সাংকেতিক লিপি রচনার ইতিহাস সম্পর্কিত সবচেয়ে প্রভাবশালী গ্রন্থে ডেভিড কান যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, ‘আরবদের
মধ্যে সাংকেতিক অক্ষরে লিপি রচনা বিদ্যার সূত্রপাত ঘটে।’ বলা বাহুল্য, ডেভিড কানের মূল্যায়ন ছিল দূরদর্শী। তিনি উল্লেখ করেছেন বছরের পর বছর তার মূল্যায়নই প্রমাণিত হয়ে আসছে, এমনকি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার পরও মূল্যায়নের গুরুত্ব কমেনি। সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি আবিষ্কারের সময় মধ্যযুগীয় আরব পণ্ডিতরা নিজেদের অনুবাদ কর্মকে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সেই জ্ঞান ব্যবহার করেছেন।
আরবীয় পণ্ডিতদের সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি উদ্ভাবন মোটেও কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। ইসলামের ‘স্বর্ণযুগে’ (যদিও
সময়কাল নিয়ে সামান্য দ্বিমত রয়েছে, তদুপরি মোটামুটিভাবে অষ্টম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে ধরা হয়) আরবের বিদ্বান ব্যক্তিরা বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক পারদর্শিতা অর্জন করেন। এছাড়া তাদের মধ্যে ছিল সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতির উত্তরোত্তর উন্নতি করার স্পৃহা ও প্রেরণা এবং পরবর্তী সময়ে সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতির উত্কর্ষ সাধনের জন্য সেগুলো দক্ষতা ও প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। উল্লেখ্য, ‘শিল্পকৌশল’
ও স্বজ্ঞাত অনুবাদ থেকে নিয়মানুগ ভাষার অনুবাদ আলাদা। কেননা ‘শিল্পকৌশল’ ও স্বজ্ঞাত অনুবাদে এক ধরনের কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট করে বলা যায়, সেই সময় আরবের পণ্ডিতরা গণিতশাস্ত্রে দারুণ মেধাবী ছিলেন, তাদের ছিল সুউন্নত রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো এবং ভাষাবিজ্ঞানে (আরবি ও অন্য ভাষা) আধুনিক বোধশক্তি।
ব্যবহারিক সংখ্যাগত চিহ্ন বা প্রতীক উদ্ভাবন এবং শূন্য সম্পর্কে ধারণা (উল্লেখ্য, পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো দুটিই গ্রহণ করেছে) পরিসংখ্যানমূলক গাণিতিক জ্ঞানের পথে সমালোচনার বিষয় ছিল। পরিসংখ্যানে পর্যাপ্ত জ্ঞান এবং বিশাল ও জটিল কোনো সংখ্যাকে নিরূপণ করার ক্ষমতা বা যোগ্যতাসম্পন্ন আরব দেশের পণ্ডিতরা বিভিন্ন গ্রন্থের প্রধান পাঠ্যাংশ থেকে বারংবার ঘটিত গবেষণামূলক অক্ষর গণনা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পণ্ডিতদের সেই সক্ষমতা সাংকেতিক অক্ষরে লিপিবদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিল।
আরবের বিদ্বানরা একটি উন্নত ও দক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রশাসন (যা ‘খেলাফত’ হিসেবে পরিচিত) উপভোগ করেন। এসব বিদ্বানের মধ্যে ছিলেন জ্ঞানী শিক্ষক এবং আমলাতন্ত্রের দক্ষ কর্মকর্তা। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রশাসন প্রয়োজনীয় অনেক সহায়তা প্রদান করে। এছাড়া সাংকেতিক লিপি রচনার উত্কর্ষ সাধন ও বিশ্লেষণের জন্যও শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রশাসন উৎসাহিত করে।
সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতির সাফল্য ও দক্ষতার জন্য কয়েকটি উপাদানের অবদান রয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভাষাবিজ্ঞানে দক্ষতা, জটিল সাহিত্য (কবিতা ও গদ্য) সৃষ্টি এবং একটি বৃহৎ আকারের সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত অনুবাদ প্রচেষ্টা। বলা বাহুল্য, এ প্রচেষ্টার শীর্ষে ছিল আব্বাসীয় খেলাফতের সময়ে গ্রিকো-আরবি অনুবাদ আন্দোলন।
গদ্য রচনা বিশ্লেষণে দক্ষতার বিকাশ শুধু রাষ্ট্রীয় উৎসাহে উৎপাদিত পণ্য ছিল না। সে যুগের আরব দেশের অনেক পণ্ডিত মনে করতেন যে, ভাষা পবিত্র, শক্তিশালী এবং অনেক ক্ষেত্রে সাংকেতিক। এখানে বলা আবশ্যক, তখন পশ্চিমা দেশের একশ্রেণীর শিক্ষিত লোক সাংকেতিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করত। যেহেতু ভাষা প্রায়ই সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতো, তাই ‘লুকানো’ তথ্য উদ্ধার করে অর্থ প্রকাশের জন্য বিশেষ ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৪০৬) বিশ্বাস করতেন, শব্দ হলো অবগুণ্ঠন, যা চিন্তা ও বোঝাপড়ার মাঝে সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে মানুষ ভাষার চ্যালেঞ্জ থেকে নিজেদের এড়াতে পারে না (পশ্চিমা জগতে একই ধরনের সমস্যা রয়েছে, যা ‘ব্যাবেল প্রবলেম’ নামে পরিচিত)। যাহোক, ইবনে খালদুনের মতে, মনুষ্য জাতির ‘সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি ও উপহার’ হলো যোগাযোগ—মোটামুটিভাবে বলা যায়, ভাষার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করার সামর্থ্য।
গত শতকের আশির দশকে ইস্তাম্বুলের আস-সুলাইমানিয়া গ্রন্থাগারে সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতির ওপর বেশ কয়েকটি নতুন পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ডেভিড কানের আগের মূল্যায়নকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। কানের মূল্যায়ন ছিল যে, আরবীয় পণ্ডিতরা সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। এসব পাণ্ডুলিপির মধ্যে ছিল নবম শতাব্দীতে লেখা আল-কিন্দির Risala fi
‘istikhrag al-mu’amma,
যা আল-কালকাসান্দির রচনা ও লিওন ব্যাতিস্তা আলবার্তির লেখা, যা অনেক আগে পশ্চিমা দেশে সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি এবং বিষয়ের ওপর পদ্ধতিগত শিক্ষার ধরন চালু করেছিল, ৫০০ বছর আগের লেখা। আরব দেশের সাংকেতিক ভাষা লেখকদের কাছে আল-কিন্দির কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আল-কিন্দির Risala fi
‘istikhrag al-mu’amma গ্রন্থে ভাষা ও সংখ্যাতত্ত্বের এক গভীর ও আধুনিক বোঝাপড়া প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গ্রহণযোগ্য পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, পাঠকরা তখনই তার পরিসংখ্যানগত কৌশল প্রয়োগ করেন, যখন রচনাটি ‘পর্যাপ্ত’ অথবা সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে অর্থপূর্ণ হয়। এছাড়া তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আরো কিছু পদ্ধতি চালু করেছেন। এসব পদ্ধতির মধ্যে একটি ছিল স্বরবর্ণ-ব্যাঞ্জনবর্ণের অনুপাত বিশ্লেষণ এবং অক্ষরবিন্যাস শৈলী। তিনি উদ্ভাবন করেন, একটি লেখার স্বরবর্ণ-ব্যাঞ্জনবর্ণের অনুপাত নির্দিষ্ট ভাষার ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। যাহোক, সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি সম্পর্কে আল-কিন্দি তিনটি প্রধান প্রয়োগ কৌশল নির্ধারণ করেন, যা তিনি অভিজ্ঞতা-পরিসংখ্যানগত এবং বাস্তবসম্মত-সর্বজনীন মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে আবিষ্কার করেছেন। প্রথম ও সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী এবং উল্লেখযোগ্য সাংকেতিক ভাষা লেখার পদ্ধতি হলো ‘অক্ষরের মধ্যে স্বল্প ব্যবধান’। এ পদ্ধতিকে তিনি ‘অক্ষরের পরিমাণগত উপযোগিতা’ শিরোনামে আখ্যায়িত করেছেন, যা প্রথমে প্রায়ই ঘটে যাওয়া ‘সবচেয়ে বেশি উপযোগী অক্ষর’ নির্ধারণের জন্য কাজ করে। পাঠকদের সুবিধার্থে তিনি স্বাভাবিক বিন্যাসের জন্য বিভিন্ন সারণি তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে এ পদ্ধতি পরিসংখ্যানের জন্য মুখ্য হয়ে ওঠে।
আল-কিন্দির দ্বিতীয় পদ্ধতি ছিল ভাষাগত নিয়মের অন্তর্নিহিত ধারণা, যা সাধারণত আরো বেশি যুক্তিবাদী ও সর্বজনীন পাঠ্য নিয়মকানুনের সঙ্গে জড়িত। তিনি ‘একক শব্দের নিয়ম-কানুন’-এর অংশ হিসেবে অঙ্গকাঠামো ও শব্দের ব্যুত্পত্তি নিয়ে তদন্ত করেন, যা প্রথম পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, এবং এ দ্বিতীয় পদ্ধতিটি ‘গুণগত উপযোগী কৌশল’ হিসেবে ব্যবহূত হয়। এসব নিয়ম অনুসারে আল-কিন্দি ‘সংযুক্ত’ ও ‘অসংযুক্ত’ অক্ষর হিসেবে বিভাজন করে বর্ণনা করেন, এমনকি অক্ষরগুলোর বৈধ আদেশ ও অবস্থানও নির্ধারণ করেন। পরবর্তী সময়ে ইবনে আদলান (১১৮৭-১২৬৮) বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে আল-কিন্দির দ্বিতীয় পদ্ধতির উন্নতি সাধন করেন।
অন্যদিকে সাংকেতিক ভাষা লেখা সম্পর্কে আল-কিন্দির তৃতীয় কৌশল ছিল ‘সম্ভাব্য শব্দ’ পদ্ধতি, যা তিনি প্রকৃত গদ্যের অর্থসূচকের ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবন করেন। তিনি লক্ষ করেছেন কীভাবে প্রচলিত শব্দ অথবা বাক্যাংশ, যেমন ইসলামী রীতি অনুসারে যেকোনো কাজের শুরুতে উচ্চারণ করা হয় ‘পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে’, যা
সাংকেতিক অক্ষরে লেখা পাঠোদ্ধারের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ সাংকেতিক ভাষার কোনো লেখক যদি নির্দিষ্ট সাধারণ বা সম্ভাব্য শব্দ বা বাক্যাংশের সঙ্গে সংযুক্ত গুপ্তলিপি খুঁজে পান, তাহলে অনুমান করা যেতে পারে যে সাধারণভাবে লেখা সংশ্লিষ্ট অক্ষরগুলো প্রকাশ করা সম্ভব, যা একটি চাবিকাঠি কিংবা সাধারণ প্রতিস্থাপন হিসেবেও সর্বত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আরো বলেছেন, যেসব গোষ্ঠী ও রচনাশৈলীতে অদ্বিতীয় বাক্যাংশ ও সম্ভাব্য শব্দমালা থাকতে পারে, সাংকেতিক ভাষার লেখকরা সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন এবং তা সাংকেতিক ভাষা পাঠোদ্ধারের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে এ কথা সত্যি, পশ্চিমা দেশের পণ্ডিতদের মধ্যে আল-কিন্দির উদ্ভাবিত পদ্ধতি যৎসামান্য প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। পশ্চিমা দেশে সাংকেতিক অক্ষরে রচিত লিপি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে ও পাদ্রিদের দ্বারা লেখা হতো, যা ‘ব্ল্যাক চেম্বারস’ হিসেবে পরিচিত। সেই ‘ব্ল্যাক চেম্বারস’-এর সদস্যরা রাষ্ট্রেরই চৌকস অঙ্গ হিসেবে পরিগণিত হতো, কিন্তু শিল্পকলার শৈলীর প্রতি তারা সামান্য অবদান রেখেছেন। যাহোক, ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে আরবের ‘স্বর্ণযুগ’ ফিকে হতে শুরু করে। ঐতিহ্যগতভাবে বলা হয়, মঙ্গোলদের আক্রমণে আব্বাসীয় খেলাফতের পতনের পর থেকে ‘স্বর্ণযুগ’ বিলীন হতে থাকে। সেই সময় পশ্চিমা দেশের ভাষা লেখকরা খুবই শ্লথগতিতে অগ্রসর হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে লিওন ব্যাতিস্তা আলবার্তির De Cifris (১৪৬৬) পশ্চিমা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত হয়। দার্শনিক ও ‘নিখুঁত’ ভাষার পরিকল্পনাবিদদের কাছে অসংখ্য হিসাব এবং ‘কম্পিউটিং’ যন্ত্র থাকার পরও আলবার্তির কাজ পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুবাদ কর্মের উন্নতি সাধন করা হয়। নকশা, পরিকল্পনা ও প্রোগ্রামের ভাষার এ প্রবণতা বুদ্ধিবৃত্তিক স্রোতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস ছিল। এখন আমরা প্রথম দিকের কম্পিউটিংয়ের সঙ্গে পরিসংখ্যান যুক্ত করি। প্রথম দিকের কম্পিউটিংয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ওয়েভার ও ক্ল্যদ শ্যানোন, যারা মূল তত্ত্বের উন্নতির জন্য এবং আধুনিক তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সরঞ্জামাদির সমালোচনায় সরব ছিলেন।
(সংক্ষেপিত)
[পাদটীকা: নিবন্ধটি ক্যুইন ডুপন্টের লেখা The cryptological
origins of machine translation: From al-Kindi to Weaver-এর দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ। মূল লেখাটি ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে Amodern 8:
Translation-Machination
জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে]





