দেশে এখন তত্ত্বোঘাটনের সময় আসিয়াছে। ইহা ভাল। কিন্তু এই সময় স্রোতে আমরা ‘গা ছাড়িয়া দিয়া ভাসিয়া না যাই’ তবেই মঙ্গল। বন্যার সময় একটু সতর্কতা অবলম্বন করিতে পারিলে বিপদের আশঙ্কা কম। তাই প্রত্নতত্ত্ববিদগণ বা পুরাতত্ত্ববিদগণ বা ঐতিহাসিকগণের একটু ধীরে ও সাবধানে চলাই সমীচীন বলিয়া বোধ হয়।
নূতন তত্ত্ব লইয়া জনসাধারণের নিকট উপস্থিত হওয়া, নূতন তত্ত্ব প্রকটিত হইতে আলোচনার জন্য সময় দেওয়া ও আলোচিত বিষয় হইতে সত্যোত্ঘাটন করা এক কথা; আর যে তত্ত্ব কেবল অনুমান সিদ্ধ, সেই তত্ত্ব লইয়া হঠাৎ কোন স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ভিন্ন কথা। আমরা শেষোক্ত পথের অনুসরণ করিতে ইচ্ছুক নহি। আলোচনার জন্য দুই চারিটি কথা বলিতে ইচ্ছা করিয়াছি মাত্র।
ঢাকা সহরের প্রায় চৌদ্দ মাইল উত্তর-পশ্চিমে বংশাবতী বা বংশী বা বংশাই নদীর পূর্ব্বপারে সাভার গ্রাম অবস্থিত। এই বংশাই নদী ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা, ইহা ব্রহ্মপুত্র হইতে উত্পন্ন হইয়া ময়মনসিংহের মধ্য দিয়া সাভারের সন্নিকট ধলেশ্বরীতে পড়িয়াছে।
বর্ত্তমান সাভারের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে বংশাই ও ধলেশ্বরীর সঙ্গম স্থল।
এই সাভারের রাজা হরিশ্চন্দ্রের বিষয় লইয়া আজ দুই-তিন বৎসর যাবৎ কিঞ্চিদধিক আলোচনা হইতেছে। এতদঞ্চলে রাজা হরিশ্চন্দ্রের বিষয়ে অনেক প্রবাদ প্রচলিত আছে। ভাল উপকরণাভাবে কোন বিষয়েরই কোনরূপ স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারা যাইতেছে না। সকলই প্রায় অনুমান সিদ্ধ হইয়া পড়িতেছে। এই আলোচনার সময় অন্তত পথ দেখাইবার জন্য দুই চারটি কথা বলা আবশ্যক, গবেষণার ভাণ মাত্রও ইহাতে নাই।
বর্ত্তমান সাভারের পূর্ব্বনাম কি ছিল। কেহ বলেন ‘সমভাগ’; কেহ বলেন ‘সমভার’; কেহ বলেন ‘সর্ব্বেশ্বর’। কেহ বলেন ‘সর্ব্বেশ্বর’ সমভাগ বা সমভারের রাজধানী। শ্রীমান বীরেন্দ্র নাথ বসু মহাশয় সাভার ধলেশ্বরীর পূর্ব্বপারে অবস্থিত এইরূপ লিখিয়াছেন কিন্তু তাহা ঠিক নহে। পূর্্বেই উক্ত হইয়াছে যে, সাভারের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে বংশাই ও ধলেশ্বরীর সঙ্গম স্থল।
নাম সম্বন্ধে উক্ত বসু মহাশয় লোকমুখে শ্রুত পয়ারটির উল্লেখ করিয়াছেন, যথা—
‘বংশাবতী পূর্ব্বতীরে সর্ব্বেশ্বর নগরী।
বৈসে রাজা হরিশ্চন্দ্র জিনি সুরপুরী।।’
আমরা অন্যরূপ কিছু উল্লেখ করিব। কিন্তু কথাটা স্পষ্টই করিয়া বলা ভাল যে, ইহার কিছু রূপান্তর করিতে হইয়াছে। বহুকালের হস্তলিখিত পাঠ উদ্ধার করা সুকঠিন বিধায়। যেরূপ পাঠ দাঁড় করান গিয়াছে তাহা এইরূপ—
ধীমন্ত পুত্রো রণধীরসেন: সংগ্রামজেতাইব কার্ত্তিকেয়স্য হিমনগ ব্যাপ্তদেশং বিজিত্যা সম্ভার পুর্ষ্যামবসৎ প্রবীরঃ।।
কার্ত্তিকের সদৃশ সংগ্রামজয়ী প্রবীর ধীমন্তপুত্র রণধীরসেন হিমালয় ব্যাপ্তদেশ জয় করিয়া সম্ভার পুরীতে বাস করিতেন। এখন দেখা যায় ‘সাভার’ ‘সমভারের’ অপভ্রংশ মাত্র। এখন প্রশ্ন এই যে, এই ধীমন্ত সেন ও রণধীরসেন কে? রণধীর সেন কোথা হইতে কোন সময়ে এই স্থানে আসিয়া রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন? ধীমন্ত সেন সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে—
যো জাতো বীরবর মহিতাইন্দুবংশ বিশেষাৎ
ধীমন্তো বীরবর মুকুটাদ্ভীমসেনান্ন পেজাৎ।।
চন্দ্রবংশতুল্য শ্রেষ্ঠ বংশ হইতে এবং বীরশ্রেষ্ঠগণের শিরোভূষণ স্বরূপ বীরবর পূজিত নৃপেন্দ্র ভীমসেন হইতে ধীমন্ত জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ভীমসেনইবা কে? কে তাঁহার পিতা? কোথায় তাঁহার বাড়ী? কি তাঁহার জাতি? ইহা জানা সময় সাপেক্ষ বটে।
রাজা হরিশ্চন্দ্র রণধীরের পুত্র। তিনি হরিশ্চন্দ্র পাল বলিয়া খ্যাত। ‘সেন’ উপাধি না হইয়া নামের অংশও হইতে পারে। ইহার জন্য প্রমাণ উল্লেখ করা অনাবশ্যক। রণধীর বীর ছিলেন। বড় যোদ্ধা না হইলে দেশ জয় করা কিরূপে সম্ভব হয়? উত্তরে হিমালয় ব্যাপ্তদেশ জয় করিয়া, দক্ষিণে ধলেশ্বরীর তীর পর্য্যন্ত দেশ অধিকারপূর্বক সমভার পুরীতে বাস করিতেছিলেন। আর তাঁহার ধার্ম্মিক পুত্র হরিশ্চন্দ্র ধর্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের ন্যায় দয়া ও ন্যায়পরতার সহিত প্রজা শাসন করিয়া ‘মহারাজ’ উপাধি লাভ করেন। বর্ত্তমান সাভার এবং তন্নিকটবর্ত্তী গ্রামসমূহে মহারাজা হরিশ্চন্দ্রের কীর্ত্তিচিহ্নাদি বহুল পরিমাণে দৃষ্ট হয়। এতদঞ্চলে কেবল তাঁহারই নাম লোকমুখে শ্রুত হইয়া থাকে। ইহার পরবর্ত্তী দুই একজন রাজার নাম এখনও শ্রুত হয় বটে। কিন্তু তাঁহাদের প্রতাপ এতদূর ছিল বলিয়া বোধ হয় না। রাজা হরিশ্চন্দ্রের ভাগিনেয় দামোদর রাজা এবং তদ্বংশোদ্ভূত রাবণ রাজা বড় রকমের ভূম্যধিকারী ছিলেন বলিয়া বোধ হয়।
মনে হয়, যেমন সুলতান মহম্মদ ভারতবর্ষে রাজ্য অধিকার করিলে মহম্মদ ঘোরি অধিকৃত রাজ্যে মুসলমান শাসন দৃঢ় করেন; যেমন ক্লাইভ ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজত্ব স্থাপন করিয়া দিলে হেষ্টিংস তাহা সুদৃঢ় করেন; তেমন রণধীর সেন বঙ্গদেশের উত্তরাংশ জয় করিলে হরিশ্চন্দ্র সুশাসন দ্বারা রাজ্য সুরক্ষিত করিয়া, দয়া ধর্ম্ম দ্বারা প্রজাপালন করিয়া নিজ নামটি অক্ষয় করিয়া গিয়াছেন। হরিশ্চন্দ্রের রাজত্ব সময়ে এই স্থানে প্রাসাদ, মঠ, দুর্গ, সৈন্যাবাস, বুরুজ ইত্যাদি প্রস্তুত হয়। সুশৃঙ্খলতার সহিত রাজ্যশাসন করায় তিনি ধনকুবের হইয়া উঠেন। উক্ত হইয়াছে তিনি রণধীরের পুত্র, তিনি ধার্ম্মিক এবং তিনি কুবের তুল্য সমৃদ্ধবান ছিলেন।
হরিশ্চন্দ্রো মহারাজো রণধীরস্য পুত্রকঃ
ধর্ম্মেশইব ধর্ম্মাতমা সমৃদ্ধ কুবেরাধিপ।
কুবের তুল্য সমৃদ্ধবান হইয়া তিনি প্রজার ধন প্রজার জন্যই ব্যয় করিয়া গিয়াছেন। আজও এতদঞ্চলে ‘সারে বারগণ্ডার’ প্রবাদ সকলের মুখেই শোনা যায়। প্রবাদের পঞ্চাশটি দীঘির অধিক সংখ্যক দীঘির চিহ্ন এখনও বর্ত্তমান। পরবর্ত্তী রাজগণ কিছু না করিয়াছিলেন এমত নয়। গাজীদের সময়ও অনেক দীঘি খনিত হইয়াছিল। ‘গাজীর দীঘি’ প্রভৃতি তাহার প্রমাণ।
ইতিপূর্ব্বে সুলেখকগণ দ্বারায় সবিস্তারে প্রকাশিত হইয়াছে বলিয়া দীঘিগুলির পরিচয়ের পুনরুল্লেখ অনাবশ্যক। তবে নিরামিষ দীঘি, জীয়স দীঘি প্রভৃতি দুই চারিটি দীঘি সম্বন্ধে এখনও নূতন তত্ত্ব বাহির করিবার উপরকরণ রহিয়াছে; সময় সাপেক্ষ।
হরিশ্চন্দ্র ধর্ম্মপরায়ণ রাজা ছিলেন। তাহার কি ধর্ম্ম ছিল? তিনি বৌদ্ধ ধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। কারণ পূর্ব্ববর্তী তত্ত্বানুসন্ধিত্সুগণ যে সকল ইষ্টকখোদিত বুদ্ধমূর্ত্তি পাইয়াছেন বা সংগ্রহ করিয়াছেন এবং আমি নিজে বর্ত্তমান রাজাসন নামক স্থান হইতে খনন করিয়া যে বুদ্ধমূর্ত্তি ও ইষ্টক খোদিত বুদ্ধমূর্ত্তি পাইয়াছি এবং সমর্থনকারী শ্লোকটি পাঠ করিলে সন্দেহ করিবার আর কিছুই থাকে না। শ্লোকটি যথা—
যমুনায়া নদীতীরে বৌদ্ধাঙ্ক মঠমন্দিরে
বীজনেচ স রাজর্ষি ধর্ম্মার্থইব তিষ্ঠতে।।
এখন প্রশ্ন এই যে, তাঁহার জাতি কি ছিল? তিনি কি উচ্চবংশ, না নিম্নবংশ-সম্ভূদ ছিলেন? তত্পর প্রশ্ন এই যে, তিনি কি গৌড়ের পাল রাজগণের কোন পুরুষ? তাহা হইলে উল্লিখিত ভীমসেন, ধীমন্তসেন এবং রণধীর কে? কাল্পনিক নাম হইলে স্বতন্ত্রকথা। পুনঃ কেহ বলেন তিনি ‘ভূইঞা’ ছিলেন; কেহ বলেন তিনি ‘বানিয়া’ ছিলেন। কেহ বলেন তিনি ‘মাহিষ্য’ ছিলেন। সাভারের সন্নিকট গান্ধারিয়ার শ্রীযুক্ত কৈলাস চন্দ্র রায় এবং কোণ্ডা গ্রামের স্বর্গীয় ভারত চন্দ্ররায় মহা মহাশয়ের পুত্রগণ হরিশ্চন্দ্রের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিয়া থাকেন। ইহারা উভয়েই পরাশর দাস বা মাহিষ্য। সম্প্রতি খুলনা জিলার বরাকপুর গ্রামের বিশ্বাস বংশের কেহ কেহ হরিশ্চন্দ্রের বংশধর বলিয়া পরিচয় দিতে উদ্যত। ইহারা বারুই (বাড়ৈ) বংশ। আইন আকবরী প্রণেতা আবুল ফজল পাল বংশীয় নৃপতি দিগকে ‘কায়েথ’ (কায়েস্থ) বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। শ্রীমান বীরেন্দ্র নাথ বসু মহাশয় পালবংশীয় রাজগণকে ক্ষত্রিয় বলিয়া প্রতিপন্ন করিয়াছেন। কারণ আবুল ফজলের ‘কায়েথ’ তখন মসিজীবী বিধায় অসিজীবী ক্ষত্রিয় হইতে কিছু অধম বলিয়া পরিগণিত হইয়াছিলেন, নচেৎ কায়স্থ এবং ক্ষত্রিয় শব্দদ্বয় প্রায় একার্থ বোধকই ছিল।* এখন সেন পালের গোলযোগটা ভাঙ্গিতে পারিলেই পরিষ্কার পথ পাওয়া যাইত, সন্দেহ নাই।
রাজর্ষি হরিশ্চন্দ্র যমুনা নদীতীরে বুদ্ধমূর্ত্তি প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে, নির্জ্জনে বসিয়া ধর্ম্মপরিচর্য্যা করিতেন। কেহ কেহ বলেন, তিনি রঙ্গপুরে ধর্ম্মপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিজান করিয়া তথায় যুদ্ধে হত হন। প্রবাদ আছে রঙ্গপুর জিলায় তাহার জীবনপ্রদীপ নির্ব্বাপিত হয়। কিন্তু এইরূপ ঋষিতুল্য রাজা কি প্রকারে সৈন্য সামন্তসহ নিজ জামাতা গোবিন্দ চন্দ্রের সাহায্য করিতে যাইয়া, ধর্ম্মপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া, সুদূর রঙ্গপুর প্রদেশে প্রাণ হারাইয়াছিলেন? হইতে পারে যে, রঙ্গপুরে জামাতা ভবনে যাইয়া তাহার জীবন প্রদীপ নির্ব্বাপিত হয়, কিন্তু অতবড় ধার্ম্মিক রাজা যুদ্ধে প্রাণ হারাইয়াছিলেন, ইহা বিসদৃশ বলিয়া বোধ হয়।
তত্পর রাজা হরিশ্চন্দ্রের মৃতদেহ প্রোথিত করা হইয়াছিল কি দাহ করা হইয়াছিল? রঙ্গপুর জেলার মধ্যে কোন স্থানে (চড়চড়া গ্রামে) হরিশ্চন্দ্রের সমাধি স্থান আছে বলিয়া প্রবাদ আছে। এই সমাধির বৃত্তাকার স্তূপটি ‘হরিশ্চন্দ্রের পাট’ নামে খ্যাত। এই স্তূপের নিচে একটি প্রস্তর বাঁধান গৃহাংশ দৃষ্ট হয়। বৈবাহিক রাজা মানিকচন্দ্রের বাড়ীতে বা পথে হরিশ্চন্দ্র দেহত্যাগ করিলে তাহার মৃতদেহ রীত্যনুসারে ভূগর্ভে নিহিত করা হয় কি দাহ করা হয়? যতটা বুঝিতে পারা যায়, তাহাতে ধার্ম্মিক রাজা হরিশ্চন্দ্রের মৃতদেহ প্রোথিত করিয়া তদুপরি বৃত্তাকার স্তূপটি সমাধিস্তম্ভ করা হইয়াছিল এবং স্তূপটির নিচের গৃহাংশে মৃতদেহ রক্ষিত হইয়াছিল। যদি ইহা সম্ভব হয়, তাহা হইলে রাজা মানিকচন্দ্রের মৃত্যুর পর তদীয় স্ত্রী ময়নামতী জলন্ত চিতায় মৃত স্বামীর অনুগমন করিতে চেষ্টা করিলেন, ইহা কি প্রকারে হইতে পারে? তবে কি রঙ্গপুরের রাজা মানিকচন্দ্রের দেশের রীতিনীতি বিভিন্নরূপ ছিল? তাহা হইলে ইহা বলিতে হইবে যে, হরিশ্চন্দ্র বৈবাহিক মানিকচন্দ্রের দেশে দেহত্যাগ করিলে, তাঁহার দেশেরও সঙ্গীয় লোকজন দ্বারা, তাঁহার দেশের রীত্যনুসারে, তাঁহার মৃতদেহ প্রোথিত করাই হইয়াছিল। মানিকচন্দ্রের স্ত্রী ময়নামতীর সহমরণ সম্বন্ধে আমাদের এখন কিছু লিখিবার উপকরণ নাই।
তত্পর গান্ধারিয়ার রাবণ রাজার বাড়ীর উত্তর দিকে মানুষ পোড়ার ‘টেক্’টিকে হরিশ্চন্দ্রের সময়কার শ্মশান বলিয়া নির্দ্দেশ করা হইয়াছে, এই সিদ্ধান্তেও বিশেষ সন্দেহ আছে। এই মানুষ পোড়ার টেকটি আধুনিক বলিয়া বোধ হয়।
তত্পর বৌদ্ধ ধর্ম্মাবলম্বী হরিশ্চন্দ্র রাজার হিন্দুয়ানি ভাব। তাম্বুলবাড়ীর অনতিদূরে তাঁহার দোলমঞ্চ এবং পীলখানার নিকট রথখোলার উল্লেখও বিপরীত বলিয়া বোধ হয়। কারণ রাজাসন খনন করিয়া ইষ্টকখোদিত বৃদ্ধমূর্ত্তির যেরূপ বাহুল্য দেখা যায়, তাহাতে রাজা হরিশ্চন্দ্র হিন্দু ধর্মের কোনো অংশকে প্রশ্রয় দিতেন বলিয়া অনুমান করা সুকঠিন। পরবর্ত্তী প্রবল প্রতাপান্বিত ভুম্যধিকারীগণ দ্বারাও এই দোলমঞ্চ ও রথখোলা প্রতিষ্ঠিত হইতে পারে।
দোলমঞ্চের দক্ষিণে তাম্বুলবাড়ীর নিকট রাজগুরুর আশ্রম নির্দ্দেশ করা হইয়াছে। বৌদ্ধ ধর্ম্মাবলম্বী হরিশ্চন্দ্র যমুনা নদীতীরে মঠমন্দিরে নির্জ্জনে ধর্ম্মাচরণ করিতেন। তাহার গুরুর আশ্রম তাম্বুলবাড়ীর নিকটে থাকা অসম্ভব। বর্ত্তমান কর্ণপাড়ায় স্ত্রী-কর্ণাবতীর বিলাস ভবন ছিল। তথায় অবস্থানকালে তাম্বুলবাড়ীতে রাজা হরিশ্চন্দ্র তাম্বুল চর্ব্বণ এবং বিশ্রামাদি করিতেন। তাহার সন্নিকট গুরুর আশ্রম, সম্ভব কি অসম্ভব বিচার্য্যের বিষয় বটে।
কোন সময়ে রাজা হরিশ্চন্দ্র সমভারে রাজত্ব করিতেন এবং সেই সময়কার রীতিনীতি এবং কলা বিদ্যার প্রচলন কিরূপ ছিল, তাহা নির্ণয় করিতে একটি বিষয় চিন্তা করা আবশ্যক। এই স্থানের একটি বিশেষত্ত্ব আছে। সাভার অঞ্চলে কোনও প্রস্তর মূর্ত্তি বা প্রস্তর স্তম্ভ বা অন্য কোন রূপ খোদিত প্রস্তর পাওয়া যায় নাই। পূর্ব্ববঙ্গের সুবর্ণ গ্রামে (বোধ হয় মুসলমান শাসন সময়ে) প্রস্তরের প্রচুর আমদানী ছিল। বিক্রমপুরের রামপালে প্রস্তর স্তম্ভ দেখা যায়। ভাওয়ালের স্থানে স্থানে প্রস্তর স্তম্ভ পতিত আছে। সাভারের নাতিদূরে ধামরাই গ্রামেও প্রস্তর স্তম্ভ দেখা যায় কিন্তু সাভার অঞ্চলে কোনও প্রস্তর খণ্ড পাওয়া গিয়েছে বলিয়া সঠিক কিছুই জানা যায় না। কেবলই ইষ্টক নির্ম্মিত বা ইস্টক খোদিত মূর্তি পাওয়া গিয়েছে ও যাইতেছে। হরিশ্চন্দ্রের রাজপ্রাসাদ বা মঠ বা কোটবাড়ী বা বুরুজ হইতে রাশি রাশি ইষ্টক নীত হইয়া কেহবা বিক্রয়, কেহবা নিজকার্য্যে ব্যবহার করিয়াছে, একথা শোনা যায় কিন্তু প্রস্তুর নির্মিত কোন কিছু পাওয়া গিয়াছে বলিয়া জানা যায় না। তবে ইষ্টক নির্মিত এমন প্রকাণ্ড খণ্ড পাওয়া গিয়াছে যে, তাহা প্রস্তর খণ্ড বলিযা ভ্রম হয়। সাভারের পুরাতন ইষ্টকগুলির এই বিশেষত্ব। ইষ্টকগুলির নানা প্রকারের গঠন। প্রস্তুত প্রণালিও স্বতন্ত্র। ‘টালি’ ইটের পরিমাণ অদ্ভুত— ১৪–১২–৪; ১২–১০–৩ ইঞ্চি। একখানা বড় টালি উঠাইতে চেষ্টা করিয়াও বিফল হইয়াছি। এমনি শক্ত গাঁথুনি এবং ইট এত পুরাতন যে, সহজেই ভাঙ্গিয়া যায়। কতকগুলির কিম্ভূতকিমাকার গঠন। কতগুলি দালানের বিশেষ বিশেষ স্থানের জন্য নির্মিত হইয়াছিল। কিন্তু কোন স্থানে, কি অভিপ্রায়ে, কিরূপভাবে লাগান হইয়াছিল নির্ণয় করা সুকঠিন।
প্রকাণ্ড ইষ্টক খণ্ডের মধ্যভাগ কাল, উপরে ইষ্টকের রঙ প্রাপ্ত হইয়াছে। খণ্ড ইষ্টক হাতে লইলে অঙ্গুলি নিষ্পেষণেই চূর্ণ হইয়া যায়। কিন্তু কাল করা সুকঠিন বটে। কাল অংশ বিশিষ্ট ইষ্টক খণ্ড বড়ই হালকা। কাল অংশের বিশেষত্ব এই যে, উহার মাটির সহিত নানারূপ মসল্লা এবং তুষ মিশান হইত। গোটা তুষ বা তুষের স্থানটি কাল অংশ ভাঙ্গিলেই স্পষ্ট দেখা যায়। নিজে দেখিয়াছি, অনেককে দেখাইয়াছি। পূর্ব্বেই বলিয়াছি, এমন প্রকাণ্ড খণ্ড পাওয়া গিয়াছে, তাহা দালানের কোন অংশ এবং কি অভিপ্রায়েই যে কোথায় কিরূপে লাগান হইয়াছিল, তাহা অনুমান করা দুরূহ। স্থপতিবিদ্যাবিশারদগণ ইহা হইতে অনেক তত্ত্বোদ্ঘাটন করিতে সমর্থ হইবেন, সন্দেহ নাই। অপ্রাসঙ্গিক হইলেও এখানে একটি কথা বলি। গত আগস্ট মাসের ৭ই তারিখে ঢাকা নগরীতে সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-এ এক বৈঠক (Conversazione) হয়। উক্ত বৈঠকে বঙ্গের সহূদয় গভর্নর লর্ড কারমাইকেল উপস্থিত থাকেন। ঢাকা বিভাগের কমিসনার মাননীয় বেল সাহেবের আহ্বানে আমি তথায় উপস্থিত ছিলাম। সেই সান্ধ্য বৈঠকে, রাজাসনে প্রাপ্ত ইষ্টক নির্ম্মিত বক্র-গঠন এক প্রকাণ্ড খণ্ড দেখিয়া মাননীয় বেল সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘Well, Horendra Babu, what was this meant for? Was it meant for drain?’ স্থপতিবিদ্যার বিশারদ বলিয়া যে উত্তর প্রদান করিয়াছিলাম, তাহাতে হাসির রোল পড়িয়া গেল। নেহাৎ চুপ করিয়া থাকিবার আন্দাজ উত্তর না হওয়াতে আমাকেও হাসিতে যোগদান করিতে হইয়াছিল।
তত্পর রাজাসন সম্বন্ধে দুই একটি কথা বলিয়া আমরা অদ্যকার প্রবন্ধ শেষ করিব। রাজাসন শব্দের অর্থ রাজার আসন। হরিশ্চন্দ্রের রাজপ্রাসাদ বা অন্তঃপুর বর্ত্তমান মজিদপুরে। মজিদপুর আধুনিক নাম। পালবংশীয় নরপতিগণের অধঃপতনের পর এতদঞ্চলের গাজীবংশীয়দের হস্তগত হয়। গাজীবংশীয়গণ প্রথমতঃ ঈশাখাঁর অধীনে থাকিয়া পরগণা ভোগ করেন। পরে ক্ষমতাপন্ন হইয়া উঠিলে আনুগত্য পরিত্যাগপূর্বক দিল্লীশ্বরের নিকট হইতে বন্দোবস্ত সইয়া ভোগ দখল করিতে থাকেন। এক সময় চাঁদপ্রতাপ, সুলতানপ্রতাপ, তালিসাবাদ, কাশীমপুর প্রভৃতি পরগণাগুলি তাঁহাদেরই করায়ত্ত ছিল। সম্ভবত মজিদপুর নামটি সেই সময়কার। কেহ কেহ বলেন, এই স্থানের নাম ‘মজুতপুর’। এই স্থানের মৃত গর্ভ হইতে প্রচুর ধনরাশি পাওয়া গিয়াছিল বলিয়া ‘মজুতপুর’ নাম রাখা হইয়াছিল।
মজিদপুরের পূর্ব্বদিকে একটি বাইদ (নিম্নভূমি) আছে। এই বাইদটি নদীর তলভাগ বলিয়া অনুমিত হয়। এই বাইদের পূর্ব্বদিকে রাজাসন। অর্থাৎ বর্তমান মজিদপুর ও রাজাসনের মধ্যে বাইদ চলিয়া গিয়াছে। বাইদের পশ্চিমাংশের নামের পরিবর্ত্তন হইল, যথা মজিদপুর কিন্তু পূর্ব্বাংশের নাম রাজাসনই রহিয়া গেল। বাইদের পূর্ব্বপার নির্জ্জন বলিয়া পরবর্ত্তী কেহ ঐ স্থানে বাস করা উপযুক্ত বিবেচনা করেন নাই। যাহা হউক, মজিদপুরে হরিশ্চন্দ্রের রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ দৃষ্ট হয়। তিনি এই স্থানেই বাস করিতেন। তাহা হইলে, নদীর এক পারে তাঁহার বাস-ভবন আর অপর পারে তাঁহার রাজ-আসন ছিল। ‘রাজাসন’ কথাটা প্রকৃত হইলে বলিতে হইবে যে, তিনি প্রত্যহ রাজকার্য্যের জন্য নদী পার হইয়া রাজাসনে দরবার করিতে যাইতেন।
স্থানীয় লোক বলিয়া থাকে, এই স্থানটি হরিশ্চন্দ্রের ভাগিনের দামোদর বা দামু রাজার বাড়ী ছিল। দামু রাজা নিঃসন্তান মাতুলের রাজপ্রাসাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক রাজাসন নামক স্থানে বাড়ী প্রস্তুত করিয়াছিলেন, ইহা অনুমান করা যায় না। বাইদের পশ্চিম পারে হরিশ্চন্দ্রের কীর্ত্তিসমূহ চতুর্দ্দিকে বিক্ষিপ্ত রহিয়াছে। বাইদের পূর্ব্বপারে রাজাসনে সামান্য একটু স্থানে ভগ্নাবশেষ ইষ্টকাদির স্তূপ দৃষ্ট হয়। ইহার কিঞ্চিৎ পূর্বে একটি চৌবাচ্চা আছে। এই চৌবাচ্চা সম্বন্ধে অনেক প্রবাদ আছে, তাহা বারান্তরে বলিবার ইচ্ছা রহিল। রাজাসনের ভগ্নাবশিষ্ট ইষ্টক স্তূপবিশিষ্ট স্থান ও তাহার সন্নিকট চৌবাচ্চা দেখিয়া মনে হয়, ‘রাজাসন’ নামটি ‘বাজাসন’ হইতে আসিয়াছে। পরবর্তী লোকেরা বাজাসনের কোন অর্থ বুঝিতে না পারিয়া হরিশ্চন্দ্র বা দামোদর রাজার আসন, তাই রাজাসন বলিয়াই স্থানটি নির্দেশ করিয়াছে। আগ্রহাতিশয্যে বিশেষভাবে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিলাম, আজ ২/৩ বৎসরের মধ্যে এখান হইতে যে সকল ইষ্টক খোদিত বুদ্ধমূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে, তাহা সমস্তই রাজাসন হইতে। হরিশ্চন্দ্রের রাজপ্রাসাদ বা বুরুজ প্রভৃতির ভগ্নাবশিষ্ট ইষ্টকরাশি হইতে কেবল কারুকার্যখচিত ইষ্টক পাওয়া গিয়াছে, কোনরূপ ইষ্টক খোদিত মূর্ত্তি পাওয়া যায় নাই।
রাজাসনের যে স্থান হইতে ইষ্টক খোদিত মূর্ত্তি পাওয়া গিয়াছে বা পাইয়াছি, আমাদের মতে সেই স্থানে বৌদ্ধ মঠ বা বিহার ছিল এবং নিকটবর্ত্তী চৌবাচ্চাতে বৌদ্ধ ক্রিয়াদি সম্পন্ন হইত এবং সেই স্থানের পূর্ব্বনাম বজ্রাসন বা বাজাসন ছিল। রাজাসন আধুনিক কল্পিত নাম। শ্রীযুক্ত পণ্ডিত রজনীকান্ত চক্রবর্ত্তী মহাশয় তাঁহার গৌড়ের ইতিহাসে ঢাকা জিলায় একটি বৌদ্ধবিহার ছিল, তাহা উল্লেখ করিয়াছেন। চন্দ্রপ্রতাপ পরগণার নান্না সুয়াপুরের নিকট ‘বাজাসন’ নামক এটা ঢিপ বা স্থান আছে। শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় সেই বাজাসনে ঢাকা জিলার একমাত্র বৌদ্ধবিহার ছিল বলিয়া অনুমান করিয়াছেন। কিন্তু আমরা বলি, সম্ভারের বৌদ্ধ রাজা হরিশ্চন্দ্রের অনেক কীর্ত্তির মধ্যে বাজাসনের বৌদ্ধবিহার অন্যতম কীর্ত্তি। তাই বর্ত্তমান সাভারের নাতিদূরে অবস্থিত রাজাসন নামক স্থানটি বাজাসন বই আর কিছুই নহে। বাজাসন বজ্রাসনেরই অপভ্রংশ। বজ্রাসন বৌদ্ধ যোগীদের বিখ্যাত আসন। বুদ্ধদেব স্বয়ং এই আসন অবলম্বন করিয়াই নির্ব্বাণপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
শ্রীযুক্ত দীনেশ বাবু বলেন, খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে ভিক্ষুরাজ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান বাজাসন বিহারে শিক্ষালাভ করেন। দীপঙ্কর বিক্রমপুর রাজকুলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম কল্যাণশ্রী এবং মাতার নাম প্রভাবতী। ৯৮০ খৃষ্টাব্দে বিক্রমপুরে ইহার জন্ম এবং ১০৫৩ খৃষ্টাব্দে তিব্বতে ইহার মৃত্যু। ইনি বিক্রমপুর হইতে উত্তরে আসিয়া বাজাসন বৌদ্ধবিহারে শিক্ষালাভ করেন। বর্ত্তমান সাভারের নাতিদূরে বাজাসন তাঁহার শিক্ষার স্থান ছিল কিনা, একটু ভাবিয়া দেখুন। শ্রীমান ধীরেন বাবু হরিশ্চন্দ্রের রাজত্ব সময় দশম শতাব্দীর শেষ পাদ অথবা একাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদ নির্দ্দেশ করিয়াছেন। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের বিক্রমপুরের উত্তরে বৌদ্ধবিহারে শিক্ষালাভেরও ঠিক সেই সময়। অতএব দেখা যায়, সাভারের নিকট রাজাসন খ্যাত বাজাসনই শ্রীজ্ঞানের শিক্ষালাভের স্থান। রাজাসন খ্যাত বাজাসনে বৌদ্ধবিহার ছিল, ইহাই অনুমিত হয়।
নান্না সুয়াপুর অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার থাকিলেও কোন বৌদ্ধ রাজার কীর্ত্তি চিহ্ন পাওয়া যায় না। সাভারের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ রাজা হরিশ্চন্দ্রের সময় বাজাসনের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধবিহারে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন এবং সাভারের নিকট রাজাসন নামটি বাজাসন বই আর কিছুই নহে, ইহাই বিশ্বাস হয়। প্রোথিত বৌদ্ধবিহার আবিষ্কার হইলে আরও নূতন তত্ত্ব উদ্ঘাটিত হইবে, আশা করা যায়।
* উল্লিখিত ‘যো জাতো বীরবর মাহিতাদিন্দুবংশবিশেষাৎ’ ইহার সমর্থন করে। অর্থাৎ চন্দ্রবংশ তুল্য শ্রেষ্ঠ বংশ হইতে ধীমন্ত জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। চন্দ্রবংশীয়গণ ক্ষত্রিয় ছিলেন। ক্ষত্রিয়ের তুল্য বংশ কায়স্থ বংশ ভিন্ন আর কি আছে, জানি না।
ঢাকা রিভিউ ও সম্মিলন— ভাদ্র, আশ্বিন ১৩২১






