‘এই সেই রুক্ষ দেবদূত, যার সঙ্গে মিশে ছিল
তুলির টান আমার রেখার টানে।
চলো, তোমায় নিয়ে যাই সেই দৃষ্টিপথে,
আকাশে, যেখানে তারাদের মাঝে স্পন্দিত ভ্যান গখ।’
—আর্সেনেই তারকোভস্কি
সেই আমলে মহিমাবঞ্চিত আর দশজন চিত্রী যেভাবে দেখতেন আঁকতেন, তার চেয়ে একটু ঘুরিয়ে অনুভবের রঙ দিয়ে চিত্রজমিন কর্ষণ করতেন এক মহামহিম চিত্রী। তেমনি ছিল তাঁর হাওয়ায় ভাসা কালের চিত্র। সমঝদারের স্মৃতির করপুটে দু-একটা নমুনা কিনা গেঁথেও যেত মাঝে-সাজে।
ভাগ্যিস রঙ নবিশীর ফর্দতালিকা নিয়ে তখনো কোনো পণ্ডিতমশাই নাজেল হননি। বর্ণছক কিংবা চিত্রের বিষয় কেরদানি শিষ্যকে গিলিয়ে দেয়ার মজমা-মজলিশ ছিল না তাঁর ব্যক্তিগত জমানায়।
চিত্রশাস্ত্র ফাতা ফাতা করতে কঠোর মোল্লাকির সঙ্গে ক্ষুদ্র-মাঝারি আর ঊনমাঝারি শিল্পীর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে; বড় শক্তির দখল নিয়ে যিনি আসেন, তিনি তো তছনছ করে দেন সবকিছু।
শাস্ত্রের খোরা-সানকি ফাটিয়ে একবারে আনকোরা ধাতুর তৈজসে শিল্পের নতুন স্বাদ ও খোরাকি সাজিয়ে দেন, আর দেন নতুন স্বাদের শিল্পদর্শন, নয়া সাকিন থেকে হাজির করা সেই দর্শনের স্বাদই আলাদা। আগের থেকে আলাদা এক চিত্রভাষার বুনুনি আরেকটা শাস্ত্রের দ্বার খুলে দেয়। চিত্রশাস্ত্রের গণিত বলে যে ব্যাপারখানা স্বীকার করি, তাতে যদি ভাবের বুলি না-ই শেখাতে পারো, তাহলে শিল্পসৃষ্টির ফুটানি দিয়ে নিজেকে বাঁচাবার তাকদ আসবে কোত্থেকে? আর এই নয়া কিসিমের তাকদের নাম হয় ভিনসেন্ট ভ্যান গখ।
সৃষ্টির ভজন-তর্পণে কত ভাব বিগ্রহের আনাগোনা তার কোনো ইয়ত্তা নেই। পথ চলতি কুড়িয়ে পাওয়া সেসব অমূল্য পার্থিব প্রাপ্তির নিগড়ে তিনি বাঁধা পড়েননি। জীবনকে আঁকতে গিয়ে শিল্পের ধারাপাতে তিনি নয়া-নামতার পাঠোদ্ধার করেছেন, তার তর্জমা করেছেন এক ভিন্ন মেজাজের গখীয় ভাবধারায়। যেখানে তিনি চিনিয়ে দিতে চান একেকজন মানুষকে, তার চারপাশকে, দৃষ্টি প্রসারিত করে বীক্ষণ বিস্তৃত করে পরম মমতায়। তেমনি নিখাদ মমতায় এঁকেছেন তন্তুবায়দেরকে।
১৮৭৯ সালের দিকেই ভ্যান গখ যখন উত্তর ফ্রান্সের ইড়ত্রহধমব থেকে চধং ফব পধষরং জুড়ে চষে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তন্তুবায়দের নিয়ে ছবি আঁকার আগ্রহ বোধ করেছিলেন। ছোট ভাই থিওকে লেখা তাঁর এক চিঠিতে তিনি এই আগ্রহের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন। কিন্তু এই সম্ভাবনা বা ইচ্ছে বাস্তবে প্রতিফলিত বা আলোর মুখ দেখেছিল তারও কয়েক বছর পর, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত তা ছিল অপ্রকাশিত।
নেদারল্যান্ডসের নুয়েনেন বাস তাঁর শিল্পী জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করেছেন। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে উত্পাদনশীল সময়সীমা বা অন্যতম ছিল সেটি। নুয়েনেনের দৈনন্দিন শ্রমের সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবীদের নিয়ে অঙ্কিত হয় তাঁর তখনকার শিল্পকর্ম। তাঁর অসাধারণ ফলাফল হিসেবে যেমন বিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘আলুভোজি’ সে সময় সৃষ্ট তেমনি অপরাপর শিল্পকর্মের মধ্যে নুয়েনেন এ সৃষ্ট হয় ১৯৫টি বহুবর্ণ চিত্র, ৩১৩টি রেখাচিত্র, ২৫টি জলরঙ, ১৯টি পত্র নকশা।
যা ভ্যান গখের আঁকা মোট ১ হাজার ১১টি রেখাচিত্র, ১৫০টি জলরঙ ১৩৩টি স্কেচ ১০টি লিথোগ্রাফ এবং কিশোর বয়সে আঁকা ২৯টি চিত্রকর্ম। ভ্যান গখ তাঁর সারা জীবনের সৃষ্ট চিত্র সংখ্যার এক-চতুর্থাংশ এই নুয়েনেনেই সমাধা করেছিলেন।
ভিনসেন্ট ১৮৮৪ সালে তাঁর ‘তাঁত’ শিল্পকর্মটি সমাপ্ত করেন। একটি বড় তাঁতের গঠনকে তাঁর চিত্রের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখাতে গিয়ে সমান্তরালভাবে ভ্যানগখ সম্পূর্ণরূপে তাঁর অনুধ্যায়কে ধারণার বশবর্তী করে আত্মীকৃত করেছিলেন। নেদারল্যান্ডসের ড্রেনথে বসবাস করার সময় গখ তাঁর সীমিত শিল্পসরঞ্জাম সংস্থানের মাধ্যমে কাজ শুরু করেছিলেন। নতুন বছরের শুরুতে তিনি নুয়েনেনে তাঁর বাবার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। বাবা সেখানে যাজক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নুয়েনেনের দরিদ্র কর্মজীবীদের মধ্য থেকে স্বল্প পারিশ্রমিকে চিত্রানুশিলনের জন্য মডেল পেয়েছিলেন। বিশেষ করে তন্তুবায়দের ধীরলয়ে দীর্ঘ পরিশ্রমের ভঙ্গিটি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
ভ্যান গখ যখন নুয়েনেনে বাস করেছিলেন, তখনকার সময়ে আঁকা বিভিন্ন ভঙ্গিতে বয়নশিল্পী এবং তাদের তাঁতসময় নিয়ে রেখাচিত্র ও তেলচিত্র মাধ্যমে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি এই কারিগর এবং তাদের প্রায় ‘ধ্যানমগ্ন’ অবস্থায় বয়নকর্ম দ্বারা মুগ্ধাবিষ্ট ছিলেন। অনুশীলন হিসেবে চরকায় মহিলার সুতা কাটার দৃশ্য এই বয়নশিল্পী বিষয়কে অবলম্বন করে আঁকা চিত্রকর্মের একটি।
বয়নশিল্পীর অঙ্কন এবং চরকায় সুতাকাটারত পেইন্টিং উভয়ের মধ্যেই আলোর প্রক্ষেপণের বিশেষ ছাপ স্পষ্ট, সাদা এবং হালকা ধূসর রঙের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বস্তুর ওপর ও বাইরে পতিত আলোর প্রভাবের চিত্রাপিত নির্মিতি পরিলক্ষিত হয়।
১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ভ্যান গখ ১৬টি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন কালি কলম ও জলরঙ মাধ্যমে। যেখানে পরিলক্ষিত হয় একজন বয়নশিল্পী অত্যন্ত নিবিষ্ট হয়ে তাঁতে বয়নে ব্যাপৃত, এবং নিকট দূরত্বে একটি উঁচু চেয়ারে একটি শিশু উপবিষ্ট। মনে করা যেতে পারে যে, এই গার্হস্থ্য দৃশ্যটি জর্জ এলিয়টের সিলাস ম্যানার উপন্যাস দ্বারা অনুপ্রাণিত, যেখানে কোনো দুর্ভাগা বয়নশিল্পী একটাই সুখ খুঁজে পায় যখন তার জীবনে শিশুর আগমন হয়!
ভ্যান গখের দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমজীবী মানুষের প্রতি যে বিশেষ গখানুভূতি ক্রিয়াশীল ছিল, তা তাঁর প্রথম দিককার কাজ থেকেই স্পষ্ট। ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৪ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসে তাঁর পরিবারের বাসস্থান নিকটবর্তী বসবাস করা বয়নশিল্পীদের অন্তত দশটি তেলচিত্র, পাশাপাশি বেশকিছু রেখাচিত্র এবং জলরঙের কাজ করেছিলেন। বয়নশিল্পী বিষয়ের সঙ্গে তাদের তাঁতঘরে তাঁতের ওপর রঙিন টানা সুতার জমিনের বিপরীতে, প্রায়ান্ধকার বিষাদময়তায় গাঢ় রঙের কাঠ এবং ধূসর দেয়ালের অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রভাব দ্বারা বিশেষভাবে উত্সাহিত হয়েছিলেন।
ভিনসেন্ট ভ্যান গখ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পীদের একজন, তা মানতে কেউ তর্ক করবে বলে মনে হয় না। নক্ষত্রখচিত রাত থেকে জড়জীবন সূর্যমুখীকে তাঁর আঁকা সবচেয়ে সেরা শিল্পকর্ম বলে মনে করা হয়।
স্বল্প সংখ্যক শিল্পপ্রেমীদের মধ্যেই ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৪ সালের ৬ মাস সময়ের মধ্যে আঁকা তাঁর বয়নশিল্পীদের নিয়ে শিল্পকর্মগুলো অনালোচিত বা স্বল্প পরিচিতই থেকে গেছে! ভ্যান গখ বয়নশিল্পীদের কর্মক্ষেত্রে তাঁর শৈল্পিকপ্রয়াসে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন, এবং ভ্যান গখ ১৮৮৩ সালে তাদের সংকল্প ও দক্ষতার জন্য বয়নশিল্পীদের সম্পর্কে তারিফ করতে গিয়ে বলেন, ‘একজন বয়নশিল্পী সরাসরি বহু সংখ্যক সুতোর সমন্বয় ও বিজড়িত করার সময় তার ফুরসত নেই এই বিষয়টিকে দার্শনিকতায় মোড়ানোর। বরঞ্চ তিনি ততোধিক আত্মীকৃত তাঁর কাজে যে, তা ভাবনায়
না থাকলেও তা প্রকাশ পায়, এবং তাঁর অনুভবের চাইতেও ব্যাখ্যাতীত অংশগ্রহণ ও অগ্রসরতা প্রকাশ পায়। অবশ্যই যদি তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে যথাযথ প্রশংসিত হন, তাহলে তিনি বয়ন নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগী হবেন, এ কথা বলাই বাহুল্য।’
তাঁর ভাই থিওকে লেখা এক চিঠিতে ভ্যান গখ এ-সংক্রান্ত কাজ সম্পর্কে বলেন,’ এই তাঁত ও তাঁত কাজ-বিষয়ক শিল্পকর্মগুলো করতে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এখনো, কিন্তু বাস্তবতা এই যে, এসবই অত্যন্ত চমকপ্রদ বিষয় সন্দেহাতীতভাবে, এসব বয়সী শিল্পসরঞ্জামের বিপরীতে ধূসর দেয়াল, আমি বিশ্বাস করি এটা খুবই চমত্কার যে, তারা যখন তখনই তা করতে ও সক্ষম।’ অতঃপর তিনি প্রদীপের আলোতে বয়নশিল্পীর কাজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘রেমব্রান্ট প্রভাব’ জীবদ্দশায় ভ্যান গখের আঁকা দুই হাজার শিল্পকর্মের মধ্যে বয়নশিল্পীদের নিয়ে করা ১৬টি শিল্পকর্ম যদিও স্বল্পতম অংশ, তথাপি সেসব শিল্পকর্ম আমাদেরকে এই তন্তুবায় কর্মজীবী মানুষ সম্পর্কে জানতে অনুপ্রাণিত করে এবং তাদের সম্পর্কে আরেকটু বেশি জানতে গখায়তা করে, যা একসময় তাঁকেও করেছিল হয়তোবা।’
ভ্যান গখ নুয়েনেনের তন্তুবায়দের সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহান্বিত হয়েছিলেন। নেদারল্যান্ডসের ব্রাবান্ট প্রদেশের এক শহর এলাকা নুয়েনেন। এই এলাকায় বয়ন তত্কালে গুরুত্বপূর্ণ পেশা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। ভিনসেন্ট ব্রাবান্টের এই হস্তশিল্পীদের জীবনযাত্রা চিত্রিত করতে চেয়েছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি অনেক শিল্পকর্ম নির্মাণ করেছিলেন। তাদের নিয়ে করা শিল্পকর্ম সব তাঁর ভাই থিওকে পাঠিয়েছিলেন বিক্রয়ের জন্য। তিনি থিওকে এও বলেছিলেন যে, যদি বিক্রি না হয়, তাহলে রেখা ও বর্ণচিত্রগুলো যেন তার সংগ্রহে রেখে দেয়। তিনি লিখেছিলেন, ‘‘তুমি যদি এইসব ‘তন্তুবায়দের’ ফেরত দাও, তাহলে তা আমাকে খুবই নিরাশ করবে!’’
এ থেকে বোঝা যায় যে, ভ্যান গখ শুধুই চিত্রকর্ম করার জন্য তাদেরকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং তাদের শিল্প আয়াস, অনাড়ম্বর জীবনযাপনযজ্ঞ তাকে নাড়া দিয়েছিল ব্যাপকভাবে। ফলে সামাজিক অঙ্গীকারবদ্ধ এই শিল্পী ব্রাবান্ট তন্তুবায়দেরকে শ্রম দানবীয়তায় অবরুদ্ধ মর্মান্তিক দুর্দশাগ্রস্ত হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
ন্যত্র থিওকে তিনি লিখছেন, ‘‘এখন আমি যে চিত্রটি আঁকছি, তা অন্যগুলোর চাইতে আকারে বড়।
যেখানে একজন তন্তুবায় তাঁতে কর্মব্যস্ত। সামনে থেকে দেখা। তুলনামূলক ছোট দেহাবয়ব তার যা সাদা দেয়ালের বিপরীতে যেন অন্ধকারময় সেললুয়েড। একই সঙ্গে অন্য একটি ক্যানভাসে সময় দিচ্ছি, যা গত শীতে আঁকতে শুরু করেছিলাম, যেখানে একটি তাঁতে লাল কাপড় বোনা হচ্ছে।
এখানে তাঁতিকে একটি কৌণিক অবস্থান থেকে চিত্রিত করা হয়েছে।
কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি অন্যান্য ছবির সঙ্গে রঙ ও করণ কৌশলের একটা সাযুজ্য বিধান করতে।
আশা করছি, শিগগিরই অন্য আরো দুটি ‘তন্তুবায়’ চিত্র শুরু করতে পারব। ভাবছি সেখানে দুটো অবয়বই আসবে পুরোপুরি ভিন্ন আঙ্গিকে। যেখানে তন্তুবায় তাঁতের পেছনে উপবিষ্ট না থেকে বরং তাঁতে সুতা টানা দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকবে।’’
ভ্যান গখের ছয় মাসের নুয়েনেন বসবাসের সময়কালে যেসব তন্তুবায় শীর্ষক চিত্রাঙ্কন করেছেন, তাতে তন্তুবায়দেরকে কৃষকদের মতোই একটি আর্যজীবনের বাসিন্দা হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।
জীবনের নিরবচ্ছিন্ন চক্রের প্রতীকস্বরূপ বিবেচনা করতে গিয়ে ভ্যান গখ এখানে তন্তুবায়দের উপস্থাপনে এক স্বতন্ত্রবিশেষ ‘ধ্যানমগ্ন কর্ম উপস্থিতির ভঙ্গি’ সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন।
ভ্যান গখের তন্তুবায় সিরিজের চিত্রমালায় বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনে যে বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হলো, প্রাথমিকভাবে চিত্র গঠনে তাঁত ও তন্তুবায়, আইকনিক কল্পচিত্র। যেখানে জনৈকের খোঁজাখুঁজির মধ্যে দূরত্বের অনুভূতি ছড়িয়ে থাকে দৃশ্যের আদ্যোপান্তে। তন্তুবায়ের আবেগ, চরিত্র লক্ষণ, ও দক্ষতাকে ঠাহর করা কঠিন হলেও ভ্যান গখ তাঁর চিত্রাঙ্কনের সূত্রে বিভিন্ন মাধ্যম, করণকৌশল ছাড়াও আলোর মাত্রা ও তার ব্যবহার এবং প্রভাব কাজে লাগিয়েছেন মুন্সিয়ানার সঙ্গে। যেখানে খোলা জানালার পথ দিয়ে ঠিকরেপড়া আলোর হালকা ধূসর প্রতিফলন বস্তুসকলকে নানা রকম নিরীক্ষার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।
গ্রামীণ বয়ন উত্পাদন তখনো কোনো সমৃদ্ধ বাণিজ্য ছিল না। এর আয়-উপাদান তথা বাজারজাত ব্যবস্থার জন্য সংবতসরের ফসল উত্পাদনের ওপর নির্ভশীল ছিল, যা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তনশীল ছিল। তখনকার তন্তুবায়দের জীবন ছিল দারিদ্র্যের। বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের লিডেনের শহুরে বস্ত্র উত্পাদন কেন্দ্রের তুলনায়। ফলে বস্ত্র কারখানার তথা শিল্পায়নে তখনকার এসব গ্রামীণ শিল্পীদের জীবন-জীবিকা ক্রমশ নিরাপত্তাহীন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।
ভ্যান গখ তাঁর ভাই থিওকে লিখেছিলেন, ‘এখানে তাদের জীবন খুবই সংগ্রামমুখর ও কঠিন।’
একজন বুনকর কঠোর পরিশ্রম করে সপ্তাহে মাত্র ৬০ গজের এক টুকরো কাপড় বনতে পারে!
যখন একজন তন্তুবায় কাজ করে বা বোনে, তখন তার স্ত্রী তার নিকটবর্তী বসে নাটাই, চরকা ঘুরিয়ে সুতা কাটে, যে কিনা কিছুক্ষণ আগে নিজেই মাকু ছুড়েছে অর্থাত্ মূলত দুজনের অংশগ্রহণেই চলছে তাদের এই তাঁত চালিয়ে রোজগারের কাজ।
ভ্যান গখের ‘তন্তুবায়’দের নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কার্ল নর্ডেনফোক নামের একজন শিল্প ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, ‘‘ভ্যান গখ তন্তুবায়দেরকে মধ্যযুগীয় উত্পাদন উপকরণের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে কার্যত বন্দি হয়ে পুরুষানুক্রমে বাকহীন চোয়ালসর্বস্ব জনগোষ্ঠী হিসেবে বসবাস করে আসছে। সামাজিক তাত্পর্য হিসেবে যা নিতান্তই ভ্রমাতীত। তথাপি তার একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে; এসব চিত্রাবলিতে একটি আবেগাকুল গখমর্মিতা, অন্তরঙ্গ পরিবেশের লক্ষণ স্পষ্ট। ১৯৬৯ সালে এক ফরাসি লেখকের লেখায় মন্তব্য হিসেবে উল্লিখিত হয় যে,’ এই চিত্রায়ণ আপাত বেখাপ্পা এবং অনমনীয় মনে হলেও তন্তুবায়দের তাঁতঘরে রহস্যময় অত্যাশ্চর্য উপস্থিতি তাদের অদম্য শক্তিমত্তারই পরিচায়ক।’’
বাম পাশ থেকে দেখা তন্তুবায়ের সঙ্গে সুতাকাটার চরকা শিল্পকর্মের মাধ্যমে ভ্যান গখ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন কর্মজীবী দরিদ্রদের উদ্দেশে। এ চিত্রটি আঁকা হয়েছে নিরানন্দ ভাব প্রকাশে, বিষাদময় অন্ধকারাচ্ছন্ন রঙের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করেছে তাঁতে বয়নকৃত লাল বস্ত্র।
ভ্যান গখ সবচেয়ে বেশি প্রেরণা পেয়েছিলেন শিল্পী মিলে’র কাছ থেকে। প্রথম জীবনে ভিনসেন্ট শিল্পী হতে চাননি, চেয়েছিলেন যাজক হতে। বাবার মতো। মানুষের যাতনা কমাতে এটাই তাঁর কাছে উত্তম পথ বলে বিবেচিত হয়েছিল হয়তো। কিন্তু তা না হতে পেরে, খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা বলতে তুলি চালনা করেছেন আজীবন। মিলেকে তিনি নিজ ভাষায় অনুবাদ করেছেন। বলা যায় যে, গখ মানবপ্রশান্তির জন্য ভেবেছেন, তাদের দুঃখ লাঘবের জন্য স্বপ্ন দেখেছেন। তার চিত্রকর্মেই অশান্ত মানবাত্মার ভিড় পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু তাঁর প্রেরণার উত্স মিলে আবার শ্রমজীবী মানুষের যাপনকে তুলে ধরেছেন শান্ত অনাবিল প্রকৃতিঘেঁষা চিত্র হিসেবে। ভ্যান গখ যেভাবে তার তুলিতে মানবকষ্টকে নিদারুণভাবে দেখিয়েছেন, তা কিন্তু মিলে’র কাজে নেই। ভিনসেন্ট উপরতলার মানুষের ছবি আঁকেননি। প্রাত্যহিক জীবনে সাধারণ্যের ভিড়ে অন্য কিছু খোঁজার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। তাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য তাঁর চিত্রকলার বিষয়ের দিকে তাকাতে হয়, যা তার মনোভঙ্গি, উপলব্ধি ও দর্শনকে উচ্চকিত করে।
উদাহরণস্বরূপ ভ্যান গখের তন্তুবায় চিত্রাবলি নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। এই বিশেষ কারুশিল্পী সম্প্রদায়কে নিজে কাছ থেকে দেখেছেন, বুঝেছেন, উপলব্ধি করেছেন। তাদের প্রাণের স্পন্দন আর শ্রমমুখী শিল্পীর প্রাণময়তা উঠে আসে একেবারেই স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে। যেখানে তাদের অনাড়ম্বর জীবনে বিস্তর অপ্রাপ্তি আছে; কিন্তু আছে ধ্যানমগ্ন ঋষির অবয়বে ধৈর্য ও সৃষ্টির প্রত্যয়। জঁ ফ্রঁসোয়া মিলের মতো কালিমাখা কুলি-মজুরের চাষার মুখ ক্যানভাসে বিধৃত করেছেন, ধরেছেন এক মরমিয়া তানে।
আবার তাতে রুঢ় গার্হস্থ্য জীবনের ওপর এক ধরনের আধিপত্য আছে। যে জীবনে তাদের সৃষ্ট কলতান শ্রমের শক্তির কথাই বলে।
ভ্যান গখ সূর্যমুখীর মতো তন্তুবায় নিয়েও অনেক ছবি এঁকেছেন। কিন্তু এই দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, তন্তুবায় তাঁর প্রথম দিককার কাজ, যেসব এর তাঁর মাস্টারপিস শিল্পতালিকায় স্থান নেই। কিন্তু অন্যদিকে রয়েছে ‘ব্লকবাস্টার এবং ম্যাগনেট’ চিত্রসম্ভার তালিকাভুক্ত সূর্যমুখী।
সমালোচকদের তত্ত্বালোচনা মোতাবেক প্রশ্ন ও উত্থাপিত হয়েছে এই নিয়ে, ‘কি অভিপ্রায় ছিল ভিনসেন্ট ভ্যান গখের? এই মধ্যযুগীয় যন্ত্রাত্যাচারের প্রতীক চিহ্ন নাকি আধুনিকতার কালে অতীত কুঠুরির নিরাশা বা তমসাচ্ছন্ন রূপে দেখা যন্ত্রযুগকে চিত্রায়িত করার!’
১৮৮৪ সালে ভ্যান গখের যখন সবেমাত্র ৩১ বছর বয়স, তখন তিনি নুয়েনেনের পারিবারিক বাসস্থানে বাস করেছিলেন। সেই শহরের প্রান্তে কারুশিল্পীদের পাড়ায় গিয়ে নিয়ম করে প্রতিদিন অনুশীলন করতেন চিত্র রচনার। সেই ব্রাবান্ট এলাকায় ছিল হস্তচালিত তাঁত শিল্পী কারিগরদের বাস। কারিগরদের দৈনন্দিন ব্যতিক্রমী কর্মচাঞ্চল্য প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে তা তাঁর গভীর মনোনিবেশে অধ্যয়ন হিসেবে দেখা দিয়েছিল। আর এই অধ্যয়ন করতে গিয়ে হস্তশিল্পীদের অমানুষিক কায়িক শ্রমের দিকটি অত্যন্ত মর্মবেদনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন। একই সঙ্গে তাদের কাজের প্রতি শিল্পনৈপুণ্যতার প্রতি তীব্র একাগ্রতা ও তাঁর নজর এড়ায়নি। সুশৃঙ্খল একাগ্র ধ্যানমগ্ন হয়ে দীর্ঘ সমর ধরে তাদের কারু কৌশল প্রয়োগ করছে যেমনটি, সাধারণত একজন চিত্রশিল্পীও তার শিল্প রচনার সময় দৃশ্যবস্তু গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন তার মতোই।
ভ্যান গখের চিঠিপত্র পাঠ চমত্কার উপায় হতে পারে তাঁর কাজের দৃশ্যগত রূপালোকের আবরণ উন্মোচনের জন্য। চাক্ষুষ রূপককে বারবার ব্যবহার করলেও তাদের উপস্থাপনে সযত্ন নন্দন ভাবনার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিটি তন্তুবায়-বিষয়ক চিত্রকর্মে। ফলে তন্তুবায় শীর্ষক চিত্রমালা একই সূত্রে গ্রথিত হয়েও বিষয় ব্যঞ্জনায় চিত্রার্পিত কথনাভাসে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। তন্তুবায় শিল্পকর্মের মতোই আলুভোজ চিত্রটি নিয়েও তাঁর কথোপকথন উঠে এসেছিল চিঠিপত্রে। ‘তন্তুবায় যখন কাপড় বোনে আমার মনে হয় তারা তাকে বিশেষ বস্ত্র বলেই চিহ্নিত করে, অথবা বিশেষ আগ্রহীদের কাছে এই চমত্কার নকশাদার কাপড় প্রস্তুতে তাদের অভিজ্ঞতা ও অভিনিবেশে একের পর এক নতুন বর্ণে ও নকশায় প্রস্তুত হতে থাকে সামান্য আয়োজনের এই হস্তশিল্পের মাধ্যমে।’ তিনি আরো যোগ করেন। ‘শীতকালজুড়ে অনুসন্ধান করে নকশা নির্দিষ্ট করার চেষ্টা করেছি, আর তার ফলশ্রুতিতে একটি কর্কশ, রুক্ষ এমন ভাব চেহারায় ফুটে উঠবে, সেই চিন্তাটাই মাথায় ছিল। ফলে (আলুভোজ) নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তা কৃষকদের মানসম্পন্ন ইমেজ পরিগ্রহে ভূমিকা রাখবে। আমার মনে হয় তাই হয়েও ছিল।
শ্রমিক ও কৃষকদের বিষয়বস্তু করে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে ভ্যান গখের নানাবিধ আগ্রহকে চিহ্নিত করা যায়। এই পরিসীমার মধ্যে ফরাসি বাস্তবতা, উত্তর ইউরোপীয় শৈল্পিক প্রেক্ষাপট ও আত্মজৈবনিক কারণ পরিগ্রহ হয়। কিন্তু এসবের মধ্যে হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো, ওলন্দাজ সংস্কারবাদী ঐতিহ্যের প্রতিপালন; যা অধ্যাত্মিকতার প্রতি বিশ্বাস এবং ভক্তিপূর্ণ বাস্তব জগতে পাওয়া যেতে পারে। যা মূল্যবান স্থিতিশীল পারিবারিক সামাজিক তথা পারিপার্শ্বিক মূল্যবোধ ধারণের কারণ।
অত্যন্ত দরদি মনে শ্রমজীবীদের জীবনচিত্রক জাঁ ফ্রাঁসোয়া মিলেট, জুলে ব্রেটনের মতো ভ্যান গখ ও আত্মন্তিক আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে খনি শ্রমিক, কাঠুরিয়া, খননকারী, তন্তুবায় প্রভৃতি পেশার সংগ্রামী শ্রমিক ও কৃষক জীবনের ছবি আঁকতে চেয়েছেন। ভিনসেন্ট খনি শ্রমিকদের মধ্যে ‘মানবিক বোধের গভীরতা’ এবং তন্তুবায়দের মধ্যে ‘স্বপ্ন খানিক দূরবর্তী’ এ রকম আশ্চর্য রকম সংযোগ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর নুয়েনেন বসবাসের জীবন তাঁকে সুযোগ করে দেয়, যা পূর্বে বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ ছিল না। নুয়েনেনের বিচিত্র গ্রামীণ আবহে তিনি মহানন্দে তন্তুবায়দের কর্মজীবন নিয়ে চিত্রাঙ্কনের নিমিত্তে অধ্যয়ন শুরু করতে পেরেছিলেন। সেই থেকে ছয় মাস সময়ে তন্তুবায়দের নিয়ে যে চিত্রগুলো রচনা করেছিলেন, সেসবই তাঁর নুয়েনেনের সময় ও সেখানকার তন্তুবায়দেরকে শিল্পকর্মে অমর করে রেখেছে।






