দূর থেকে প্রথম দর্শনে মনে হয়েছে, ‘বন্দী শিবির থেকে’ (১৯৭২)-এর কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) সন্তর মতো এগিয়ে আসছেন আমাদের দিকে; না A time Between Ashes and Roses (1971)-এর কবি আদোনিস (১৯৩০), যারপিতৃ প্রদত্ত নাম আলী আহমদ সাঈদ এসবার হেঁটে আসছেন যেন দামেস্ক থেকে লেবানন, লেবানন হয়ে প্যারিস আর পারস্যের কিছু গোলাপ আর গোলাপের সুবাস নিয়ে ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮ উদ্বোধন করতে। শামসুর রাহমানের বিনয়ের কথা মনে পড়বে আদোনিসের সংস্পর্শে আসা লেখক-পাঠক-সংস্কৃতিমনা মানুষের। ঢাকা লিট ফেস্টের অন্যতম পরিচালক কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ ঢাকা ক্লাবে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় মনে হলো, ৮৭ বছরের আরবের এ মহান কবি বিনয়ের সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাম জিজ্ঞেস করলেন, বললাম শামীম রেজা, তিনি নাকে দীর্ঘ ঘ্রাণ নিয়ে আরবিতে বললেন, তারপর ফরাসি বললেন, অতঃপর কুণ্ঠিতভাবে ইংরেজিতে সুঘ্রাণে, সুগন্ধি ফুলের চেয়েও অধিক কত কত সমার্থক কথা আমার মুগ্ধতা দেখে হাত বাড়ালেন উষ্ণতা অনুভব করলাম; কবির বড় মেয়ে আরওয়াদ এসবার দোভাষীর ভূমিকায় এলেন, আমি ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম দেওয়ানি হাফিজের রুমীর
মসনবির, ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম খৈয়ামের রুবাইর কিছুটা আরব কবি ইমরুল কায়েসের। এ ঘ্রাণ গোলাপের চেয়েও অন্য কোনো অনন্তের, অন্য কোনো আলাদা অতিন্দ্রিয়র, শা বলে মিম উচ্চারণ করতে করতে আবার বললেন, হে তরুণ কবি বন্ধু, তোমার জন্য আমার হূদয়ের উষ্ণতা, মানবিকতার পক্ষে দাঁড়িয়ে লিখে যাও পৃথিবীর ইতিহাস, তোমার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ুক নামের মতো। আমার হাতে বন্ধু আলীম আজিজের দেয়া ‘বণিক বার্তার সিল্করুট’ ছিল, সেখানে আদোনিসের কবিতার অনুবাদের ওপরে বড় একটি ফটোগ্রাফ ছিল কবির। তিনি অনুবাদকের নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং লিখতে বললেন, আমি আমার বন্ধু রফিক উম মুনির চৌধুরীর নাম লিখলাম, কবি সাহায্য নিলেন মেয়ের। আনন্দিত হলেন মনে হলো, চেহারায় কমলা রঙের আভা ধরেছে, চোখে বিস্ময়, স্প্যানিশে অনূদিত আরেকটি গ্রন্থ তার সামনে বাড়িয়ে দিলাম।
দিতেই প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি স্প্যানিশ জানো নাকি? বললাম না, আমার বন্ধু তোমার ‘নিউইয়র্কের জন্য কবরলিপি’ কবিতাটি অনুবাদ করেছেন স্প্যানিশ থেকে। আরো জানালাম, তোমার নির্বাচিত কবিতা নামে একটি সংকলন আরবি থেকে শাহদাৎ তৈয়ব অনুবাদ করেছেন। তিনি অনেকক্ষণ ধরে ক্যালিগ্রাফি করে করে Khaled Matlawa-এর ইংরেজি অনূদিত বইটিতে স্বাক্ষর করলেন আমার জন্য। মানবিক রূপ দেখছিলাম আর মনে পড়ে যাচ্ছিল শামসুর রাহমানের বিনয় আর কবিতার কথা—
‘কবুরে স্তব্ধতা নিয়ে বসে আছি। নড়ি না চড়ি না/এইটুকু...
পুরো শহরে সৈন্যরা টহল দিচ্ছে, যথেচ্ছ করছে গুলি, দাগছে কামান
...মরছে মানুষ পথে-ঘাটে-ঘরে, যেন প্লেগবিদ্ধ রক্তাক্ত ইঁদুর। (পথের কুকুর, বন্দী শিবির থেকে)
আদোনিসের ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি মনে পড়ে যাবে পাঠকের, মনে পড়বে ভৈকম মহম্মদ বশিরের গল্পের কথা;
যুদ্ধ-মৃতদের হাড়ে তৈরি লাঠি ভর করে হাঁটছে সময়
মানবিক চোখের পাপড়িতে যেন বিষাক্ত সিসায় বুনে চলা লাল গালিচার উৎসব
যুদ্ধ-অজস্র শেকল ভাঙা চুরমার হওয়া ছিন্নভিন্ন ধড় আর ঘাড়ের উৎসব
ইতিহাস শুধুই পা, আর সময় যেন নিছকই জুতা...
(যুদ্ধ, আদোনিস)
দ্য প্যারিস রিভিউ থেকে অনূদিত রবিন ক্রেসওয়েলের ইংরেজি অনুবাদের অনুবাদ বন্ধু রফিকের ‘একালের শোকগাথা’ নিয়ে কথা হলো ‘দেশান্তরী ট্রাকেরা/ সীমান্তের পর সীমান্ত পেরোয়ে/ নির্বাসন আর হু হু আগুনের/ গানের মধ্য দিয়ে...’
পরিযায়ী পাখির মতো এক্সাইল কবি, পেরুর Cesar vallejo(1892-1938) সেজার ভায়েহো, ফ্রান্সে; রোমানিয়ার কবি Paul Celan (1920-70) পাউল সেলান ফ্রান্সে, রাশিয়ান-আমেরিকান কবি Joseph Brodsky (1940-96) জোসেফ ব্রডস্কি নিউইয়র্কে, যিনি ১৯৮৭ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন; এদের কথা মনে করিয়ে দেবে আদোনিসের নির্বাসিত জীবনালেখ্য, বিশেষ করে কবিতা পাঠ করতে করতে। বিশেষভাবে মনে পড়বে টিএস এলিয়ট আর আমাদের জীবনানন্দের কথা, যাদের কবিতা চিত্রকল্পের ভেতর চিত্রকল্প, উপমার ভেতরে উপমা, পরাবাস্তবের ভেতর পরাবাস্তব-পাশ্চাত্য আর প্রাচ্য একবার বা লীন যেন আদোনিসের কবিতায়। পরাবাস্তব আর সুফিবাদ মিলেমিশে সহাবস্থান করে কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছেন আদোনিস।
বাংলা ট্রিবিউনের বৈঠকিতে ডিএলএফের অন্যতম পরিচালক আহসান আকবার জানিয়েছিলেন কীভাবে আদোনিসের ঢাকা আগমন সম্পর্কে। নোবেল লোরিয়েট ভিএস নাইপল ঢাকায় এসে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, আহসানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমাদের জন্য আমার কিছু করার আছে কিনা? একবাক্যে আহসান আকবার জানালেন, আমরা ২০১৭ একজন কবিকে ঢাকায় নিতে চাই, সে যদি আপনার বন্ধু আদোনিস হয়, তাহলে খুব ভালো হয়। নেপথ্যের গল্প আরো ভিন্ন রকমের। দুই পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ ও আহসান আকবার প্যারিসে আদোনিসের সঙ্গে দেখা করতে যান; একবাক্যে রাজি হন আদোনিস। তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাঈদের উক্তিটি মনে পড়বে আমাদের— Today’s most daring and provocative Arab poet, মনে পড়বে আদোনিস সম্পর্কে তার বন্ধু নাইপলের কথা— ‘আমাদের শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ব্যক্তিত্ব আদোনিস। অসামান্য প্রজ্ঞা আর অন্তর্দৃষ্টি যার। আমাদের কালের গুরু।’
লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের লনে কাবিতা পাঠ শেষে দায়িত্ব পড়ল আদোনিসকে ক্যাফে নিয়ে গিয়ে সঙ্গ দেয়ার। তার বেড়ে ওঠা, ১৪ বছর বয়সে সিরিয়ার অজপাড়াগাঁ কাসাবিনে প্রেসিডেন্টের সামনে কবিতা পাঠ, কোরআনে হাফেজ এক কিশোরের কবি হয়ে ওঠার গল্প, দামেস্ক আর লেবাননে তার স্টাডিতে ইসরায়েলি বোমা পড়ার গল্প এরই মধ্যে আমাদের জানা হয়ে গেছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
পশ্চিমা আধুনিকতার অন্তসারশূন্যতার প্রশ্নে তার প্রথম দিকের বইয়ের কথা বললেন, যার নাম আরবিতে ‘আগানি মিহইয়ারিদ দামেস্কি (১৯৬১)’ আরবি কবিতার ইতিহাসে ভাষা আর বোধের গভীরতা, চিন্তা আর দার্শনিকতায় এ কাব্যগ্রন্থ এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ‘আকারে রূপে নিরাকার হয়ে থাকার যে সুফিবাদী উচ্চারণ, তা-ই আদোনিসের কবিতার মূল সুর। ‘কোনো আদর্শের সরাসরি ব্যবহার করলে সেটা কবিতা থাকে না— বললেন আদোনিস। আমি বিভিন্ন সময় সরাসরি বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছি, কারাবরণ করেছি, কিন্তু কবিতায় বিমূর্তভাবে এসেছে আমার বোধে।’ বর্তমান পৃথিবীতে মুসলিমদের অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ইবনে রুশদের মতো ভাবুক কিন্তু জন্মেছে আরববিশ্বে, যাকে পাশ্চাত্য পড়াতে নিষেধ করেছিল দীর্ঘদিন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের সেই সময়ের মতো উঠে দাঁড়াতে হবে। আমেরিকার কলোনি হয়ে আছে আরববিশ্ব। এখান থেকে বেরিয়ে সন্ত্রাসবাদী সংস্কৃতিকে পেছনে ফেলে মুসলমানদের পাশ্চাত্যের অনন্য সংস্কৃতিটুকু নিতে হবে, ঘুরে দাঁড়াতে হবে ইবনে সিনাদের সময়ের মতো। ধর্মবিশ্বাসী মুসলিমরা ব্যবহূত হচ্ছে সেই স্পেনের পতনকাল থেকে, ঘুরে দাঁড়াতে হবে বিজ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, মেধায়। রাতের পার্টিতে আবার পাশে বসা, আবার ছবি তোলা, এমন করে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কবিকে দেখা ছাড়া কিইবা আর কথা চলে। পড়ে নেব ভেবে এক শতকের প্রায় সমান বয়সী কবিকে (বাতেনে) গোপন করে ফেলেছি তার অবয়ব, আত্মার ভেতরে বদলাতে চেয়েছি আদোনিসের কবিতার সারাৎসার। যেন ‘দেহই আমার স্রষ্টা/ প্রেমই দেহের সৃষ্টিকর্তা/ দেহই আমার ফিত্না— দেহই আমার নিয়ামত/ দেহই আমার সত্তা... (নারী)






