আঠারো শতকের মধ্যভাগে ভাগ্যহত যুবক উইলিয়াম লেগ্র্যান্ড, সবকিছু হারিয়ে নিউ অরলিন্স ছেড়ে চলে এসেছেন দক্ষিণ ক্যারোলাইনার সুলিভান দ্বীপে। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় যখন সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসে মনোযোগ দিয়েছেন, ঠিক তখন ঘটনাচক্রে লেগ্র্যান্ডের হাতে আসে একটা সোনার পোকা, ‘আ
গোল্ড-বাগ’ এবং পোকার সঙ্গে এল একটা পুরনো পার্চমেন্ট। আগুনের উত্তাপে পার্চমেন্টে ভেসে ওঠে একটি সংকেত। লেগ্র্যান্ড তখনো জানতেন না, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের জলদস্যুর গুপ্তধন উদ্ধারের চাবি তার হাতে এসে গেছে। পার্চমেন্টে লেখা সংকেতটি ছিল এ রকম—
এভাবেই শুরু হয় আমেরিকান ছোটগল্পকার, কবি ও সাহিত্যিক এডগার অ্যালান পোর ‘দ্য গোল্ড-বাগ’ নামের বিখ্যাত ছোটগল্পটি, যাতে পাঠকেরা উপভোগ করেন এক অভূতপূর্ব অভিযান, আর সবকিছুর মূলে রয়েছে ক্রিপ্টোগ্রাফি।
এডগার অ্যালান পো নামটি গথিক হরর জনরার সঙ্গে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে নামটি শোনামাত্রই হয়তো মনে পড়ে যাবে কথা বলা সেই রেইভেনকে, অথবা কারাগারের সেই ভীতিপ্রদ পেন্ডুলামের কাহিনী। অথচ আধুনিক গোয়েন্দা গল্পের পথপ্রদর্শক এ সাহিত্যিক যে একজন তুখোড় ক্রিপ্টোগ্রাফারও ছিলেন, সেটা হয়তো অনেকেরই অজানা।
ক্রিপ্টোগ্রাম বা গুপ্তসংকেত সাধারণভাবে ব্যবহূত হয় একই সঙ্গে দুটো উদ্দেশ্য সাধনে: ১. আগ্রহী পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, ২. তৃতীয় কোনো পক্ষের হাতে পড়লেও যেন তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়। ইতিহাসে ক্রিপ্টোগ্রাফির অজস্র ব্যবহার দেখতে পাওয়া গেলেও শুরুটা হয় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের হাত ধরে। তিনি তার বিভিন্ন জেনারেলকে স্পর্শকাতর নির্দেশগুলো সংকেতের মাধ্যমেই দিতেন। এরপর আমরা ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবীর পাগলামি, কখনো বা রীতিমতো অবসেশন দেখতে পাই। যেমন ভিঞ্চি তার হাজারেরও অধিক পাতার ডায়েরির পুরোটাই লিখেছেন উল্টো অক্ষরে, কেবল আয়নার সামনে ধরলেই যা পড়তে পারা যায়। আল-কিন্দি ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আনলেন বিন্যাস সমাবেশের ধারণা। নিউটন মনে করতেন, পুরো বাইবেল ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করে লেখা কোনো মেসেজ, যার সমাধান করতে তিনি পণ্ডশ্রম করেন।
এতসব আলোচনার পর প্রশ্ন জাগে, সাহিত্যে প্রথম ঠিক কবে ক্রিপ্টোগ্রাফির ধারণা ব্যবহার করা হয়?
শুরুটা হয় ১৮৪০ সালে। ফিলাডেলফিয়ার প্রধান পত্রিকা আলেক্সান্ডারস উইকলি মেসেঞ্জারে পোর লেখা একটি নিবন্ধ দিয়ে। সেখানে পো তার পাঠকদের উদ্দেশে একটি চ্যালেঞ্জ জানালেন। আহ্বান জানালেন পাঠকদের নিজেদের বানানো সাবস্টিটিউশন সাইফার পাঠানোর। ফলে ফিলাডেলফিয়া থেকে তো বটেই, পুরো যুক্তরাষ্ট্র থেকেই তার উদ্দেশে ক্রিপ্টোগ্রাম আসতে থাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি এসব ক্রিপ্টোগ্রামের অনেকগুলো ডিসাইফার করেন এবং সমাধানগুলো পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশ করেন।
পরের বছর পো ক্রিপ্টোগ্রাফির ওপর ‘আ ফিউ ওয়ার্ডস অন সিক্রেট রাইটিং’ শীর্ষক আরেকটি নিবন্ধ লেখেন। এ নিবন্ধেই পোর সেই বিখ্যাত উক্তিটি হাজির হয়, পো জানান, ‘মানুষের
উদ্ভাবনী ক্ষমতা কখনই এমন সাইফার তৈরি করতে পারে না, যা সমাধানের ক্ষমতা তার নেই।’
উনিশ শতকে জাদুবিদ্যার মতো সিক্রেট রাইটিং বা ক্রিপ্টোগ্রাফিকেও আর্ট হিসেবে গণ্য করা হতো। দীর্ঘকাল কোড ব্রেকিংকে গণ্য করা হতো দুরূহ কাজ হিসেবে। ফলে লোকে ক্রিপ্টোগ্রাফারদের বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী বলে মনে করতেন। তারপর এ সম্পর্কে তাদের মধ্যে বেশ রকম কুসংস্কারও বিরাজমান ছিল। এমন অবস্থায় পোর এ ক্রিপ্টোগ্রাফির চ্যালেঞ্জ এবং এ-সম্পর্কিত অকপট লেখা সাধারণের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছিল। পোর ব্যাখ্যাকৃত পদ্ধতিটি সাধারণ পাঠকদের কাছে ছিল একই সঙ্গে সহজবোধ্য ও চিত্তাকর্ষক। এভাবে কোড ব্রেকিংয়ে পাঠকও ধীরে ধীরে পারদর্শী হয়ে উঠছিলেন। আজকের দিনের ম্যাগাজিনে যে মজাদার ক্রসওয়ার্ড পাজলের দেখা মেলে, তা পোর সেই ক্রিপ্টোগ্রাফির জনপ্রিয়করণেরই ধারাবাহিকতার স্মারক।
ক্রিপ্টোগ্রাম পাজলের প্রতি হঠাৎ জন্মানো এ আগ্রহ ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে পো একটি ছোটগল্প লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৮৪৩ সালে প্রকাশ পেল তার ‘দ্য গোল্ড-বাগ’ নামের বিখ্যাত ছোটগল্পটি। গল্পটি তাকে এনে দিয়েছিল গ্র্যান্ড প্রাইজ এবং সেই সঙ্গে দিয়েছিল ১০০ ডলার। গল্পটিতে পো শুধু ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহার করেই থেমে যাননি, বরং কীভাবে সহজ উপায়ে কোড ভাঙা যায়, তার বিশদ বর্ণনাও দিয়েছিলেন। তার এ বর্ণনাই গল্পটিতে আলাদা এক স্বাদ যুক্ত করেছিল, যা সেই সময়ের পাঠকের কাছে ছিল একেবারে নতুন।
কীভাবে ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহারের ফ্রিকোয়েন্সিকে কাজে লাগিয়ে সাবস্টিটিউটশন কোড ভাঙা যায়, পো গল্পের ধারাবাহিকতায় তা ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন ইংরেজি ২৬টি বর্ণমালার মধ্যে সবচেয়ে অধিকসংখ্যকবার ব্যবহূত বর্ণটি হলো ‘e’। এভাবে প্রতিটি বর্ণমালার ক্ষেত্রে ব্যবহারের হার বের করা হয়। একই সঙ্গে কোডের সাবস্টিটিউশনগুলোর ফ্রিকোয়েন্সিও বের করা হয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট কোডে যদি সবচেয়ে বেশিসংখ্যকবার ৪ সংখ্যাটি আসে, তবে একে বর্ণমালা ‘e’ এর সাবস্টিটিউশন হিসেবে ধরে নেয়া হবে। এ নিয়ম অনুসরণ করে গোল্ড-বাগ
গল্পের ক্রিপ্টোগ্রামটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়েছে ৪, যার সাবস্টিটিউশন অক্ষর ‘e’। এরপর সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত সংকেতটি হলো, যার সাবস্টিটিউশন অক্ষর ‘t’। এভাবে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে খুব সহজেই যে কেউ গল্পের সংকেতটির পাঠোদ্ধার করে ফেলতে পারবেন।
সাহিত্যে প্রথমবারের মতো ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার শুধু পাঠকদেরই আলোড়িত করেনি, বরং সাহিত্যকে দিয়েছে একটি অভিনব কৌশল, যা গল্পের কাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে পাঠকের আগ্রহকেও এগিয়ে যাবে। অ্যালান পোর এ ক্ল্যাসিক গল্পটি পরবর্তী সময়ে অনেক বিখ্যাত লেখককে প্রভাবিত করেছে।
সবার আগে বলতে হয় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের কথা। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি লেখেন ‘দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ড্যান্সিং মেন’, যা
একইভাবে পাঠকদের দ্বারা সমাদৃত হয়। এরপর ডয়েল প্রায় ১০ বছর পর পুনরায় ক্রিপ্টোগ্রাম ব্যবহার করে লেখেন ‘দ্য ভ্যালি অব ফিয়ার’। এ গল্পে শার্লক হোমসের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রফেসর মরিয়ার্টিকে ক্রিপ্টোগ্রাম ব্যবহার করতে দেখা যায়। এরপর বেশি দূর না গিয়ে বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। তার ‘গুপ্তধন’ ছোটগল্পটি সরাসরি অ্যালান পো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে লেখা।
অ্যালান পো ও ডয়েলের ধাঁধায় বুঁদ সাহিত্যকে এরপর অপেক্ষা করতে হয়েছিল অনেকগুলো বছর। এ সময়ের মধ্যে সাহিত্যে ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার তেমন একটা দেখা যায় না। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় কেন ফোলেটের ব্লকবাস্টার উপন্যাস ‘দ্য কি টু রেবেকা’, এ
উপন্যাসে পুনরায় গুপ্তসংকেতের দেখা মেলে। এরপর আমরা সাহিত্যে আরো বহুবার ক্রিপ্টোলজির ব্যবহার দেখতে পেয়েছি, যার ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত আছে। এর মধ্যে বিখ্যাত কয়েকটি হলো উমবার্তো একোর দ্য
নেম
অব
দ্য
রোজ, ড্যান ব্রাউনের দ্য
ভিঞ্চি
কোড, রবার্ট হ্যারিসের এনিগমা, নিল স্টিফেনসনের ক্রিপ্টোনমিকন ইত্যাদি।
তাসনিম
রহমান:
নন-ফিকশন লেখক





