দুনিয়ার অন্যতম সুন্দর ও মূল্যবান ধাতু হলো স্বর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এ সোনালি ধাতু সম্পদ, শক্তি, ক্ষমতা, এমনকি ইচ্ছার প্রতীক হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। এছাড়া স্বর্ণ অনেক সংস্কৃতিতে পবিত্রতা বা কৃতিত্বের প্রতীক। স্বর্ণ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু জনশ্রুতি ও কাহিনী যুক্ত ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে (১৮৪৮ সাল) ও অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যে (১৮৫০ সাল) ‘গোল্ড রাশ’-এর পর অনেক শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিক লেখার জন্য নতুন পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে স্বর্ণ শিল্পকলা ও সাহিত্যে একটি অনন্য স্থান অর্জন করে। তখন থেকেই সাহিত্যে ও চলচ্চিত্রে স্বর্ণকে বা স্বর্ণের রঙকে প্রায়ই সুখ, ও আশাবাদের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়।

উপন্যাস ও ছোটগল্পের চেয়ে কবিতা কিংবা সংগীতে স্বর্ণ ও স্বর্ণকে প্রতীক বা উপমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

স্বর্ণের জন্য মানুষের আকুলতা ও অতৃপ্তি চিরকাল ধরে চলে আসছে এবং তা মার্কিন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক ও কবি হেরম্যান মেলভিল [১৮১৯-৯১] অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন Gold in the Mountain কবিতায়: 

Gold in the mountain,

And gold in the glen,

And greed in the heart,

Heaven having no part,

And unsatisfied men. 

অন্যদিকে রবার্ট ফ্রস্ট [১৮৭৪-১৯৬৩] প্রকৃতির ভিন্ন রূপ তুলে ধরার জন্য এবং জীবনের কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, তা বলার জন্য Nothing Gold Can Stay কবিতায় বলেছেন:

Nature’s first green is gold,

Her hardest hue to hold.

Her early leaf’s a flower;

But only so an hour.

Then leaf subsides to leaf.

So Eden sank to grief,

So dawn goes down to day.

Nothing gold can stay.

মার্কিন কবি এমিলি ডিকিনসন [১৮৩০-৮৬] The Moon Was But a Chin of Gold কবিতায় চাঁদকে রুপালি অবয়ব হিসেবে দেখেননি, বরং তার কাছে চাঁদকে মনে হয়েছে এক ফালি স্বর্ণ। যা হোক, কবিতার কয়েক লাইন যেমন:

The Moon was but a Chin of Gold

A Night or two ago

And now she turns Her perfect Face

Upon the World below

অনেক কবি শরতের হলুদ গাছের পাতার উজ্জ্বলতাকে স্বর্ণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন ইংরেজ লেখক জিকে চেস্টারটন [১৮৭৪-১৯৩৬] গাছের সোনালি পাতাকে ভূয়সী প্রশংসা করে রচনা করেছেন Gold Leaves কবিতা। 

ইংরেজ লেখক, কবি ও নাট্যকার থমাস ডেকারের [১৫৭২-১৬৩২] Golden Slumbers কবিতাটি Patient Grissel নাটকে ঘুমপাড়ানি গান হিসেবে ব্যবহার করেছেন, যা রেনেসাঁর সময়ের সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী দল The Beatles একই শিরোনামের গানে কবিতাটি ব্যবহার করেন, যা Abbey Road LP-তে স্থান পেয়েছে।

তবে কবিরা স্বর্ণের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক ফুটিয়ে তুললেও ইংরেজ কবি টমাস হুড [১৭৮৯-১৮৪৫] বরং স্বীকার করেছেন যে স্বর্ণের বিশেষ কাজ হলো অপরাধকে উত্সাহিত করা। তিনি লিখেছেন: 

Gold! Gold! Gold! Gold!

Bright and yellow, hard and cold

Molten, graven, hammered and rolled,

Heavy to get and light to hold,

Price of many a crime untold 

কবিতার মতো কথাসাহিত্যেও স্বর্ণ ও স্বর্ণকে প্রতীক বা উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই আসে এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের ক্ল্যাসিক উপন্যাস The Great Gatsby-এর নাম। তিনি অন্যান্য রঙের মতো স্বর্ণের রঙকে মৃত্যু ও ক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলেন। তার মতে, স্বর্ণ হলো ধন-দৌলত, অর্থকড়ি অথবা অপব্যয়ী জীবনযাত্রার প্রতীক। একইভাবে ফরাসি কবি, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার ভিক্টর হুগো [১৮০২-৮৫] বিখ্যাত উপন্যাস Les Miserables-এর এক জায়গায় স্বর্ণকে উল্লেখ করেছেন: There are men who dig for gold; dug for compassion, অর্থাত্ যারা স্বর্ণ উত্তোলন করার জন্য গর্ত করে, তারা আসলে করুণাকে খনন করে।

ইংরেজ লেখক ও কবি জিওফ্রে চসারের [১৩৪৩-১৪০০] বিখ্যাত উপন্যাস Canterbury Tales. সেখানে তিনি স্বর্ণ শব্দটির গুণাগুণ সম্পর্কে উচ্চধারণা পোষণ করার জন্য প্রশ্ন করেছেন: If gold rusts, what then can iron do? একই উপন্যাসের অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন:

For, as you know, no master of a household 

Has all of his utensils made of gold; 

Some are wood, and yet they are of use.


এছাড়া জর্জ আরআর মার্টিনের A Dance with Dragons উপন্যাসে তুলনামূলকভাবে স্বর্ণের ব্যবহার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে Gold has its uses, but war is won with iron.

বিশ্বসাহিত্যে ‘গোল্ড’ শিরোনামে অনেক উপন্যাস ও ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে। যেমন ব্রিটিশ লেখক ক্রিস ক্লিভের খেলোয়াড়দের নিয়ে উপন্যাস ‘গোল্ড’, যা ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। টম আহত হওয়ার কারণে মাত্র ১ সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য অলিম্পিক স্বর্ণ হাতছাড়া করে এবং পরবর্তী সময়ে সেই ব্যর্থতার ছায়ায়ই সে বাস করে। এছাড়া এ উপন্যাসে লেখক দুজন নারী অলিম্পিক খেলোয়াড়ের বন্ধুত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন। বলা বাহুল্য, সেই ব্যর্থ খেলোয়াড় একসময় নারী খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করে। 

বিশ্বনন্দিত মার্কিন লেখক আইজাক আজিমভের [১৯২০-৯২] বিজ্ঞান বিষয়ে লেখা একটা ছোটগল্পের শিরোনাম ‘গোল্ড’, যা ১৯৯১ সালে Analog Science Fiction and Fact-এ প্রকাশিত হয়। গল্পটি ১৯৯২ সালে ‘হুগো অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে। এছাড়া ‘গোল্ড’ শিরোনামে গল্প লিখেছেন মার্কিন লেখক মাইক বোজার্ট [জন্ম ১৯৬৪], গল্পটি অশ্লীলতার জন্য নিন্দিত হয়। তার পরও গল্পটি পরবর্তী সময়ে উপন্যাস আকারে প্রকাশিত হয়।

অন্যদিকে স্বর্ণ খনির শ্রমিকদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যত লেখক ও কবি হেনরী লসন (১৮৬৭-১৯২২) লিখেছেন ছোটগল্প Payable gold, যা ১৯০০ সালে প্রকাশিত অন দ্য ট্র্যাক গ্রন্থের একটি পর্ব। তবে স্বর্ণ খনির শ্রমিকদের নিয়ে আরো অনেক গল্প ও উপন্যাস রচিত হয়েছে।

সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার [১৫৬৪-১৬১৬] নিজেও জানতেন স্বর্ণের শোভা ও শক্তি। তিনি তার লেখায় স্বর্ণের প্রতীকী ও কাল্পনিক ব্যবহার করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় তার বিখ্যাত নাটক The Merchant of Venice-এর সেই বহুল পরিচিত গান All That Glisters Is Not Gold, যার প্রথম দুই লাইন:

All that glitters is not gold

Often have you heard that told.

তার মানে বাইরের দিকে যা ভালো দেখা যায়, তা কোনোভাবেই ভেতর থেকে ভালো নয়।

এছাড়া তিনি A Midsummer Night's Dream-এ লিখেছেন:

Even till the eastern gate, all fiery-red,

Opening on Neptune with fair blessed beams,

Turns into yellow gold his salt green streams.

গোল্ড বা স্বর্ণেকে লোকসংগীতেও উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:

Make new friends

But keep the old

One is silver

And the other gold.

কিন্তু এখানে স্বর্ণ কি নতুন বন্ধু, নাকি পুরনো বন্ধু, তা খোলাসা করে বলা হয়নি। তবে ধরে নেয়া যায় যে দুজনেই আপন ও কাছের মানুষ।

উপকথা কিংবা শিশু-কিশোর উপযোগী উপদেশমূলক বিভিন্ন গ্রন্থেও স্বর্ণকে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। All That Glitters is Not Gold এবং Gold coins and selfish man উজ্জ্বল উদাহরণ। শেষের গল্পটির উপদেশ হলো ‘সততা প্রশংসিত হয় এবং আকাঙ্ক্ষা শাস্তি ভোগ করে।’ অন্যান্য উপকথার শিরোনাম হচ্ছে কৃষক ও স্বর্ণ হাঁস, স্বর্ণের ডিম, স্বর্ণের পিণ্ড।

এবার ভিনদেশী সাহিত্য থেকে যদি দৃষ্টি ফিরিয়ে আনা হয় বাংলা সাহিত্যে, তাহলে দেখা যাবে যে সেখানেও স্বর্ণ কিংবা স্বর্ণকে প্রতীক বা উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশকে গভীর ভালোবেসে পুরো দেশটিকে সোনার বাংলা হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখেছেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। এছাড়া তিনি ‘সোনার তরী’ শিরোনামে কবিতাই রচনা করেছেন, যা কাব্যগ্রন্থের শিরোনামও। অন্যদিকে কবি ও লেখক হুমায়ুন আজাদ নিজেই স্বর্ণ হতে চেয়ে প্রেয়সীর কাছে আকুল অনুরোধ করেছেন:

‘তুমি যাকে দেহ দাও, তাকে গাধা করো

তুমি যাকে স্বপ্ন দাও, তাকে সোনা করো।’

[কবিতা: তুমি সোনা আর গাধা করো] 

শুধু কি কথাসাহিত্য, কবিতা, গান ও শিল্প-সাহিত্যে স্বর্ণ কিংবা স্বর্ণকে প্রতীক হিসেবে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা কিন্তু নয়। পবিত্র কোরআন শরিফে সাতটি সূরার মোট ১০ আয়াতে স্বর্ণ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে বাইবেলে স্বর্ণ উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৯ বার।

পরিশেষে বলা যায়, অনেকটা সময়ের জন্য সাহিত্যে স্বর্ণের ব্যবহার একটি বিশেষ ফ্যাশনের মধ্যে সংযত ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণ ও স্বর্ণের প্রতীকী বা উপমা ব্যবহারের ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। সাহিত্যে স্বর্ণের সঙ্গে যে বোধবুদ্ধি ও প্রতীকটি রয়েছে, তা খুবই ইতিবাচক বলে অনেকে ধারণা করেন। যা হোক, সময়ের উত্তরণ ঘটিয়ে স্বর্ণ নিশ্চয় সাহিত্যে আরো বিবিধ মাত্রায় প্রকাশ পাবে।


ফজল হাসান: লেখক, অনুবাদক