‘পায়ের তলায় শর্ষে’— এমন ধূলি ওড়ানো ভ্রমণগন্ধী শব্দবন্ধ একমাত্র রসিক বাঙালির কলম থেকেই বের হওয়া সম্ভব। ভ্রমণ নিয়ে আধ্যাত্মিকতার চাদর জড়ানো উপনিষদের একটি বাণী শিক্ষিত বাঙালির মুখে মুখে ফিরত— চরৈবেতি, চরৈবেতি— এগিয়ে চলো, বসে থাকলে তোমার ভাগ্য বসে পড়বে, শুয়ে থাকলে ভাগ্যও যে শুয়ে থাকবে। অতএব, চলতে থাকো, এগোতে থাকো। এমন আত্মোপলব্ধির বাণীতে সাধারণ বাঙালির ভ্রমণ বাসনা কতখানি উদ্দীপ্ত হয়েছিল, তা বলা মুশকিল হলেও এ দার্শনিক বাণীটি যে সাধুসন্তদের বেলায়ই বেশি প্রযোজ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গৃহস্থ মানুষের ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাসকে ফুটিয়ে তুলতে গড়িয়ে চলা চাকার মতো আটপৌরে সরসের উপমাটি যেন সবচেয়ে লাগসই।
কবে, কীভাবে এবং কেন ঘরকুনো বাঙালিরা পায়ের তলায় শর্ষে এঁটে গেল, তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে বেশ কয়েকটি স্তর পেরিয়ে আসতে হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য। বাঙালি সে যুগে বিনোদন বা স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে অথবা অবকাশ যাপনের জন্য ঘর থেকে খুব বের হতেন, তা নয়। মূলত ধর্ম এবং পুণ্য লাভের জন্যই তারা দেশ ভ্রমণে পা বাড়াতেন। বহুদূরে তীর্থস্থানে যেতেন এবং তীর্থ বাস করে, শারীরিক ও মানসিক উন্নতি লাভ করে ঘরে ফিরতেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকেও ভ্রমণ বলতে সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মূলত তীর্থ ভ্রমণকেই বোঝাত। তবে
প্রযুক্তির উন্নতি ও যোগাযোগের অবকাঠামো তৈরির কারণে তীর্থযাত্রার খপ্পর থেকে ভ্রমণ ধীরে ধীরে বের হয়ে অবকাশ যাপনের উপায় হিসেবে রূপ নিয়েছে।
বাংলায় লেখা ভ্রমণ কথার পাতা ওল্টালে চোখে পড়বে কীভাবে অল্প অল্প করে বাঙালির ভ্রমণবৃত্তান্ত ধর্মীয় অনুষঙ্গ পিছু হটে যাচ্ছে। আর ধর্মীয় কাঠামোর জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ স্থান করে নিচ্ছে। তবে মানতেই হবে বাঙালি— হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে— আধুনিক ট্যুরিজম বা পর্যটনের গোড়াপত্তন হয়েছিল তীর্থাভিলাষ থেকেই।
তীর্থযাত্রার একটি বাড়তি সুবিধা ছিল। সেটি হলো: এর কেন্দ্রবিন্দুতে লুকিয়ে থাকা ‘কমিউনিটি ধারণা’র এক হিতকরী বাতাবরণ। আর এই কারণেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সার্বিক নিরাপত্তার অভাবে জলপথ বা স্থলপথ নির্বিশেষে বাঙালি দলবেঁধে ঘর থেকে বের হতো তীর্থ দর্শনে। দেশে ইংরেজ শাসনের হাঁটি হাঁটি পা পা অবস্থার শেষ হওয়ার পরও নিরাপত্তা ও আর্থিক কারণে এ দলবেঁধে বা ‘কমিউনিটি যাত্রা’র রেওয়াজ পরিবর্তন হয়নি। রবীন্দ্রনাথের ‘দেবতার গ্রাস’ কবিতায় মুখুজ্জে মশায় সাগর সঙ্গম তীর্থে যাবেন স্থির হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘গ্রামে গ্রামে রটি গেল সেই বারতা’। তখন স্থানীয় বড় মানুষের বদান্যতায় বহু ধর্মপ্রাণ দরিদ্র তার সঙ্গী হয়ে তীর্থ দর্শনের সুযোগ পেত। এরই ধারাবাহিকতায় মুখুজ্জে মশায়ের নৌকায় যাত্রী হওয়ার আবেদন জানিয়ে যে অনেকেই তার সঙ্গে সাগর সঙ্গমে যাত্রা করেছিল, সে কাহিনী সবারই জানা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপাল কুণ্ডলা’র নায়ক নবকুমার এমনই দলবেঁধে নৌকায় তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরার সময় অন্য যাত্রীদের তাকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়ার কাহিনীও সবার জানা।
বাঙালির বেড়ানোর উত্স সন্ধানের চেষ্টায় অবধারিতভাবে এসে পড়ে বাংলার রূপকথার কাহিনী, নানা মঙ্গল কাব্যসহ চৈতন্য জীবনী কাব্যের নানা প্রসঙ্গ। সাত সমুদ্র তেরো নদীর পথে বাঙালি শিশুর মানস ভ্রমণের শুরু রূপকথার কাহিনী সূত্রেই। এরই হাত ধরে শুরু হয় বাঙালি জীবনে বিদেশ যাত্রার জন্য জলপথের রোমাঞ্চকর সন্ধান। স্থলপথের চেয়ে জলপথে বিপদ-আপদ বা দস্যু তস্করের আতঙ্ক কম না হলেও মনে হয় জলপথ ছিল তুলনামূলকভাবে অধিকতর আরামদায়ক। তবে মঙ্গলকাব্যে বাঙালির জলযাত্রার বর্ণনা রয়েছে— সেখানে ভ্রমণের চেয়ে বাণিজ্যে লক্ষ্মী লাভই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য।
গবেষকরা প্রায় সবাই স্বীকার করেন যে, মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গলে ‘বণিক খণ্ডে’ শ্রীমন্তের জলযাত্রায় বা চাঁদ সওদাগর, বেহুলার জলপথের (মনসা মঙ্গল) বর্ণনায় চোখে পড়বে ভ্রমণ সেখানে মুখ্য নয়, লক্ষ্মী লাভই প্রধান উদ্দেশ্য।
বাংলায় জলপথে ভ্রমণের বাস্তবকাহিনী বা বর্ণনা পেতে আমাদের দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। কল্পকাহিনীর আওতা ছেড়ে কাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত বাংলা ভাষায় ভ্রমণবৃত্তান্ত হাতে এল পলাশী যুদ্ধের কয়েক বছরের মধ্যে। বিজয় রাম সেনের তীর্থমঙ্গল (ইংরেজি ১৭৭৬) সচেতনভাবে নির্মিত প্রথম জলপথে ভ্রমণকাহিনী। গবেষকদের মতে, ‘একই সঙ্গে বাংলার প্রথম সার্থক ভ্রমণকাহিনী’। এতে রয়েছে ইংরেজি ১৭৬৯ সালের কাছাকাছি সময়ে ভূকৈলাসের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষালের সঙ্গে বিজয়রামের নৌকায় কাশীযাত্রার বিবরণ, পয়ার ছন্দে লিখিত। প্রসঙ্গত, কৃষ্ণচন্দ্র যাত্রা শুরু করেন খিদিরপুর থেকে। তার নৌকা পুঁটিমারিতে পৌঁছানোর পর কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে যোগ দেন বিজয়রাম। পুঁটিমারি থেকে বিজয় রাম স্বচক্ষে যা দেখেছেন, তার ভিত্তিতে লিখেছেন।
তার আগের অংশের যাত্রাপথের যে বর্ণনা রয়েছে, সেই অংশটি লিখেছেন কৃষ্ণচন্দ্রের দেয়া বিবরণ অনুযায়ী। যেহেতু এ রচনা কোনো কল্পিত কাহিনী নয়, তাই তীর্থমঙ্গল গঙ্গারাম দত্তর মহারাষ্ট্র পুরাণের মতোই এক ঐতিহাসিক চিত্রের দলিল।
তীর্থযাত্রায় সময় কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষাল সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো চিকিত্সক পাননি, যদিও তার সঙ্গে যাত্রী ছিল। বৈদ্য বিজয়রামকে দেখে তিনি খুশি হয়েছিলেন। বই থেকে জানা যায়, কোনো যাত্রী অসুস্থ হলে বিজয়রাম তার চিকিত্সা করেছেন, কিন্তু কৃষ্ণরামের বাহন থাকায় তিনি কোনো অর্থ নিতেন না। যাত্রাকালে অনেকের বসন্ত হয়েছিল এবং বিজয়রাম তাদের চিকিত্সা করেছিলেন।
১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষত্ তীর্থমঙ্গল বই আকারে ছেপে প্রকাশ করে। ভূমিকায় নগেন্দ্রনাথ বসু লিখেছেন, ‘সাধারণে যে উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রা করিয়া থাকেন আমাদের কবি (বিজয়রাম) কেবল সেই উদ্দেশ্যেই তীর্থযাত্রী হন নাই। তাঁহার প্রধান উদ্দেশ্য তাঁহার তীর্থযাত্রার একমাত্র সহায় কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষালের গুণকীর্তন, তীর্থ মাহাত্ম্যকীর্তন এবং পথে যাত্রাকালে যাহা ঘটিয়াছিল তত্সমুদয়ের প্রকাশ, সুতরাং গ্রন্থখানিকে কেবল তীর্থ পরিচিতি বলিয়া গ্রহণ করিলে চলিবে না, একখানি সুন্দর ভ্রমণ কাহিনী বলিয়া স্বীকার করিতে হইবে।’
নগেন্দ্রনাথ আরো লিখেছেন যে, গ্রন্থটিতে কেবল তীর্থের কথা নয়, এতে সে সময়কার বাঙালির সমাজচিত্র, দেশের অবস্থা, লোকের মনের অবস্থা এবং ইংরেজ শাসনের প্রথম অবস্থার চিত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। এজন্য এই তীর্থমঙ্গল কেবল তীর্থযাত্রীর পক্ষে নয় ১৮ শতকের সমাজ তত্ত্ব ও ইতিহাসের একটি উপাদেয় অধ্যায় বলে সমাদৃত হবে।
গবেষকদের অভিমত তীর্থমঙ্গল প্রাক-আধুনিক সময়ের ভ্রমণ সাহিত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিজয়রামের ১৪৩ বছর পর প্রকাশ হয় মহেন্দ্রচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশে তীর্থ বিবরণ’। লেখক, গবেষক প্রদীপ বসু মন্তব্য করেছেন, মহেন্দ্রচন্দ্র তার বইটি লিখেছেন অনেকটা গাইড বুকের ধরনে। তীর্থস্থানের বিবরণ, সাধুসন্তদের জীবনী ছাড়াও বইতে রয়েছে তীর্থস্থানে যাতায়াতের বর্ণনা। এছাড়া ছিল প্রধান দ্রষ্টব্যের বর্ণনা, থাকার জায়গাসহ তীর্থযাত্রীদের নানা বিষয়ে পরামর্শ এবং সতর্কবাণীও দিয়েছিলেন।
১৮২২ সালের ৬ জুলাই ‘সমাচার দর্পণ’-এ খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালির দলবেঁধে জলপথে কাশি, গয়া, প্রয়াগযাত্রার সংবাদ। যাত্রার মুখ্য উদ্দেশ্য যে পুণ্য লাভ, সে সম্পর্কে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
সমাচার দর্পণে প্রকাশিত সংবাদের অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো— ‘জেলা মুর্শিদাবাদের কান্দি গ্রামের দেওয়ান গঙ্গা গোবিন্দ সিংহ মহাশয়ের ভ্রাতুষ্পুত্র দেওয়ান বিজয় গোবিন্দ সিংহ মহাশয় সপরিবারে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বৈষ্ণব, আত্মীয় কুটুম্ববান্ধব ইত্যাদি প্রায় সাত-আটশ লোক সমভিব্যাহারে এবং বজরা ও ভাউলিয়া (নৌকা) ও পিনিশ (নৌকা) ইত্যাদি আটাইশ খানা (২৮) নৌকা সমভিব্যাহারে ত্রিস্থলী অর্থাত্ কাশি, গয়া, প্রয়াগ এবং বৃন্দাবন দর্শনাকাঙ্ক্ষী হইয়া ১৭ই বৈশাখ পাটনাতে পৌঁছিয়া ওই সকল লোক সমভিব্যাহারে গয়া ধামে গিয়াছেন।’
এর পর ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়ের রোজনামচার আদলে জলপথে ভ্রমণ কাহিনী— মোট ২৭ দিনের দিনলিপি। এতে সে সময়ের পূর্ববঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, নানা জনপদ এবং নদনদীর ভৌগোলিক বিবরণ রয়েছে। পূর্ববঙ্গের ভৌগোলিক বিবরণ এবং জনপদের তথ্য থাকায় বইটি আমাদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া পূর্ববঙ্গে ভ্রমণ নিয়ে খুব বেশি বইও সমসময়ে লেখা হয়নি। বাংলা গদ্যের শৈশবে রচিত এ ভ্রমণ কাহিনীর ভাষা সম্পর্কে দীনেশচন্দ্র সেনের প্রশংসূচক মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। প্রসঙ্গত, বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় নৌকাপথে কালনা হতে বঙ্গপুরে যাত্রা করেছিলেন। পথে মুর্শিদাবাদেও যাত্রাবিরতি করেন তিনি।
দুই
১৮৫৪ সালে পূর্ববঙ্গে উল্লেখযোগ্য ভ্রমণকারী হলেন কবি, সাংবাদিক ও সম্পাদক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। তীর্থ ভ্রমণ বা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ করেননি তিনি। তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল পূর্ববঙ্গের সার্বিক অবস্থা স্বচক্ষে দেখে, তা নিয়ে পত্রিকা ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর জন্য বিস্তারিত প্রতিবেদন লেখা। কলকাতায় পাঠানো এই প্রতিবেদনগুলো ভ্রমণকারীর পত্র নামে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হয়েছিল। প্রথম পত্রটি লেখা হয়েছিল রাজশাহী থেকে ৩০ অগ্রহায়ণ, ১২৬১ সনে (ইংরেজি ১৮৫৪)।
জলপথে ভ্রমণ করতে করতে তিনি রাজশাহী উপস্থিত হন। সেখান থেকে ফরিদপুর, পাবনা, সুধারাম (নোয়াখালী), চট্টগ্রাম, কমিল্যা (কুমিল্লা), বিক্রমপুর ও বরিশাল ভ্রমণ করে সেসব অঞ্চলের প্রশাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, উত্পন্ন দ্রব্য, সামাজিক জীবন, উত্সব, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষাত্মক প্রতিবেদন লিখেছিলেন। এতে শুধু নিরস তথ্যই ছিল না, গুপ্ত কবির স্বভাবসুলভ পরিহাস ও কৌতুক রসেরও কমতি ছিল না। যেমন— বিক্রমপুরে পৌঁছে সেখানে কলকাতা থেকে খড়দহ মেলের অধিবাসীদের দেখে কৌতুক করে লিখেছিলেন,
‘খড়দহ মেল যারা বেমেল হয়েছে তারা
খড়েতে আগুন লাগিয়াছে।
নাহি তার পূর্বভাব, ক্রমে ক্রমে ভঙ্গভাব,
স্বভাবে অভাব ঘটিয়াছে।’
সম্ভবত খড়দহ মেলের অধিবাসীদের দীর্ঘদিন বিক্রমপুর বসবাসের ফলে তাদের কিঞ্চিত্ পূর্ববঙ্গীয় বা বাঙালভাবের আবেশ ঘটেছিল, যা গুপ্ত কবির চোখে পড়তে দেরি হয়নি।
জলপথে বাঙালির ভ্রমণ প্রসঙ্গে ডাক-নৌকা করে বেড়ানোর রূপকটিও উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয়। ১০ মার্চ, ১৭৮১। ডাক ও যাত্রী বহনের জন্য ডাকঘরের তত্ত্বাবধানে ডাক-নৌকা চালু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, তখন নদীতে জলদস্যু ও ডাকাতদের উপদ্রব ছিল। তাই নৌকায় সশস্ত্র প্রহরীর ব্যবস্থা করা হতো। ডাক বিভাগের পণ্যসামগ্রী পরিবহনের নির্দিষ্ট ডাক-নৌকায় যাত্রী বহনের সুযোগে অনেক তীর্থযাত্রীও ঠাঁই নিত। ১০ মার্চ জারি করা বিজ্ঞপ্তি থেকে জানানো হয়, ডাক-নৌকায় ২৪টা দাঁড় থাকবে।
বিক্রমপুরে মহারাজা রাজবল্লভের ঐতিহাসিক রাজনগরে হাজির হয়ে গুপ্ত কবি রাজবল্লভের রাজভবন ও অন্যান্য প্রাচীন কীর্তি পুরোটা দেখে উঠতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। রাজনগরের ‘রাজসাগর’ ছাড়াও ‘রানীসাগর,’ ‘আনন্দসাগর’, ‘সুখসাগর’ প্রভৃতি বিশাল দীঘি দেখে চমত্কৃত হয়েছেন তিনি। রাজবল্লভের বংশধরদের দেখে তিনি লিখেছেন, ‘তাহাদের বর্তমান অবস্থা দেখিয়া দুঃখে চক্ষের জল সংবরণ করা দুষ্কর হত।’
কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যহীন জীবনযাত্রায় তার মনে যে তীব্র ক্ষোহের সঞ্চার হয়েছিল, তাও লিখেছেন, ‘কিন্তু কি আশ্চর্য, এ পর্যন্ত কেহ অভিমানটুকু পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই। সে বিষও নাই। সে চক্রও নাই, অথচ ফোঁসফোঁসানির ত্রুটি হয় নাই... অহংকারপরায়ন না হইলে এত বিপদগ্রস্ত কখনই হইতেন না।’
ঈশ্বর গুপ্ত এই প্রাচীন কীর্তিগুলো সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি দেখেছিলেন, এই ভবনগুলো তখনো মোটামুটি টিকে রয়েছে। ছাদ নষ্ট হলেও একটা ইটও খসেনি, চুন নষ্ট হয়নি, ছাদ তৈরি করে দিলেই স্বছন্দে ১০০ বছর সুখে থাকা যেতে পারে। অন্তঃপুরের অনেকাংশ এখনো টিকে আছে। তাই রাজপরিবারের সদস্যরা এখনো এই ভবনগুলোতে বসবাস করে চলেছেন। সমবেদনা জানালেও তিনি এদের মনোভাবের সমালোচনা করতে ছাড়েননি, ‘বহু পরিবার হেতু এখন ঘর ঘর রাজা, সকলে হুজুর সাজিয়া জুজুর মত ভঙ্গি করিয়া থাকেন বটে।’
ত্রিপুরায় পৌঁছে ঈশ্বর গুপ্ত ত্রিপুরা রাজ্যের শাসন ব্যবস্থার বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন এবং সমালোচনা ভিত্তিহীন ছিল না। তিনি লিখেছেন, ‘‘রাজা আগরতলার প্রাসাদেই আছেন। কিন্তু পক্ষীর আমোদেই অধিক আমোদে পাইয়া থাকেন। সম্প্রতি পুরুষে পুরুষে বিবাহ দিয়া গুরুতর উত্সব করিয়াছেন। রাজার শাসন প্রণালী বা রাজকাজে অবহেলায় কবি উদ্বিগ্ন হয়ে লিখেছেন, ‘রাজা দরবারে বসেন না।’ ক্রমেই ঋণ বৃদ্ধি হইতেছে। এমত প্রাচীন রাজার ঘরের অবস্থা এরূপ হওয়াতে সকলেই ক্ষুব্ধ হইবেন।’’ গুপ্ত কবির বর্ণনা শুধু এমন কাহিনীই নয় পূর্ববঙ্গের মূল্যবান সামাজিক দলিলও বটে।
তিন
এতক্ষণ নদীপথে বাংলার ভ্রমণ কথা সবিস্তারে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। নদীপথে ভ্রমণের বাহন সম্বন্ধে পর্যটকের কৌতূহল জাগা স্বাভাবিক। নদীপথে যা চলে সবই তো নৌকা, কিন্তু নৌকার প্রকারভেদ ছিল বহু। তবে এর মধ্যে প্রধান হলো— বজরা, কিস্তি, ভড়, ছিপ, ডিঙ্গি, পানসি, গাদা বোট, জালি বোট, পিনেস এবং বালাম। ভড় হলো হাতি পারাপার, তোপ বহনকারী বড় নৌকা। কিস্তিও মালবাহী বড় নৌকা, পানসি হালকা সরু নৌকা, ছিপ দ্রুতগামী সরু নৌকা। বঙ্কিমের ‘দেবী চৌধুরানী’তে ছিপের বর্ণনা করেছেন।
তবে বিলাসে, আরামে শুধু বসবাস নয়, মহাসুখে দিনযাপন করতে হলে চাই একটি অলৌকিক জলযান, যার নাম বজরা।
বজরাকে বাংলার নিজস্ব বাণিজ্য তরী বলা চলে। আবার অভিজাতদের বাসোপযোগী কাঠের কামরা ও ছাদযুক্ত বড় নৌকাকেও বলে বজরা। তখন অবস্থাভেদে রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ, জমিদার ও শৌখিন মানুষদের ছোট-বড় বজরা থাকত।
বজরার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অল্প পানিতে চলতে-ফিরতে ভারি সেয়ানা এ জলযান। দেখতে চওড়া, এর নিচের অংশটা চামচের মতো চ্যাপ্টা, সাধারণ নৌকার মতো নিচের অংশটা ছুচালো নয়, ফলে কম পানি হলেও আটকে যায় না, আর চড়ায় আটকে গেলে লগি দিয়ে সহজেই ঠেলে জলে ভাসানোর সমস্যা হয় না।
অনেকে মনে করেন বজরা দেশী জলযান নয়, বিদেশী জলযান ও দেশী নৌকার মিশ্রণে তৈরি। মীর জুমলার ১৬৬২ সালে আসাম অভিযানের সময় কিন্তু তার নৌবাহিনীতে চারটি বজরার খবর পাওয়া গেছে। ইউরোপীয় নৌবাহিনীর অনুসরণে তিনি এই নতুন জলযান সংগ্রহ করেছিলেন— এমনও হতে পারে।
ইউরোপের বাইরেও বজরার মতো জলযানের হদিস পাওয়া যায়। চীনে, মিসরে ও দক্ষিণ আমেরিকায় জলযান নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের অভিমত, এ দেশে ইংরেজরা বজরার ব্যবহার শুরু করেছিলেন সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে। তাদের প্রধান শাসনকেন্দ্র কলকাতা থেকে হুগলি নদী ধরে নদীপথে পূর্ববঙ্গ বা আসাম যেতে চাইলে পাড়ি দিতে হবে সুন্দরবনের অনেক অগভীর নদী আর খাড়ি। সাধারণ নৌকায় সেটা সম্ভব নয়। অথচ আসামে যাতায়াত সুগম না হলে চায়ের বাগান আর কাঠের ব্যবসার প্রসার হবে না। ইংরেজরা যখন প্রথম আসামে ঢোকেন, ব্রহ্মপুত্রের তীরে নিরাপদ থাকার জায়গা নেন। কাজেই কলকাতা থেকে বড় বড় বজরা ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র বিকল্প। এতে বজরায় থাকা, বজরা থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের শুরু হলো। ইংরেজের দেখাদেখি এ দেশী জমিদার-ব্যবসায়ীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বজরার ব্যবহার। বজরার ধীরে ধীরে পদ্মা আর গঙ্গায় অতি পরিচিত জলযান হয়ে উঠতে বেশি দেরি হয়নি। কলকাতা থেকে ঢাকা পৌঁছাতে হলে কোম্পানির কর্মকর্তারা সবাই বজরা ব্যবহার করেছেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের বিখ্যাত বজরায় ১৮ জন অতিথির বসে খাওয়ার মতো বিশাল টেবিলের বন্দোবস্ত ছিল। ঢাকা থেকে সিলেট যেতে বজরাই তখন একমাত্র সম্বল। কোম্পানির প্রথম দিকের কালেক্টর উইলিয়াম ম্যাকপিস থ্যাকারে এবং পরবর্তীতে কালেক্টর লিন্ডসেকে নিয়ে বজরা সাগরের মতো বিশাল হাওড় পেরিয়ে সিলেট শহরে পৌঁছেছিল। লিন্ডসের স্মৃতিকথায় এ জলপথে ভ্রমণের মনোজ্ঞ বর্ণনা রয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি বজরাটির নাম ছিল ‘সোনামুখী’। পরে কোম্পানির শাসন শেষ হলে এদেশে সরাসরি রাষ্ট্রীয় শাসন আসার পর গভর্নর জেনারেলের নিজস্ব বজরাটির নাম বদলায়নি।
রবীন্দ্রনাথের ‘গল্পগুচ্ছ’-এর চেয়েও তার পদ্মায় বোট ভাসিয়ে মাসের পর মাস নদীর জলে ঘুরে বেড়ানোর, নদীতে বাস করার ঘটনাটা যেন বেশি টানে। এই বোট মানে বজরা। রবীন্দ্রনাথ কেন বজরা বলতেন না জানি না। বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানীও ‘ত্রিস্রোতা’ অর্থাত্ তিস্তার বুকে বজরায় ভেসে বেড়াতেন।
‘সেই বজরা নানা বর্ণে চিত্রিত, তাতে কত রকম মুরদ আঁকা আছে। তার পিতলের হাতল, ডাণ্ডা প্রভৃতি রুপার গিল্টি। নাবিকেরা পাল ঢাকা দিয়া শুইয়া আছে, কেবল বজরার ছাদের ওপর একজন মানুষ।’
নদীর নাম ত্রিস্রোতা— অর্থ তিনটি স্রোত বলে তিস্তা। করতোয়া, আত্রাই আর পুনর্ভবা। সিকিম থেকে উত্সারিত এই নদী দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি জেলা হয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশে। তার আগের পাহাড়ি নাম ছিল তিস্তাং।
বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানীর কাল পেরিয়েও দীর্ঘদিন তিস্তা এবং বাংলার অন্যান্য নদীতে বজরা চলেছে তার মৃদু-মন্থর গতিতে। লোকলস্কর নিয়ে রান্নাবান্না করে খেয়ে-শুয়ে-বসে জলে ভেসে ভেসে এমন এক মহাসুখে দিন কাটানোর উপযোগী আর কোনো জলযানের হদিস বাঙালি আগে আর পায়নি। পূর্ববঙ্গের ঢাকায় থাকার সময়ে জেমস রেনেল তার বিখ্যাত সার্ভে কাজ চালানোর উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গ এবং এর আশপাশের সব নদী ঘুরে বেড়িয়ে ছিলেন তার ছোট্ট বজরা নিয়ে। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ একটানা বজরায় থেকে মানচিত্র তৈরি করেছেন তিনি। এই বজরায় ভেসে বেড়ানোর সময় দু-একবার ডাকাতের হাতে পড়েছিলেন। তবে আহত হয়েও ডাকাতদের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বহু পরে লেখা ১৯৬৫ উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘জলযাত্রা’ নামের বইতেও মির্জাপুর অঞ্চলের ডাকাতদের কথা লিখেছিলেন। ‘জলপথে মুর্শিদাবাদ’ বইতেও জলদস্যু বা ডাকাতদের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাতে বোঝা যায় জলপথে এ সমস্যা বাংলা এবং বাংলার বাইরের সব জায়গাতেই ছিল।
১৭৮৩ সালে ঢাকা থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌকা (বজরা) করে কলকাতা পৌঁছেন পাটনার দীন মোহাম্মদ ও তার সঙ্গী ক্যাপ্টেন বেকার সাহেব। চুনার গড় থেকে নদীপথে কলকাতা হয়ে ঢাকা সফরে এসেছিলেন দীন মোহাম্মদ। কলকাতা ফিরে গিয়ে তিনি জাহাজে চেপে বিলাতে পাড়ি দিয়েছিলেন— এসব তথ্য ইংরেজিতে লেখা বিলাত থেকে ছাপা দীন মোহাম্মদের ভ্রমণ কাহিনীতে দেয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের জলপথ ও ঢাকার বর্ণনা তার এ বইয়ের মূল্যবান সংযোজন। দীন মোহাম্মদের বর্ণনার একটি অংশ নিচে দেয়া হলো—
কিছুদিন ঢাকায় থাকার পর আমরা কলকাতার দিকে যাত্রা করলাম। নদীপথে দু’দিন পর এসে পড়লাম সুন্দরবন নদীতে। নদী খুব সংকীর্ণ, বহু শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত। দু’দিকের জমি নিচু, জলের ধার পর্যন্ত বড় বড় গাছে ঢাকা। মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে বন্য পশুর গর্জন ছাড়া চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ।
হিংস্র জন্তু প্রচুর, বাঘেরা এত বেপরোয়া যে নৌকোয় ঝাঁপিয়ে পড়ে যাত্রীদের ধরে নিয়ে যায়। তীরে বহু গ্রাম, দশ থেকে বারো মাইল দূরে একেকটি অবস্থিত। কুটিরগুলো শিল্পসৌকর্যহীন, চওড়া সবুজ কাপড় (ভষধমবং) বাঁশের কাঠামোয় বাঁধা। বন্যা এলে অধিবাসীরা অতি সহজে তাদের বাসস্থান স্থানান্তর করে, প্রথমে খুলে আলাদা করে, তারপর ‘ছাদ’ ইত্যাদি গুটিয়ে বান্ডিল বেঁধে নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। এদের প্রয়োজন সামান্য, অল্পেই তুষ্ট, শহরের বিলাসিতা আর লোভের পাপ তাদের স্পর্শ করেনি। গ্রামগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কুটির আমাদের চোখে পড়ল, কয়েকজন ইউরোপিয়ান ভাগ্যান্বেষী এগুলো বানিয়েছিল। তারা বাংলার বিভিন্ন জায়গায় জাহাজ তৈরি ও অন্যান্য কাজের জন্য গাছ কাটিয়ে সরবরাহ করত। (অনুবাদ: অরুণ নাগ)
চার
বাস্তব জগতের মাটি ছেড়ে এবার আকাশপথে অবনঠাকুরের সঙ্গী হয়ে মানসভ্রমণে বাংলাদেশ বেড়ালে কেমন হয়। তার শব্দের তুলিতে তৈরি করেছেন এক অদৃষ্টপূর্ব আকাশ রেল। তিনি এ জাদুট্রেনের নির্মাতাই নন, এই জাদু ভ্রমণের একমাত্র যাত্রীও। বুড়ো আংলার কাহিনীতে আমতলি গ্রামের রিদয়কে নিয়ে উড়ে চলা সুবচনীর হাঁসের পিছু পিছু অবনঠাকুরের এই জাদুট্রেন ভেসে চলে হাঁসের দলের সঙ্গে আকাশপথে। সুন্দরবন ছাড়িয়ে বাংলাদেশের বুকের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে এ রেলগাড়ি। বাখরগঞ্জের ধান ক্ষেতের ওপর দিয়ে যেতে যেতে হাঁসের দল ভেসে ওঠা, ক্ষেত আর মাঠ, ক্ষেত আর মাঠ— বাখরগঞ্জ, রিদয় মজা পেয়ে হাততালি দিয়ে যেই বলেছে বাহ্ কি তামাশা, অমনি হাঁসেরা যেন ধমকে বলে ওঠে, ‘সেরা দেশ— সোনার দেশ— সবুজ দেশ— ফলন্ত ফুটন্ত বাংলাদেশ।’ হাঁসেরা উড়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে নিচের গ্রামে ঘরের মটকায় পাহারা দেয়া মোরগকে। কোন গ্রাম? মোরগ জবাব দেয়, তেঁতুলিয়া, সাবেক তেঁতুলিয়া। কোন শহর? নোয়াখালী— খটখটে। কোন মাঠ? তিরপুরনীর মাঠ— জল থই থই। কোন বিল? চলনবিল— জল নেই। যাত্রীরা বুঝে যায় কোন জায়গায় কি পাওয়া যায়, কোথায় বিপদ, কোথায় নিরাপদ। এমনি করে বরিশাল, খুলনা, যশোর, ফরিদপুর হয়ে ধলেশ্বরী নদী পেরিয়ে ক্রমে হাঁসের দল চাঁদপুরের দিকে চলে— পুবমুখে।
অবনঠাকুর তার নিজের জীবনের সব ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে অসাধারণ এক কৌশলে— রিদয় আর সুবচনীর হাঁসের দৃষ্টিতে— বাংলাদেশের নানা জনপদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনার কাজে লাগিয়েছেন। ১৯১৯-২০ সালে তিনি একবার দার্জিলিং বেড়াতে গিয়েছিলেন বুড়ো আংলার টুং সোনাটা, ঘুম অধ্যায়ে সেই অভিজ্ঞতা বড় মিষ্টি হয়ে ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথা কৈলাস পর্বত বা মানসসরোবরের পথে হাঁসের দলের সঙ্গে জাদু রেলগাড়িতে বেড়ানোর যে বর্ণনা রয়েছে, তাতে ধরা পড়েছে বাংলার ভূগোলের এক অসাধারণ বাস্তব ছবি। সেই উড়ে বেড়ানোর পথে রয়েছে বাংলার মানচিত্রের সাতনল, আগরতলার রাজবাড়ি, মীরকাদিম, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার নবাববাড়ি, পাবনা, বোয়ালিয়া, বগুড়া, রাজশাহী, জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়ি। আবার এ পথেই চোখে পড়ে গৌহাটি, ডিব্রুগড়, শিলং; অন্যদিকে ঘুমলেক, কার্সিয়াং কালিম্পং, টুং সোনাটা ইত্যাদি স্থানের ভৌগোলিক পরিচয়। বাংলায় ভ্রমণের এমন স্নিগ্ধ, বনবিথী ছাওয়া, হিম-কুয়াশা আর রোদ-বৃষ্টিমাখা ভূগোলের বর্ণনা সচরাচর চোখে পড়ে না। বুড়ো আংলা পড়ে যদি কোনো বাঙালির নিজের দেশটা ভালোভাবে ঘুরে দেখার বাসনা প্রবল না হয়, তবে সেটা হবে এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা।
পাঁচ
দেশে রেলগাড়ি চালু হওয়ার আগে বাংলার স্থলপথে ভ্রমণের প্রধান যানবাহন ছিল পালকি ও গরুর গাড়ি। ক্ষেত্রবিশেষে ঘোড়ার গাড়ি বা ঘোড়ায় টানা ডাক বহনকারী ও (ডাক-গাড়ি) ব্যবহার করা হতো।
প্রায় প্রত্যেক ধনী বাঙালি পরিবারে তখন পালকির খুব চল। বালথাজার সলভিন্স বাংলাদেশে প্রায় আট রকমের পালকির সচিত্র বিবরণ দিয়ে গেছেন। পালকি বেহারারা এমন স্বছন্দ গতিতে পালকি বয়ে যায় যে, ভেতরের যাত্রী তার দুলুনি তেমন অনুভব করে না। তারা বেশ জোরেও চলতে পারে। কাজেই পালকি চেপে সহজেই দেশের একমাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত যাওয়া যায়।
পালকি ব্যয়বহুল এবং রাজসিক বিলাসিতার এক চরম নির্দশন। জমিদার, সঙ্গতিপূর্ণ ভূস্বামী, অভিজাত সম্প্রদায় ও বিদেশী রাজপুরুষ ও কর্মকতা ছাড়া পালকির ব্যবহার মধ্যবিত্ত বা সাধারণ মানুষের ছিল নাগালের বাইরে।
কোম্পানির আধিপত্য বাংলার বাইরে প্রসারিত হওয়ার ফলে কাজ চালানো গোছের ইংরেজি জানা শিক্ষিত বাঙালির বিহার-উড়িষ্যায় মাঝারি মাপের নানা চাকরির দরজা খুলে গিয়েছিল। এ চাকরি বা কর্মসূত্রে তখন বাঙালির নিয়মিত এসব প্রদেশে যাতায়াত করতে হত। সেই রেল-স্টিমারবিহীন, তীর্থযাত্রাবহির্ভূত এই কেজো ভ্রমণের জন্য গরুর গাড়ি করে সপরিবারে যাতায়াত তাদের আর্থিক সামর্থ্যে কুলিয়ে যেত। জমিদার বা অভিজাত শ্রেণী ও কোম্পানির প্রশাসনিক কর্তা বা ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা অবশ্য ব্যয়বহুল পালকিই ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তবে সে আমলে পথেঘাটে দস্যু-তস্করের উপদ্রব থাকায়, তাদের পাইক-পেয়াদা সঙ্গে নিয়ে চলতে হতো।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাজে জেমস ফরবেস ১৭৬৬ সাল থেকে ১৮ বছর এ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাটিয়েছেন। একবার পালকিতে চেপে তিনি একটানা নয় মাস বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেছেন। তিনি লিখেছেন দূরদেশে যাত্রাকালে যাত্রীরা পালকির গদির ওপর আরামে নিদ্রা যান, যেন তিনি তার আপন গৃহে নিজের বিছানাতেই শুয়ে আছেন।
সেকালের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী উইলিয়াম হজেস ১৭৮১ সালে কলকাতায় হাজির হন। ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সৌজন্যে গঙ্গা তীরবর্তী বরাবর মুঙ্গের পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে (প্রায় তিন মাইল) ছবি আঁকার সুযোগ পান তিনি। পুরো পথটি তিনি ‘ডাক’ পালকিতে চেপে ছবি আঁকতে আঁকতে মুঙ্গের পৌঁছেন। এই যাত্রাকালে আঁকা তার সবচেয়ে বড় আকারের দুটি বিখ্যাত ছবি হলো— মতি ঝরনা ও রাজমহলের ধ্বংসাবশেষ। মুঙ্গের থেকে হজেস অবশ্য নৌকা করে গঙ্গা দিয়ে কলকাতা ফিরে এসেছেন। হজেস লিখেছেন যে, বাহকদের একেক দলে নয়জন করে থাকে। সাতজনে পালকি বয়। বাকি দুজনের একজন মালপত্র বহন করে, অন্যজন রাত্রে মশাল হাতে নিয়ে পথ দেখিয়ে আগে আগে চলে। দশ মাইল যাওয়ার পর বাহক বদল হয়।
সেই যুগে নদী-নালার নকশা কাটা সবুজ ওড়না জড়ানো বাংলার গ্রামের মধ্য দিয়ে পালকি ভ্রমণের এক মিষ্টি বিবরণ লিখে গেছেন কলকাতা নিবাসী বিখ্যাত ইংরেজ শিল্পী কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্ট।
‘আমি ইট-সুরকি ও কোলাহলের জগত্ থেকে এসেছি। এ নির্মল শান্ত-স্নিগ্ধ বাতাস, কচি সবুজ মাঠ আলো-ছায়ার মোহময়ী মায়া কী করে কাটিয়ে যেতে পারি। তাই পালকিতে না চেপে হেঁটে গ্রামের সরু পথ ধরে এগিয়ে চললাম।’
গ্রামের মাটির ঘর দেখে তার মনে হয়েছিল কোনো নিপুণ শিল্পী যেন ঘন সবুজ গাছপালার মাঝখানে ঠিক ছবির মতো একেকটি ঘর বসিয়ে দিয়েছে। মেয়েরা সাহেব দেখে পথের এক ধারঘেঁষে দাঁড়িয়ে মুখের ওপর ঘোমটা টেনে দিচ্ছে।
পালকি চেপে উড়িষ্যার কোনারক ভ্রমণের এক মনোজ্ঞ বর্ণনা রয়েছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রানীচন্দের কাছে বর্ণিত স্মৃতিকথায়। চারখানা পালকি সাজিয়ে, লাঠি-লণ্ঠন লোকজন স্ত্রী-পুত্র কন্যা সঙ্গে নিয়ে যাত্রা করেছিলেন তিনি। কুড়ি মাইল পথ বালির ওপর দিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছি, সারা রাত। পান, তামাক, খাবার জলের কুঁজো পালকির ভেতরে তাকে ঠিক ধরা, মিষ্টান্নের ভাঁড়ও একটি; পাশে লাঠিখানা। পালকি চলেছে ‘হুম্পা হুয়া’। পুরী ছাড়িয়ে সারা রাত চলেছি— ভয়ও হচ্ছে, কী জানি যদি বালির মাঝে পালকি ছেড়ে পালায় বেহারারা। আমার আগে আগে চলেছে তিনখানা পালকি। মাঝে মাঝে হাঁক দিচ্ছি, ‘ঠিক আছিস সবাই?’ সুনসান বালি, কোথায় যে আছি— বাতাসে না পৃথিবীতে কিছু বোঝার উপায় নেই। থেকে থেকে ধপাস ধপাস শব্দ, বেহারাদের আট-দশটা পা পড়ছে বালিতে। এক জায়গায় শুনি ঝপ্ঝপ্ ঝপ্ঝপ্ শব্দ।
‘কী হলো রে?’
‘বাবু নিয়াখিয়া নদী আসি গেলাম।’
ওপরের উদ্ধৃতিটি দীর্ঘ হলেও অবনঠাকুরের গদ্যের মাধুর্য্য ও সাবলীলতার কারণে বিবরণটি সংক্ষিপ্ত না করে হুবহু পরিবেশন করার লোভ সামলানো গেল না।
ছয়
রেলগাড়ি চালু হওয়ার আগে বাংলার বাইরে ভ্রমণ কত ব্যয়সাধ্য এবং কষ্টকর ছিল, তার বিবরণ যোগেন্দ্রকুমার চট্টপাধ্যায়ের ‘স্মৃতির সেকাল’-এ দেয়া আছে। লেখকের পিতা উড়িষ্যার কটকে শিক্ষকতা করতেন। সেই সূত্রে তাকে চন্দননগর থেকে বেশ কয়েকবার তার কর্মস্থলে সপরিবারে যাতায়াত করতে হয়েছে। বালক যোগেন্দ্রকুমার প্রতিবারই পিতার যাত্রাসঙ্গী হয়েছিলেন। পালকি ব্যয়বহুল বলে মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী বাঙালির গরুর গাড়িই ছিল সাশ্রয়ী যান। তবে সেই গরুর গাড়িতে বাংলা থেকে কটক পৌঁছতে কমপক্ষে ১৮-১৯ দিন লেগে যেত। যোগেন্দ্রকুমারের বর্ণনাটি সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার এবং মধ্যবিত্ত বাঙালির বাংলার বাইরে ভ্রমণের সুবিধা-অসুবিধার বাস্তব চিত্রসংবলিত এক অসাধারণ প্রামাণ্য দলিল বলে বিবেচিত হতে পারে।
যোগেন্দ্রকুমারের পিতা কটক থেকে বদলি হয়ে দেশে ফেরার সময় তিনটি গরুর গাড়ি দৈনিক পারিশ্রমিক হিসেবে ভাড়া করেছিলেন। কটক ছাড়ার পর পথে পড়ে মহানন্দা নদী, সেই নদীতে জোড়া নৌকায় গরুর গাড়িসহ খেয়া পার হতে হয়। দুটি অতি বৃহত্ নৌকা পাশাপাশি বাঁধা। সেই নৌকায় একসঙ্গে পাঁচ-সাতটি গরুর গাড়ি, পাঁচ-সাত জোড়া বলদ ও ২০-২৫ আরোহী ও মালপত্র বোঝাই করা যায়। গরুর গাড়ি ও যাত্রীরা নৌকায় ওঠার পর নৌকা ছেড়ে ছিল। এবার লেখকের নিজের ভাষায় সেই খেয়া পার হওয়ার বর্ণনা শোনা যাক:
‘উড়িষ্যাতে নদী পার হইবার জন্য যে সকল নৌকা ছিল, তাহার চাতালের চারিদিকেই বেড়া দিয়া ঘেরা থাকিত। গরু, যাত্রী এবং গাড়ী উঠানামার সময় দুই পার্শ্বের খানিকটা বেড়া খোলা রাখা হইত। নৌকা ছাড়িবার পূর্বে সেই স্থানে বেড়া টানিয়া দেওয়া হইত।
উড়িষ্যার অধিকাংশ নদীতে ভয়ানক কুমীরের উপদ্রব ছিল। অনেক সময় তাহারা নাকি নৌকার উপর হইতে মানুষ টানিয়া লইয়া যাইত। সেই কুমীরের আক্রমণ হইতে যাত্রীদিগকে রক্ষা করিবার জন্য প্রায় সকল নৌকাতেই ঐরূপ বেড়া দেওয়া হইত।’
৩ ঘণ্টা চলার পর নৌকা গন্তব্যে পৌঁছল। বেড়া খুলে যাত্রী এবং গরুর গাড়ি নামানোর পর আবার যাত্রা শুরু হলো। কটক যাত্রীরা সন্ধ্যার আগেই পথের পাশের একটি চটিতে ঠাঁই নিলেন। এই রাস্তায় কিছু দূর পর পর যাত্রী চটি পাওয়া যায়। চটিগুলো যাত্রীদের বিশ্রাম ও আহারের ব্যবস্থা করে নগদ পয়সার বিনিময়ে। চটিওয়ালাকে লেখকের পিতা জিজ্ঞাসা করলেন, সে চটিতে রাতে থাকে কিনা। চটিওয়ালা চটিতে রাত কাটালে যাত্রীরা নিশ্চিন্ত হতেন। কারণ যে চটিতে চটিওয়ালা রাতে থাকে না, সে চটিতে রাতে প্রায়ই চুরি-ডাকাতি হয়। অনেক সময় চটিওয়ালাই চোর-ডাকাতকে খবর দিত। তার যদি সন্দেহ হতো যে যাত্রীদের সঙ্গে টাকাকড়ি ও গয়নাগাটি আছে, তবে সে-ই ডাকাতদের খবর পাঠিয়ে দিত। লেখক আরো জানাচ্ছেন, উড়িষ্যার ডাকাতরা কেবল যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করেই ক্ষান্ত হতো না, তার শিশু বালক বৃদ্ধ স্ত্রী পুরুষ সবাইকেই মেরে ফেলত।
প্রথম চটিতে রাত কাটিয়ে যাত্রাপথে আরো কয়েকটি চটিতে তাদের রাত কাটাতে হয়েছিল। সকালে আহারাদির পর দুপুরের বিশ্রাম এবং বেলা ৩টা-সাড়ে ৩টার সময় আবার যাত্রা শুরু করে সন্ধ্যার সময় আরেক চটিতে আশ্রয় নেয়া— এভাবে ১৮-১৯ দিন কাটানোর পর মেদিনীপুর হতে কটক বা কটক হতে মেদিনীপুরে পৌঁছানো সম্ভব হতো।
কটক থেকে শেষবারের মতো দেশে ফেরার পথে দাতন নামের এক জায়গায় চটিতে রাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন লেখকের পরিবার। সেই দাতনের চটিতে ডাকাতের হাত থেকে ভাগ্যক্রমে রেহাই পাওয়ার কাহিনীও বর্ণনা করেছেন লেখক। দাতনের চটিওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করা হলে জানায়, সে রাতে চটিতেই থাকে।
লেখক ও তার পরিবারের সবাই নিশ্চিন্ত হয়ে খাবারের ব্যবস্থা করছেন, এমন সময় হঠাত্ চটিওয়ালা এসে জানায়, তার বাড়ি থেকে লোক এসেছে, তাকে বাড়ি যেতে হবে। আপত্তি ও পুলিশের ভয় দেখানো সত্ত্বেও সে বাড়ি চলে গেল। সেই রাতেই দেখা গেল চটি হতে অনেক দূরে দুই সারি আলো ধীরে ধীরে চটির দিকে এগিয়ে আসছে। লেখকের পিতা চটির উত্তর দিকে আর একটি যাত্রীদল কিছুক্ষণ আগে এসেছিল তাদের খবর দিতে ছুটলেন। সেই যাত্রীদের দলপতি একজন মাড়োয়ারি ভদ্রলোক, তার সঙ্গে ছয়জন দারোয়ান। মাড়োয়ারি ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিয়ে তাদের আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, তিনি রেশমি কাপড়ের ব্যবসা করেন। সব সময় ৫-৭ হাজার টাকা মূল্যের কাপড় নিয়ে তাকে এ পথে যাতায়াত করতে হয় বলে ছয়জন বন্দুকধারী দারোয়ান সঙ্গে রাখেন। নিজের কাছেও দোনলা বন্দুক আছে। সুতরাং ডাকাতদের এ চটিতে আসতে দেবেন না তিনি। ডাকাতরা তখন চটির দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছিল। একটু পরে তিনি তার দারোয়ানের আকাশের দিকে মুখ করে বন্দুক চালাতে হুকুম দিলেন। বন্দুকের শব্দ শুনে ডাকাতরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং ৫-৬ মিনিট পর আবার বন্দুকের শব্দ হলে দস্যুদল মশাল নিভিয়ে অন্ধকারে মিশে গেল। পাছে তারা অন্ধকারে আবার ফিরে আসে, সেজন্য প্রভুর আদেশে দারোয়ানরা সারা রাত পথে টহল দিয়ে এবং মাঝে মাঝে বন্দুকের আওয়াজ— জেগে রইল। পরদিন ভোর বেলা মাড়োয়ারি ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখকের পিতা আবার যাত্রা শুরু করে নির্বিঘ্নে বাংলায় পৌঁছলেন।
সাত
রেলগাড়ির আবির্ভাব বাঙালির অনড়, উদ্যমহীন, নিস্তরঙ্গ জীবনের বন্ধ দরজা এক ঝড়ো হাওয়ার ঝাপ্টায় ভেঙে ফেলেছিল। বহু যুদ্ধে জয়ী ও পরাজিত এক বিশাল-বিক্ষুব্ধ অতীতসমৃদ্ধ ভারতের মুখোমুখি বাঙালিকে দাঁড় করিয়ে ছিল ইংরেজের এ যন্ত্রযান। রেলপথ খুলে গেলে সাধারণ বাঙালির মধ্যে দেশ দেখার চেয়ে তীর্থ যাত্রার ইচ্ছাই প্রথম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ মতিলাল হেঁটে কাশি পৌঁছেছিল— ‘হুতোমপ্যাঁচার নকশা’র প্রেমানন্দ ও জ্ঞানানন্দ গোসাই কিন্তু রেলগাড়ি চেপে ‘পশ্চিম’ যাত্রার তোড়জোড় করেছিল। তবে সেই রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা যে অকথ্য কষ্ট ও দুর্দশা সহ্য করেছিল, তা শুধু দ্রুতগতিতে পথ পেরিয়ে আসার অনাস্বাদিত আনন্দে।
এই রেলপথের হাত ধরেই বাঙালির পশ্চিমে বেড়ানোর সুযোগ বেড়ে গেল। বাঙালি তখন পশ্চিম বলতে বুঝত দক্ষিণ বিহারের মালভূমি অঞ্চলকে। উনিশ শতকের সাহেবদের দেখাদেখি বাঙালিরাও হাওয়া বদলের অর্থাত্ সাময়িক অবকাশ যাপনের এবং স্বাস্থ্য ফেরানোর উদ্দেশ্য পশ্চিমে ছুটিতে পাড়ি দেয়া শুরু করে। তাদের পছন্দের জায়গাগুলো ছিল— দেওঘর, জসিডি, মধুপুর, ঘাটশিলা, রাঁচি, হাজারিবাগ, পালামৌ, গিরিডি ইত্যাদি। রেলগাড়ি আসার পরই বাঙালির ওইসব জায়গায় যাতায়াত বাড়তে থাকে।
এই অঞ্চলের আহার্য বস্তুর প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য দেখে বাংলা থেকে আসা যাত্রীদের মুখে ‘বাহ্ দারুণ সস্তা— ড্যাম চিপ শাকসবজি মাছ দুধ’ ইত্যাদি অহরহ শুনে শুনে স্থানীয়দের কাছে এই হাওয়া বদলকারীদের নাম হয়ে গেল ‘ড্যামচি’; কিংবা ড্যামচি সাহেব বা বাবু।
রাজকীয় পালকি, বাদশাহী বজরা, পাইক-পেয়াদা, হাতি-ঘোড়া-উটের পিঠে চেপে বেড়ানোর দিন কি তবে ফুরিয়ে এল রেলগাড়ির ইঞ্জিনের ধোঁয়ায়? উত্তরে ‘না’ বলা ছাড়া উপায় নেই। তবে ভারতের সব জায়গায় না হলেও রেলপথের কল্যাণে কিছু কিছু জায়গায় মধ্যযুগের যানবাহনের তেজ যে কমে এসেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। ধনী-নির্ধন, জাতপাতের ছোঁয়াছুঁয়ি সামাজিকভাবে সরিয়ে রেখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একটি মাত্র যানে যাত্রী হয়ে যার যার গন্তব্যে পা বাড়ানোর অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা রেলগাড়িই প্রথম এ দেশের মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল। সম্ভবত রেলগাড়িই ভারতে ভ্রমণের গণতন্ত্রীকরণের সূচনা করেছিল উনিশ শতকে।
হাল আমলে বাঙালির সেই হাওয়া বদল নিয়ে বিতর্কের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে হাওয়া বদল কি যথাযথই পর্যটনের বা ভ্রমণের পর্যায়ে পড়ে? প্রশ্নটি তুলেছেন লেখিকা আশাপূর্ণাদেবী তার ‘না ভ্রমণের বৃত্তান্ত’ (সেরা ভ্রমণ কাহিনী— প্রথম খণ্ড) নামের প্রবন্ধে। তার চোখে হাওয়া বদলের মূল তাত্পর্য হলো নিত্যদিনের একঘেয়ে চক্রে বাঁধা জীবনটা থেকে অন্তত গোটা কয়েকদিনের রেহাই পেয়ে নতুন হয়ে ওঠা। ফলে হাওয়া বদল ব্যাপারটিকে ভ্রমণের মর্যাদা দেয়া অনুচিত। কারণ দেশের মানুষকে দেখার, জানার সুযোগই আসল দেশ ভ্রমণ বা পর্যটন। হাওয়া বদলে এ সুযোগ পুরোপুরি মেলে না।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার পুত্র বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ প্রসঙ্গ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ব্যতীত এ লেখা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। দেবেন্দ্রনাথ বাড়ির বাইরে কাটিয়েছেন জীবনের অধিকাংশ সময়। হিমালয় দেবেন্দ্রনাথের অতি প্রিয় স্থান, তার ঘন ঘন হিমালয় বাস থেকেই তা বোঝা যায়। ভ্রাম্যমাণ দেবেন্দ্রনাথ কখনো বাস করেছেন চুচুড়ায়, কখনো চন্দন নগরে, মুসৌরি পাহাড়ে, কখনো সিমলায় ও কাশ্মীরে। চীনেও নাকি তিনি গিয়েছিলেন।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে বৃহত্তর জগতের আঙিনায় পা রাখার সুযোগ ঘটে বালক রবীন্দ্রনাথের তার পিতার সঙ্গে হিমালয়ে ভ্রমণ উপলক্ষে। পাহাড়ি অঞ্চলে একা একা ঘুরে বেড়ানোর মধ্য দিয়ে বক্রোটা পাহাড়ের মাথায় পিতার বাসভবনে সূর্যোদয় দেখে বালক রবির বিশ্বপথিক হয়ে ওঠার সোপান গড়ার কাহিনী জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলাসহ তার সব ভ্রমণকাহিনীতে ধরা রয়েছে— সারা জীবন ধরেই তিনি ছিলেন চরম ভ্রাম্যমাণ।
কবি ‘ছেলেবেলা’তে লিখেছেন, ‘কলকাতায় আমরা মানুষ, সেখানে ইতিহাসের মাথা তোলা চেহারা কখনো দেখিনি। আমেদাবাদে এসে এই প্রথম দেখলুম চলতি ইতিহাস থেমে গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে— তার পিছন ফেরা বড়ো ঘরোয়ানা।’ আমেদাবাদে কবির মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথের জেলা জজ হিসেবে সরকারি বাসস্থান ছিল শাহিবাগে। এই শাহিবাগে বাদশাহি আমলের প্রাসাদ বাদশাহর জন্য নির্মিত। এই বাড়িতেই বেশ কিছুদিন কাটিয়ে ছিলেন তরুণ রবীন্দ্রনাথ। আমেদাবাদে বাস রবীন্দ্রজীবনে ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। আমরা সবাই জানি, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে এই শাহিবাগের পরিবেশটি সাহিত্যরূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
জীবনস্মৃতিতে বালক রবীন্দ্রনাথ তার হিমালয় বাসের কথা স্মরণ করে লিখেছেন, ‘আমার যৌবনারম্ভে এক সময়ে আমার খেয়াল গিয়াছিল আমি গোরুর গাড়িতে করিয়া গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ধরিয়া পেশোয়ার পর্যন্ত যাইব। আমার এ প্রস্তাব কেহ অনুমোদন করেন নাই এবং ইহাতে আপত্তির বিষয় অনেক ছিল। কিন্তু, আমার পিতাকে যখনই বলিলাম তিনি বলিলেন, ‘‘এ তো খুব ভালো কথা; রেলগাড়িতে ভ্রমণকে কি ভ্রমণ বলে।” এই বলিয়া তিনি কিরূপে পদব্রজে এবং ঘোড়ার গাড়ি প্রভৃতি বাহনে ভ্রমণ করিয়াছেন, তাহার গল্প করিলেন। আমার যে ইহাতে কোনো কষ্ট বা বিপদ ঘটিতে পারে, তাহার উল্লেখমাত্র করিলেন না।’
ভ্রমণ সম্পর্কে পিতা-পুত্রের নির্মোহ ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্বিমতের কোনো সুযোগ নেই। হিমালয় নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, জলধর সেনের ‘হিমালয়’ গ্রন্থের পর একেবারে প্রথম দিকেই স্থান পাবেন রত্নমালা দেবী তার ‘হিমালয় পরিভ্রমণ’-এর জন্য। রত্নামালা তার হিমালয় যাত্রা লিখেছিলেন তীর্থযাত্রী হিসেবে। দিনলিপির আকারে ভ্রমণপথের বর্ণনা সাবলীল গতিতে এগিয়ে গেছে। পথের বিবরণ এবং সেখানের অধিবাসীদের উল্লেখ ছাড়াও চমত্কার প্রাকৃতিক দৃশ্যেরও ছবি রয়েছে। এই স্বল্প জানা ভ্রমণ কাহিনীর প্রকাশকাল ১৩৩২ বঙ্গাব্দ।
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তীর্থযাত্রী আর ‘ড্যামচি’ বাবুর খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে বাঙালি অনেক দিন আগে। বাঙালি ভ্রমণপিপাসু, এ কথা আজ সুবিদিত। তবে একালে তার হাওয়া বদলের হাওয়া দিক পাল্টেছে। এক সময় বিলাত ছিল তার অধরা, এখন সেটি তার সহজ আয়ত্ত। হরেক রকম ট্যুর প্যাকেজ আর ট্রাভেল এজেন্সি তাকে টানছে দক্ষিণ এশিয়ায়, টানছে আমেরিকায়। এখন সত্যিই তার পায়ের তলায় শর্ষে।
অবনঠাকুরের রিদয় আর সুবচনীয় হাঁস আজ আর নেই। কিন্তু শাশ্বত বাংলা আজো চির অমলিন, চিরভাস্বর। পরিযায়ী পাখিরা সেদিনের মতো আজো সবুজ শ্যামলিমা ঢাকা বাংলার ওপর দিয়ে উড়ে যায়— যেতে যেতে বলে ওঠে, ‘সেরা দেশ— সোনার দেশ— সবুজ দেশ— বাংলাদেশ।’
লেখক: গবেষক, সাবেক কূটনীতিক






