কয়েক হাজার বছর ধরে রাজা, রানী কিংবা শাসক, সেনাপতিরা রাষ্ট্র শাসনে নির্ভর করেছেন একটি দক্ষ বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থার ওপর। রাষ্ট্রের গোপনীয় বার্তা শত্রুপক্ষের হাতে বা বিরোধী কোনো শক্তির হাতে পড়লে পরিণতি যে ভয়ানক হতে বাধ্য, সেটাও তারা জানতেন। একটি তথ্য ফাঁসে বদলে যেতে পারে কোনো নির্ধারক যুদ্ধের ফলাফল। তাই জন্ম নেয় সংকেতলিপি—এ বার্তা কেবল যিনি পাঠাবেন এবং যাকে উদ্দেশ্য করে পাঠানো হচ্ছে, তিনিই বুঝতে পারবেন। কারণ সংকেতলিপির সংকেত কেবল তাদেরই জানা!
গোপনীয় বার্তা তৈরি ও প্রেরণে সাম্রাজ্যে-রাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে কোড-মেকিং বিভাগ। এরা একদিকে নিজের রাষ্ট্রের জন্য যেমন নিরাপদ সংকেত বার্তা তৈরি করেন, তেমনি শত্রুদের গোপন বার্তার মর্ম উদ্ধার করা ছিল তাদের দায়িত্ব। কোডব্রেকাররা হলেন ভাষাতাত্ত্বিক আলকেমিস্ট—এক রহস্যময় গোত্র, যারা অর্থহীন প্রতীক থেকে অর্থবোধক কোনো বার্তা উদ্ধার করতে পারেন। ক্রিপ্টোলজির রোমাঞ্চকর-রহস্যময় দুটি গোষ্ঠী নিয়ত যুধ্যমান—কোডমেকার ও কোডব্রেকার। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ হলো দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধ, যা ইতিহাসে গভীর ও নাটকীয় সব প্রভাব রেখে গেছে।
ক্রিপ্টোলজির ইতিহাস চূড়ান্ত গতিশীল, সব ইতিহাসই নিশ্চয়ই গতিশীল, তবে ক্রিপ্টোলজিতে তা বিশেষভাবে উপযুক্ত। কোডমেকাররা সবসময়ই নতুন কোড তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন আর কোডব্রেকাররা সেটা ভাঙতে। একবার কোনো কোডের রহস্য ভেঙে গেলে সেটা আর কার্যকর থাকে না। কোডমেকারদের তত্ক্ষণাৎ নতুন কোড তৈরিতে কাজে লেগে যান—এ যেন এক অনন্ত, নিত্যই নতুন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের সূত্রে বিকশিত হয়েছে বিজ্ঞান। গণিতবিদ থেকে ভাষাতাত্ত্বিক; যোগাযোগ তত্ত্ব থেকে কোয়ান্টাম তত্ত্ব—সবকিছুই যুক্ত হয়েছে এ যুদ্ধে। কোডমেকার ও কোডব্রেকারদের এ যুদ্ধ বিজ্ঞানের এসব শাখাকে সমৃদ্ধ করেছে, জ্বালানি জুগিয়েছে প্রযুক্তির বিকাশে, বিশেষত আধুনিক কম্পিউটার উদ্ভাবনে। আধুনিক কালে সব তথ্যই এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে আদান-প্রদান হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্রিপ্টোগ্রাফি এ যুগে অতীতের চেয়ে যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—এটা তথ্যের যুগ আর গোপন বার্তা আদান-প্রদানই এ যুগের তালা-চাবি।
আজকের দিনে ক্রিপ্টোগ্রাফি নাগরিক জীবনে বিরাট প্রভাব রাখছে। কিন্তু যুগে যুগে এবং এখনো এটা সমরবিদ্যায় গভীর প্রভাবসঞ্চারী ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে। বলা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল রসায়নবিদদের। কারণ এ যুদ্ধেই প্রথমবারের মতো মাস্টার্ড ও ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহূত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল পদার্থবিদদের—প্রথমবারের মতো অ্যাটম বোমার ডেটোনেটর খোলা হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে গণিতবিদদের যুদ্ধ। কারণ ভবিষ্যৎ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অস্ত্র—তথ্যের নিয়ন্ত্রণ থাকে গণিতবিদদের হাতে। দুনিয়ায় এখন সামরিক তথ্যাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন গণিতবিদরাই এবং এ গণিতবিদরাই আবার কোড ভাঙার মূল কারিগর।
গোপন লিখনের সবচেয়ে পুরনো নিদর্শন পাওয়া যায় ‘ইতিহাসের জনক’ হেরোডটাসের আমলে। রোমান দার্শনিক, কর্মকর্তা সিসেরো এমনটাই জানিয়েছেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে গ্রিস ও পারস্যের মধ্যে যুদ্ধের বিবরণী দিয়েছেন হেরোডটাস; তার কাছে এটা ছিল স্বাধীনতা ও দাসত্বের মধ্যকার লড়াই। হেরোডটাসের কথা অনুযায়ী গোপন বার্তা লেখার বিদ্যাই গ্রিসকে পারস্যের একাধিপতি জেরক্সেসের অধীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরক্সেস গ্রিস আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। সে সময় স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে গ্রিক ডিমারাটাস পারস্যের নগর সুসায় বসবাস করছিলেন। দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও স্বদেশের প্রতি তখনো তার মনে কিছু আনুগত্য অবশিষ্ট ছিল। তাই জেরক্সেসের আক্রমণের পরিকাল্পনার কথা কীভাবে স্বদেশী স্পার্টানদের কাছে পৌঁছে দেয়া যায়, তিনি সেই উপায় খুঁজতে বসেন। চ্যালেঞ্জটা ছিল পারসিক রক্ষীদের চোখ এড়িয়ে স্পার্টানদের কাছে বার্তা পাঠানো। হেরোডটাস লিখেছেন—
বার্তার কথা
ফাঁস
হয়ে
গেলে
বিরাট
বিপদ
হয়ে
যেত।
তাই
তার
কাছে
গোপনে
বার্তা
পাঠানোর
একটাই
উপায়
ছিল:
ভাঁজ
করা
এক
জোড়া
কাঠের
ফলক
থেকে
মোমের
স্তর
তুলে
ফেলে
তাতে
জেরক্সেসের
আক্রমণের
বার্তা
লিখে
তার
ওপর
পুনরায়
মোম
গলিয়ে
ঢেকে
দেয়া।
এতে
ফলকটি
ফাঁকাই
মনে
হবে
এবং
পথে
পারস্যের
রক্ষীরা
সেটা
দেখলেও
কিছু
বুঝতে
পারবে
না।
এভাবে
গন্তব্য
পর্যন্ত
পৌঁছার
আগে
কেউই
গোপন
বার্তার
রহস্য
বুঝতে
পারবে
না।
লিওনাইডাসের
স্ত্রী
গর্গো
ছিল
ঐশ্বরিক
আশীর্বাদ
প্রাপ্ত।
সে
এই
বার্তার
রহস্য
বুঝেছিল,
তিনি
স্পার্টানদের
বলেছিলেন,
মোম
সরলেই
সেখানে
কোনো
বার্তা
পাওয়া
যাবে।
তা-ই
হয়েছিল,
বার্তাটি
গ্রিকদের
মধ্যে
ছড়িয়ে
পড়েছিল।
ডিমারাটাসের বার্তা পেয়ে গ্রিকরা পারস্যের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। রাষ্ট্রের রূপার খনিগুলো থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে গ্রিকরা ২০০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করে। ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জেরক্সেসের বাহিনী যখন এথেন্সের স্যালামিস উপসাগরে হাজির, তখন বিস্মিত হয়ে তারা আবিষ্কার করে প্রস্তুত এক গ্রিক সেনাবাহিনীকে। এটা ছিল বার্তাকে লুকিয়ে প্রেরণের যুগ, যা স্টেগানোগ্রাফি নামে পরিচিত। বার্তা লুকানোর বহু পদ্ধতি হেরোডটাসের আমল থেকে পরবর্তী দুই হাজার বছরে দেখা গেছে। যেমন প্রাচীনকালে চীনারা সূক্ষ্ম সিল্কে বার্তা লিখে সেটা গুটি পাকিয়ে ছোট বলের আকার দিত, তারপর মোম দিয়ে সেটা ঢেকে দেয়া হতো। এ বল বার্তাবাহক গিলে নিতে। ষোলো শতকে ইতালির বিজ্ঞানী জিওভান্নি পর্তা গোপনে বার্তা প্রেরণের এক অভিনব উপায় আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি এমন এক কালি উদ্ভাবন করেছিলেন, যা দিয়ে সেদ্ধ ডিমের খোসার ওপরে লেখা হতো, কিন্তু সেটা বাইরে থেকে দেখা যেত না, কালির দাগ পড়ত ভেতরে থাকা সেদ্ধ ডিমের নরম সাদা অংশে। ডিম থেকে খোসা ছাড়ালেই কেবল সেই বার্তা পড়া যেত।
স্টেগানোগ্রাফিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল অদৃশ্য কালির। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে প্লিনি দি এল্ডার থিথাইম্যালাস গাছের রস থেকে অদৃশ্য কালি তৈরির পদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। এ কালি শুকিয়ে গেলে অদৃশ্য হয়ে যেত, কিন্তু সামান্য তাপ পেলেই আবার বাদামি রঙের কালি স্পষ্ট হয়ে উঠত।
স্টেগানোগ্রাফি বহু বছর ধরে দুনিয়ায় ব্যবহার হয়েছে সফলতার সঙ্গেই। কিন্তু এ পদ্ধতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা আছে—বার্তাবাহককে তল্লাশি করে বার্তটা কোনোভাবে পেয়ে গেলে আর কিছুই গোপন থাকে না। তাই স্টেগানোগ্রাফির সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটি বিদ্যা বিকশিত হচ্ছিল, যার নাম ক্রিপ্টোগ্রাফি। গ্রিক শব্দ ক্রিপ্টোজ অর্থ ‘লুকানো’। ক্রিপ্টোগ্রাফির উদ্দেশ্য বার্তাকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং বার্তার অর্থকে লুকানো যা এনক্রিপশন নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে শুধু বার্তা প্রেরক ও প্রাপকই জানেন সেই সূত্র, যা দিয়ে বার্তার অর্থ উদ্ধার করা যাবে। এতে বার্তাটি শত্রুর হাতে পড়লেও কোনো সমস্যা নেই, কারণ তার অর্থ তারা উদ্ধার করতে পারবে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাতিন আমেরিকায় থাকা জার্মান এজেন্টরা এক পৃষ্ঠার বার্তাকে ফটোগ্রাফিক পদ্ধতিতে সংকুচিত করে একটি বিন্দুর আকার দিতে পারত। এ মাইক্রোডটটি তারা যেকোনো একটি সাধারণ চিঠি বা অন্য কোনো লেখার একটি ফুলস্টপের ওপর বসিয়ে দিত। এ রকম প্রথম মাইক্রোডট সিআইএ শনাক্ত করেছিল ১৯৪১ সালে। এর পর থেকে এ পদ্ধতিতে পাঠানো জার্মান এজেন্টদের বার্তা আমেরিকানরা পড়তে পারছিল। এমন অবস্থায় জার্মানরা নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করে। স্টেগানোগ্রাফির সঙ্গে তারা যুক্ত করে ক্রিপ্টোগ্রাফিকে। ফলে আমেরিকানরা মাইক্রোডট শনাক্ত করতে পারলেও বার্তার অর্থ উদ্ধার করতে পারত না।
ক্রিপ্টোগ্রাফির ক্ষমতা একটা উদাহরণে পরিষ্কার হয়ে যায়। ধরা যাক একটি বাক্যে ৩৫টি অক্ষর আছে। এখন কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এ অক্ষরগুলোকে উল্টোপাল্টা বসিয়ে বাক্যটি লেখা হলো। বাক্যটি অর্থবোধক করার সূত্রটি শুধু বার্তাপ্রেরক ও বার্তাবাহকই জানেন। বার্তাটি যদি শত্রুর হাতে পড়েও যায়, তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু থাকবে না। কারণ এ ৩৫টি অক্ষরের জন্য ৫০,০০০,০০০,০০০,০০০, ০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০টির বেশি ভিন্ন ভিন্ন সজ্জা আছে। যদি একজন মানুষ প্রতি একটি করে সজ্জা নিরীক্ষা করে দেখেন এবং দুনিয়ার সব মানুষকে দিন-রাত এ কাজে লাগানো হয়, তাহলেও কয়েক হাজার বছর কেটে যাবে সব সজ্জা নিরীক্ষা করতে। এ পদ্ধতি অক্ষরের পক্ষান্তরকরণ বলে পরিচিত। এ পদ্ধতি যথেষ্ট নিরাপদ হলেও আবার এর কিছু সমস্যা আছে। অনেক সময় খোদ বার্তার প্রাপকই বার্তার অর্থ উদ্ধার করতে পারেন না। ক্রিপ্টোগ্রাফির আরেকটি বহুল ব্যবহূত পদ্ধতি হচ্ছে অক্ষরের প্রতিস্থাপন। এ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রাথমিক কালের উদাহরণগুলোর একটি পাওয়া যায় ভারতীয় কামসূত্র গ্রন্থে। চতুর্থ শতকে ব্রাহ্মণ বাৎসায়ন গ্রন্থটি রচনা করেন। অবশ্য তিনি তার এ গ্রন্থ লিখেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের একটি পাণ্ডুলিপির ওপর ভিত্তি করে। কামসূত্রে বলা হয়েছে, নারীদের ৬৪ কলায় পারদর্শী হওয়া উচিত, যার মধ্যে আছে রান্না, পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থাপনা, সুগন্ধি তৈরি, মায়াবিদ্যা, দাবা খেলা, বই বাঁধাই। ৪৫তম কলাটি হচ্ছে ম্লেচিতা-বিকল্প—গুপ্ত লিখন বিদ্যা। এজন্য একটি পদ্ধতিকে ব্যবহারের পরামর্শও দেয়া আছে—অক্ষরের প্রতিস্থাপন। ইচ্ছামতো বর্ণের জোড়া তৈরি করা, তারপর মূল বার্তার প্রত্যেকটি অক্ষরকে তার জোড়ার অন্যটি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা।
মধ্যযুগে ক্রিপ্টোগ্রাফির বিরাট অগ্রগতি হয়েছিল ইসলামী দুনিয়ায়। নবম শতকের আরব দার্শনিক আল-কিন্দি রচনা করেছিলেন গুপ্ত
বার্তার
মর্মোদ্ধারের
পদ্ধতিসংক্রান্ত
পাণ্ডুলিপি। এ পাণ্ডুলিপি ইতিহাসের আড়ালে চলে গিয়েছিল। ১৯৮৭ সালে ইস্তাম্বুলের সুলাইমানিয়াহ অটোমান আর্কাইভে এটির সন্ধান পাওয়া যায়। ক্রিপ্টোঅ্যানালাইসিসের বা সংকেতলিপি বিশ্লষণের সূচনা বলা যায় এ গ্রন্থকে। আল-কিন্দি যখন এ কাজ করছেন, ইউরোপে তখন দুর্দশা, ক্রিপ্টোগ্রাফির বেসিক নিয়েই চলছে তাদের কাজ। ইউরোপে তখন একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোগ্রাফির চর্চায় পৃষ্ঠাপোষকতা করছিল—খ্রিস্টীয় চার্চ। খ্রিস্টান সাধুরা বাইবেলের কোনো গোপন বার্তা উদ্ধারের আশায় এ চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন—এ অনুসন্ধান আধুনিক কালেও অব্যাহত আছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে হিব্রু ক্রিপ্টোগ্রাফির কিছু নিদর্শন সে যুগের সাধুদের রোমাঞ্চিত করেছিল। তারা সেখান থেকে নতুন অর্থ উদ্ধারে গভীর অভিনিবেশে কাজ করেছিলেন। এ চর্চা ইউরোপে ক্রিপ্টোগ্রাফিকে বিকশিত করেছিল। ক্রিপ্টোগ্রাফিবিষয়ক রচিত প্রথম ইউরোপীয় গ্রন্থটির নাম এপিসল
অন
দ্য
সিক্রেট
ওয়ার্কস
অব
আর্ট
অ্যান্ড
দ্য
নালিটি
অব
ম্যাজিক। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এটি লিখেছিলেন ইংরেজ ফ্রান্সিসকান সাধু ও বহুবিদ্যা বিশারদ রজার বেকন। তিনি তার বইতে বার্তা গোপন করার সাতটি পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছেন।
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার বিস্তৃত হতে থাকে। আলকেমিস্ট ও বিজ্ঞানীরা তাদের নিত্যনতুন অনুসন্ধানের বিবরণ ও আবিষ্কারকে গোপন রাখতে ক্রিপ্টোগ্রাফির সহায়তা নিতে শুরু করেন। ইংরেজি সাহিত্যের জনকরূপে খ্যাত কবি জিওফ্রে চসার কবিতার জন্য বিখ্যাত হলেও তিনি একই সঙ্গে ছিলেন জ্যোতির্বিদ ও ক্রিপ্টোলজিস্ট। চসার মধ্যযুগে সংকেতলিপি রচনার কিছু সেরা উদাহরণ রেখে গেছেন। তার ট্রিটিজ অন দি অ্যাস্ট্রোল্যাব এ কয়েকটি এনক্রিপ্টেড অনুচ্ছেদ লিখে গেছেন।
পনেরো শতকে ক্রিপ্টোলজির রমরমা অবস্থা দেখা দেয় ইউরোপে। সেই রেনেসাঁ যুগে শিল্প, বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনে ক্রিপ্টোগ্রাফি বিদ্যাও বিকশিত হয়েছিল। অন্যদিকে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গোপন বার্তা আদান-প্রদানের বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তা হাজির করেছিল। এ সময় ইতালিতে জন্ম নিয়েছিল অনেকগুলো স্বাধীন নগর, যেগুলো একে অন্যের প্রভাব খর্ব করতে সচেষ্ট ছিল। দৌত্যকর্ম জরুরি হয়ে উঠেছিল। স্বভাবতই গোপনে বার্তা আদান-প্রদান দরকার হচ্ছিল। প্রত্যেকর স্বাধীন নগরই নিজেদের জন্য সাইফার দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং কূটনীতিকদের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সংকেতবিদ্যায় পারদর্শী সচিব। এ রকম রাজনৈতিক আবহাওয়া জন্ম দিয়েছিল ইউরোপের প্রথম বিশিষ্ট ক্রিপ্টোলজিস্টের—জোভান্নি সোরো। এ জোভান্নিকে আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফির জনকও বলা হয়। ১৫০৬ সালে তাকে ভেনিসের সংকেতলিপিবিষয়ক বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ইতালিজুড়ে তার দক্ষতার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। মিত্র নগরের সরকারও বিভিন্ন সাংকেতিক বার্তার অর্থ উদ্ধারে তার সহযোগিতা চাইতেন। ভ্যাটিকান থেকেও অনুরোধ আসত গোপন বার্তার অর্থ উদ্ধারের জন্য। উল্লেখ্য, সে আমলে ভ্যাটিকান ছিল ইউরোপে সংকেতলিপি বিশ্লেষণের সবচেয়ে সক্রিয় কেন্দ্রগুলোর একটি। স্বয়ং পোপের তরফ থেকে গোপন বার্তার অর্থ উদ্ধারের জন্য অনুরোধ আসত জোভান্নির কাছে। ১৫২৬ সালে পোপ সপ্তম ক্লেমেন্ট জোভান্নিকে পাঠিয়েছিলেন অর্থ উদ্ধার করে দেয়ার জন্য এবং জোভান্নি কাজটি সফলভাবে করে দিয়েছিলেন। এরপর একবার যখন পোপের একটি গোপন সংকেত বার্তা ফ্লোরেন্টাইনরা আটক করেছিল, তখন পোপ জোভান্নির কাছে বার্তার একটি কপি পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, তার বার্তাটি ফ্লোরেন্টাইনরা পড়তে পারবে কিনা। জোভান্নি তখন পোপকে আশ্বস্ত করেছিলেন এই বলে যে তিনি নিজেই সেটির অর্থ উদ্ধার করতে পারেননি, তাই ফ্লোরেন্টাইনদের সাধ্য নেই সে বার্তার রহস্য ভেদ করা। অবশ্য মনে হয় এটা ছিল জোভান্নির একটি কৌশল। কারণ তিনি ভ্যাটিকানের ক্রিপ্টোলজিস্টদের তাদের দুর্বলতা ধরিয়ে দিতে আগ্রহী ছিলেন না। এর মধ্যে ইউরোপজুড়েই কদর বাড়ছিল কিপ্টোলজিস্টদের। ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিসের দরবারে নিয়োগ পেয়েছিলেন ফিলিবার্ট বাবোঁ। তিনি সংকেতলিপি নিয়ে তার কাজের ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের জন্য খ্যাতিমান হয়েছিলেন। কোনো সংকেতের মর্মোদ্ধার না করা পর্যন্ত তিনি নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিতেন। রাত-দিন এক করে টানা এক সপ্তাহ পাগলের মতো কাজ করার উদাহরণও আছে ফিলিবার্টের জীবনে।
মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক দুনিয়াতেও ক্রিপ্টোগ্রাফির ভূমিকা বর্তমান। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধে এ বিদ্যার যথেষ্ট প্রয়োগ দেখা গেছে। কূটনীতি, গুপ্তরচরবৃত্তি কিংবা প্রেম, ব্যক্তিজীবনেও মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার করে থাকে। সেদিকে না গিয়ে ক্রিপ্টোগ্রাফির কিছু কৌতূহলোদ্দীপক দিকের উল্লেখ করে এ লেখার সমাপ্তি টানতে চাই। উনিশ শতকের সাহিত্যে ক্রিপ্টোলজি, সাইফার ও কোড জায়গা করে নেয়। জুল ভার্নের জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দি আর্থ উপন্যাসে চামড়ার কাগজে লেখা রুনিক বর্ণমালায় লেখা একটি বার্তার অর্থ উদ্ধারের মাধ্যমে শুরু হয় যাত্রা। ১৮৮৫ সালে রচিত মাথিয়াস
স্যান্ডর্ফ-এ জুল ভার্ন একটি গোপন সংকেতকে উপন্যাসের অন্যতম নির্ধারক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সৃষ্টি গোয়েন্দা শার্লক হোমস একজন দক্ষ ক্রিপ্টোলজিস্ট। শার্লক হোমস তার ক্রিপ্টোগ্রাফি বিদ্যার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজটি করেছেন দি অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য ড্যান্সিং ম্যান উপন্যাসে। আটলান্টিকের অন্য পাড়ে এডগার অ্যালান পো আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে। ফিলাডেলফিয়ার আলেক্সান্ডার উইকলি মেসেঞ্জারের জন্য লিখতে গিয়ে তিনি পাঠকেদের চ্যালেঞ্জ জানান যে তাদের পাঠানো যেকোনো মনোঅ্যালফাবেটিক সাবস্টিটিউশন সাইফারের অর্থ তিনি উদ্ধার করতে পারবেন। তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে পাঠকরা অসংখ্য সাইফার পাঠিয়েছিলেন এবং পো সেগুলো সফলভাবে সমাধান করে দিয়েছিলেন। তার সাফল্যে পাঠকরা চমকে গিয়েছিলেন। এক গুণমুগ্ধ ভক্ত অ্যালান পোকে ‘দুনিয়ার সবচেয়ে বিজ্ঞ ও দক্ষ ক্রিপ্টোগ্রাফার হিসেবে’ আখ্যা দিয়েছিলেন। অ্যালান পো ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে তার উৎসাহের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখিয়েছিলেন ১৮৪৩ সালে তার লেখা দ্য
গোল্ড-বাগ গল্পে। পেশাদার ক্রিপ্টোগ্রাফাররা গল্পটিকে সাহিত্যে ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহারের সেরা নিদর্শন হিসেবে মানেন। গল্পটিতে গুপ্তধনের সন্ধান দেয়া ছিল সাংকেতিক ভাষায় লেখা একটি বার্তায়। গল্পে কল্পনার জগতে হলেও বাস্তব জগতে গুপ্তধনের সন্ধানে ক্রিপ্টোগ্রাফিক বার্তা নিয়ে আলোড়ন ওঠার ঘটনা আছে। দ্য বিল সাইফার বা বিল পেপারস তিনটি সাইফারটেক্সটের সমন্বয়। ধারণা করা হয়, একটিতে আছে লুকিয়ে রাখা ধনরত্নের (বর্তমানে যার মূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মার্কিন ডলার) অবস্থানের খোঁজ। সাইফারটি আজও সমাধান করা যায়নি। দ্বিতীয় সাইফারে আছে ধনরত্নের বিবরণ (সমাধান করা হয়েছে) এবং তৃতীয় সাইফারে দেয়া ধনরত্নের মালিক এবং তার নিকটাত্মীয়দের সন্ধান।
দ্য বিল
সাইফার-এর আবির্ভাব ১৮৮৫ সালে। প্যাম্ফলেট আকারে প্রকাশিত এ সাইফারটেক্সটে টমাস জে. বিলের গুপ্তধনের সন্ধান দেয়া আছে বলে উল্লেখ করা হয়। ভার্জিনিয়ার বেডফোর্ড কাউন্টিতে টমাস ১৮২০-এর দশকে তার বিপুল সোনাদানা লুকিয়ে রেখেছেন। এ গুপ্তধনের অবস্থান সাংকেতিক লিপিতে লিখে একটি বাক্সে ভরে টমাস স্থানীয় রবার্ট মরিসের কাছে দিয়ে যান এবং এরপর আর টমাসকে কেউ কোনোদিন দেখেনি। প্যাম্ফলেটের বর্ণনা অনুসারে মরিস ২৩ বছর পর বিলের সেই বাক্সটি খোলেন। মৃত্যুর আগে মরিস এ কাগজগুলো তার এক বন্ধুকে দিয়ে যান, যিনি ২০ বছর ধরে সংকেতলিপির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেন। তিনি মাত্র একটি কোডের অর্থ উদ্ধার করতে পেরেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি এ সংকেতলিপিগুলো উল্লিখিত তথ্য সহকারে দ্য
বিল
সাইফার শিরোনামে প্রকাশ করে যান। এরপর বহু গুপ্তধন শিকারি এ সংকেতের অর্থ উদ্ধার ও গুপ্তধন উদ্ধারে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিলের সেই সংকেত আজও প্রহেলিকা হয়েই রয়ে গেছে।
সায়মন সিংয়ের দ্য
কোড
বুক:
দ্য
সিক্রেট
হিস্ট্রি
অব
কোডস
অ্যান্ড
কোড-ব্রেকিং
গ্রন্থ অবলম্বনে
শানজিদ
অর্ণব:
লেখক ও সাংবাদিক





