কারাগার এমন এক জায়গা যেখানে নানা ধরনের মানুষ এক ছাদের তলায় বাস করে। এরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে এসেছে, কেউ সহিংস আচরণ করতে পারে, আবার থাকে সাধারণ নিরীহ মানুষও। তাই কারাগার পরিচালনায় প্রয়োজন একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ, যাকে প্রিজন ডিসিপ্লিন বলা হয়। কলকাতার সদর নিজামত আদালতই ছিল ভারতবর্ষের প্রথম প্রতিষ্ঠান, যা এ নিয়ে কাজ করে। এ আদালত ১৮১১ সালে বাংলায় জেল প্রশাসনের জন্য কিছু নিয়ম-নীতি জারি করে। তবে সর্বজনীন আইন না থাকা ও কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে এ নিয়ম খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ১৮৩৪ সালেও বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, যা ব্যর্থ হয়। অসংগতিপূর্ণ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নীতিনির্ধারকরা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে যান। কারাগারের শৃঙ্খলা ও অন্য বৃহৎ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্য পার্থক্য হলো সব ক্ষেত্রে দুটি শ্রেণী থাকে। একটি পরিচালক শ্রেণী, অন্যটি অধীনস্থ শ্রেণী বা বন্দি শ্রেণী। বাইরের প্রতিষ্ঠানে অধীনস্থ শ্রেণীর সঙ্গে বাকি জগতের যোগাযোগ থাকে, কিন্তু কারাবন্দিদের যোগাযোগ খুবই সীমিত, তারা সমাজ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত ও জনসম্মুখে নিন্দিত হয়। তাই এক্ষেত্রে শৃঙ্খলার নিয়মগুলো ভিন্ন ধরনের হয়।
কারাগারের শৃঙ্খলার ধারণাটি কারাগারের উদ্দেশ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে জেল শৃঙ্খলার বিষয়টি কাগজে-কলমে বিভিন্ন সময় পরিবর্তিত হয়েছিল। নতুন নিয়মে কারাগারে কয়েদিদের শারীরিক নির্যাতন নয়; কেবল সাজা ভোগের সময়ে বন্দি থাকা ও সংশোধনের সুযোগ দেয়াই ছিল কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এভাবে কারাগার ব্যবস্থাপনার আধুনিক নিয়মে কারা শৃঙ্খলার উপযুক্ত কারা ভবন, কারারক্ষী, প্রশিক্ষিত কারা কর্মকর্তা নিয়োগ ও পরিচালনায় নিয়োজিত করা হয়। এ প্রশিক্ষিত কর্মীরা পরিদর্শন, কর্মসংস্থান, তত্ত্বাবধান ও পরিচালনায় কাজ করেন। শৃঙ্খলার বিশেষ দিক হলো যদি ভবনগুলো সঠিক কাঠামোয় থাকে তাহলে কারাবন্দিদের পরিচালনা করতে সহজ হয়। ভারতের ১৮৬৪ জেল কোড ও ১৮৯৪ জেল আইনের অন্যতম অংশ ছিল আদর্শ ভবন। একটি কারাগারের জন্য নির্বাচিত স্থানটি জলাভূমি থেকে মুক্ত এমন স্থান হতে হবে। কারাগারের সেল তৈরিতে বেশকিছু বিষয় মেনে করতে হবে। কারা সেল কারাগারের মাঝের দিকে হলে ভালো, স্যাঁতসেঁতে, আলোহীন বা স্বল্প আলোর স্থানগুলো ত্যাগ করতে হবে। কারাগারে সেল কক্ষের উচ্চতা মেঝে থেকে অবশ্যই ১৫ ফুট হতে হবে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে ঔপনিবেশিক আমলে ভারতে প্রতিটি জেলই ছিল অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও অসংখ্য নিয়ম ভঙ্গের মাঝে তৈরি এবং নিরাপত্তাহীন। ভারতের কারাগারে বন্দিদের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর ঘাটতি ছিল। বাংলার কারাগারের মহাপরিদর্শক ফ্রেড মুয়াট কারাগার নিয়ে বলেছেন, বেশির ভাগ পুরনো কারাগার এমনভাবে তৈরি যেখানে পয়োনিষ্কাশন ও স্বাভাবিক বায়ু চলাচলের কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্বাস্থ্যবিধি
কারাগারে বন্দিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষের। বন্দিদের মধ্যে রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে পড়লে তা সমাজের সাধারণ মানুষের জন্যও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। মুয়াট বাংলা ও ভারতের কারাগারের জন্য প্রথম স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন করেন। ভারতীয় জেল আইন ১৮৩৪ ও ১৮৬৪ কারাগার স্বাস্থ্য কমিটির তথ্য অনুযায়ী বছরে কারা মৃত্যুহার হাজারে ৭৩ থেকে ৯৬ ছিল। ভারতের বন্দিরা বেশির ভাগ যে রোগগুলোয় ভুগছিল তা হলো আমাশয়, ডায়রিয়া, আলসার, ক্রমাগত জ্বর, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, যক্ষ্মা, রক্তস্বল্পতা এবং সংক্রামক রোগের ঘটনাও ঘটেছিল। একবার ১০ বছরের সমীক্ষায় দেখা গেছে, কলেরা সংক্রমণ ভারতের কারাগারে বেশি ছড়িয়েছিল। তাই এ রোগে মৃত্যুহারও বেশি। যক্ষ্মা বাংলায় সবচেয়ে বেশি কারামৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল। এর জন্য মূলত অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, স্বল্প জায়গা, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, বন্দিদের অপুষ্টি ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়। কারাগারে মৃত্যুহার বেশি হওয়ার পেছনে জেল প্রশাসনের দায় ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৮৬৪ সালে ১০ বছরের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, ভারতবর্ষের কারাগারে ৪৬ হাজার ৩০৯ জনের মৃত্যু ঘটেছে। জেল প্রশাসক এ বিষয়ে বলেছেন, মৃত্যুর হার মুক্ত জনসংখ্যার স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
জেল শ্রম
শাস্তির পরিবর্তিত পদ্ধতির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের বিষয়ে একটি আদর্শিক ভাবনা তৈরি হয়। সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান এখন দোষীদের নৈতিক সংস্কারের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হয়েছিল। এ সংস্কারগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা, শিল্প ও জেল শ্রম আনা হয়েছিল। জেলবন্দিদের কর্মসংস্থান করা জেল প্রশাসকদের জন্য অন্যতম কঠিন কাজ ছিল। যেহেতু কারাগারে বন্দিরা সবচেয়ে অলস সময় পার করে, ফলে ক্রমাগত অলস সময় বন্দিদের জীবনে অনেক বড় প্রভাব ফেলে। দুই শতাধিক বছর আগে ইংরেজ সংস্কারক হাওয়ার্ড দ্বারা প্রবর্তিত নিয়মে জোর দেয়া হয়েছিল যে কারাবন্দিদের কর্মের মাঝে রাখতে হবে। ফলে পরবর্তী মুক্ত জীবনে তারা স্বাভাবিক থাকতে পারবে। তা না হলে কারাগারে অলস সময় জীবনকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। সমাজ সংস্কারকরাও কঠিন শ্রমের ভিত্তি গড়ে তোলার কথাই বলেছেন। কারাগারে বন্দিদের শ্রমকে তাদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ ও যত্নের মাধ্যম হিসেবেই দেখা হয়েছে। তবে কারাগারে শ্রমের ধরন, বিষয়বস্তু নিয়ে কারা কর্মকর্তা, আইনপ্রণেতা ও পেনোলজিস্টদের মাঝে অসংখ্য মতভেদ ছিল। শ্রম শাস্তির একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে, কারাবাস নিজেই একটি শাস্তি, কারা শ্রম তার পাশাপাশি আরো কঠিন একটি অংশ, যা কঠোর শ্রমে কারাবাস নামে প্রতিফলিত হয়েছে। জেলে রান্না, বাগান করা, পোশাক তৈরি থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতার নানা কাজই ছিল কারাবাসীদের কাজ। তবে তাদের দাবি থাকত জেল প্রশাসকদের কাছে যেন বিনিময়ে কিছু সুবিধা দেয়া হয়। সাধারণত নগদ অর্থ প্রদানসহ জেলের পোশাক ছেড়ে সাধারণ কাপড় পরতে পারা, বিভিন্ন পুরস্কার অতিরিক্ত শ্রমের জন্য, এছাড়া সাজা কমে আসত বন্দিদের।
কারাগারে শিক্ষা
১৮৩৪ সালে জেল ডিসিপ্লিন কমিটির সদস্যদের দ্বারা কারাগারের বন্দিদের শিক্ষার বিষয়ে করা একটি কমিটির কথা ছিল দণ্ডপ্রাপ্তদের জন্য কোনো আলাদা নির্দিষ্ট অতিরিক্ত ব্যয় করা ঠিক হবে না। তাই দীর্ঘদিন কারাগারে শিক্ষার জন্য আলাদা কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ১৩২ কারা ধারায় বলা হয়েছিল, কারা শৃঙ্খলা শিক্ষা অনেক বড় প্রভাব ফেলবে কারা ব্যবস্থায়। তবে তা কখনই নিয়মিত করা হয়নি। জেলজীবনের অংশ হিসেবে এটি ছিল। উনিশ শতকে কারাবন্দিদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে কিছু বিষয় শেখানো হতো। তখন কারা শিক্ষা বলতে এতটুকুই ছিল। বর্তমানে কারাশিক্ষার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এখন কারাগার থেকে কোনো কারাবন্দি শিক্ষার্থী পরীক্ষাও দিতে পারছে।
সেলুলার সিস্টেম
কারাগার নিয়ে আলোচনায় সেল সিস্টেম অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কারাগারে চারটি সাধারণ সেল ব্যবস্থা ছিল। প্রথমত, কোন রকমের শ্রম ছাড়া বন্দিকে দিন-রাত একটি কক্ষে রাখা; দ্বিতীয়ত, নজরদারির মধ্যে সশ্রম একটি কক্ষে রাখা; তৃতীয়ত, রাতে শ্রমসহযোগীদের সঙ্গে এবং দিনে বন্দিদের সঙ্গে রাখা এবং চতুর্থত, অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গেই রাখা।
প্রথমটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছিল। তবে খুব বেশি অমানবিক, বন্দিদের জীবনের জন্য বিপজ্জনক ভেবে বাদ দেয়া হয়। দ্বিতীয়টি ছিল ১৮৬৫ ইংরেজ জেল আইন দ্বারা প্রবর্তিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সরাসরি সক্রিয় সবাইকে ব্রিটিশ সরকার কুখ্যাত সেলুলার বা কালাপানি সেলে বন্দি এবং নির্যাতন করতো। যা ছিল আন্দামানে অবস্থিত। ১৮৯২-৯৫-এ বেশকিছু নীতির পরিবর্তন ঘটেছিল গ্ল্যাডস্টোন নীতির ফলে। তবে কারাবন্দিদের জন্য সন্তোষজনক নয়। চতুর্থটি ছিল ভারত সরকার ধারা প্রবর্তিত। এপি হাওয়েন জেল শৃঙ্খলা নীতিতে এটিকে সাধারণ কারাবাসের ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলায় এখনো এ ধরনের সেল সিস্টেমই বেশি। তবে কারাগারে সমষ্টিগত সিস্টেম থেকে যতদিন না বের হবে ততদিন ভারতীয় কারা ব্যবস্থায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পৃথক ব্যবস্থার কঠোর প্রবক্তা ফ্রেড মুয়াট।
কারাগারে অপরাধ
১৮৯৪ সালে জেল আইন ধারা ৪৭ শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে নির্ধারণ করে দেয়। যেসব অপরাধে কারাগারের মধ্যেই আবার শাস্তি দেয়া হয় সেগুলোর মধ্যে আছে কারাগারের পোশাক ও অন্যান্য সম্পত্তি ধ্বংস করা, মারামারি করা, ঝগড়া করা, চুরি করা, মিথ্যা অভিযোগ করা, কারা কর্মকর্তাদের প্রতি অসম্মান করা, কাজকে অবহেলা করা অর্থাৎ ওই কাজ যা জেল শৃঙ্খলায় নিষিদ্ধ তাই অপরাধ। কারাগারে সাজা খাটা অবস্থায় আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে সাজা পেতে হবে। বাংলার কারাগারে জেল অপরাধের সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। ১৮৮৯ সালে কমিটি রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলা, পাঞ্জাব, অযোধ্যা, বোম্বে, মাদ্রাজ ও উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে সবচেয়ে বেশি জেল অপরাধ সংঘটিত হয়। কারাগারে মোট অপরাধের প্রায় অর্ধেকই সংঘটিত হয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ফলে।
কারা শাস্তিতে চুল কাটা
নারী বন্দিদের পুরুষ বন্দিদের তুলনায় বেশি সুবিধা দেয়া হতো ক্ষেত্রবিশেষে। তবে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের ফল ছিল কঠিন। কারাগার কর্তৃপক্ষ দ্বারা পরিচালিত শাস্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, নারী বন্দি যারা প্রায়ই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করত তাদের চুল কেটে দেয়া।
ফারিহা আজমিন: লেখক





