা প্রশাসন শক্তিশালী করা হোক।

১৭৫৭ সালে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা লর্ড ক্লাইভের কাছে পরাস্ত এবং দেশীয় স্বজনদের হাতে নিহত হলেন। ১৮৫৭-তে সিপাহি বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসকদের আতঙ্ক বাড়িয়ে দিল। কোম্পানি শাসনের সমাপ্ত ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশরাজের শাসনে চলে এল ভারতবর্ষ। শাসন সহায়ক সব সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ শুরু হলো। এ সময় জেলাখানাগুলোর বড় কর্তার আপগ্রেডেশন হলো। ভারতে লোয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর কারাগারগুলোর ইন্সপেক্টর জেনারেল হলেন ফ্রেডরিক জে মুয়াট। ১৭৯৩ থেকে ১৮৫৮ পর্যন্ত প্রশাসন চালিয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরাজ ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলে ১৮৫৮ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল ব্রিটিশরাজের হাতে। ১৯৫৮ সালেই গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট জারি হয়। 

ওল্ড আলিপুর গোল (গোল মানে কারাগার, শৈশবের পাঠ স্মরণ করুন) ১৮১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি প্রেসিডেন্সি জেল হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ১৮৫৮ সালের ২০ ডিসেম্বর ফ্রেড মুয়াট ভারত সরকারের কাছে যে কারা প্রতিবেদন দাখিল করেন সে আলোচনায় যাওয়ার আগে আলিপুর কারাগারের কজন স্বনামধন্য কয়েদির নাম উল্লেখ করছি। তারা হলেন অরবিন্দ, দুদু মিয়া, সুভাষ চন্দ্র বসু, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, গোপীনাথ সাহা, দিনেশ গুপ্ত, বিধান চন্দ্র রায়, পারুল মুখার্জি, চারু মজুমদার প্রমুখ। আলিপুর জেলে যেসব দেশদ্রোহীর (অন্তত সরকারের দৃষ্টিতে) ফাঁসি হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, চারুচন্দ্র বসু, বীরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, গোপীনাথ সাহা, প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী, অনন্তহরি মিত্র, রাজকৃষ্ণ বিশ্বাস, দিনেশ গুপ্ত ও দিনেশ মজুমদার। ১৮৫৮ সালে বিরাজমান বাংলা ও বার্মায় স্থায়ী কারাগার আলিপুর কারাগার, বারাসাত, ভাগলপুর, নদীয়া, যশোর, বর্ধমান, হুগলি, বাঁকুড়া, আকিয়া, স্যান্ডোয়ে, রামরি, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর ঢাকা, ফরিদপুর চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা (কুমিল্লা) ও নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ। সিপাহি বিদ্রোহের পরই গুরুতর অপরাধীদের জন্য আন্দামান দ্বীপে একটি পেনাল সেটলমেন্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব ছিল ইন্সপেক্টর জেনারেল মুয়াটের ওপর। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তিনি আন্দামান সফরে যেতে পারেননি বলে উল্লেখ করেছেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৯৬ সালে এর নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯০৬ সালে সমাপ্ত হয়। কারাগার মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদন থেকে গৃহীত কিছু ঐতিহাসিক ও কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য:

৩০ এপ্রিল ১৮৫৮ বাংলা ও বার্মার কারাগারগুলোয় মোট কয়েদির সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৭০। এর মধ্যে পুরুষ ১৯ হাজার ৩০০ এবং নারী ৫৭০ জন। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পুরুষ কয়েদি ১ হাজার ৭২ ও নারী কয়েদি ১৭৫। ভয়ংকর চরিত্রের এবং বিশেষ নিরাপত্তায় অন্তরীণ পুরুষ ২৪২ এবং নারী একজন। রাজবন্দি পুরুষ ১৭ ও নারী একজন। মানসিক অসুস্থ পুরুষ ৪৮, নারী একজন। অনেক জেল ওয়ার্ডে কয়েদির সংখ্যা ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি। এতে কয়েদিদের মধ্যে রোগ সংক্রমণ বাড়ছে এবং স্বাস্থ্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। ১৮৫৭-৫৮ বছরে (সে সময় বছরের শুরু ধরা হতো ১ মে থেকে আর শেষ ৩০ এপ্রিল) ৫ হাজার ৬৭১ সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে জেলখানার শিল্প ও কারখানায় নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ভয়ংকর অপরাধীদের আউটডোর শ্রম বিশেষত রাস্তা নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এতে তাদের পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাদের সঠিক নজরদারিতে রাখার মতো পর্যাপ্ত জনবলও কারা প্রশাসনের নেই। তার পরও গত ৩০ বছরে ২ হাজার ৫৯৯ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিকে রাস্তা নির্মাণকাজে নামানো হয়েছে। এখন ইনডোর কাজে বেশি জোর দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আলিপুর জেলের ছাপাখানা আরো বড় করা হয়েছে এবং এটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি ছাপাখানায় পরিণত হয়েছে।

কারাগারের কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রী থেকে ২ লাখ ২ হাজার ৩৩১ টাকা আয় হয়েছে, ২০ হাজার ১৬২ টাকার সামগ্রী রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ৫১ হাজার ৩৩৮ টাকায় মালপত্র বর্তমানে গুদামে মজুদ আছে। কারা প্রশাসনের শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতি ঘটায় আয় বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ পাঁচটি কারাগারের আয়ের একটি তুলনামূলক বিবরণী টাকার অংকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। 

কারাগারে কয়েদি রাখতে রাষ্ট্রের কয়েদিপিছু ব্যয়ের একটি হিসাব প্রতিবেদনে উঠে এসেছে (১৮৫৭-৫৮)

হুগলি-২৯ টাকা

যশোর-৪১ টাকা

আলিপুর-৩৫ টাকা

ঢাকা-৩৭ টাকা

এ সময় কারাগারে উৎপাদন কর্মে নিয়োজিত কয়েদির আয়

হুগলি-৭০ টাকা

যশোর-৪৫ টাকা

আলিপুর-৩৫ টাকা

ঢাকা-৩৬ টাকা

সড়ক নির্মাণ কয়েদি শ্রমিকের শ্রমমূল্য ১ লাখ ২৯ হাজার ১৪১ টাকা, জেলখানায় বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত কয়েদি শ্রমিকের শ্রমমূল্য ৭৬ হাজার ৫৬০ টাকা। সব মিলিয়ে কয়েদিদের আয় ৪ লাখ ৪৯ হাজার ১৭২ টাকা। একই সময়ে (১৮৫৭-৫৮ সালে) কয়েদি ও কারাগার প্রশাসনের মোট ব্যয় ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৬০৪ টাকা। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি অর্থ উঠে এসেছে।

১৮ হাজার ৮৯০ জন কয়েদির রেশনের জন্য খরচ হয়েছে ৪ লাখ ৭ হাজার ৪৯২ টাকা, কয়েদিপ্রতি বার্ষিক খরচ ২২ টাকা ৫ আনা। কয়েদিদের বিছানা ও পোশাকে ব্যয় হয়েছে ৪৯ হাজার ১৩৫ টাকা। কয়েক বছর ধরে দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিও ছিল লক্ষণীয়। ওষুধের জন্য খরচ হয়েছে ১৮ হাজার ৫৯২ টাকা এবং এর মধ্যে ৫ হাজার ১৮৯ টাকা লেগেছে ইউরোপীয় ওষুধের জন্য। ইংরেজ ও ইউরোপীয় কয়েদিরা অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত।

১৮৫৭-এর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেছে ২ হাজার ১২০ জন কয়েদি। তাদের মধ্যে ছয়জন নারী। মৃতদের ধর্মভিত্তিক ভাগ:

হিন্দু কয়েদি: ১৩৭৩

মুসলমান কয়েদি: ৫৮৫

অন্যান্য: ১১৯ 

ধর্ম অনুল্লেখিত: ১৩

মোট: ২১২০

মৃত্যুর হার মোট কয়েদির ১ দশমিক ৭২৭ শতাংশ। মৃতদের মধ্যে ৫২৬ জনের কারাবাসকালের মেয়াদ তিন মাসের কম এবং ৪৭৮ জনের দুই বছরের অধিক। এদের মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তও রয়েছে। ২ হাজার ১২০ মৃত্যুর ২৩৬ (১১.১৩ শতাংশ) জন বার্ধক্যজনিত কারণে প্রয়াত, যেখানে কলেরায় মৃত ৩৮৮ (১৮.৩০ শতাংশ)। মোট ৯৯৭ (৪৭.০৩ শতাংশ) জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত হয়। কারা মহাপরিদর্শক তার প্রতিবেদনে বলেছেন ১ হাজার ১০৭টি মৃত্যুর জন্য জেল কর্তৃপক্ষ কোনো না কোনোভাবে কমবেশি দায়ী। জেলখানায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা থাকলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। কারামৃত্যু নিয়ে ফ্রেড মুয়াটের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। 

১. জেলখানায় মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুরা বেশি অসুস্থ হচ্ছে।

২. ২০১০ জনের মধ্যে ৫২৬ জন কারাগারে আসার আগে থেকেই অসুস্থ ছিল।

৩. বিনাশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের তুলনায় সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের বেশি মৃত্যু হয়।

৪. সাত ভাগের এক ভাগ মৃত্যু বার্ধক্য ও ক্ষয়জনিত।

৫. নিজ জেলার কারাগারে যেসব কয়েদি তারা অন্য জেলার কয়েদির তুলনায় বেশি অসুস্থ থাকছে (১৮৫৭ সালের পর্যবেক্ষণ)।

৬. নারীর রোগাক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুবরণ করা পুরুষের তুলনায় অনেক কম।

৭. আমাশয় ও ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু আগের তুলনায় কমে এসেছে।

৮. শ্বাসকষ্টজনিত মৃত্যুহার বাড়ার বড় কারণ পোশাকের স্বল্পতা এবং অনেক ক্ষেত্রে স্যাঁতসেঁতে ও ঠাণ্ডা জায়গায় শয়ন।

৯. চর্মরোগ স্কার্ভি কমে আসছে।

১০. কৃষি শ্রমিকরা কারারুদ্ধ অবস্থায় সবচেয়ে কম মানিয়ে নিতে পারে এবং বেশি ভোগে।

সিপাহি বিদ্রোহের সময় বেশ কটি জেল ভাঙা ও বিদ্রোহীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পলাতক ১ হাজার ৬১২ কয়েদির মধ্যে ৯৩৬ জনকে পুনরায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তাদের ধরতে ১ হাজার ৩৮৪ টাকা ব্যয় হয়েছে। তাদের হাতে একজন বরকন্দাজের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রেড মুয়াট তখন অফিস করতেন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে। তিনি প্রতিবেদনটি ২০ ডিসেম্বর ১৮৫৮ সই করছেন। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মোট কয়েদি ৭৭০২৩ জন এবং পশ্চিমবঙ্গে ১,০১,২৯৭ জন। সবচেয়ে বেশি কয়েদি চীনে ১ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের কয়েদি ১ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন।

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক