সত্যজিৎ রায় ৩০টির বেশি সিনেমা বানিয়েছেন। বাংলা, ভারত এবং বাকি দুনিয়ায় অপু ট্রিলজি বিশেষত তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে। তাঁর অপু ট্রিলজি নিয়মিতভাবে আলোচিত হয়, ডিভিডিতে এখন পর্যন্ত তাঁর অন্য সিনেমাগুলোর চেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে সত্যজিেক তাঁর আজীবন অর্জনের জন্য অস্কার দেয়া হয়। এর পেছনে ভূমিকা ছিল মার্টিন স্করসেস ও পরিচালক ইসমাইল মার্চেন্টের। সেই অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে অদ্রে হেপবার্নের মূল মনোযোগ ছিল পথের পাঁচালীকে নিয়ে। লেখক আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে সত্যজিতের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। ১৯৯১ সালে রায়ের ৭০তম জন্মদিনে ক্লার্ক লিখেছিলেন, ‘কেউ যখন বলেন যে, প্রথম প্রকাশিত গল্পটিই আমার অন্য লেখাগুলোর চেয়ে সেরা, তখন আমি খুব বিচলিত বোধ করি। সত্যজিৎও হয়তো তাঁর প্রথম সৃষ্টি নিয়ে এমনটা অনুভব করেন। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, পথের পাঁচালী এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে হূদয়গ্রাহী সিনেমাগুলোর একটি। অনেক দৃশ্য আমার আর কখনো দেখার প্রয়োজন হবে না। কারণ সেগুলো দেখামাত্রই আমার স্মৃতিতে গেঁথে গেছে।’
ভারতের বাইরে পথের পাঁচালীর খ্যাতি অনেক ধনী ভারতীয়কে (বিশেষত বলিউডের) বহুদিন বিরক্ত করেছে। কারণটা ছিল সিনেমায় দারিদ্র্যের প্রদর্শনী. বোজলে ক্রোথার নিউইয়র্ক টাইমসে যে কুখ্যাত রিভিউ লিখেছিলেন, সেখানে তিনি এ দারিদ্র্যের ওপরই জোর দিয়েছিলেন। আমরা জানি, নেহরুর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সত্যজিতের এই প্রথম কাজটি ১৯৫৬ সালে কান উত্সবে গিয়েছিল এবং বিশ্বসিনেমার মানচিত্রে ভারতীয় সিনেমার নাম প্রতিষ্ঠিত হয়।
২৫ বছর পর ভারতীয় সংসদে পথের পাঁচালীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ পুনরায় উত্থাপিত হয়। অভিযোগ উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য নার্গিস দত্ত, তিনি ১৯৫৭ সালের ব্লকবাস্টার মাদার ইন্ডিয়ার (পথের পাঁচালীর বিরুদ্ধে বলিউডের জবাব) নায়িকা। আকর্ষণীয় নার্গিস ছিলেন তার সময়কার অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা। নার্গিস সংসদে সত্যজিতের বিরুদ্ধে ভারতের ইমেজ নষ্ট করার অভিযোগ করেন। পরবর্তীতে একটি ম্যাগাজিনে দেয়া সাক্ষাত্কারেও তিনি একই অভিযোগ করেছিলেন। বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে সত্যজিৎ যে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়ছিলেন, তারই একটি প্রতীক হয়ে দেখা দিয়েছিল নার্গিসের বক্তব্য—
প্রশ্ন: অপু ট্রিলজিতে রায় কী দেখাতে চেয়েছেন? এবং তাতে আপনার আপত্তি কেন?
নার্গিস: তিনি পশ্চিমবঙ্গের একটি দরিদ্র অঞ্চলকে চিত্রিত করেছেন। এলাকাটি এতটা দরিদ্র যে, তা ভারতের দরিদ্র পরিস্থিতিকেও সঠিকভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। আপনার বাড়ি কোথায়?
প্রশ্নকর্তা: উত্তর প্রদেশ।
নার্গিস: আপনি কি আপনার ৮০ বছর বয়সী দাদিকে মরার জন্য শ্মশানে একাকী ছেড়ে আসবেন?
প্রশ্নকর্তা: না।
নার্গিস: পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এমনটা করে। এবং এটাই সত্যজিৎ তার সিনেমায় তুলে ধরেছেন। এটা ভারতের প্রকৃত চিত্র নয়।
প্রশ্নকর্তা: পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কি এমনটা করে?
নার্গিস: আমি জানি না। কিন্তু বিদেশে গেলে বিদেশীরা প্রশ্ন করেন, ‘ভারতে কি স্কুল আছে?’, তোমাদের দেশে কি গাড়ি আছে? এসব প্রশ্ন শুনে লজ্জায় আমার মাথা নিচু হয়ে যায়। অবস্থাটা এমন যে, কোনো বিদেশী যদি প্রশ্ন করে, তুমি কেমন ধরনের ঘরে বাস কর?’ তখন আমার জবাব দিতে ইচ্ছে করে, ‘গাছের মাথায় বাস করি।’ আপনার কি মনে হয় যে, পথের পাঁচালীর মতো সিনেমা বিদেশে এত জনপ্রিয় হয় কেন?
প্রশ্নকর্তা: আপনি বলুন।
নার্গিস: কারণ বিদেশীরা ভারতকে দুর্দশাগ্রস্ত দেখতে চায়। আমাদের দেশ সম্পর্কে তারা এমন দৃশ্যই কল্পনা করে এবং সিনেমাটি তাদের সেই চিত্রায়ণকে নিশ্চিত করেছে।
প্রশ্নকর্তা: কিন্তু সত্যজিতের মতো একজন বিখ্যাত পরিচালক কেন এমনটা করবেন?
নার্গিস: অ্যাওয়ার্ড জেতার জন্য। তার সিনেমাগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল নয়। সেগুলো কেবল অ্যাওয়ার্ড জেতে।
প্রশ্নকর্তা: মি. রায়ের কাছে আপনি কী প্রত্যাশা করেন?
নার্গিস: আমি চাই মি. রায় যেমন বিদেশে দারিদ্র্যকে তুলে ধরেছেন, তেমন তিনি ‘আধুনিক ভারত’কেও তার সিনেমায় দেখাবেন।
প্রশ্নকর্তা: কিন্তু পথের পাঁচালীর গল্প যদি দরিদ্র গ্রামের জন্য হয়, তাহলে সেখানে আধুনিক ভারত দেখানোর সুযোগ কোথায়?
নার্গিস: মি রায় আধুনিক ভারতের ওপর ভিন্ন সিনেমা নির্মাণ করতে পারেন।
প্রশ্নকর্তা: ‘আধুনিক ভারত’ কী?
নার্গিস: বাঁধ।
প্রশ্নকর্তা: আধুনিক ভারতকে ফুটিয়ে তুলেছে এমন একটি সিনেমার উদাহরণ দিতে পারেন?
নার্গিস: না।
সত্যজিৎ এসব বক্তব্য নিয়ে মাথা ঘামাননি। কিন্তু অনেকেই তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন, যার মধ্যে ছিলেন অভিনেতা ও থিয়েটার পরিচালক উত্পল দত্ত। একদল বিশিষ্ট লেখক এবং নির্মাতা নার্গিস দত্তকে লিখলেন:

‘আপনি যে আধুনিক ভারতের কথা বললেন তা হচ্ছে বাঁধ, বিজ্ঞানী, স্টিল কারখানা, কৃষি সংস্কার। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, বোম্বাইয়ের বাণিজ্যিক সিনেমায় এসব দেখানো হয়? প্রকৃতপক্ষে বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমায় দেখানো হয় গুণ্ডা, চোরাকারবারি, ডাকাত, খুনি, ক্যাবারে ডান্সার, যৌন বিকারগ্রস্ত এবং ধর্ষকদের গল্প। এগুলোকে নিশ্চয়ই আধুনিক ভারতের রূপায়ণ বলা যায় না।’
এ বিতর্কের কিছুদিন পর ১৯৮১ সালে ভারত সরকার শিশুশ্রমের ওপর সত্যজিতের সিনেমা নির্মাণে অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত দেয়। কারণ সংবিধান মতে, ভারতে শিশুশ্রম নেই। এ সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সুচিন্তিত প্রতিবাদ হিসেবে তিনি নির্মাণ করলেন ‘সদ্গতি’। নিচু বর্ণের অসহায় এক কৃষক ও নিষ্ঠুর এক পুরোহিতের গল্প নিয়ে এ সিনেমা। ১৯৯০-এর দশক থেকে ভারতীয় অর্থনীতি দ্রুতগতিতে বিকশিত হতে থাকে, তৈরি হয় বিরাট এক সচ্ছল-আত্মবিশ্বাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এর ফলে সিনেমার মাধ্যমে বিদেশে ভারতের দরিদ্র শ্রমিকদের দেখানোর ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা এক রকম উঠে যায়। ২০০৯ সালের সিনেমা স্লামডগ মিলিয়নেয়ার (নির্মাণ ব্রিটিশদের কিন্তু তৈরি হয়েছে একটি ভারতীয় উপন্যাস অবলম্বনে) বিদেশে প্রচুর দর্শক টেনেছে, একই সঙ্গে অনেকগুলো অস্কারও জিতেছে। ভারতেও সিনেমাটি দারুণভাবে উদযাপন হয়েছে। পথের পাঁচালী নিয়ে যে রকম বিতর্ক হয়েছিল, তার ছিটে-ফোঁটাও দেখা যায়নি স্লামডগ মিলিয়নেয়ার নিয়ে। সত্যজিৎ এবং তার অপুর মতো স্লামডগ মিলিয়নেয়ারের পরিচালক ড্যানি বয়েল বিচক্ষণতার সঙ্গে ‘আধুনিক ভারতের’ প্রেক্ষাপটে তার অর্থলোভী প্রধান চরিত্রটি স্থাপন করেছেন। সঙ্গে ছিল গুণ্ডা, চোরাকারবারি, খুনি, যৌন বিকারগ্রস্ত, বলিউডি নাচ-গান। সিনেমাটি ভারতের ব্যাপারে নেতিবাচক চিত্র দেখিয়েছে এবং এ রকম সিনেমা আরো আছে, কিন্তু তাতে বোম্বাইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব, উর্দু কবি, চিত্রনাট্যকার এবং সফল গীতিকার জাভেদ আখতারের মতামতের প্রতিফলন দেখা যায়। জাভেদ আখতার সত্তরের দশকে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। ২০০৯ সালে কলকাতায় সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতায় তিনি আধুনিক ভারতীয় সিনেমা নিয়ে তাঁর অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন: ‘এসব সিনেমা দেখায় যে আমরা থামতে এবং চিন্তা করতে প্রস্তুত নই। সবাই ছুটছে তাত্ক্ষণিক লাভের জন্য, চারপাশের মানুষের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই। আমরা সিনেমা বানাচ্ছি মাল্টিপ্লেক্সে যাওয়া ক্ষুদ্র, ধনী একটি গোষ্ঠীর কাছে এ লাইফস্টাইল বিক্রি করতে। ছোট শহর বা গ্রামের মানুষ নিয়ে এ মানুষেরা চিন্তা করেন না। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমায় যে দরদ এবং সংবেদনশীলতা দেখা যায়, তা দুঃখজনকভাবে শুধু আমাদের সিনেমা নয়, বরং আমাদের জীবন থেকেও হারিয়ে গেছে।’ সত্যজিতের সিনেমায় খলচরিত্র নেই। এ বিষয়টি উল্লেখ করে আখতার বলেছেন, ‘তাঁর চরিত্রগুলোয় শুধু নেতিবাচক ছায়া থাকে। তারা তাদের নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্বাস নিয়ে নিজেদের মধ্যেই থাকে। কিন্তু হিন্দি সিনেমায় থাকে ভয়ানক সব খলচরিত্র, যারা ঘৃণা উসকে দেয়। আর সত্যজিতের খল চরিত্রগুলোর জন্য আপনি দুঃখ অনুভব করবেন। এমনই ছিল তার সংবেদনশীলতা।’
ঔপন্যাসিক সালমান রুশদী, জাভেদ আখতারের উদ্বেগের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি উদাহরণ দিয়েছেন। সবাই জানেন যে, রুশদী সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময় পরিচয় নিয়ে উচ্ছ্বসিত (উদাহরণ হিসেবে তার ‘মিডনাইট চিলড্রেন’ উপন্যাসটিকে বিবেচনা করা যায়)। রুশদীর জন্ম বোম্বাইয়ে, শুরুতে এ শহরে এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়েছেন, পরবর্তীতে শিক্ষিত হয়েছেন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানে। সত্যজিৎ এবং পথের পাঁচালী নিয়ে ১৯৯০ সালে রুশদী লিখেছেন—
আকিরা কুরোসাওয়া বলেছিলেন, ‘সিনেমাটা দেখার পর আমার মনের উচ্ছ্বাসকে আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।’ সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী নিয়ে এমনটাই বলেছিলেন তিনি। এটা খুবই সত্য যে, সিনেমাটি নির্মাণে তেমন কিছুই ব্যবহার করা হয়নি। অভিনয় করেছেন মূলত অপেশাদার অভিনয় শিল্পীরা। সিনেমাটি নির্মাণ করেছিলেন যে পরিচালক, তিনি তখন মাত্র সিনেমা বানানোর নিয়ম শিখছেন, কারণ তার পথচলাটা একা একা। সিনেমাটি এমন এক গীতিকাব্য আর আবেগের উন্মেষ ঘটায়, যা অনেক মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিকে নাড়া দেয়। আজো রবিশঙ্করের সেই সংগীত অনুভূতির ঢল নামায়, চোখের সামনে অনেক দৃশ্য এসে ভিড় করে। ... সবকিছুর পর সেই অমর দৃশ্য, পুরো দুনিয়ার সিনেমায় এমন ট্র্যাজিক দৃশ্য পাওয়া কঠিন, হরিহর শহর থেকে তার সন্তানদের জন্য উপহার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসে। তখনো সে জানত না যে, তার মেয়ে আর দুনিয়ায় নেই। স্ত্রী সর্বজয়াকে যখন সে তার মেয়ের জন্য আনা শাড়ি দেখায়, তখন সে কাঁদতে থাকে। এবার হরিহর বুঝতে পারে এবং সেও কেঁদে ওঠে। এবার দেখা গেল সত্যজিতের কারিশমা, কান্নার শব্দের পরিবর্তে তিনি শোনালেন তার সানাইয়ের সুর। মনে হলো যেন আত্মারা কাঁদছে।’
একসময় বাংলায় রায় ছিলেন ‘অলিম্পিক উচ্চতায়’। ১৯৫৫ সালে পথের পাঁচালী নিয়ে উন্মাদনা সৃষ্টির পর থেকে রায়ের নতুন সিনেমার মুক্তি ছিল কলকাতার বিশেষ ঘটনা। মুক্তির পর পরই পথের পাঁচালীকে নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি সংবাদ মাধ্যমে রিভিউয়ের স্রোত বয়ে যায়। সাধারণত সত্যজিৎ তার দর্শকদের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রুচিই গ্রিক নাটক, শেক্সপিয়ার, চ্যাপলিন এবং ওয়েস্টার্ন সৃষ্টি করেছে... আমি এমন কোনো একজন পরিচালকের নাম জানি না, যিনি জনপ্রিয় হওয়ায় ভীত হয়েছেন।’
তাঁর সামনে থাকা কঠিন পরিস্থিতি নিয়ে রায় সবসময় সচেতন ছিলেন। তিনি যখন ১৯৫০-এর দশকে কাজ শুরু করেছিলেন, তখন দর্শকরা সিনেমায় জনপ্রিয় বাংলা উপন্যাসের নির্জীব, অসার রূপায়ণ দেখে দেখে অভ্যস্ত। বাংলার সিনেমার প্রচলিত ধারা দর্শকদের চিন্তাশক্তি রহিত করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে এসেও পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। রায় বলেছেন, ‘এখানে অনেক পশ্চাত্পদ, নির্বোধ এবং বাতিল পরিচালক আছে, তাদের কাজ আমার কাজের সঙ্গে থাকবে এটা বিশ্বাস করাটাই কঠিন।’ রায় বিশ্বাস করতেন যে, তিনি দর্শকদের শিক্ষিত করতে পারবেন এবং ধীরে ধীরে তাদের ভালো কাজের প্রশংসা করার সক্ষমতা বাড়ছিল। এ বিশ্বাস এবং বিদেশী দর্শকদের প্রশংসাই শুরুর দিনগুলোয় সত্যজিেক টিকিয়ে রেখেছিল। ১৯৭৪ সালে বলেছিলেন, ‘কীভাবে আপনি সিনেমা বানাচ্ছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আপনার মধ্যে যোগ্যতা থাকলে আজ বা কাল ঠিকই আপনি আপনার নিজস্ব বাজার তৈরি করে নিতে পারবেন। কিন্তু যদি তা করতে না পারেন, তাহলে টিকে থাকতে হলে আপনাকে যা করতে হবে তা হলো সমঝোতা।’
সত্যজিৎ রায়ের শৈল্পিক উত্তরাধিকারের ভবিষ্যৎ কী? ১৯৮৯ সালে তিনি লিখেছিলেন : আমি নিশ্চিত যে, শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে সিনেমার অবসান হলেও চ্যাপলিন বেঁচে থাকবেন। চ্যাপলিন সত্যিকার অর্থেই অমর।’ রায়ের ব্যাপারে কী হবে? তার নামও কি অমর হয়ে থাকবে? আমি বলব, হ্যাঁ। তবে তত দিন থাকবে, যত দিন সিনেমা টিকে থাকবে। যারা সিনেমাকে সিরিয়াসভাবে নেন, নিছক বিনোদনের মাধ্যম মনে করেন না, তাদের মাঝে সত্যজিতের সেরা কাজগুলো চ্যাপলিন, বার্গম্যান, আইজেনস্টাইন, ফেলিনি, ফোর্ড, হিচকক, কুরোসাওয়া, রেনোয়া ও স্করসিসের মতো পরিচালকদের কাজের সঙ্গে টিকে থাকবে।
বিংশ শতকের মহান লেখক, ‘নোবেলজয়ী ভিএস নাইপল সত্যজিৎ (এবং কুরোসাওয়া) সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন যে, তারা আমেরিকানদের মতো সম্পত্তি খোঁজেন না। উনিশ শতকে ঔপন্যাসিকরা যা করতেন, সেটাই তারা তাদের সিনেমায় করেন। তার আধুনিক মাধ্যমে তাদের সমাজ, সংস্কৃতিকে বর্ণনা করছেন। তাদের কাজ পাশাপাশি থাকে, কারণ দুনিয়া সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সাদৃশ্য, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্নভাবে তারা একই কথা বলেছেন।’
কিন্তু একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়: সত্যজিতের সিনেমায় দেখানো সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে একুশ শতকের মানুষ কতটা মাথা ঘামাবে? আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া, আরব, চীন বা জাপানের সংস্কৃতির মতো ভারতীয় সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই বিবেচিত হবে। কিন্তু বাংলার বাইরে ভারতের অন্য অংশগুলোর সঙ্গে সত্যজিতের সিনেমার সম্পর্ক ভালো নয়, বলিউডে তো একেবারে অনুপস্থিত। বাংলার বাইরে খুব অল্প কয়েকজন ভারতীয় পরিচালক সত্যজিতের ঋণ স্বীকার করেন।
সত্যজিৎ বারবার নিজেকে যে বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী বলেছেন সেটা কী? এটা নিশ্চিত হওয়াটা কঠিন। আমেরিকান ও ইউরোপীয় বিশ্লেষকরা রায়ের সিনেমার রিভিউয়ে যে উদাসীনতা দেখিয়েছেন, সেটা চূড়ান্ত অর্থে বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি পশ্চিমাদের অবহেলা। এটা ভাবাবেগময় পথের পাঁচালীর জন্য কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু অপরাজিত এবং বিশেষত অপুর সংসারকে আহত করেছে এবং ১৯৬০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে পরবর্তীকালে নির্মিত সত্যজিতের সিনেমাগুলোর মর্যাদাদানে বাধার সৃষ্টি করেছে।
সোজা কথায় বললে সত্যজিতের সিনেমার চরিত্ররা যত বেশি বাঙালি সংস্কৃতির কথা বলেছে, বিদেশী সমালোচকরা তত বেশি সেগুলোর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়েছে। বাঙালি দর্শকরা জানেন যে, বাংলা একসময় কসমোপলিটন সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত ছিল, সেটা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি কূপমণ্ডুকতা দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এই সংকীর্ণতার কথা সত্যজিৎ অপরাজিততে বলেছেন এবং আগন্তুকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন। কিশোর অপুকে তার প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলার এক কোণে বিচ্ছিন্ন এলাকায় বাস করি বলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও সংকীর্ণ হতে হবে এমন কোন কথা নেই।’ কলকাতায় কলেজের এক বন্ধু অপুকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমার কি কোনো লক্ষ্য নেই? তুমি এখানে কুয়োর ব্যাঙয়ের মতো বসবাস করবে? সুযোগ পেলে কি তুমি বিদেশে যাবে না?’
এখনকার সেরা বাঙালি পরিচালক গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ এবং অপর্ণা সেন সত্যজিতের সিনেমা থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। কিন্তু সত্যি কথা বললে বেশির ভাগ বাঙালি সত্যজিতের কাজ নিয়ে সিরিয়াস নয়। পরিস্থিতি এমনই যে, সত্যজিতের সিনেমা নিয়ে নির্মিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ রেট্রোস্পেক্টিভ নিয়ে কলকাতার কাগজগুলো তেমন কোনো কাভারেজ দেয়নি। এটি ২০০২ সালে লন্ডনের ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটারে প্রদর্শিত হয়েছিল। এ রকম অবহেলা সত্যজিতের ক্যারিয়ারের মধ্যভাগে কল্পনাও করা যেত না।
আমার মনে হয়, অপু ট্রিলজি বাদে সত্যজিতের অন্য কাজগুলো সাংস্কৃতিক ঘূর্ণাবর্তে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ এগুলো স্রষ্টা যে পুর্ব ও পশ্চিমের যে বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন, তার ব্যাপ্তি ও অনন্যতা। কুরোসাওয়ার সিনেমার মতো সেগুলো বিশ্ব সিনেমার মূল স্রোতেও থাকবে না আবার আবদ্ধ বাঙালির জীবনে ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার মতোও টিকে থাকবে না।
। অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব






