শিলিগুড়ির সবাই মহানন্দপাড়া রোড এবং ২৫ নম্বর বাড়িটির এককালের বাসিন্দাটিকে চেনে। নকশালী আন্দোলনের জনক চারু মজুমদারের কথা জানতে চাইলে স্থানীয় এক মিষ্টির দোকানি হাসেন। ‘ও! আপনি ওই বাড়িতে যেতে চান,’ জিজ্ঞেস করেন তিনি। ‘সোজা চলে যান, হাতের ডানেই পড়বে বাড়িটা।’
চারুর ছেলে শিলিগুড়ি কলেজে ইংরেজি শিক্ষাদানকারী অভিজিত্ তাঁর বড় দুটি বোন ডাক্তার অনীতা ও স্কুলশিক্ষক মধুমিতাকে নিয়ে ওই বাড়িতে থাকেন। অভিজিত্ অকৃতদার হলেও স্বামীর সঙ্গে অনীতার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে এবং মধুমিতা একজন বিধবা।
বাড়িটি এখন দুই অংশে বিভক্ত। সামনের নবনির্মিত অংশটি সবার জন্য উন্মুক্ত এবং ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট অভিজিতের এক চাচাতো ভাইয়ের অফিস হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। বাড়ির বাকি অংশ বহিরাগতদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। কাঠের এ কুটিরেই এককালে চারু তাঁর আরাম কেদারায় বসে ভূস্বামীদের খপ্পর থেকে নকশালবাড়িকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সহকারীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এখানেই ভারতে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দেয়া ঐতিহাসিক আট দফা রচনা করেছিলেন তিনি। এটা রাষ্ট্র ও নিজ দল সিপিআই (এম)-এর শত্রুতে পরিণত করে তাঁকে। পুলিশ তাঁর পিছু নিয়েছিল, দল তাঁকে বহিষ্কার করেছিল। ১৯৬৯ সালে ঘর ছেড়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান তিনি। শিলিগুড়ি আর কখনো তাঁকে দেখেনি, এমনকি তাঁর মৃতদেহও নয়।
কিন্তু আমি বাড়িতে ঢোকার পর চারুর উপস্থিতি এখনও সজীব বলেই মনে হলো। ১৯১৮ সালে এক জামিদার পরিবারে জন্মগ্রহণকারী চারু রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথের তুলে ধরা বাংলার রেনেসাঁকে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদেরই পরিমার্জিতকরণ ছাড়া আর কিছু নয় বলে প্রত্যাখ্যানকারী বিদ্রোহী, নাস্তিকে পরিণত হন। কথিত আছে যে, একবার শিস্যদের ঠাকুর ও সুভাষ চন্দ্র বোসের মূর্তি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর শোয়ার ঘরে একটা বইয়ের তাকে ঠাকুরের রচনা দেখেছি আমি।
এগুলো কি নতুন? ‘না, না। এগুলো সবই আমার বাবার সংগ্রহের। ঠাকুরের লেখার দারুণ ভক্ত ছিলেন তিনি,’ বললেন অভিজিত্। তাহলে তিনি ঠাকুরের মতো কবিদের বিরোধী বলে কথা রটল কীভাবে? অভিজিত্ বললেন তার কারণ ইতিহাস রচনাকারীরা সব জায়গা থেকে তাঁর বাবার নাম মুছে ফেলতে চেয়েছেন। “রবীন্দ্রসংগীত ও ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত ভালোবাসতেন তিনি। খাঁটি বাঙালি ও খাঁটি ভারতীয় ছিলেন তিনি। কিন্তু লোকে তাঁকে ‘চীনের চেয়ারম্যানই আমাদের চেয়ারম্যান’ স্লোগান তোলা এবং শ্রেণী শত্রু খতমের আহ্বান জানানো কথিত নিশ্চিহ্নকরণের তত্ত্ব প্রচারের জন্যই চেনে।”
তবু, এমনকি আজকের দিনেও উড়িষ্যা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও পশ্চিম বাংলায় ছড়াগানে চারুর স্তুতি গাওয়া হয়। অভিজিত্ শান্তিনিকেতনের এক ভাস্করের তৈরি তাঁর বাবার একটা আবক্ষ মূর্তি পেয়েছিলেন, বাবার খাটের পাশে সেটা রেখে দিয়েছেন। ‘তাঁর আরাম কেদারাটা যেভাবে ছিল সেভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে। আমরা কাউকে ওটায় বসতে দিই না,’ বললেন অভিজিত্।
চারুই প্রথম ভারতে সশস্ত্র কৃষক বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং ভূস্বামীদের উত্পাদনের অর্ধেকের বদলে দুই-তৃতীয়াংশ বর্গা চাষীদের দিতে বাধ্য করা ১৯৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলনের সময় সিপিআইয়ের কর্মী হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৬৭ সালে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের ভেতর দিয়ে জমি অধিকারে উদ্বুদ্ধ করেন, যার ফলে সিপিআই (এম) তাঁকে বহিষ্কার করে। বেশ কয়েকজন নেতা দল ত্যাগ করে তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। জীবনের সর্বস্তরের জনগণ— কলকাতা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেরালার বুদ্ধিজীবী এবং গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষজন তার বাড়িতে ভিড় জমাতে শুরু করে। ‘বিখ্যাত অভিনেতা উত্পল দত্তের একবার আমাদের বাড়িতে এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করার কথা আমার মনে আছে। বহু লোকের সঙ্গেই কথা বলতেন বাবা,’ বললেন অভিজিত্।
একই বছর শুরু হয়েছিল নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন। ১৯৬৯ সালে পুলিশ তাঁকে খুঁজে বেড়ানোর সময় স্ত্রী ও তিনটি স্কুলপড়ুয়া শিশুকে রেখে আন্ডারগ্রাউন্ড আশ্রয়ে চলে যান চারু। অভিজিত্ বললেন তাঁর মা লীলা, যিনি কমিউনিস্ট পার্টিরই সদস্য ছিলেন, টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করেছেন। চারু ছাত্রদের শ্রেণী শত্রুদের হাতে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার আহ্বান জানালেও সন্তানদের সেই ধরনের প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করতে দিয়েছেন।
একে রটনা বলছেন অভিজিত্। ‘বাবা কখনই আমাদের লেখাপড়ার পেছনে টাকা খরচ করেননি। মা-ই ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট হিসেবে নিজের আয়ের টাকায় পরিবার চালিয়েছেন।’ তিনি বললেন কেউই সত্যিটা বুঝতে পারেনি। পরিবার পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। অভিজিত্ এখন তাঁর বাবার দলের একটা খুদে অংশের নেতৃত্বে থাকলেও অনীতা ও মধুমিতা সমাজে মেলামেশা করা বা কৃষক আন্দোলনের মা-বাবার ভূমিকা প্রসঙ্গে কথাবার্তা বলতে অনীহা প্রকাশ করে আসছেন। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনীতা গণমাধ্যমে বাবার ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকার করছেন। অবশ্য দ্য উইকের সঙ্গে খোলামেলা কথাই বলেছেন তিনি।
সমাজের একাংশের দুর্ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে অনেক দিন আগেই ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিয়েছেন অনীতা। বাবাকে ভালোবাসলেও তাঁকে কখনই নায়ক হিসেবে বিবেচনা না করার কথা বললেন তিনি। ‘আমার বন্ধু, দার্শনিক ও পথনির্দেশক ছিলেন তিনি। হ্যাঁ, শিক্ষা লাভে আমাকে তিনি সাহায্য করেননি, সেটা মা করেছেন। কিন্তু জীবনের চরম বিপর্যয় থেকে আমাদের বাঁচানোর কারণে আমার ওপর বিপুল প্রভাব রয়েছে তাঁর,’ বললেন অনীতা।
বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ডাক্তার হয়েছিলেন তিনি। ‘তোমাকে বিজ্ঞানের বিষয় বেছে নিতে দেখে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছি,’ মেয়েকে বলেছিলেন চারু। ‘তোমার লেখাপড়ার খরচ জোগাবে কে? অন্তত আমি তো নই।’
‘ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজে সহপাঠীদের ঠাট্টা-মশকরার শিকার হয়েছি আমি। আমাকে ওরা জিজ্ঞেস করত— বাবা যেখানে সবাইকে স্কুল ছাড়ার কথা বলছেন, সেখানে আমি কেন একটা হাই প্রোফাইল মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছি। আমি ওদের বলেছিলাম যে, বাবা সবাইকে এ কথা বলেননি, কেবল যারা বিপ্লবী হতে চায় তাদের বলেছেন। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে,’ বললেন অনীতা।
নকশালবাড়ির মুক্ত অঞ্চলে গরিবদের বিনা পয়সায় চিকিত্সা করে বাবার ইচ্ছা পূরণ করেছি আমি। কিন্তু আমি সত্যি হতাশ হয়েছি। হ্যাঁ, এখন আর ভূস্বামীরা নেই, কিন্তু পরিবেশ ভীষণ রকম দূষিত। ডাক্তার হিসেবে চালিয়ে যেতে পারিনি আমি,’ বললেন তিনি।
মধ্য ষাটে শীর্ণ-নাজুক অনীতা বললেন এটা পরিহাসমূলক যে, বাবা যেখানে ঘাতক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, সেখানে মা মানুষের জীবন বীমা করতেন। তাঁর মনে চারুর আদর্শ ভালোভাবেই বেঁচে আছে বলে মনে হলো। কিন্তু নকশালীদের প্রতি কোনো ধরনের সহানুভূতি থাকার কথা অস্বীকার করেছেন তিনি।
চারুর নিন্দুকরা তাঁকে স্বৈরাচারী বলে থাকে। কিন্তু তাঁর সন্তানরা বলছেন তাঁরা মুক্ত পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। ‘আমার মা যেন সবার ভাবি ছিলেন। দলের সবাই তাঁকে ভালোবাসত। সবাই আসত আর বাবার সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করত,’ বললেন অভিজিত্। খানিকটা বিরক্ত মনে হলেও বাবা এমনকি তাঁর স্থানীয় ধর্মীয় উত্সবে যোগদানেও আপত্তি করেননি। ‘আমি ছোট থাকতে, এলাকায় সরস্বতী পূজায় অংশ নিতাম, বাবা সেজন্য কখনই আমাকে ভর্ত্সনা করেননি। কিন্তু পূজার সময় প্রায়ই আমি যাতে যেতে না পারি, সেজন্যে আমাকে আগেভাগে বিছানায় শুইয়ে দিতেন,’ বললেন তিনি।
অনেকের কাছে চারু ছিলেন ত্রাস। আদর্শের নামে তাঁর সমর্থকরা নকশালবাড়িতে ১০০ জনেরও বেশি ভূস্বামীকে হত্যা করেছে। পশ্চিম বাংলায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ পুলিশ ও সরকারি কর্মচারীকে মেরেছে। তাদের শিরোশ্ছেদ করা হয়েছে, পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বা গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা চারুর ওপরই বর্তেছে সব দায়।
‘পুলিশদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা জানতে চেয়েছিলাম তার কাছে। অস্বীকার করেছেন তিনি,’ বলেছেন নব্বইয়ের দশকে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশের মহাপরিচালক হিসেবে অবসরে যাওয়া অমিয় সামন্ত। ‘তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম নিশ্চিহ্নকরণের তত্ত্ব তাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল কিনা। তিনি অস্বীকার গেছেন। তবে সশস্ত্র বিপ্লবের ধারণা তাঁর ছিল বলে স্বীকার করেছেন। কেবল ভূস্বামীদেরই সাজা দেয়ার কথা বলেছেন তিনি,’ বলেছেন সামন্ত। ‘আন্দোলন অশুভ হাতে পড়ে গিয়েছিল। চারু মজুমদারের নাম ভাঙিয়ে আগাগোড়া প্রাধান্য বিস্তার করেছিল তারা।’
অভিজিত্ বলেছেন, তাঁর বাবা পুলিশ আর শিক্ষকদের হত্যার নির্দেশ দিতে পারেন না। ‘দরিদ্র কৃষক আর শ্রমিকদের করুণ জীবনের কথা ভেবেই সশস্ত্র বিপ্লবের স্লোগান দিয়েছিলেন তিনি। খুবই সংবেদনশীল মানুষ ছিলেন। শ্রেণী শত্রুর কথা বলে যারা মানুষকে কষ্ট দেয়, তাদের কথা বুঝিয়েছিলেন তিনি। সাধারণ লোকদের গায়ে হাত দেয়ার কথা কখনই কাউকে বলেননি,’ বলেছেন তিনি।
অনীতা বললেন, তাঁর বাবা খুবই সাহসী মানুষ ছিলেন। দুই দফা হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও ৪৯ বছর বয়সে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে হূদরোগের কারণে অনেক দিন কলকাতার চিত্তরঞ্জন মেডিকেল কলেজে থেকেছেন। তবু বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। ‘জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দেখেও নীরব দর্শক হয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি,’ বললেন তিনি।
১৬ জুলাই, ১৯৭২ কলকাতার এন্টালির আত্মগোপনের জায়গা থেকে চারুকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সময়ের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সামন্ত বলেছেন, ‘কলকাতার প্রধান ডিটেক্টিভ দেবী বিশ্বাসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাকে গ্রেফতার করার। কলকাতাবাসীরা কখনই আমাদের ডিপার্টমেন্টকে তাঁর শহরে থাকার কথা জানায়নি। এটাই তাঁর জনপ্রিয়তা কতখানি সেটা তুলে ধরে। কিন্তু তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী দীপক বিশ্বাস তাঁর কলকাতায় বাস করার কথা আমাদের কাছে প্রকাশ করে দেন।’
দীপক ছিলেন সেই মানুষ, চারু যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতেন। ১৯৬৭ সালে, এমনকি মাও জেদংয়ের সঙ্গে দেখা করতে তাকে চীনে পাঠানো হয়েছিল। ‘দীপক বাবু পুলিশের অত্যাচার সহ্য করতে পারেননি। ফলে তিনি আমাদের নেতার আস্তানার কথা ফাঁস করে দিয়েছেন। সেজন্য সাজাও পেয়েছেন,’ বললেন চারুর আরেক ঘনিষ্ঠ সহকারী আজিজুল হক।
চারুর মৃত্যুর পর দীপক শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন, চারুর বাড়ি থেকে বড়জোর ৫০০ মিটার দূরে হিল কার্ট রোডে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশের দলিল মোতাবেক চারুর সিপিআইয়ের (এমএল) শাখা সংগঠন হকের সেকেন্ড সেন্ট্রাল কমিটির হাতে নিহত হয়েছেন দীপক। ‘অবশ্যই আমাদেরই কেউ হত্যা করেছে তাকে,’ নিজের ভূমিকা স্বীকার বা অস্বীকার না করেই বলেছেন হক।
গ্রেফতারের পর চারুকে কলকাতার লালবাজারে পুলিশ চেকআপে রাখা হয়েছিল। গ্রেফতারের খবর পেয়েই পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ছুটে গেছেন অনীতা। কয়েকজন পুলিশের কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে বলে দেখতে পান। ‘নাজুক ছিলেন তিনি, বড্ড শীর্ণ আর ফ্যাকাশে লাগছিল। বাতাসের জন্য হাঁসফাঁস করছিলেন,’ বললেন অনীতা। ‘ডাক্তারির ছাত্র হিসেবে ওই সময় অন্ততপক্ষে ইনহেলার বা অক্সিজেন পেলে ভালো হতো বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কিছুই পাননি। কথাটা বলতে হচ্ছে বলে আমি দুঃখিত, তবে আমি মনে করি তাঁর জীবন রক্ষাকারী সব ওষুধ প্রত্যাহার করা হয়েছিল বলেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। জাতি কখনই তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি। কিন্তু তাঁকে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করতে দেয়া উচিত ছিল তাদের, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম খুলে নেয়া উচিত হয়নি।’
পুলিশ স্টেশনে আটক অবস্থায় তাঁর অবস্থার কথা জানতে চেয়েছিলেন অনীতা। ‘এই পুলিশগুলোর সঙ্গে আছি, তো যা হওয়ার তাই হবে,’ পরিবারের সঙ্গে এটাই ছিল তার শেষ কথা। ২৮ জুলাই, ১৯৭২ গ্রেফতারের মাত্র ১২ দিন পর পরিবারকে জানানো হয় যে, চারু আর নেই। প্রতিবেশীরা বাগডোরা থেকে কলকাতায় আসতে টিকিট কিনেছিল। মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে চারুর লাশ দেখানোর জন্য একের পর এক ট্রে খোলা হয়েছে। শেষ ট্রেতে রাখা ছিল সেটা। অভিজিত্ বললেন, তাঁর বাবার পায়ের আঙুলগুলো অস্বাভাবিক কালো ছিল, যেন পোড়ানো হয়েছে।
এর পর একটা গাড়িতে করে পরিবারকে ক্রিমেটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়, যদিও কমিউনিস্ট হওয়ায় চারু কখনই চাননি তাঁর দেহ দাহ করা হোক। ক্রিমেটোরিয়ামের চারপাশ সেনাবাহিনীর লোকজন ঘেরাও করে রেখেছিল। শেষকৃত্য সম্পাদন করতে চেয়েছিলেন লীলা, কিন্তু তাঁকে অনুমতি দেয়া হয়নি। ছোট অভিজিেকই চিতায় আগুন ধরাতে বলা হয়েছিল। পরিবারকে এর পর অবিলম্বে কলকাতা ছাড়তে বলা হয়। অবশ্য রাতটা একটা হোটেলে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। ‘ওই হোটেলের ম্যানেজারকে এক রাতের জন্য আমাদের রুম ভাড়া দেয়ায় গ্রেফতার করা হয়,’ বললেন অভিজিত্।
যে জিনিসটা সবচেয়ে যন্ত্রণা দেয় তাকে সেটা হলো— ভূমি সংস্কার ও কৃষক আন্দোলনে বাবার ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ‘ভারতের বহু ভালো ভালো ঘটনা কেবল তাঁর কারণে ঘটলেও ইতিহাস রচয়িতারা তাঁর ভূমিকাকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন,’ বললেন অভিজিত্। ‘চারু মজুমদারের মতো মানুষ না থাকলে ভারত পরিণত হতো ভূস্বামীদের দেশে। লাখ লাখ কৃষক প্রাণ হারাতেন এবং সে কারণে ভারত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।’
চারু অভিজিতের নায়ক রয়ে গেছেন। ‘লোকে আমাকে নকশালী বললে সত্যিই গর্ববোধ করি,’ বললেন তিনি। ‘আদর্শ যদি এতই অচল আর ঘৃণিত হতো, ৫০ বছর ধরে টিকে থাকত না। স্বীকার করি আজকের নকশালরা ষাট বা সত্তরের দশকের মতোই একই রকম নেই। কিন্তু চারু মজুমদারের আদর্শ এখনো প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এবং রাষ্ট্র সর্বাত্মক উপায়ে একে ধ্বংস করে দিতে চায়।’
রূপান্তর: শওকত হোসেন






