বাঙালির একালের বহুশ্রুত কৌতুকটি ক্লিশে হয়ে গেছে। তবুও আরেকবার! স্বামী ঈষৎ ক্ষুব্ধ হয়ে স্ত্রীকে বলল, অনেক হয়েছে, আর নয়। আমি ইউরোপেই চলে যাবো। স্ত্রী সম্ভবত বলতে চেয়েছিল, জাহান্নামে যাও। কিন্তু রাগ সামলে তা না বলে বলল, ইউরোপে কেন?
সুন্দরী নারীরা শুনেছি নিজেরাই এগিয়ে এসে তাদের সঙ্গে শয়নের প্রস্তাব দেয় এবং প্রতিবার শয়নের জন্য পুরুষটিকে বাংলাদেশী টাকায় ১ হাজার টাকা করে প্রদান করে।
স্ত্রী বলল, বেশ ওভাবে কামাই করে প্রতি মাসে আমাদের ২০-২৫ হাজার টাকা পাঠানোর কথা ভাবছ নাকি? কিন্তু তোমার ক্ষমতা তো আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না, মাসে ২ হাজার টাকায় ইউরোপে টিকে থাকতে পারবে তো?
কিন্তু ১৩০ বছর আগে যে বাঙালি ইউরোপ গমন করেছেন, তিনি কী বলছেন?
‘(বুলিয়ার নামক ভবনের) দ্বারদেশ পার হইয়া দেখি একটি বিস্তৃতস্থলে অসংখ্য যুবক-যুবতীর হাট বসিয়াছে। তাহার পার্শ্বস্থ গৃহে অনেক ব্যক্তি সুন্দরীর সঙ্গে কফি ভক্ষণে এবং প্রেমোন্মত্তচিত্তে সুধাপানে প্রবৃত্ত আছে।’
যুবতীরা তার মতে স্বেচ্ছাচারিণী এবং রঙরসে উন্মত্ত, বাদ্য বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যুবক-যুবতী হাত ধরাধরি করে বাদ্যের তালে তালে ‘মণ্ডলাকারে ও পদোত্তোলনপূর্বক’ নৃত্যে মেতে উঠল। ঘুরে ঘুরে এবং পা তুলে অবিরাম নেচেই চলেছে। যুবক-যুবতী হাত ধরাধরি করে শ্রান্তি কিছুটা দূর করতেই আবার বাদ্য বেজে ওঠে এবং তারা হাস্যমুখে প্রেমভরে গদ গদ হয়ে নৃত্য চালিয়ে যেতে থাকে।
ঘটনাটি ফ্রান্সের। এই দৃশ্য দেখে বাঙালি পরিব্রাজকের কী মনে হয়েছে, তা তিনি স্পষ্টভাবেই বলেছেন:
‘ফরাশীশ্গণের নীতিশিক্ষা ক্রমেই হ্রাস হইয়া আসিতেছে। বিদ্যালয়ের যুবক ছাত্রবৃন্দ কোথায় নীতিশিক্ষার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিবে, না, অশিক্ষিত ব্যক্তির ন্যায় দূষিত চরিত্রসম্কন্ন হইয়া বৈদেশিকগণের ঘৃণার পাত্র হইতেছে। দুশ্চরিত্রা স্ত্রী লোকের সঙ্গে যথেচ্ছ আমোদ-প্রমোদে যুবকগণের চরিত্র যে কত দূর কলুষিত হইতে পারে, তাহা ভারতবর্ষীয়গণের বুঝিবার শক্তি নাই। ...তাহাদের ধর্মনীতি ক্রমেই সমাজ হইতে তিরোহিত হইতেছে। ইহাদের অধিকাংশ লোক দুমা, বালজাক ও জোলার নবেল পাঠে ব্যগ্র। এ সকল গ্রন্থকারের পুস্তকপাঠে কেবল কুশিক্ষা হইয়া থাকে, সেজন্য সাধারণ ফরাশীশ্গণের মধ্যে ধর্ম্ম ও নীতিজ্ঞানসম্কন্ন প্রকৃত উন্নত চরিত্রের লোক বড় কম।’
আলেকজান্দার দুমা, বালজাক ও এমিল জোলা বাঙালি বুদ্ধিজীবী পাঠকের এমন সমালোচনা জীবদ্দশায় পাঠ করলে হতোদ্যম হতেন, না বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে পাগল আখ্যা দিতেন, এখন আর জানার উপায় নেই।
জোলা, বালজাক ও দুমার উপন্যাস পড়ে যে ফরাসি জাতি কুশিক্ষায় ডুবে রইল, তাদের ভেসে ওঠার আর আশা নেই। তিনি আরো লক্ষ করেছেন, ‘অশ্লীল গ্রন্থ ও অশ্লীল ছবি ফরাশীশ্গণ ক্রয় করিতে বিশেষ তত্পর। দোকানে প্রকাশ্যরূপে উলঙ্গ স্ত্রীমূর্তি বিক্রীত হয়।’
তিনি আফসোস করেছেন, দার্শনিক অগাস্ত কোতের পজিটিভিস্ট দর্শন গ্রন্থ সাধারণ ‘ফরাশীশ্গণ একবার পড়িয়াও দেখেন না।’
উত্তম লেখকদের রচনা পড়ে ‘জর্ম্মন ছাত্রবর্গ প্রায় সকলেই সচ্চরিত্র ও অতি উচ্চভাবে শিক্ষিত। তাঁহারা গম্ভীর প্রকৃতিসম্কন্ন এবং সামাজিক উন্নতির জন্য বিশেষ ব্যগ্র তাহার হিজেল (হেগেল) সুপনারের (সোপেনহোর) গ্রন্থপাঠে মনকে পবিত্র করিয়াছেন, কলুষিত ভাব তাঁহাদিগের চিত্ত হইতে দূরীভূত হইয়াছে।’
এতসব অনাচার দেখার পর পরিব্রাজক প্যারিসের হোটেলে এসে শয়ন করলেন। ‘পরদিবস শুনিলাম ভিকতর হ্যূগোর মৃত্যু হয়েছে।’ এই সূত্র ধরেই বাঙালি পরিব্রাজকের সফরকালটি নির্ণয় করা সহজ হয়েছে। ভিক্টর হুগোর মৃত্যু হয়েছে ২২ মে ১৮৮৫। ইউরোপ সফরনামায় ভিক্টর হুগোকে বাঙালি পরিব্রাজক বলেছেন কবিকুলের শিরোভূষণ, জ্ঞানীর শ্রেষ্ঠ এবং দেশহিতৈষীর অগ্রগণ্য হিসেবে। বাঙালি কবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত তাঁর সম্কর্কে লিখেছেন, ‘অক্ষয় বৃক্ষের রূপে তব নাম রবে।’
পরিব্রাজকের কানে পৌঁছেছে নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে সমাহিত করার সময় যে বিশাল আয়োজন ও ধুমধাম হয়েছে গবর্নমেন্ট ভিক্টর হুগোর জন্য তার চেয়ে বেশি এবং বিশেষ সম্মান দেখাবেন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটি ঘটতে এক সপ্তাহ লেগে যাবে। হুগোমুগ্ধ বাঙালি পরিব্রাজক শেষকৃত্যের সমারোহ দেখতে প্যারিসে আরো এক সপ্তাহ অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু গ্র্যান্ড হোটেলে এক সপ্তাহের ব্যয়নির্বাহের সঙ্গতি না থাকায় তাঁকে অপেক্ষাকৃত সস্তাদরের হোটেল সেন্ট পিটার্সবার্গে সঙ্গোপনে চলে আসতে হলো। এই হোটেলেও ইংরেজ ও আমেরিকানদের ঠাসাঠাসি অবস্থা। হোটেলের ‘মধুর ভাষিণী এবং অতি সত্স্বভাবসম্কন্ন’ তত্ত্বাবধায়ক ভদ্রমহিলা তাকে মোহিত করল।
১ জুন (১৮৮৫) সোমবার মহামহোত্সবের দিনে ১৩ টাকা দামের টিকিট ক্রয় করে বাঙালি পরিব্রাজক ফিউনারেল প্রসেশন পর্যবেক্ষণ করলেন। ভাগ্যিস টিকিট আগেই কিনেছেন, আজ কিনলে ৩০-৪০ টাকা ব্যয় করতে হতো।
স্বল্পবসনা ফরাসি নারীরা বাঙালি পরিব্রাজকের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটাতে না পারলেও প্যারিসের দুই সপ্তাহে আমোদে-প্রমোদে তার কাছে মাত্র দুই দিবস বলিয়া বোধ হইয়াছিল।
হোটেল ত্যাগ করার সময় হোটেলের ভৃত্যদের জন্য তিনি ব্যথিত বোধ করলেন— ‘ইহারা বড় বিশ্বাসী। আমরা হোটেল ঘরের মধ্যে টেবিলের উপর মূল্যবান বস্তু ফেলিয়া রাখিতাম, কেহ তাহা স্পর্শও করিত না।’
ভারত থেকে প্যারিস পর্যন্ত এসেছেন ট্রেনে ও জাহাজে। দেশ পর্যটন ও ব্যবসা-শিক্ষা লাভের জন্য পরিব্রাজক নানা ধরনের বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এপ্রিল (১৮৮৫) মাসের শেষের দিকে কলকাতা থেকে ইউরোপ যাত্রা করেন। ‘স্বদেশ ত্যাগ করিয়া অর্নবপোতে উঠিবার সময় পদদ্বয় কাঁপিতে লাগিল। কোথায় যাইতেছি, কোন দূরদেশে যাইতেছি, কী ঘটিবে, এই চিন্তা আসিয়া মনোরাজ্য আক্রমণ করিল। স্টীমার ছাড়িয়া দিল; আমরা ধীরে ধীরে পুত্তলিকার মত, স্কন্দনহীন জড় পদার্থের মত কেবিনে আসিয়া বসিলাম।’
জাহাজের কেবিনে অন্য একটি শয্যায় তার সঙ্গী একজন ইতালীয় রোমান ক্যাথলিক পুরোহিত— তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে রাতে দুতিনবার উপাসনা করেন এবং বাংলা ভাষায় বেশ বাক্যালাপও করতে পারেন।
তিনি ব্রিন্ডিসি হয়ে ইংল্যান্ড যাওয়ার টিকিট কিনেছেন। মাদ্রাজ থেকে অন্য একটি ছোট স্টিমারে আরোহণ করে সুয়েজের কূলে এসে পৌঁছলেন। সকাল ৯টা এন্থন (এডেন) হতে ট্রেন ছাড়ল, রাত ৯টায় পৌঁছলেন আলেকজান্দ্রিয়া স্টেশনে। আলেকজান্দ্রিয়ার দালালরা তাদের নির্দিষ্ট হোটেলে যাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে চলল। তিনি একটি গাড়িতে ক্যাথলিক পুরোহিতকে নিয়ে চলে এলেন ‘খিদাইভ হোটেলে’। বড় এবং ভালো মানের হোটেল হলেও পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় খাবার পেলেন না। ‘দুগ্ধ ও চা পান করিয়া যামিনী যাপন করিলাম।’
সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলে দেখলেন একদল ভিক্ষুক ইতালীয় গান গেয়ে ও বাজনা বাজিয়ে ভিক্ষা করছে। বিকালে ব্রিন্ডিসির স্টিমার ধরলেন। রাত পেরিয়ে গেল। স্টিমার উত্তাল সমুদ্রের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।
‘প্রভাতে শয্যা হইতে উঠিয়া যে স্নানাগারে প্রবেশ করিব, এমত ক্ষমতা হইল না। সমুদ্রের প্রবল তরঙ্গে মহারঙ্গে পোত টলমল করিতেছে। আমি মাতালের মত টলিতে টলিতে স্নানাগারের কবাটে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খাইয়া কোন প্রকারে মহাকষ্টে প্রস্তরের টবের মধ্যে বসিয়া স্নানকার্য সমাপনপূর্ব্বক কেবিনের শয্যার উপর আসিয়া পড়িলাম। শয্যা ত্যাগ করিয়া উঠিতে আর সাহস হইল না এবং বড় একটা ক্ষমতাও রহিল না।’
ব্রিন্ডিসি পৌঁছলেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৯ অব্দে এখানেই কবি ভার্জিলের মৃত্যু হয়। ব্রিন্ডিসি থেকে ঘণ্টায় ৪৫ মাইল বেগে ছুটতে পারে, এমন দ্রুতগামী ট্রেনে (স্মর্তব্য, ঘটনাটি ১৩১ বছর আগেকার) ইতালি। ইতালি থেকে তিনদিনের পথ প্যারিস, জার্নি বাই ট্রেন।
বাঙালি পরিব্রাজক আফসোস করে বলছেন, ‘আমাদিগের দেশের ন্যায় ইউরোপের রেলগাড়িতে সুখে রাত্রে হস্তপদ বিস্তার করিয়া শয়নপূর্ব্বক নিদ্রা যাইবার সুবিধা নাই। এখানে যাত্রী অনেক হইয়া থাকে সুতরাং বসিয়াই সমস্ত রাত্র নিদ্রা যাইতে হয়। রাত্রে সাড়ে ৩টার দিকে এদেশে চারদিক পরিষ্কার হইয়া যায়। অন্ধকার থাকে না এবং ৫টার সময় প্রভাত, বেশ রৌদ্র দেখা দেয়। প্রভাতের আলোক হইবামাত্র আর নিদ্রা হইল না। কাজেই চক্ষু মুদিয়া জপের অবস্থায় আর অনর্থক বসিয়া থাকা বিড়ম্বনা বোধ করিলাম।’
রেলযাত্রার তৃতীয় দিন ফরাসি পল্লীগ্রামের শোভা দেখতে দেখতে মেঘাচ্ছন্ন ও বৃষ্টিমুখর দিনে পরিব্রাজকের প্যারিস উপস্থিতি।
গ্র্যান্ড হোটেলে ঢুকে কিছুটা ক্লান্তিমোচন করে যখন খাবার ঘরে এলেন, দেখলেন ‘প্রত্যেক ব্যক্তির সম্মুখে টেবিলের উপর এক বোতল করিয়া মদ্য বিনাব্যয়ে প্রদত্ত হইয়া থাকে, কিন্তু আমরা সুধাপ্রয়াসী নহি— কাজেই তাহা পরিত্যাগ করিলাম।’
গ্র্যান্ড হোটেলের পাশেই তু হাম্মামখানায় যাওয়ার বাসনা হলো। দরজায় টোকা দিতে তাকে ভেতরে নিয়ে গেল। একটি বাক্সের মতো কুঠুরিতে প্রবেশ করে কাপড়চোপড় রেখে কেবল একটি নেংটি পরে এক উষ্ণ কক্ষে প্রবেশ করতে হলো, তখন দরদর করে ঘাম ঝরতে শুরু করল। তাকে একটি উঁচু বেদিতে শুইয়ে একজন বলিষ্ঠ পুরুষ সজোরে তার গাত্রমর্দন করতে শুরু করল। অতঃপর একবার উষ্ণ জলের পিচকারি, একবার শীতল জলের পিচকারি দিয়ে শরীর ধোয়ার কাজ সাঙ্গ করল। গোসলের চার্জ দিতে হয় আড়াই টাকা, গোসলের ব্যবস্থা হোটলেও আছে, সেখানে চার্জ দেড় টাকা। যেহেতু বাঙালি পরিব্রাজকের ইউরোপ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসা শেখা, তিনি ভালো করেই হাম্মামের খোঁজখবর নিয়েছেন। প্যারিসের এই তুর্কি হাম্মাম তৈরিতে খরচ পড়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা আর হাম্মাম থেকে প্রতিদিন আয় হচ্ছে ৫০০ টাকা। ফরাসি ধনাঢ্য সমাজের গোসলের প্রিয় জায়গা হাম্মাম। প্রিন্স অব ওয়েলস এবং পারস্যের সম্রাটও এখানে গোসল করে প্রশান্তি লাভ করেছেন।
কিন্তু হাম্মাম ব্যবসা কি ভারতে বিশেষ করে বাংলায় জমবে? হাত-পা ছুঁড়ে সাঁতার কেটে নদীর এপার-ওপার হওয়ার যে আনন্দ, হাম্মাম কি তা দিতে পারবে? এমনকি গোসলের জন্য মাত্র ৪ আনাও যদি ধার্য করা হয় ক’জন বাঙালি খদ্দের সাড়া দেবেন?
তিনি ল্যুভ মিউজিয়াম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। এই প্রকাণ্ড অট্টালিকাটি একসময় রাজপ্রাসাদ ছিল। ‘এক্ষনে ইহাতে পৃথিবীর আশ্চর্য সকল বস্তুসকল সব ধরনের দেখিবার জন্য রক্ষিত হইয়াছে। ইহার মধ্যে কোটি কোটি টাকার বস্তু রহিয়াছে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইউরোপের যেখানে ভালো জিনিস পাইয়াছেন, তাহাই ল্যুভরে যত্নের সহিত রাখিয়া গিয়াছেন। দুর্বৃত্ত কমুনিস্টগণ অগ্নির দ্বারা এই পৃথিবীর আশ্চর্যকীর্তি ধ্বংস করিতে চেষ্টা করিয়াছিল; কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারে নাই। ফরাশীশ্ রাষ্ট্রবিপ্লবকারীগণের উত্কৃষ্ট প্রাসাদসমূহ যাহা নগরের শোভা— তাহাই বিনষ্ট করিবার ইচ্ছা অত্যন্ত প্রবল। সাবেক বাস্টিল, সাবেক হোটেল ডিভিলি ও টিলারিস রাজবাটী, তাহারা একেবারে ধ্বংস করিয়া ফেলিয়াছে।’
এক বৃদ্ধা প্যারিসের সৌন্দর্য নিয়ে বাঙালি ভ্রমণকারীর মতামত জানতে চেয়েছিলেন। ‘আমি তদুত্তরে কহিলাম প্যারিসের ন্যায় সুন্দর স্থান ভূমণ্ডলে আর নাই। এই কথা শুনিয়া তিনি একেবারে আনন্দে করতালি দিয়া ‘‘ভারতবাসীরা চিরজীবী হউন’’ বলিয়া আমাদিগকে আশীর্বাদ করিলেন।’
(২)
বাঙালি ‘অমরাবতী সদৃশ’ প্যারিস ত্যাগ করলেন, ক্যালেডোবার হয়ে সন্ধ্যা ৭টায় লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে পৌঁছলেন। সে আমলে জাত্যভিমানী বাঙালি হিন্দু কালাপানি পার হয়ে বিলেতে পৌঁছলে তার জাত-ধর্ম সমূলে বিনাশ হতো। এ পরিব্রাজক নিজের ধর্মনামা নিয়ে তেমন আতঙ্কিত ছিলেন না। তিনি বাল্যকালে জর্জ বেয়নল্ডসের উপন্যাস পড়ে যে লন্ডনের বর্ণনায় মুগ্ধ হয়েছেন, সেখানে এসে পৌঁছেছেন। (১৮৪৬ সালে প্রকাশিত বেয়নল্ডসের ‘লন্ডনের রহস্য’ গ্রন্থটি এমনিই বেস্টসেলার্স লিস্টে ছিল, ভারতীয় মারাঠি ও উর্দু ভাষাতেও এটি অনূদিত হয়েছে।)
ভিক্টোরিয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে ক্যাব গাড়িতে সেন্ট জর্জ স্ট্রিট পিমলিনো অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছলেন। একটি ভদ্র ইংরেজ পরিবারের পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকবেন। সেই বম্বে থেকে আসা দুজন ভ্রমণকারী ভদ্রলোকও অবস্থান করছিলেন। তাদের সঙ্গে আলাপ করে বাঙালি ভ্রমণকারীর মনে হলো ইউরোপ দেখে দেশে ফিরে গেলে তাদের সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা নেই। বম্বে বাংলার মতো কুসংস্কারচ্ছন্ন নয়। বাংলা এমনই হীন মনের যে, বিলেত ভ্রমণের অপরাধে সুপণ্ডিত বিহারীলাল বসু, রমেশ বাবু, আনন্দমোহন বাবু, সুরেন্দ্রবাবু প্রমুখকে সমাজচ্যুত করেছে।
বিলেতে বসে বাংলার দিকে ফিরে তাকিয়ে পরিব্রাজকের মনে হলো: ‘বাঙ্গালীরা কেবল জাতি মারিতে এবং দলাদলী করিতে বিশেষভাবে দক্ষ। ইহারা কিসে দেশের হিত হয় একবারও ভাবিয়া দেখে না। বাটীতে থাকিয়া মদ্য মাংস খাইবে, কুক্রিয়ার এক শেষ করিবে, তথাপি বাঙ্গালী সমাজ একটি কথাও বলিবে না। কিন্তু যদি কেহ বিদ্যাশিক্ষার জন্য অথবা মানসিক উন্নতি সাধনের জন্য ইউরোপে যায়, তবে আর আমাদিগের দেশের লোক তাহাকে কোনও প্রকারে সমাজ মধ্যে গ্রহণ করিবে না। ইহা অনল্পক্ষোভের বিষয় নহে।’
কয়েক দিন লন্ডন ঘুরে তিনি বেশ বুঝতে পারলেন, ‘পারিশ অপেক্ষা লন্ডন আয়তনে বৃহত্, কিন্তু নগরশোভায় পারিশ দেখিতে এত উত্কৃষ্ট যে, তাহার সঙ্গে লন্ডনের তুলনাই হয় না। এখানে বৃহত্ সৌধশ্রেণী আছে, কিন্তু সেগুলি সমুদয় কয়লার ধূমে একবারে কৃষ্ণবর্ণ হইয়া গিয়াছে। পার্লামেন্ট গৃহ ও ওয়েস্ট মিনস্টার প্রভৃতি অতি সুন্দররূপে নির্ম্মিত, কিন্তু কয়লার ধূমে তাহার বাহ্যশোভা বিনষ্ট হইয়া গিয়াছে।’
লন্ডনের লোক খোশগল্প কি বাজে কথায় সময় কাটায় না। কিসে টাকা হবে, কিসে ব্যবসা জমবে, সে চিন্তায় তারা ব্যতিব্যস্ত।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাদের বলেছেন ‘দোকানদারের জাতি’। খোশগল্প ফরাসি পুরুষদের বড্ড প্রিয়। গৌরকিশোর ঘোষের একটি রম্যরচনায়, ফরাসি মসিয়ে ফুসফুসিয়ে হূষ্টচিত্তে তার বাঙালি অতিথিকে বলছেন: আমরা ফরাসিরা নিজেদের ইউরোপের বাঙালি বলে গর্ববোধ করে থাকি। ইংরেজের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে পরিব্রাজক তার বাঙালি ভ্রাতাদের সম্কর্কে বলেছেন: ‘আমাদিগের দেশে কোন এক কালে কোন লোকের পূর্ব্বপুরুষ রাজা ছিলেন, সেই সূত্রে তিনি আর অহঙ্কারে মাটিতে পা দেন না। ঘরে খাবার নাই, তথাপি সগর্ব্বে পেচকের ন্যায় গম্ভীরভাবে বাটীতে বসিয়া থাকেন, নিজের ভরণপোষণ যাহাতে ভালরূপে চলে, তাহার দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করেন না। এইরূপ মহামূর্খতার জন্যই আমাদিগের দেশের ভদ্রলোকসকল অনর্থক কষ্ট পায়।’
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে আবিষ্কার করলেন ইংরেজরা বড় একটা ‘শেক্সপিয়র, মিলটন, কার্লাইল, ডারউইনের গ্রন্থ’ পাঠ করেন না। বরং ইংরেজ ভদ্রমহিলারা ফরাসি ও ইতালীয় ভাষা উত্তমরূপে লিখে উত্তম গ্রন্থ প্রণয়ন করেন।
ইতর ইংরেজদের মধ্যে অত্যন্ত নীচ ও ভয়ানক শ্রেণীর মানুষও তিনি দেখেছেন, যাদের দ্বিপদ পশুই বরং বলা যায়। ‘ইহাদিগের স্ত্রী-পুরুষ... মদ্যপান করিয়া কলহ করে এবং চিত্কার করত পথিকগণের ভয় উত্পাদন করে। এখানে পথিকগণের নির্ব্বিঘ্নে ভ্রমণ করিবার সাধ্য নাই। হঠাত্ এই শ্রেণীর দুষ্ট বালক-বালিকা, স্ত্রী বা পুরুষ আসিয়া পথিকদিগের মূল্যবান বস্তু অপহরণ করিয়া লয়।’
পুলিশও তাদের শাসন করে না। বাংলাদেশের পুলিশের মতো তারাও দুষ্ট লোকদের অপকর্মের ভাগীদার, এমন কথা তিনি বলেননি। ‘কিন্তু দুঃখ এই যে, আজকাল অনেক ইতর শ্রেণীর সাহেবের উত্পাতে ভারতবাসীগণ বিশেষ মনঃকষ্টে কাল যাপন করিতেছেন। ...আমাদিগের দেশের ইতর লোকেরা শিষ্ট ও ধর্মভীরু কিন্তু ইংলন্ডের ছোটলোকসকল মনুষ্য কি পশু বোঝা কঠিন।’
লন্ডনে এসে তিনি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছেন থিয়েটার দেখে। তখনকার লন্ডনে তিনি হিসাব করে দেখেছেন ৩৫টি থিয়েটার রয়েছে। এর মধ্যে দু-তিনটি বাদে সবগুলোই লোকারণ্য থাকে। নাটক দেখতে তিনি প্রিন্সেস থিয়েটারে গমন করলেন।
‘এই স্থানে মিসেস ল্যাংট্রীর অভিনয় দেখিলাম। আজ এখানে ‘‘পেরিল’’ নামক নাটকের অভিনয় হইল। মিসেস ল্যাংট্রী এই নাট্যে ল্যাডি অরমন্ড প্রধান নায়িকার অভিনয়ক্রিয়া সম্কন্ন করেন। ইনি ইংলন্ডের বিখ্যাত সুন্দরী। বড় লোকেরা ইঁহার সঙ্গে আলাপ করিতে উমেদারী করিয়া থাকেন। কেবল অভিনয়ের জন্য নহে তাঁহাকে একবার দেখিবার লোভে টাকা খরচ করিয়া এই থিয়েটারে আসিয়া থাকে।’
(বাঙালি পরিব্রাজক যে সুন্দরী নায়িকার কথা বলেছেন, তার নাম লিলি ল্যাঙ্গট্রি, তিনি মহারানী ভিক্টোরিয়ার পুত্রের মিস্ট্রেস হয়েছিলেন, বহু শিল্পীর হাতে চিত্রিত হয়েছেন, একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সম্কর্কও ছিল।)
তিনি ব্যাকুল আগ্রহে হেনরি আরভিং ও এলেন টেরির অভিনয় দেখার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল হেনরি আরভিং অভিনীত শেক্সপিয়রের কোনো নাটক দেখবেন, কিন্তু তিনি সে সময় ডিকার ওয়েকফিল্ডের ‘অলিভিয়া’ নাটকের ডক্টর প্রিমরোজ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। এমন জীবন্ত অভিনয় তাকে মুগ্ধ করেছে এবং অলিভিয়ার ভূমিকায় এলেন টেরির অভিনয় দেখে তিনি অশ্রুপাত করতে বাধ্য হয়েছেন।
মাদাম তুশোর মোমের মিউজিয়াম তাকে মুগ্ধ করল পঞ্চম হেনরি, প্রথম এলিজাবেথ, জিওফ্রে চসার, শেক্সপিয়র (শেকসপিয়র), আব্রাহাম লিংকন প্রমুখের মোমের মূর্তি তার কাছে জীবন্ত মানুষের মতোই মনে হয়েছে। ভলতেয়ারের মূর্তিটি মাদাম তুশো নিজ হাতে তৈরি করেছেন। ‘দেখিলে, জীবিত মনুষ্য বলিয়া ভ্রম হয়।’
এরপর চোখের জলে লন্ডনকে বিদায় জানিয়ে প্যারিস হয়ে ইতালিতে এলেন। প্রথমে তুরিন তার পর মিলান, ভেনিস। ভেনিসে মশা ও মৌমাছির উত্পাত।
এরপর রোম। রোম তাকে মোহিত করল। তাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে রোমান নারী। ‘নানা অলঙ্কারে ভূষিতা রোমের সুন্দরীগণকে দেখিলে দেবকন্যা বলিয়া ভ্রম হয়। ইউরোপ মধ্যে ইহাদিগের তুল্য সুন্দরী নাই বলিলেও বলা যায়। সুদীর্ঘ নাসিকা, সুচঞ্চল মৃগ নয়ন, কৃষ্ণবর্ণ ভ্রুযুগল, মুখের বর্ণ ও কান্তি অতি আশ্চর্য্য— দেখিবামাত্র মুখখানি গোলাপ ফুল বলিয়া ভ্রম জন্মে।’
নেপলসের জাতীয় চিত্রশালায় র্যাফায়েল, টিশিয়ান টিনটরেটো, ভ্যান ডাইক প্রমুখের ছবি তার চিত্তে চাঞ্চল্য এনে দিল। অগ্নি-উদ্গীরণের আগ্নেয়গিরি ভিসুভিয়াস না দেখলে বাঙালির ইউরোপ ভ্রমণ অসম্কূর্ণ থেকে যায়। তিনি ভিসুভিয়াস থেকে পম্কেইয়ের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিয়ে পা চালিয়ে যখন রেলস্টেশনে এলেন, দেখলেন সেখানকার ভিক্ষুক বেহালা বাজিয়ে ভিক্ষা করে, অনর্থক বিরক্ত করে পয়সা আদায় করে না।
রাজা রামমোহন রায় কিংবা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো তিনি যদি আর না ফিরতেন, কী এমন ক্ষতি ছিল। কিন্তু জাত-কুল খুইয়ে ভারতের বঙ্গপ্রদেশে ফেরার জন্য তিনি আবার ব্রিন্ডিসি থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে স্টিমারে চড়লেন।
[প্রতাপ চন্দ্র ঘোষ কর্তৃক ৯১ দুর্গা চরণ মিত্র স্ট্রিট কলিকাতা থেকে প্রকাশিত এবং কৃষ্ট চন্দ্র দাস কর্তৃক ওসবর্ন প্রিন্টিং হাউজ, ১১ বেনটিঙ্ক স্ট্রিট থেকে মুদ্রিত ‘বাঙ্গালি ইউরোপ দর্শন’ গ্রন্থটির প্রচ্ছদসহ এটিকে হস্তগত করতে না পারায় বাঙালি পরিব্রাজক লেখকের নাম আমার কাছে অজ্ঞাত রয়ে গেছে, কারো সংগ্রহে গ্রন্থটি থাকলে নিশ্চয়ই অনুগ্রহ করে লেখকের নাম বিভাগীয় সম্পাদককে অবহিত করবেন। গ্রন্থের সফরনামা ১৮৮৫ সালের।]






