১.
মেরী স্টোপস হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারলাম, আমি তিন মাসের প্রেগনেন্ট। আমি মা হতে যাচ্ছি— এ রকম একটা খবর শুনে যেখানে আনন্দে আপ্লুত হওয়ার কথা, সেখানে কেন যেন টেনশন হচ্ছে। রিপোর্টটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে হাসপাতাল থেকে বের হলাম। মিরপুর থেকে রায়ের বাজার বধ্যভূমি হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, আর কত কী যে ভাবছি। তিন মাস পনের দিন হলো বিয়ে করেছি, বাড়িতে এখনো কেউ জানে না। ফারুক (আমার স্বামী) বলে— নিজেরা একটু গুছিয়ে নিই, তার পর জানাব। ১৭ বছর বয়স আমার, পিরিয়ড মাঝে মধ্যে অনিয়মিত। তাই পিরিয়ড অনিয়মিত নিয়ে খুব মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন হলো শরীরটা খুব খারাপ, খুব বমি হচ্ছে। কিছু খেতে পারছি না, এমনকি পানিও খেতে পারছি না, বমি হচ্ছে। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে ২০ টাকা ভিজিট দিয়ে মেরী স্টোপসে ডাক্তার দেখাতে এলাম। এখন এমন একটা খবর শুনে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল আমার।
মা, বাবা, ভাই, বোন কেউ নেই আমার, এতিম আমি। এক দূরসম্পর্কের মামার বাসায় মামির হাজার নির্যাতন সহ্য করে এসএসসি পাস করার পর মামি আর আমাকে তার বাড়িতে রাখতে রাজি না হওয়ায় একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে সার্ভের কাজ করি। তিন মাসের মধ্যে ২০ দিন কাজ হয়েছে সেখানে, সেখান থেকে যে টাকা পেয়েছি, বাসা ভাড়া দেয়ার পর এখন হাতে আছে ৪০ টাকা। এর ২০ টাকা দিয়ে ডাক্তার দেখানো হয়েছে, তাই শেষ সম্বল ২০ টাকা খরচ না করে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছি।
ফারুক বাড়িতে গেছে, তার মা অসুস্থ। সে প্রতি সপ্তাহে বিকালে বাসার পাশের ফার্মেসিতে ফোন দেয়। আজ তার ফোন দেয়ার দিন, তাকে জানাতে হবে আজ, আমাদের সন্তান পৃথিবীতে আসছে।
হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন বেলা ৩টা। বিছানায় শরীরটা দিয়ে ক্লান্ত আমি, আর চোখের কোণে জল। ৪টার দিকে ফার্মেসিতে যাই, ৫টা নাগাদ ফারুকের ফোন আসে। সে জানিয়ে দেয়, এখন এ অবস্থায় এ সন্তানের পৃথিবীতে আগমন সম্ভব নয়।
বললাম— এ সন্তান আমাদের প্রথম সন্তান।
শুনে সে বলল— একসঙ্গে থাকলে আরো সন্তান পাওয়া যাবে, তবে এখন সময় তার পক্ষে না।
আজ অ্যাবোরশন করাতে এসেছি, আমার সন্তানকে হত্যা করতে এসেছি।
দুদিন ঘুমাতে পারিনি। টাকা ধার করে অ্যাবোরশন করাতে এসেছি।
আমাকে আলাদা একটা রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। কাপড় পাল্টিয়ে অ্যাপ্রোন পরিয়ে আমাকে শুইয়ে দেয়া হলো। চলছে আমার সন্তান হত্যার প্রস্তুতি। সে যে কী কষ্ট, কী যে ব্যথা। আমার শরীর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে বের করা হচ্ছে, আমারই অংশ।
হত্যা করা হল আমার সন্তানকে।
হত্যা করা হলো একজন মাকে।
২.
আজ খুব লেখাপড়া করছি, আজ আমরা ভাত খাব। কী যে আনন্দ, বোঝাতে পারব না।
এই ভাবতে ভাবতে ছোট বোনটাকে বললাম— পলি, আয় মন দিয়ে পড়ি, আজ ভাত খাব।
অনেকগুলো ভাইবোন আমরা, সবাই লেখাপড়া করে। বড় বোনটা এইচএসসি দেবে, মেজো বোনটা এসএসসি দেবে। বড় ভাইটা নাইনে পড়ে, ছোট ভাইটা সেভেনে আর আমি ফাইভে পড়ি, পলি টুতে পড়ে। বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে। বাবা মায়ের কোনো খবর নেয় না, তাই আমাদেরও খোঁজখবর নেয় না। ভাবখানা এমন যে, এই সন্তানগুলো শুধু মায়ের, বাবার কোনো ভূমিকা নেই বা দায়িত্ব নেই সন্তানদের প্রতি। ১৫ দিন ধরে নানা বাড়ি থেকে আনা লাল আটার রুটি খাচ্ছি। রুটির ভেতরে মাঝে মধ্যে পোকা দেখি, আমি কাউকে বলি না, তাতে সবার খাওয়া নষ্ট হয়ে যাবে। এলাকার এক দিদিমণি আছে, যার কাছে আমি পড়তে যাই। ভালো ছাত্রী বলে সে আমার কাছ থেকে বেতন নেয় না। দিদিমণি, আমাদের ২০ জনকে একসঙ্গে পড়াত। আর মাঝে মধ্যেই একটা ডিম সিদ্ধ খায়। আমি দিদিমণির দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবতে থাকি— একটা মানুষ, একটা ডিম একবারে খায় কীভাবে!!!!?
আজ দিদিমণির কাছে যখন পড়ছিলাম, তখন মা গিয়ে দিদিমণিকে বলল— ‘আজ ওকে একটু আগে আগে ছেড়ে দিবেন। একটা দোকান থেকে বাকিতে এক কেজি চালের ব্যবস্থা করেছি, শিল্পী গিয়ে একটু নিয়ে আসবে।’ দিদিমণি আমাকে ছুটি দিয়ে দিল, আমিও লাফাতে লাফাতে বুকের মধ্যে বইগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাড়িতে এসে মাকে বললাম— ভাত কি দিয়ে খাব? মা বলল— ‘তরকারি তো জোগাড় করতে পারিনি, চাল নিয়ে আয়, গরম ভাত কাঁচামরিচ আর লবণ দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে’।
আমি বইগুলো রেখে এক দৌড়ে দোকানে। দোকান থেকে চাল আনার পথে সবজিবাজারে দেখলাম, সেখানে দোকানদাররা পচা আর পোকা বেগুনগুলো ফেলে দিচ্ছে। আমি সেগুলো কুড়িয়ে যে ফ্রকটা পরে আছি, তার মধ্যে বেঁধে আনলাম। বাড়িতে এসে মাকে দিলাম।
মা রান্না করছে ভাত আর বেগুন পোড়া। ভাতের ঘ্রাণ কী যে আনন্দময়, তা বলে বোঝানো যাবে না! এই পলি, পড়, জোরে জোরে পড়, আজ ভাত খাব। এই বলে আমিও চিত্কার করে পড়তে লাগলাম—
‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’
৩.
ভাবছি রক্ত বিক্রি করব, গত দুদিন আমার ছোট্ট মেয়েটি না খেয়ে আছে। মা হিসেবে এখন কি আমার আত্মহত্যা করা উচিত? আমার রক্তের গ্রুপ এবি নেগেটিভ, শুনেছি এ রক্তের অনেক দাম।
দীর্ঘ পাঁচ বছর সংগ্রাম করে চলেছি আমরা, আমরা বলতে আমি আমার মেয়ে মেঘ। মেঘের যখন নয় মাস বয়স, তখন তার জন্মদাতা আমাদের অস্বীকার করে চলে যায়। তার পর থেকে একটু একটু করে ভেঙে পড়া, আবার শক্ত হওয়া।
খুব বিত্তবান পরিবারে জন্ম না নিলেও মধ্যবিত্ত একটি সুখী পরিবারের সন্তান আমি। পরিবারের অমতে বিয়ে করে ফেলি পড়ালেখা শেষ করার আগেই। যাকে এত ভালোবেসে, ভরসা করে হাত বাড়িয়ে ছিলাম নতুনের পথে, সে যখন অচেনা অজানা পথের মাঝে ছেড়ে দিল, তখন নয় মাসের বাচ্চাটাকে নিয়ে পথ চলা শুরু। পুরুষ ছাড়া একা একা জীবনযাপনে আমার কোনো সমস্যা না থাকলেও আমার আশপাশের মানুষগুলোর একাধিক সমস্যা দেখেছি আমাকে নিয়ে। যারা কিনা একবেলা না খেয়ে থাকলেও কোনো সময় পেটের খবরটা নিতে আসেনি। এমনকি আমার পাঁচ বছরের মেয়েটিরও না।
সবদিকে ব্যর্থ চেষ্টা করে মেডিকেলের দিকে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল নীরা আর এসব কথা ভাবছিল। ভাবছিল, একজন নারীর জন্য কখনই কোনো পথ সহজ-সরল বা সমান্তরাল হয় না। অনেককে বলতে শুনেছে সে, ‘যে পাহাড় ডিঙাতে পারে, সে-ই প্রকৃত যোদ্ধা।’ পাহাড়ে ওঠা কি এত সোজা, দম লাগে।
তবু জীবনের কাছে হার না মেনে চলব এ পথ, পথকে আমি দেখিয়ে দেব— আমিই তোমার সব...।
৪.
আমার যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আমার বয়স ১৫ কিংবা ১৬ বছর। মাত্র ক্লাস টেনে পড়ি, গরিব কৃষকের মেয়ে। দেখতে সুন্দরী ছিলাম, তাই মেম্বারের ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। আমরা নয় ভাইবোন ছিলাম। বুঝতেই পারছেন, এ রকম একটা পরিবারের মেয়ের বিয়ে মেম্বারের ছেলের সঙ্গে, চাট্টিখানি কথা না। তো খুব আয়োজন করে ঘটা করে আমার বিয়ে হয়েছিল, বিয়ের আগে ভাবিরা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিল বাসর রাতে স্বামীর আদর-সোহাগের কথা। সেসব কথা শুনে লজ্জায় আমার কান মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল।
যাক সেসব কথা, বিয়ে হয়ে গেল আমার। আমি এখন স্বামীর বাড়ি। স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার পর নানা রকম আয়োজন শেষে আমাকে ফুল দিয়ে সাজানো একটি রুমে নিয়ে গিয়েছিল আর মেয়েরা আমাকে খাটে বসিয়ে মুখে একটা খোঁচা দিয়ে বলেছিল, ‘নাও গো দিয়ে গেলাম বাসর ঘরে, বাকিটা সামলানো তোমার কাজ।’
তারা চলে যাওয়ার পর যে লোকটার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে, যাকে আমি ভালো করে এখনো একবার দেখিনি, আমার স্বামী ঘরে ঢুকে দরজা আটকে খাটে এসে বসল আর বলল— ‘ওই দেখ, টেবিলের ওপর দুধ আছে নিয়ে আয়।’ আমি লক্ষ্মী বউয়ের মতো গ্লাসভরা দুধ এনে দিতেই সে খেয়ে গ্লাস রেখে আসার নির্দেশ দিলে, তা মেনে খাটের পাশে এসে দাঁড়াই। সে আমাকে বলে— ‘কিরে দাঁড়াই আছিস ক্যান, শুয়ে পড়।’ আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করতে থাকি। সে আবার বলে— ‘কিরে, শুয়ে পরিস না ক্যান? তোরে কি দেখার জন্য বিয়া করছি?’ এই বলে সে আমাকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
তারপর, তারপর জোর করে আমার শরীরের সঙ্গে তাণ্ডবলীলা চালায়। সে যে কী ভয়ঙ্কর, কী যে ব্যথা, কী যে কষ্ট: (আমার সমস্ত শরীর ব্যথায় কুঁকড়ে আসে, আমি প্রথমে একবার চিত্কার করে উঠলে, আমাকে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলে— ‘কিরে মাগী, চিল্লাস ক্যান? আব্বা, মা পাশের রুমে, চুপ।’ আমিও চুপ করেই ছিলাম, ব্যথায় গোঙাতে পর্যন্ত পারিনি। সে তার শরীরের সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাকে পিষে ফেলেছে, তার নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যায় তার কামবাসনা।
পরের দিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে গেলে পেটে ব্যথা, শরীর ব্যথা। আমার স্বামী আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলে— ‘ওই উঠ, মা উঠে গেছে। কলতলায় পানির শব্দ পাস না? যা মারে সাহায্য কর।’
করেছি, সারা দিন সংসারের সব কাজ করে, শ্বশুর-শাশুড়ির সব কাজ করে রাতে আবার সেই একই পাশবিক কর্ম চলেছে আমার ওপর...
এখন? প্রায় ২০-২৫ বছর হইল সংসার করি, তিন বাচ্চার মা আমি এখন। ছেলেমেয়েরা সবাই বড় হয়ে গেছে। এত দিনেও সংসারে স্বামীর আদর-সোহাগ কারে বলে চিনলাম না, শুধু তার কামনাই পূরণ করে গেলাম। প্রতি রাতেই স্বামীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেকে সপে দিচ্ছি, অনিচ্ছায়। মেয়েমানুষ, স্বামীর সংসার করাই ধর্ম, তাই স্বামীর সকল ইচ্ছা মেনে নেয়াটাই ধর্ম।






