‘আত্মহত্যার অধিকার’ কোনো গল্পই নয়; অন্তত যাকে ‘গল্প’ বলে মানি বা জানি। আবার আত্মহত্যার অধিকার অসাধারণ গল্প, ১৯৩০-৩২ সাল পর্যন্ত বাংলা ছোটগল্পের গতিপথকে মনে রাখলে অথবা না রাখলেও। একটি ছোটগল্প পড়ার সময় পাঠককে অতশত মনে রাখার দিব্যি কে দিয়েছে। সমালোচককেও বা কেন মনে রাখতে হবে। আবার একটি ‘গল্প’ অথবা ‘অগল্প’ পড়ার সময়ে এসব ‘গতিপথ’ কিংবা ইত্যাদি প্রাতিষ্ঠানিক সমালোচনার একাডেমিক ভাষাও মনে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

কিন্তু সে কথা যদি উড়ে আসে। পাঠকের প্রস্তুতি বলে একটা কথা তো তোলা যায়, নইলে সাহিত্যের ইতিহাসেরই প্রয়োজন পড়ে না। এমনকি কোনো সৃষ্টিশীলতারই নয়। যদিও বিজ্ঞান তার চর্চায় স্বাভাবিক গতিপথকে মনে না রেখে এগোতে পারে না বুঝি, সাহিত্য তবে কী করে এগোয়। আর বাংলা ভাষায় সে মানুষটির প্রবল রাবীন্দ্রিক জমানায়ও লেখক হিসেবে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার নিজস্ব প্রণোদনা ‘জাত-বৈজ্ঞানিকের কেন-ধর্মী জীবনজিজ্ঞাসা’, সেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাক্রমী রাগী চোখ জোড়ার অতলে মানুষের জন্য অন্তর্লীন ভালোবাসা তাহলে বোধ হয় ঠিকঠাক খুঁজে দেখা যায় না।

হয়তো ওই ‘কেন-ধর্মী জীবনজিজ্ঞাসা’র জোরে এমন একটি অগল্প বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি। কিন্তু বারবার অগল্প কেন বলছি, সে কথা যদি পাশ থেকে গজিয়ে ওঠে, তাহলে তার কোনো মাত্র ব্যাখ্যা না দেয়াটাও কোনো কাজের কথা নয়। কেননা আগেই বলা হয়েছে, আত্মহত্যার অধিকার প্রায় কাহিনীহীন, অন্তত গল্পে একটা কাহিনী বলতে যা বুঝে থাকি। যদি এও বুঝে থাকি যে উপন্যাসে কোনো কাহিনীই শেষ হয় না, আর গল্পে শেষ বাক্যটি এক সমাপ্তি ঘটায়। ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ বলে গল্পে কিছু নেই, ওটি রবীন্দ্রনাথের একটি আত্মঅনুভূতিপূর্ণ কবিতা, এক একটিই ছোটগল্প লিখে মনে হবে শেষ হয়নি, নইলে ‘ওই বর্ষাযাপন (সোনারতরী) পর্বে কি তারও পরে কেন রবীন্দ্রনাথেরই একটি গল্প পাওয়া যাবে না, যা শেষহীন নয়। সাহিত্যের অধ্যাপকরা পারেনও, ছুঁতো একটা খুঁজে পেলে যাচাইয়ের কোনো প্রয়োজনও বোধ করেন না। একেবারে চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ি!

তবে তখন পর্যন্ত সমালোচক মশাইরা ‘উন্নত আর্ট’ বলে রবীন্দ্রনাথকে যতভাবেই রসিকতা করুন, সেখানে অসাধারণ প্রচুর কাহিনীর সমাবেশ তারা পেয়েছেন, যা অবিস্মরণীয়, বাঙালি-জীবনের এমন নিপুণ ও নির্মম চিত্র তখন পর্যন্ত আঁকা-লেখা খুব হয়নি। সেখানে কল্লোলীয় অথবা কালিকলমীয় যুবাদের প্রচেষ্টাও অনেকাংশে রাবীন্দ্রিক, এমনকি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম গল্প ‘অতসী মামি’ও তাই। কিন্তু সেই গল্প থেকে এ আত্মহত্যার অধিকারের দূরত্ব তো খুব বেশি নয়, মাঝখানে বড়জোর পাঁচ-ছটি গল্প লিখেছেন তিনি, এই গল্প অন্তর্ভুক্তও ‘অতসী মামি ও অন্যান্য গল্প’ গ্রন্থে, তবু এই গল্পটি তখন পর্যন্ত বাংলা গল্পের সব ধরনের আড় ঠেক গোঁজ কি খুঁটিকে একেবারে মান্য না করে দাঁড়িয়ে গেছে। গল্পহীন গল্পের এই চূড়ান্ত রূপ যেন (একই সময়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু গল্পও স্মরণীয়)।

কার গল্প আত্মহত্যার অধিকার? এ কার আত্মহত্যার অধিকার? অবশ বাম পায়ের নীলমণির, নাকি সরকারদের বড় ছেলের দুরারোগ্য হাঁপানি রোগী পিসেমশাইয়ের। সেখানে পৌঁছে কোনোভাবে তো গল্প শেষ হয় না। গল্প শেষ করার প্রয়োজনও বোধ করেননি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ শেষ পর্যন্ত তো কোনো দিন পৌঁছানোর প্রয়োজন হবে না, সে সুযোগ নেই। এই যে শেষহীন এ আবার ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ নয়, এই শেষহীন শেষ শুরুতে ফেরার।

যখন বর্ষাকালেই নীলমণি ও নিভার পরিবারের সীমাহীন দুর্ভোগ। ‘কিছু নারিকেল আর লতাপাতা মান-সম্ভ্রম বজায় রাখিয়াই কুড়াইয়া সংগ্রহ করা গিয়াছিল। চালের ওপর সেগুলি বিছাইয়া কোনো লাভ নয় নাই। বৃষ্টি নামিলেই ঘরের মধ্যে সর্বত্র জল পড়ে।’

এই হলো নীলমণির ঘর। সেখানে আছে স্ত্রী নিভা, মেয়ে শ্যামা, বড় ছেলে নিমু, আর ছোট ছেলেটি এখনো দুগ্ধপোষ্য। এই প্রবল বর্ষণে অনেকক্ষণ নিজেদের ঘরে কাটিয়ে দিল তারা। এর ভেতরে নিভা একবার বলেছিল, পাশেই প্রতিবেশী সরকারদের বাড়ি যেতে। নীলমণি রাজি হয়নি। তার আত্মমর্যাদা বোধ বাধা দিয়েছে।

একটু খ্যাপাটে প্রকৃতির মানুষ। হয়তো তার কারণ তার জীবনের সীমাহীন ব্যর্থতা। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও গড়ে তুলতে পারেনি। এমন খ্যাপাটে ও শারীরিকভাবে খানিক অক্ষম মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণত যা ঘটে, নীলমণির ক্ষেত্রেও তাই। সে তার সকল প্রকার রাগঝাল স্ত্রী ও কন্যার উপরে ঝাড়ে। একটু আগে নিভা একবার সরকারদের ওখানে যাওয়ার কথা বলেছিল, তা নিয়ে খেপেছে। ‘হাতের কাছে ঘটিটা তুলিয়া লইয়া নীলমণি বলিল চুপ। একদম চুপ। আর একটি কথা কইলে খুন করে ফেলব।’ আবার দরজার কাছে পরিচিত কুকুর ভুলুর উপস্থিতি নীলমণির সহ্য হয় না। শ্যামা মানা করে ভুলুকে মারতে। বাপের হাতের লাঠি আঁকড়ে থাকে। নীলমণি মেয়ে সম্পর্কে বোঝে, ‘পেটের ক্ষুধায় এখনও তাহার কান্না আসে, ছেঁড়া কাপড়ে তাহার সর্বাঙ্গ লজ্জায় সংকুচিত হইয়া থাকে; তাহার বুকে ভাষা আছে, মনে আশা আছে, ভব যন্ত্রণা সহ্য করিতে তাহার শক্তির অকুলান হয় না, বরং একটু বাড়তিই হয়।’ এমন বর্ণনার ভেতরে মানিক মাঝে মাঝেই ছড়িয়ে যান তার ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্য; ‘লাঠিটা নীলমণিকে মেয়ের হাতে ছাড়িয়া দিতে হইল; কিন্তু ঘরের বেড়ার অনেকগুলি বাতাই আলগা ছিল।’ এতে নীলমণির মনের অবস্থা হয়, ‘মেয়েকে না মারিয়াও তো মাঝে মাঝে তাহার মরিতে ইচ্ছা করে।’

এর পর সন্ধ্যা-পরবর্তী অন্ধকারে লণ্ঠন জ্বালিয়ে এক সময় নীলমণি সপরিবার সরকারদের প্রতিবেশী বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই দালানের সামনের ঘরখানায় কোনো মতে রাতটুকু কাটিয়ে দিতে পারবে। যাওয়ার পথে মাঝখানে পুকুর, তার পাশের জলস্রোত। সেখানে মেয়ে শ্যামাই সাঁতার না জানা নীলমণির অবলম্বন। আর মনে হয়, ‘যে প্রকৃতির অত্যাচারে ভাঙা ঘরে টিকিতে না পারিয়া তাহাকে আশ্রয়ের খোঁজে পথে নামিয়া আসিতে হইল, সেই প্রকৃতিরই দেওয়া নির্মমতায় হয়তো সরকাররা দরজা খুলিবে না, ঘুমের ভান করিয়া বিছানা আঁকড়াইয়া পড়িয়া থাকিবে। না, নীলমণি আর যুঝিয়া উঠিতে পারিল না। তাহার শক্তি নাই, কিন্তু আক্রমণ চারিদিক হইতে; পেটের ক্ষুধা, দেহের ক্ষুধা, শীত-বর্ষা, রোগ, বিধাতার অনিবার্য বিধান— সে কোন দিক সামলাইবে?’

পাঁচটি প্রাণী সরকারদের দোতলা বাড়ির নিচতলায় পৌঁছে। যে বড় ছেলে দরজা খোলে, তার তির্যক কথায় নীলমণি গুটিয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সে ঘরের খাটে ওই বড় ছেলের পিসেমশাই শুয়ে আছে, তার মতো আত্মীয়কে ফরাশ তুলে শুধু শতরঞ্চিতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে নীলমণির অবজ্ঞাবোধ খানিকটা কমে।

সরকারদের বড় ছেলের কাছে একটি কম্বল চেয়েছিল, দেখিয়ে দিয়েছে ঘরের কোনায় নোংরা চট। তাতে কী, যারা আপনার লোকের সঙ্গে এমন আচরণ করে, তাদের কাছে নীলমণি আর কী আশা করতে পারে। ফলে ‘নীলমণির মেজাজ যেন ম্যাজিকে ঠাণ্ডা হইয়া গিয়াছে। তাহার কণ্ঠস্বর পর্যন্ত মোলায়েম শোনাইল।’

এর পর শ্যামা গন্ধযুক্ত চট বিছায়। নিভা শুকনো কাপড় পরে। কোলের ছেলেটাকে দুধ দেয়। বাইরে ঝড়। ‘ঘরের কোথাও এতটুকু ছিদ্র নাই, কিন্তু বাতাসের কান্না শোনা যায়। চাপা একটানা শাঁ শাঁ শব্দ। তাদের, —নীলমণি আর তার পরিবারকে নাগালের মধ্যে না পাইয়া প্রকৃতি যেন ফুঁসিতেছে।’

এই ঘরের দরজা আর সব জানালা বন্ধ করে দেয়ায় এই সময়ে ঘটনাটি ঘটে। এ গল্প যেন এই জায়গায় প্রথম তার স্বাভাবিকতায় খানিকটা টান দিল, অথবা যে স্বাভাবিক তির্যক ঝকঝকে ভাষিক বর্ণনায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে অবধারিত করে তুলছিলেন, সে জায়গায় একটু সুতো ছাড়লেন। তাতে অবশ্য কাহিনীর চমত্কারিত্বের ‘স্বাভাবিক’ যে ‘চমক’ সাধারণ পাঠক হিসেবে গাথা থাকে, সেখানে কোনো টান নিশ্চিত পড়ে না। কিন্তু নীলমণিসহ বাকিরা দেখল:

বড় ছেলের পিসে চাদর ফেলিয়া চৌকিতে উঠিয়া বসিয়াছে। লণ্ঠনের স্তিমিত আলোয় পিসের মূর্তি দেখিয়া নীলমণি শিহরিয়া উঠিল, একটা শব যেন সহসা বাঁচিয়া উঠিয়াছে। মাথার চুল প্রায় ন্যাড়া করিয়া দেওয়ার মতো ছোট ছোট করিয়া ছাঁটা, চোখ যেন মাথার অর্ধেকটা ভিতরে চলিয়া গিয়াছে, গালের ঢিলা চামড়ার তলে হাড় উঁচু হইয়া আছে। বুকের সবগুলি পাঁজর চোখ বুজিয়া গোনা যায়। বুকের বাঁ পাশে কী ঠিক চামড়ার নিচেই হূিপণ্ডটা ধুঁকপুক করিতেছে।

পিসে নিঃশ্বাসের জন্যে হাঁপাইতেছিল। খানিক পরে ক্ষীণস্বরে বলিল, একটা জানলা খুলে দিন।

নীলমণি সভয়ে বলিল, দে তো শ্যামা, জানালাটা খুলে দে।

শ্যামা আরও বেশি ভয়ে ভয়ে বলিল, ঝড় হচ্ছে যে বাবা!

হোক খুলে দে।

এই দৃশ্য থেকেই যেন নীলমণি বাঁচার আশ্বাস পায়। প্রকৃতি, পরিবার, শারীরিক অক্ষমতা সবকিছুর প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে জেনে গেছে, এই হাঁপানি থেকে তার নিস্তার নেই। এ নিয়ে বাঁচা অসম্ভব। বাঁচতে সে চায় না। ‘নীলমণির গায়ে কাঁটা দিতে লাগিল।’ বাতাস! পৃথিবীতে কত বাতাস! তবুও ফুসফুস ভরাইতে পারে না। অন্নপূর্ণার ভাণ্ডারে সে উপবাসী, পঞ্চাশ মাইল গভীর বায়ুস্তরে ডুবিয়া থাকিয়া ওর দম আটকাইল।’

পিসে তার দুরারোগ্যতার কথা বলে চলে। নীলমণি কিছুই বলে না। দেখে ‘বিনিদ্র আরক্ত চোখ দুটি কেবলই মিটমিট করিয়া চলে।’ এর পরই এই গল্প শেষ হয়। গল্পহীন এক অমর গল্প, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানুষকে দেখার নিষ্করুণ বর্ণনায়। রূপকে যাকে কখনো কখনো একটু কোমল মনে হলেও এই তুলনাও কত রূঢ়। মৃতের আত্মার ভেতর দিয়ে যেন নতুন করে জীবনকে খুঁজে পায়।

তেল কমিয়া আসায় আলোটা দপদপ করিতেছে, এখনই নিবিয়া যাইবে। ছেলেকে বুকে জড়াইয়া হাতকে বালিশ করিয়া নিভা দুর্গন্ধ ছেঁড়া চটে কাত হইয়া শুইয়া পড়িয়াছে। শ্যামা বসিয়া বসিয়া ঝিমাইতেছে।

নীলমণির হুঁকা-কলকি শ্যামা জানালায় নামাইয়া রাখিয়াছিল। আলোটা নিবিয়া যাওয়ার আগে নীলমণি বাকি তামাকটুকু সাজিয়া লইল। তার পর ঠেস দিয়া আরাম করিয়া পিসের শ্বাস টানার মতো শাঁ শাঁ শব্দ করিয়া জলহীন হুঁকায় তামাক টানিতে লাগিল।

নীলমণি বেঁচে গেল। গল্পের নাম ‘আত্মহত্যার অধিকার’, কিন্তু অন্যদিক থেকে যেন তার উল্টোটাও। আত্মহত্যার ভেতরে আত্মজীবন। বেঁচে থাকা। ভাষায় ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার তেজ না থাকলে এই গল্প লেখা যেন সম্ভব নয়, একইভাবে কল্পনাশক্তিতে মানুষকে এত গভীর অতলে প্রায় ডুবুরির মতো গহিনে গিয়ে দেখতে না পেলে, এই কাহিনী ভাবাই অসম্ভব। এ তো অসম্ভব গল্পই। সবদিক থেকে। গল্পের প্রস্তুতকৃত কাঠামোকে এইভাবে অস্বীকার, সেও গল্প-কল্পনার আরেক মাত্রা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন ২৪ ছাড়িয়েছেন!