অনুবাদ: শওকত হোসেন

[ফিলিপ রথ— পুলিত্জারজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক ৮৫ বছর বয়সে গত মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্কের এক হাসপাতালে মারা যান। সল বেলোর পর আমেরিকান প্রভাবশালী এ লেখক নোবেল পুরস্কার না পেলেও তালিকায় তার নাম ছিল প্রায় ফি বছর। তার লেখা সেরা বইগুলোর মধ্যে আছে— ঘোস্ট রাইটার, জাকারম্যান আনবাউন্ড, দি অ্যানাটমি লেসন, প্রাগ ওর্গি, কাউস্টারফ্রেইট, আমেরিকার পাসতোরাল, প্যাট্রিমনি: এ ট্রু স্টোরি ও অন্যান্য।

ফিলিপ রথের সঙ্গে মিলান কুন্ডেরার দুটি কথোপকথন এ সাক্ষাৎকারের উৎস। মিলান কুন্ডেরার বুক অব লাফটার অ্যান্ড ফরগিভিং-এর অনূদিত পাণ্ডুলিপি পাঠের পর এ সাক্ষাত্গুলো ঘটে। প্রথমবার তার লন্ডন সফরের সময়, অন্যটি তিনি প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে। ফ্রান্স থেকে এসব সফরে গিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সাল থেকে তিনি সস্ত্রীক রিনেতে অভিবাসী হিসেবে অবস্থান করছিলেন, এখানে রিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। কথোপকথনের সময় কুন্ডেরা বিক্ষিপ্তভাবে ফরাসিতে হলেও বেশির ভাগ সময় চেক ভাষায় কথা বলেছেন। তার স্ত্রী ভেরা দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেন। একটি চূড়ান্ত চেক ভাষ্য পিটার কাসসি ইংরেজিতে তর্জমা করেছেন।]

রথ: আপনি কি পৃথিবীর ধ্বংস অত্যাসন্ন মনে করেন?

কুন্ডেরা: সেটা নির্ভর করছে ‘অত্যাসন্ন’ বলে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন, তার ওপর।

রথ: আগামীকাল বা পরশু।

কুন্ডেরা: পৃথিবীর ধ্বংসের দিকে ধেয়ে চলার বোধ খুবই প্রাচীন।

রথ: তাহলে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

কুন্ডেরা: বরং উল্টো। মানুষের মনে যুগ যুগ ধরে একটা ভীতি টিকে থাকলে তাতে নিশ্চয়ই কিছু সারবত্তা আছে।

রথ: যা-ই হোক, আমার মনে হয় এই উদ্বেগের পটভূমিতেই আপনার সর্বশেষ বইয়ের গল্পগুলো, এমনকি পরিষ্কার রসগল্পের চরিত্রগুলোও রচিত হয়েছে।

কুন্ডেরা: ছোটবেলায় কেউ যদি আমাকে বলত: একদিন দেখবে তোমার জাতি দুনিয়া থেকে উধাও হয়ে যাবে, স্রেফ বাজে কথা, আমি কল্পনা করতে পারি না এমন কিছু ধরে নিতাম। মানুষ জানে সে মরণশীল, কিন্তু তার জাতির এক ধরনের অমর জীবন থাকার কথা ধরে নেয় সে। কিন্তু ১৯৬৮ সালের রুশ আগ্রাসনের পর প্রতিটি চেক ইউরোপের জমিন থেকে তার জাতি হয়তো নীরবে মুছে যাবে, এ চিন্তার মুখোমুখি হয়েছে; ঠিক যেমন গত পাঁচ দশকে ৪০ মিলিয়ন ইউক্রেনীয় পৃথিবী থেকে নিঃশব্দে উধাও হয়ে যাচ্ছিল, কেউ পরোয়া করেনি। অথবা লিথুনিয়ানীয়রা। আপনি জানেন ১৭ শতকে লিথুয়ানিয়া একটি ইউরোপীয় পরাশক্তি ছিল? আজ রাশিয়া লিথুয়ানীয়দের আধাবিলুপ্ত কোনো গোত্রের মতো রিজার্ভেশনে আটকে রেখেছে, বাইরের দুনিয়ায় ওদের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে পর্যটকদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আমার জাতির জন্য কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে, জানি না। এটা নিশ্চিত যে রাশিয়ানরা একে তাদের সভ্যতায় বিলীন করে দিতে তাদের পক্ষে সম্ভবপর সবই করবে। কেউ জানে না তারা সফল হবে কিনা। কিন্তু সম্ভাবনা রয়েই যায়। এবং এমন একটা সম্ভাবনা থাকার আকস্মিক উপলব্ধি জীবনের সামগ্রিক বোধকে পাল্টে দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

রথ: কিন্তু তবু পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম ইউরোপের নিয়তি ভীষণভাবে ভিন্ন বিষয় নয় কি?

কুন্ডেরা: সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারণা হিসেবে পূর্ব ইউরোপ মানে বাইজেন্টাইন বিশ্ব, বোহেমিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরিতে শিকড় ছড়ানো সুস্পষ্ট ইতিহাস নিয়ে রাশিয়া, ঠিক যেমন অস্ট্রিয়া কখনই পূর্ব ইউরোপের অংশ ছিল না। একেবারে গোড়া থেকেই ওরা এর গোথিক, রেনেসাঁ, সংস্কার— যে আন্দোলনের সূতিকাগার এই অঞ্চলেই ছিল— পশ্চিমা সভ্যতার বিপুল অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিয়েছে। এখানে মধ্য ইউরোপেই আধুনিক সংস্কৃতি বৃহত্তম প্রণোদনা পেয়েছে; সাইকোঅ্যানালিসিস, দ্বাদশ স্বর, বার্তুক সংগীত, কাফকা এবং মুসিলের উপন্যাসের নতুন নন্দনতত্ত্ব। রাশিয়ার হাতে যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্য ইউরোপের (কিংবা অন্তত এর বেশির ভাগ অংশ) অধিভুক্তি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এর গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র খোয়ানোর কারণ হয়েছে। আমাদের শতকে পাশ্চাত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ এ ঘটনা এবং মধ্য ইউরোপের অবসানকে সমগ্র ইউরোপের সমাপ্তির সূচনা হওয়ার সম্ভাবনা আমরা নাকচ করে দিতে পারি না। 

রথ: প্রাগ বসন্তের সময় আপনার উপন্যাস ‘দ্য জোক’ ও গল্পগ্রন্থ ‘লাফেবল লাভস’ প্রতিটি ১ লাখ ৫০ হাজার কপির সংস্করণ হিসেবে বের হয়। রুশ হামলার পর ফিল্ম একডেমিতে শিক্ষকতার পদ থেকে আপনাকে বহিষ্কার করা হয় এবং আপনার সব বই পাবলিক লাইব্রেরির তাক থেকে হটিয়ে দেয়া হয়। সাত বছর পরে আপনি এবং আপনার স্ত্রী কিছু বই আর কাপড়চোপড় গাড়ির পেছনে নিয়ে ফ্রান্সে চলে আসেন, এখানে বিশ্বের অন্যতম বহুলপঠিত লেখকে পরিণত হন। একজন অভিবাসী হিসেবে আপনার অনুভূতি কেমন?

কুন্ডেরা: একজন লেখকের কাছে বিভিন্ন দেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা এক বিশাল সুযোগ। কেবল বিভিন্ন দিক থেকে দেখলেই দুনিয়াকে বুঝতে পারবেন আপনি। ফ্রান্সে বেরোনো আমার সাম্প্রতিক বই একটা বিশেষ ভৌগোলিক এলাকায় শুরু হয়েছে: প্রাগের ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিম ইউরোপীয় চোখে দেখা হয়েছে, অন্যদিকে ফ্রান্সের ঘটনা দেখা হয়েছে প্রাগের চোখে। এটা দুটি দুনিয়ার সাক্ষাৎ। একদিকে আমার স্বদেশ: মাত্র অর্ধশতকের পরিক্রমায় গণতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, বিপ্লব, স্তালিনবাদী ত্রাস, স্তালিনবাদের পতন, জার্মান ও রুশ দখলদারি, গণবহিষ্কার, স্বভূমিতে পাশ্চাত্য ইউরোপের মরণের অভিজ্ঞতা পেয়েছে এটা। এভাবে ইতিহাসের ভারে ডুবতে চলেছে এটা এবং বিপুল সংশয়ের চোখে তাকাচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে ফ্রান্স: শত শত বছর ধরে বিশ্বের কেন্দ্র থাকলেও আজকাল বড় ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনার অভাবে ধুঁকছে। এ কারণেই এটা বিভিন্ন চরমপন্থী আদর্শিক দশায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এটা নিজস্ব কোনো মহান কীর্তির গীতিধর্মী, উন্মত্ত প্রত্যাশা যেটি অবশ্য ঘটছে না, কখনো ঘটবে না।

রথ: ফ্রান্সে কি আপনি আগন্তুক হিসেব বাস করছেন, নাকি সাংস্কৃতিক দিক থেকে স্বস্তি বোধ করেন?

কুন্ডেরা: আমি ফরাসি সংস্কৃতির বিপুল ভক্ত। এতে আমার দারুণ আগ্রহ। বিশেষ করে প্রাচীন সাহিত্যের প্রতি। লেখকদের ভেতর রেবেলেইস আমার সবচেয়ে প্রিয়। আর দিদেরো। তার ‘জাঁক লে ফ্যাটালিস্টে’ লরেন্স স্টার্নের মতোই ভালো লাগে। উপন্যাসের আদলে এগুলো সর্বকালের সেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল। এবং বলা যেতে পারে তাদের পরীক্ষা এত আমোদময়, সুখময় এবং আনন্দকর ছিল, এখন যা ফরাসি সাহিত্য থেকে উধাও হয়ে গেছে, যা ছাড়া শিল্পকর্মের সব কিছু এর তাত্পর্য হারায়। স্টার্নে ও দিদেরো উপন্যাসকে একটা দারুণ খেলা মনে করতেন। উপন্যাস ঘরানার রসবোধ আবিষ্কার করেছিলেন তারা। আমি যখন উপন্যাসের সম্ভাবনা হারিয়ে যাওয়া নিয়ে বিজ্ঞ বিতর্ক শুনি, তখন ঠিক উল্টো অনুভূতি জাগে আমার। উপন্যাস এর ইতিহাসের পরিক্রমায় বহু সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। উদাহরণস্বরূপ, স্টার্নে ও দিদেরোর উপন্যাসে লুকিয়ে থাকা উন্নতির তাড়না কোনো উত্তরসূরি হাতে তুলে নেননি।

রথ: আপনার শেষ বইটিকে উপন্যাস বলা হচ্ছে না, কিন্তু টেক্সটে আপনি ঘোষণা করছেন: এই বইটি ভিন্নতার আদলে একটি উপন্যাস। তাহলে এটা কি উপন্যাস নয়?

কুন্ডেরা: আমার একান্ত নিজস্ব নান্দনিকতা যতদূর জড়িত, এটা আসলেই একটা উপন্যাস, কিন্তু কারো ওপর মত চাপিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। উপন্যাসের ধরনে বিপুল স্বাধীনতা সুপ্ত রয়েছে। কোনো একটি স্টেরিওটাইপ কাঠামোকে উপন্যাসের অলঙ্ঘনীয় সত্তা ভাবা ভুল হবে।

রথ: তবু কিছু একটা উপন্যাসকে উপন্যাসে পরিণত করে এবং সেটা এই স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়।

কুন্ডেরা: উপন্যাস হচ্ছে বিভিন্ন বানোয়াট চরিত্র নিয়ে রচিত নাটকের ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম গদ্যের একটা দীর্ঘ লেখা। সীমা বলতে এটুকুই। কৃত্রিম বলে আমি সব দিক থেকে এবং পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনায় তার বিষয়বস্তুকে ধরার আকাঙ্ক্ষাকে বুঝিয়েছি। পরিহাসমূলক রচনা, উপন্যাসসুলভ বর্ণনা, আত্মজীবনীমূলক বিচ্ছিন্ন অংশ, ঐতিহাসিক বাস্তবতা, কল্পনার দৌড়: উপন্যাসের কৃত্রিম শক্তি সবকিছুকে অনেকটা পোলিফোনিক মিউজিকের মতো একটি সমন্বিত এককে পরিণত করার ক্ষমতা রাখে। কোনো একটি বইয়ের অখণ্ডতা এর প্লট থেকে আসে, কিন্তু ধারণা দিয়েও সেটা জোগানো চলে। আমার শেষ রচনায় এ ধরনের দুটি ধারণা আছে— হাসি ও বিস্মৃতি।

রথ: হাসির বিষয়টা বরবারই আপনার একান্ত বিষয় ছিল। আপনার বইটি রসিকতা বা পরিহাসের ভেতর দিয়ে হাসি উসকে দেয়। আপনার চরিত্রগুলো বিষাদের মুখোমুখি হয়, তার কারণ তারা রসবোধ খুইয়ে বসা একটা পৃথিবীর সাথে হোঁচট খায়।

কুন্ডেরা: স্তালিনবাদী সন্ত্রাসের সময়ই আমি রসবোধের গুরুত্ব জানতে পারি। তখন আমার বয়স ২০ বছর। কোন লোকটা স্তালিনবাদী নয়, ঠিকই বুঝে যেতাম। হাসি দেখেই বুঝতাম, একে আমার ভয় পাওয়ার কারণ নেই। রসবোধ স্বীকৃতির একটা বিশ্বস্ত লক্ষণ। তখন থেকেই রসবোধ হারাতে বসা একটা পৃথিবীর কারণে সন্ত্রস্ত হয়ে আছি।

রথ: আপনার শেষ বইতে অবশ্য ভিন্ন কিছু জড়িত। ছোট একটা প্যারাবলে আপনি দেবদূতের হাসিকে শয়তানের হাসির সাথে তুলনা করেছেন। শয়তান হাসছে কারণ ঈশ্বরের দুনিয়া তার কাছে অর্থহীন ঠেকছে; দেবদূত আনন্দের সাথে হাসছে কারণ ঈশ্বরের দুনিয়ায় সবকিছুরই একটা অর্থ আছে।

কুন্ডেরা: হ্যাঁ। মানুষ একই দৈহিক অভিব্যক্তি ব্যবহার করে— দুটো ভিন্ন ভিন্ন একান্ত মনোভাব প্রকাশের জন্য হাসে। কেউ সদ্য খোঁড়া কবরে টুপি ফেলে বসল, তো শেষকৃত্য অর্থ খুইয়ে ফেলে, জন্ম নেয় হাসি। প্রেমিকযুগল হাতে হাত ধরে হাসতে হাসতে মাঠের ওপর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। ওদের হাসির সঙ্গে রসিকতা বা কৌতুকের কোনো সম্পর্ক নেই। এটা অস্তিত্বের কারণে আনন্দ প্রকাশের দেবসুলভ সিরিয়াস হাসি। দুই ধরনের হাসিই জীবনের আমোদের অংশ, কিন্তু এটা যখন আবার একটা দ্বৈত বিপর্যয় তুলে ধরে: অন্ধবিশ্বাসের দেবদূতদের উদ্দীপ্ত হাসি, যারা তাদের জগতের তাত্পর্য নিয়ে এত নিশ্চিত যে, তাদের আনন্দের অংশীদার না হওয়ার কারণে যে কাউকেই ফাঁসিতে ঝোলাতে পারে। আর উল্টো দিক থেকে ভেসে আসা আরেক ধরনের হাসি, যেটা সবকিছু অর্থহীন হয়ে গেছে ঘোষণা করে, এমনকি শেষকৃত্যও হাস্যকর এবং গ্রুপ সেক্স হাস্যকর মূকাভিনয় মাত্র। মানুষের জীবন দুটো ফারাকে বাঁধা: অন্ধবিশ্বাস এক পাশে, আরেক পাশে সংশয়বাদ।

রথ: এখন আপনি যাকে দেবদূতের হাসি বলছেন, সেটা আপনার আগের উপন্যাসগুলোয় ‘জীবনের গীতিময় মনোভাবে’র একটি নতুন পরিভাষা। আপনার একটি বইয়ে স্তালিনবাদী ত্রাসের যুগকে জল্লাদ এবং কবির আমল বলে অভিহিত করেছেন।

কুন্ডেরা: টোটালিটারিয়ানিজম কেবল নরক নয়, বরং স্বর্গের স্বপ্নও বটে— যুগপ্রাচীন নাটক যেখানে সবাই একটি মাত্র সাধারণ ইচ্ছা ও বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্প্রীতিতে বাস করবে, কেউ কারো কাছে কিছু গোপন করবে না। আন্দ্রে ব্রেতোও গ্লাস হাউজে বসবাসের কথা বলার সময় এ স্বর্গের স্বপ্ন দেখেছেন। টোটালিটারিয়ানিজম আমাদের সবার গভীরে প্রেথিত এবং সব ধর্মে শিকড় ছড়ানো এসব আদি আদর্শকে ব্যবহার না করলে এত এত লোককে কখনই আকর্ষণ করতে পারত না। বিশেষ করে এর অস্তিত্বের গোড়ার পর্যায়গুলোয়। স্বর্গের স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে শুরু করলে অবশ্য এখানে সেখানে লোকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শুরু করে, ফলে স্বর্গের শাসকরা স্বর্গ উদ্যানের পাশেই একটা ছোট গুলাগ তৈরি করতে বাধ্য হয়। সময়ের পরিক্রমায় এ গুলাগ ক্রমেই বড় আর নিখুঁত হয়ে ওঠে, অন্যদিকে পাশের স্বর্গ ক্রমেই ছোট আর নিঃস্ব হয়ে চলে। 

রথ: আপনার বইতে মহান ফরাসি কবি পল এলুয়ার স্বর্গ ও গুলাগের ওপর দিয়ে ওড়ার সময় গান গাইছেন। আপনার বইতে উল্লিখিত ইতিহাসের এই অংশটুকু সত্যি?

কুন্ডেরা: যুদ্ধের পর পল এলুয়ার পরাবাস্তববাদ ছেড়ে বলা যেতে পারে ‘টোটালিটারিয়ানিজমের কাব্য’র বিরাট ভাষ্যকারে পরিণত হন। তিনি ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, ন্যায়বিচার, সুন্দর আগামীর গান গেয়েছেন, তিনি যূথবদ্ধতার পক্ষে আর বিচ্ছিন্নতার বিপক্ষে গান গেয়েছেন। ১৯৫০ সালে স্বর্গের শাসকরা এলুয়ারের প্রাগের বন্ধু পরাবাস্তববাদী সালভিস কালেন্দ্রাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিলে এলুয়ার বন্ধুত্বের জন্য নিজের ব্যক্তিগত মনোভাব দমন করে প্রকাশ্যে বন্ধুর ফাঁসির অনুমোদন ঘোষণা করেন। কবি গান গাওয়ার সময় জল্লাদ হত্যা করে।

এবং কেবল কবি নন। স্তালিনবাদী ত্রাসের পুরো সময়টাই সমবেত গীতিময় বিকার ছিল। এত দিনে সেটা পুরোপুরি বিস্মৃত হয়ে গেছে, কিন্তু এটাই আসল ব্যাপার। লোকে বলতে পছন্দ করত: বিপ্লব চমৎকার, কেবল ওটা থেকে দেখা দেয়া ত্রাসই অশুভ। কিন্তু এটা সত্যি নয়। সুন্দরের ভেতরই অশুভের অস্তিত্ব ছিল, স্বর্গের স্বপ্নেই নরক ছিল এবং আমরা যদি নরকের অর্থ বুঝতে চাই আমাদের অবশ্যই যেখান থেকে এর উদ্ভব সেই স্বর্গকে পরখ করতে হবে। গুলাগগুলোকে দায়ী করা একেবারেই সহজ, স্বর্গের বেলায় এটা বরাবরের মতোই কঠিন। আজকাল সারা দুনিয়ার মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবে গুলাগের ধারণা প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু এখনো টোটালিটারিয়ানিজমের কাব্যে সম্মোহিত হয়ে লিরের মহান আর্চঅ্যাঞ্জেলের মতো এলুয়ার কালেন্দ্রার দেহভস্ম ক্রিমেটোরির চিমনি গলে আকাশে ভেসে যাওয়ার সময় প্রাগের মাথার ওপর যে সুর তুলেছিলেন, সেই একই সুরের টানে নতুন গুলাগের দিকে ছুটে যেতে রাজি আছে।

রথ: আপনার গদ্যের জোরালো বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য জীবনের ভেতর অবিরাম মোকাবেলা। কিন্তু ব্যক্তিগত কাহিনীগুলো একটা রাজনৈতিক পটভূমিতে গড়ে ওঠার প্রেক্ষিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যক্তিজীবনে ঢুকে পড়ে। আপনি বরং ক্রমাগত দেখান যে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ব্যক্তিগত ঘটনাবলির মতো একই নিয়মের অধীন, ফলে আপনার গদ্য রাজনীতির এক ধরনের সাইকোঅ্যানালিলিস।

কুন্ডেরা: প্রকাশ্য জীবনের মতো ব্যক্তিগত জীবনেও মানুষের দর্শন একই। বইয়ের অন্য ধারণা বিস্মৃতির কথা ধরুন। এটা মানুষের বিরাট ব্যক্তিগত সমস্যা: সত্তার ক্ষতি হিসেবে মৃত্যু। কিন্তু সত্তা কি জিনিস? এটা আমাদের স্মরণের সবকিছুর সমষ্টি। এভাবে মৃত্যুর যে জিনিসটি আমাদের ত্রস্ত করে, সেটা অতীতের ক্ষতি নয়। বিস্মৃতি জীবনের মধ্যেই উপস্থিত মৃত্যুর একটা ধরন। প্রাণপ্রিয় মৃত স্বামীর বিলীয়মান স্মৃতি ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা করতে গিয়ে এটাই আমার নায়িকার সমস্যা। কিন্তু বিস্মৃতি আবার রাজনীতিরও বড় সমস্যা। একটা বড় শক্তি যখন কোনো ছোট দেশকে এর জাতীয় সচেতনতা থেকে বঞ্চিত করতে চায়, তখন সংগঠিত বিস্মৃতির কৌশল ব্যবহার করে। বোহেমিয়ায় এখন এটাই ঘটছে। সমসাময়িক চেক সাহিত্য, এখনো যদি এর কোনো মূল্য থেকে থাকে, ১২ বছর ধরে মুদ্রিত হয়নি; মৃত কাফকাসহ ২০০ চেক লেখককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৪৫ জন চেক ইতিহাসবিদকে তাদের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। নতুন করে ইতিহাস লেখা হয়েছে। বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ ধ্বংস করা হয়েছে। অতীত সম্পর্কে সচেতনতা হারানো কোনো জাতি ধীরে ধীরে আপন সত্তা হারিয়ে ফেলে। সুতরাং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্মমভাবে আমাদের একটুও মনোযোগ না দিয়ে সারাক্ষণ মোকাবেলা করা সাধারণ বিস্মৃতির সমস্যাকে আলোকিত করেছে। রাজনীতি ব্যক্তিজীবনের দর্শনকে উন্মুক্ত করেছে, ব্যক্তিজীবন রাজনীতির দর্শনকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

রথ: আপনার বৈচিত্র্যের বইয়ের ষষ্ঠ অংশে নায়িকা তামিনা একটা দ্বীপে হাজির হয়, যেখানে আছে কেবল শিশু। শেষে ওরা তাকে ধাওয়া করে মৃত্যুতে ঠেলে দেয়। এটা কি স্বপ্ন, রূপকথা, কোনো উপমা?

কুন্ডেরা: আমার কাছে উপমার চেয়ে অচেনা কিছু নেই, কোনো ধরনের প্রকল্প স্পষ্ট করে তোলার জন্যই লেখকের হাতে গল্প তৈরি হয়।  বাস্তব কিংবা কাল্পনিক ঘটনাকে অবশ্যই তাত্পর্যপূর্ণ হতে হবে। পাঠক সেগুলোর ক্ষমতা আর কবিতায় মুগ্ধ হবে বলেই ধরে নেয়া হয়। আমি সবসময় এই ইমেজে তাড়িত হয়ে এসেছি। আমার জীবনের একটা সময়ে বারবার নিজের স্বপ্নের কাছে ফিরে গেছি: নিজেকে শিশুদের ভেতর আবিষ্কার করছে একজন লোক, ওদের হাত থেকে পালাতে পারছে না। এবং আমরা যে ছেলেবেলাকে গীতময় করে তুলি, ভালোবাসি, সেটাই সহসা নিখাদ ত্রাসে পরিণত হচ্ছে। একটা ফাঁদ হয়ে। এটা কোনো উপমা নয়। কিন্তু আমার বইটা বহুস্বর, যেখানে বিভিন্ন গল্প পরস্পরকে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, আলোকিত করছে, একে অন্যকে সম্পূর্ণতা দিচ্ছে। বইটির মূল ঘটনা টোটালিটারিয়ানিজমের কাহিনী, মানুষকে স্মৃতি থেকে বঞ্চিত করে শিশুদের জাতিতে পরিণত করে। সব ধরনের টোটালিটারিয়ানিজমই এটা করে, এর ভবিষ্যতের কাল্ট, অতীতের প্রতি অবহেলা এবং চিন্তার প্রতি অবিশ্বাস দিয়ে। প্রবলভাবে কৈশোরিক জীবনের মাঝে স্মৃতি আর পরিহাসে সমৃদ্ধ একজন সাবালক শিশুদের দ্বীপে তামিনার মতোই বোধ করে।

রথ: আপনার প্রায় সব উপন্যাস, সত্যি বলতে আপনার সর্বশেষ বইটির সব বিচ্ছিন্ন অংশ দৈহিক মিলনের দীর্ঘ দৃশ্যে এ অস্বীকৃতি দেখা যায়। এমনকি যেসব অংশ ‘মাদার’-এর মতো নামধারী অধ্যায়ও সূচনা ও উপসংহারসহ ত্রয়ী যৌনতার একটা দীর্ঘ দৃশ্য। একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে আপনার কাছে যৌনতার মানে কী?

কুন্ডেরা: আজকের দিনে যখন যৌনতা সংস্কার হয়ে নেই, স্রেফ বর্ণনা, স্রেফ যৌনতার স্বীকৃতি লক্ষণীয়ভাবে একঘেয়ে হয়ে গেছে। লরেন্সকে কেমন সেকেলেই না মনে হয়, অথবা অশ্লীলতার গীতিময়তা নিয়ে হেনরি মিলারকে! অথচ জর্জ বাতালির বিশেষ কয়েকটা যৌনতার অনুচ্ছেদ আমার মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে গেছে। এর কারণ সম্ভবত সেগুলো গীতিময় না হয়ে দার্শনিক ধরনের। এখানে ঠিকই বলেছেন আপনি, আমার বেলায় সবকিছুই দীর্ঘ যৌনদৃশ্যের ভেতর দিয়ে শেষ হয়। আমার মনে হয়, দৈহিক প্রেমের দৃশ্য একটা অতি তীক্ষ আলো তৈরি করে, যেটা সহসা চরিত্রের মূল সত্তা উন্মুক্ত করে এবং তাদের জীবনের অবস্থাকে পূর্ণ করে। তামিনা মরিয়া হয়ে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে কাটানো হূত অবকাশের কথা ভাববার সময় হুগো তার সঙ্গে মিলিত হয়। যৌনদৃশ্য হচ্ছে মূলবিন্দু, যেখানে গল্পের সব থিম একত্র হচ্ছে এবং যেখানে এর গভীরতম গোপন বিষয়গুলো রয়েছে।

রথ: শেষ, মানে সপ্তম অংশ আসলে যৌনতা ছাড়া আর কিছু নিয়েই কাজ করেনি। এ অংশটি কেন বইটি শেষ করছে, অন্য কোনো অংশ নয় কেন, যেমন আরো বেশি নাটকীয় ষষ্ঠ অংশ হতে পারত, যেখানে নায়িকা মারা যাচ্ছে?

কুন্ডেরা: উপমাগতভাবে বলতে গেলে তামিনা দেবদূতদের হাসির ভেতর মারা গেছে। অন্যদিকে, বইটির শেষ পর্বের ভেতর দিয়ে ভিন্ন ধরনের হাসি উঠে আসছে, সবকিছু অর্থ হারিয়ে ফেললে যেমন শোনা যায়। একটা বিশেষ কাল্পনিক রেখা রয়েছে, যেটা পেরিয়ে গেলে সবকিছু অর্থহীন আর হাস্যকর ঠেকে। কেউ নিজেকে প্রশ্ন করছে: সকালে ঘুম থেকে ওঠা কি আমার কাছে অর্থহীন নয়? কাজে যাওয়া? কোনো কিছুর জন্য চেষ্টা করা? কেবল এভাবে জন্ম নিয়েছি বলেই একটা জাতির অংশ থাকা? মানুষ এই সীমানার খুব কাছে বাস করে এবং অনায়াসে নিজেকে অন্য প্রান্তে আবিষ্কার করে বসতে পারে। এই সীমানা সব জায়গাতেই আছে; মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে এবং এমনকি সবচেয়ে গভীর সবচেয়ে জৈবিক স্তর যৌনতায়ও। এবং এটাই জীবনের গভীরতম অঞ্চল হওয়ায় যৌনতার প্রতি উচ্চারিত প্রশ্নই গভীরতম প্রশ্ন। এ কারণেই আমার বৈচিত্র্যের বই এটা ছাড়া অন্য কোনো ভিন্নতা দিয়ে শেষ হয়নি।

রথ: তবে কি আপনি আপনার নৈরাশ্যবাদের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে গেছেন?

কুন্ডেরা: আমি নৈরাশ্যবাদ আর আশাবাদ— এ দুটি শব্দের ব্যাপারে সতর্ক। উপন্যাস কিছুই নিশ্চিত করে না, উপন্যাস প্রশ্ন খোঁজে, তুলে ধরে। আমি জানি না আমার জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে কিনা, জানি না আমার কোন চরিত্র ঠিক হয়েছে। আমি গল্প তৈরি করি, একটাকে অন্যটির মুখোমুখি করি এবং এই উপায়ে প্রশ্ন তুলি। সবকিছুর জন্য প্রশ্ন থাকার ভেতর দিয়েই মানুষের নির্বুদ্ধিতা এসেছে। দোন কিহোতে বাইরের দুনিয়ায় পা রাখার পর তার কাছে সেটা রহস্যে পরিণত হয়েছে। এটাই পরবর্তীকালের উপন্যাসের সমগ্র ইতিহাসে প্রথম ইউরোপীয় উপন্যাসের উত্তরাধিকার। ঔপন্যাসিক পাঠককে বিশ্বকে একটা প্রশ্ন হিসেবে উপলব্ধি করতে শেখাচ্ছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রজ্ঞা এবং সহিষ্ণুতা রয়েছে। পূতপবিত্র নিশ্চয়তার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটা বিশ্বে উপন্যাসটি মৃত। টোটালিটারিয়ান দুনিয়া, যেখানেই পাওয়া যাক না কেন, সেটা প্রশ্নের চেয়ে বরং উত্তরেরই দুনিয়া। এখানে উপন্যাসের কোনো স্থান নেই। যা-ই হোক, আমার কাছে মনে হয় যে সারা দুনিয়ায় আজকের দিনে মানুষজন বোঝার চেয়ে বরং বিচার করতে চায়, প্রশ্নের চেয়ে উত্তর দিতে চায়, ফলে মানবীয় নিশ্চয়তার শোরগোলের ভেতর উপন্যাসের কণ্ঠস্বর শোনাই কঠিন।