আম আঁটির ভেঁপু বইটির অলংকরণের সূত্রেই পথের পাঁচালী উপন্যাসের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের পরিচয়। এর আগে মূল উপন্যাসটি তিনি পড়েননি। শুধু এটা কেন, তখনকার সময়ের নামকরা অনেক বাঙালি সাহিত্যিকের লেখাও পড়েননি বলে দিলীপকুমার গুপ্তের কাছে বকুনি খেয়েছিলেন। ডি. কে. গুপ্ত তাঁর সংগ্রহ থেকে একরাশ বাংলা বই দিয়ে বলেছিলেন ‘এগুলো পড়ো।’ গল্প বা উপন্যাসের ইলাস্ট্রেশন হল লিখিত ঘটনা বা ভাবের চিত্রময় প্রকাশ। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লেখার সময় যেভাবে ভিস্যুয়াল কমিউনিকেশনের দিকে নজর রাখতে হয়, তারই সংক্ষিপ্ত প্রকাশ বইয়ের ইলাস্ট্রেশনে তুলির আঁচড়ে করতে হয়। আম আটির ভেঁপু-র ইলাস্ট্রেশনের সুবাদে তাঁর মনে হল, এ রকম কাহিনিকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ পরিবেশে একটি শিল্পসম্মত ছবি করা যায় যাতে রূপময় বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর পরিপ্রেক্ষিতে পল্লিজীবনের মানুষের আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার পাশাপাশি বেঁচে থাকার ইচ্ছাকেও প্রকাশ করা যাবে। শান্তিনিকেতনে শিল্পশিক্ষার রীতি ও ধরন তাঁকে দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে— কীভাবে একটি বিষয়কে দেখতে হয় ও তাকে প্রকাশ করতে হয়। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু শিখিয়েছেন বস্তুর মধ্যে অন্তর্নিহিত প্রাণছন্দকে অনুভব করে তাকে প্রকাশ করার রীতি প্রকরণ। বিষয়ের স্বাভাবিক উন্মেষ ও প্রকাশের আনন্দরূপ মূর্ত করাই শিল্পীর কর্তব্য ও সাধনা। বিনোদবিহারী শেখালেন বিষয়বস্তুর পারস্পরিক টেনশনের সঙ্গে মিলিয়ে সমগ্র কম্পোজিশনের টেনশনকে প্রকাশ করার কায়দা। শান্তিনিকেতনে শিক্ষালাভের ফলে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন শিল্পে দেশীয় ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অন্তরাত্মাকে প্রকাশের শিল্পভাবনায় ভারতীয়দের গুরুত্ব। সত্যজিৎ রায় স্বীকার করেছেন যে, “আমি জানি না আমার পক্ষে পথের পাঁচালী করা সম্ভব হত কি না যদি না শান্তিনিকেতনে শিক্ষানবিশীর সুযোগ আমার জীবনে ঘটতো। ওইখানেই আমি শিখেছি প্রকৃতিকে কি করে দেখতে হয়, কিভাবে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে হয় এবং কি করে প্রকৃতির অন্তর্নিহিত ছন্দকে অনুভব করতে হয়।” নন্দলাল বসুর সম্পর্কে বলতে গিয়েও তিনি লিখেছেন, “আমার পথের পাঁচালীর ভিস্যুয়ালের মধ্যে যা সাদা কালোর ডায়ানামিক্স ও সামঞ্জস্য রয়েছে সেটা নন্দলালের দান বলে আমি মনে করি।”
চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর অনুরাগ জীবনের একেবারে গোড়ার দিকে আর পাঁচজনের মতোই ছিল নায়ক-নায়িকাভিত্তিক। ক্রমে সেটা হল পরিচালকভিত্তিক। চলচ্চিত্রের বিচার চলে দু’দিক থেকে— ভিতরের বস্তু আর বাইরের রূপ। তিনি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “কাহিনীর গঠন, সৃষ্ট চরিত্রের সমস্যা, তাদের চরিত্ররূপ, পরস্পরের সম্পর্কঘটিত নাট্যগতির রস আর তাদের হূদয়াবেগের প্রকাশভঙ্গি— এ সব হচ্ছে এক শ্রেণীর বিচার্য। কিন্তু ফিল্মের যেটা দৃশ্যরূপ— চোখের সামনে আমরা কি জিনিস দেখছি এবং কোন জিনিস কিভাবে দেখান হচ্ছে তার সমস্যা হচ্ছে চলচ্চিত্রের নিজস্ব সমস্যা। পরিচালক তাঁর ক্যামেরার সাহায্যে কি করেছেন তার উপরেই এই দৃশ্যরূপের নির্ভর।” অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রতি আকর্ষণ কাটিয়ে যখন ভিন্ন ভিন্ন পরিচালকের পৃথক পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রয়োগ-নৈপুণ্যের দিকে নজর এল, তখন থেকে তিনি একজন স্রষ্টার দৃষ্টিতে ছবি দেখতে শিখলেন, সেই সঙ্গে ছবির রসাস্বাদনও গভীর হল। ছবি তৈরি করার কথা তখনও মাথায় আসেনি। চাকরি করে মাকে নিয়ে আলাদাভাবে থাকার ব্যবস্থা করা গেছে। বিয়েটা ছিল জরুরি, কেননা সে সম্পর্কটা অনেক দিনের। তাই এ সব কর্তব্য মুলতবি রেখে সিনেমার পরিচালক হওয়া প্রায় বিলাসী কল্পনা। অফিসের কাজে দক্ষতার জন্য তাঁকে কয়েক মাসের জন্য বিদেশে পাঠানো হল, উদ্দেশ্য সেখানকার অফিসে কাজ করা ও কাজ শেখা। বিদেশে সময়টা ব্যবহার করলেন দু’ভাবে— পেশাগত কাজে আর নিজের শখ মেটাতে। যে জন্য তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে সে কাজে অবহেলা করার মতো মানসিকতা তাঁর নয়। নিষ্ঠাভরে সে কাজ করেছেন, সেই সঙ্গে বাকি সময়ের থেকে কিছুটা উদ্বৃত্ত করে তিনি সস্ত্রীক ছবি দেখেছেন নিয়মিত, প্রায় প্রতিদিনই। ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল, তিনি চাকরির নিরাপত্তার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতারও হদিশ পেলেন। চাকরি হল অনেকটাই অফিসের উপরওয়ালার নির্দেশ মানা ও ক্লায়েন্টের চাহিদা মেটানো। দুটোতেই মৌলিকত্ব বা নিজস্বতা খর্ব হতে বাধ্য। এ জন্য চিন্তার স্বাধীনতা কমে যায়। ব্যক্তিত্ববান মানুষের দ্বন্দ্বটা শুরু হয় এখান থেকেই। যাঁরা কর্মক্ষেত্রে আপসহীন, যাঁদের আত্মসম্মান, মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সেই সঙ্গে আত্মবিশ্বাস আছে, তাঁরা এ অবস্থায় এমন সব সিদ্ধান্ত নেন যেটা সাধারণ মানুষের ছা-পোষা ধারণার মনে হবে প্রায় আত্মহত্যার শামিল বা নির্বোধ অপরিণত বাস্তববুদ্ধির পরিচয়।
বিলেতে থাকাকালীন তাঁর দেখা অসংখ্য ছবির মধ্যে এমন কয়েকটি ছবিও ছিল, সিনেমার সমালোচকদের সংজ্ঞায় যাদের বলা হয় নিও- রিয়েলিস্টিক। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল বাইরের চাকচিক্য একটু বিসর্জন দিয়েও অল্প খরচায় জরুরি, প্রাসঙ্গিক ও নিজস্ব বক্তব্যকে প্রকাশ করা। ভিত্তোরিও ডি সিকার বাইসাইকেল থিভস্ হল এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ছবিটি সত্যজিৎ রায়ের ধারণার ভিত নাড়িয়ে দিল। তা হলে কম পয়সায়ও ছবি করা যায়! অপেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে, স্টুডিওর ভাড়া বাঁচিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রাকৃতিক আলোছায়াতে ছবি করা সম্ভব হলে, নিজস্ব ভাবনাচিন্তাকে রূপায়িত করার জন্য, লাভের কথা চিন্তা না করেও একেবারে আর্থিক ভরাডুবির মতো পরিস্থিতিকে বাঁচিয়ে যদি ছবি তৈরি করা যায় তো মন্দ কী? পথের পাঁচালীর কাহিনি হল সে দিক থেকে একেবারে মনের মতো, যাকে বলা যায় আদর্শস্থানীয়। ব্যস্ আর কী? চুসান নামে জাহাজটিতে করে দেশে ফেরার পথেই পথের পাঁচালীর প্রথম খসড়া তৈরি।
শিল্পকর্মে শিল্পীর ব্যক্তিত্ব ও মৌলিকতার ছাপ রাখার প্রধান শর্ত হল দেশজ ভাবধারা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে নিজস্ব বোধকে অবলম্বন করে প্রকাশ মাধ্যমের রীতি-প্রকরণকে বাছাই করা। সত্যজিৎ রায় তখনকার সময়ের দেশি-বিদেশি ছবির খোঁজ খবর রাখতেন, এবং সে সম্পর্কে তাঁর পড়াশুনাও যথেষ্ট। তিনি বুঝেছিলেন যে শিল্পের অন্য শাখায় ভারতীয় শিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি হলেও এই নবীন শিল্পমাধ্যমটিতে অনেক নতুন কিছু করার সুযোগ আছে। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সংগীত, চিত্রশিল্প, নাট্যকলা ও সাহিত্যে ভারতীয়ত্বের ছাপ সুস্পষ্ট, একমাত্র চলচ্চিত্রে এর বিকাশ অপূর্ণ। তিনি চাইলেন এ ক্ষেত্রে তাঁর শান্তিনিকেতনের শিক্ষার উপর নির্ভরশীল হতে হবে। আনন্দ থেকেই বিশ্বভুবনের উত্পত্তি— যে আনন্দ সমস্ত সুখ-দুঃখ নিয়ে, অথচ সুখ-দুঃখের অতীত। সকল শিল্পকলার মূল লক্ষ্য এই দিকে। কবিতা, চিত্র, গান, নাচের মতো চলচ্চিত্রেও সৃষ্টির মূল আনন্দের ছন্দকে তার আপন ছন্দে প্রকাশ করতে হবে। পরবর্তীকালে পৃথ্বীশ নিয়োগীর সঙ্গে শিল্পবিষয়ে কথোপকথনে দেখতে পাই দেশের ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর টান। গাছ যেমন প্রাণশক্তি পায় মাটিতে পোঁতা শিকড় থেকে, শিল্পেরও শিকড় ছড়িয়ে আছে দেশের মৃত্তিকার গভীরে। তাই প্রথম ছবিতেই তিনি কোনও অতিকথনের মধ্যে না গিয়েও পল্লিজীবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে প্রকাশ করলেন, নিপুণভাবে বাছাই করা কয়েকটি দৃশ্যের মাধ্যমে— পল্লির সন্ধ্যাবেলার রূপ, মাঠজোড়া সীমাহীন আকাশ, দিগন্তবিস্তীর্ণ কাশবন, উজাড় করে দেওয়া বৃষ্টির সৌন্দর্য। এর পাশাপাশি গ্রামের মানুষের ব্যবহারিক ক্ষুদ্রতা, তার পাশে সহানুভূতি, রুক্ষ কর্কশ ব্যবহারের পাশে স্নেহময় মাতৃত্ব, আশার গড়ে ওঠা দিনের পাশে দারিদ্র্যের নিষ্করুণ প্রকাশ, বাঁচার ইচ্ছার পাশে মৃত্যুর হাতছানি। ‘হাসি কান্না হীরা পান্না দোলে ভালে/কাঁপে ছন্দ ভালো মন্দ, তালে তালে/ নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে/ তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ, তাতা থৈ থৈ।’ জীবনের এই ছন্দময় প্রকাশ পথের পাঁচালীর পরও সত্যজিৎ রায়ের অনেক ছবির মূল সুর রচনা করেছে। তিনি এ ছবির জন্য মাধ্যমটির প্রয়োগগত দিককে সমৃদ্ধ করার কথা ভাবলেন পাশ্চাত্য সংগীতের প্যাটার্নকে অবলম্বন করে নয়, ভারতীয় মার্গসংগীতের উপর নির্ভর করে। এইখানেই, এই ছবিতে রবিশঙ্করের স্মরণীয় ও আশ্চর্য অবদান। আমরা আজও পথের পাঁচালীকে মনে রাখি ছবির প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যপ্রকাশের কাব্যময়তা, বিষয় উন্মোচনের সহজ সরল ভাবের জন্য। সেই সঙ্গে নিঃসন্দেহে রবিশঙ্করের বাজনার লৌকিক প্রকৃতির সহজ ও আন্তরিক প্রকাশের জন্য। [পথের পাঁচালীতে শুধু ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রই ব্যবহূত হয়েছিল। সেগুলি হল: সেতার, দিলরুবা, ভীমরাজ, সরোদ, পাখোয়াজ, তার সানাই, বাঁশি, গুপিযন্ত্র, চমং (তারের ঝাঁঝ) আর কাচারি।] এ ছবিতে পল্লিজীবনের দৃশ্যাবলি যেন আমাদের ধরাছোঁয়ার সীমার মধ্যে এসে পড়ে। রূপ ও বর্ণের সঙ্গে যেন মাটির সোঁদা গন্ধও নাকে এসে লাগে। এ সব সম্ভব হয়েছে সুব্রত মিত্রের ক্যামেরা চালনায় ব্যবহারিক দক্ষতার জন্য। ছবি তৈরির ব্যাপারে বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর সত্যজিৎ ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। দুজনেই চিত্রশিল্পী ও প্রয়োগধর্মী শিল্পী। তাই বংশী চন্দ্রগুপ্তের কাজ আর সত্যজিৎ রায়ের ভাবনা মিলেমিশে এক হয়ে বাস্তবতার এক ঘন সংবেদ্য প্রকাশ ঘটিয়েছে এই ছবিতে।
১৯৫৫ সাল। আমরা তখন কিশোর। পথের পাঁচালী ছবিটির সঙ্গে প্রথম পরিচয় দৈর্ঘ্য-প্রস্থে কুড়ি ফুট বাই আট ফুট একটি বিশাল বিজ্ঞাপন, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় বিলবোর্ড, তার মাধ্যমে। ঠিক চৌরঙ্গির চার রাস্তার সঙ্গমস্থানে। ধবধবে সাদা প্রকাণ্ড আকারের বিজ্ঞাপন প্রচারচিত্র, তাতে তুলির টানে ছন্দময় ভাবে লেখা পথের পাঁচালী। শব্দ ক’টি যেন রেখার বাধাকে অতিক্রম করে অনির্দিষ্টের দিকে উড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর বর্ষাকালের কালো বিশাল একখানা মেঘের নীচে প্রাণচঞ্চল দুটি ছেলেমেয়ের ছুটে যাওয়ার আনন্দময় প্রকাশ। সিনেমার বিজ্ঞাপন যে এমন হতে পারে তখন তা ছিল আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে। হিসেবি লোকের সাধারণ চোখে মনে হবে স্পেসের কী অপচয়! পাত্র-পাত্রীর পরিচয় বা অভিনেতা-অভিনেত্রীর ছবি কিছু নেই। থাকবেই বা কী করে? কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অপর্ণাদেবী ও রেবাদেবী চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও খুব জনপ্রিয় নন। চুলিবালার বহুদিন যাবৎ এ জগতের সঙ্গে কোনও যোগসম্পর্ক নেই। করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় গণনাট্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, জনান্তিক ও প্রতিধ্বনি নামে সলিল চৌধুরীর দুটি নাটকে অভিনয়ও করেছেন ১৯৫০ সালে। তবে এঁদের কারওই প্রচারমূল্য এমন নয় যে ছবির বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়বে। যাই হোক, এই ছবিটি যে একটু স্বতন্ত্র ধরনের হবে ওই বিজ্ঞাপন তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ছবির মুক্তির আগে বেশ কিছু দিন ধরে শহরের বিভিন্ন জায়গায় টাঙানো এমন নতুন ধরনের বিজ্ঞাপন আমাদের কল্পনাকে প্রসারিত করতে ও নানা শাখাপ্রশাখায় বিস্তার করতে সাহায্য করেছে। অপু আমাদের খুব প্রিয় চরিত্র। আমরা তখনও তার মতো অবাক হই, বিস্ময় বোধ করি, স্বপ্ন দেখি। আমরা সবাই তখন আশায় বুক বেঁধে ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে মশগুল। ভারতবর্ষ মাত্র কয়েক বছর হল স্বাধীন হয়েছে। যে সময়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে, তখন তার অর্থনীতি প্রায় সম্পূর্ণ গতিহীন। পরিসংখ্যান রায় দেয় যে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দশকগুলিতে ভারতের অর্থনৈতিক গতির চাকা ঘুরছিল উল্টো দিকে। স্বাধীনতার কিছুদিন আগে, ১৯৪৩ সালে, এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের গ্রাসে পড়তে হয় দেশকে। বাংলায় ওই কুখ্যাত পঞ্চাশের মন্বন্তরে প্রায় তিরিশ লাখ লোক প্রাণ হারায়। এর জের কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর দেশ বিভাগ বাঙালির জীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে দেয়। জাতীয় জীবনে এই উপর্যুপরি দুগর্তির ফলে পারিবারিক শৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে যায় দ্রুত। যৌথ পরিবারের বাঁধন ভেঙে নিছক অর্থনৈতিক কারণে শুধুমাত্র টিকে থাকার জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থপরতার মুখগুলি হয়ে ওঠে প্রকট। অখণ্ড বাংলার চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে পড়ার জন্যও বিপুল সংখ্যক হিন্দু বাঙালি এই বাংলায় জড়ো হয় উদ্বাস্তু হিসেবে। তথাকথিত কোমলপ্রাণ, অলসচিত্ত বাঙালি এই বিপর্যয়কে মোকাবিলা করে কীভাবে নিজেদের পুনর্বাসন ও নবজীবন গড়ে তুলেছে সে হল পঞ্চাশের ইতিহাস। বাংলার এই পূর্বকথা হল পথের পাঁচালী ছবিটির প্রেক্ষাপট। দেশের স্বাধীনতা লাভ, যে রকমই হোক না, মানুষের মনের রুদ্ধ আবেগকে অনেকটা মুক্ত করে দেয়। সেই মনের ভাব নিয়েই চারিদিকের হতশ্রী অবস্থার মধ্যেও আমরা ডাক শুনেছি তখনকার সরকারের— পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, পঞ্চশীল নীতি, মুদ্রার দশমিকীকরণ, নানা পদক্ষেপে নতুন ভারত গড়ার আহ্বান। পশ্চিমবঙ্গে দেশভাগজনিত সামাজিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়কে রোধ করার জন্য শিল্পী সাহিত্যিকরা দৃঢ় সংকল্পে স্থির, এক সুস্থ সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় স্বাধীন মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার, যা কিছু জীর্ণ পুরাতন অক্ষম, তা ভেঙে ফেলার। এমন পরিস্থিতিতে পথের পাঁচালীকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি মুক্ত চিত্তে। নিজেদের ভাবনা আশা কল্পনা আর ইচ্ছাকে রূপায়িত করার বাসনায়। নাট্য আন্দোলন এগোচ্ছে জোর কদমে। গ্রুপ থিয়েটারের আন্দোলন তখনও প্রবলভাবে দানা বাঁধেনি। বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন সকলকে চমকিত করেছে আর বহুরূপী দল একের পর এক নতুন নতুন প্রযোজনায় ধারাবাহিকভাবে আমাদের রুচি বদলের কাজ করে যাচ্ছে। কষ্ট করেও ভাঙা মঞ্চে শিশির ভাদুড়ী করে যাচ্ছেন তার শেষ অভিনয়গুলি। অন্য দিকে শিল্পসাহিত্য নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। সাহিত্যপত্রের জোয়ার তখন। চতুরঙ্গ, পরিচয়, কবিতা, পূর্বাশা, উত্তরসূরী, নতুন সাহিত্য, সুন্দরম-এর মতো পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। সব মিলেমিশে সাংস্কৃতিক জগেক মাতিয়ে রেখেছেন শিল্পী সাহিত্যিকেরা। সে তুলনায় একমাত্র চলচ্চিত্রেই তেমন উত্সাহব্যঞ্জক কিছু হচ্ছিল না। যদিও মোটামুটিভাবে বলতে গেলে চল্লিশের দশক থেকে বাংলা ছবিতে কিছুটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাই বিষয়বস্তুতে সমাজচেতনা, তারকাপ্রথা অগ্রাহ্য করে আনকোরা নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে কাজ করায় আর সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রের উপযুক্ত চিত্রনাট্য ও কাহিনি বিন্যাসের ঢং থেকে। তবে সে সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দু’-একটি ছবিতেই। তখনকার দিনে সবচেয়ে সাড়া জাগানো ছবি উদয়ের পথে। দেশাত্মবোধের আবেদন দেখা যায় ভুলি নাই, ৪২-এ। বসু পরিবার, সাড়ে চুয়াত্তর চিত্রোপযোগী গুণে উতরে যাওয়া ছবি। নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল আর একটি সাড়া জাগানো ছবি। এমন কয়েকটি হাতে গোনা ছবির প্রচেষ্টা দেখা গেলেও প্রধান লক্ষ্য ছিল দর্শকের মামুলি প্রথায় মনোরঞ্জনের। বিষয়বস্তুর গভীরতায় এবং চরিত্র ও পরিবেশের ব্যঞ্জনাময় ডিটেলসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রধর্মী প্রকাশের ফলে ছবিও যে স্মরণীয় শিল্পসৃষ্টি হয়ে উঠতে পারে এ-রকম গভীর চিন্তা বা নিষ্ঠাবান প্রচেষ্টা কারও মধ্যে দেখা যায়নি। সে হিসেবে পথের পাঁচালী ভারতীয় চলচ্চিত্রজগতে এক সুস্পষ্ট দিকচিহ্ন। থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের পৌনঃপুনিকতার অবসান ঘটিয়ে এই ছবির আবির্ভাবের পর বাংলা ছবি তার রূপৈশ্বর্য খুঁজে পেল। যে কোনও যুগান্তকারী সৃষ্টির পেছনে এক নির্দিষ্ট বা অনির্দিষ্ট পরম্পরা লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্র যেহেতু বিশ্বজনীন শিল্পমাধ্যম, তাই এর ভাষার বিকাশের পরিক্রমার চিহ্ন পাই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য চিত্রসৃষ্টির প্রচেষ্টায়। গ্রিফিথ, আইজেনস্টাইন, চ্যাপলিন, দোভজোঙ্কো, পুদভকিন, দনস্কয়, অরসন ওয়েল্স, রেনোয়া, ডি সিকার সৃষ্টিতে যে ভাষার বিকাশ, তারই উত্তরসূরি এই পথের পাঁচালী। তবে, এর বৈশিষ্ট্য হল: বিন্যাসে ভারতীয় শিল্পপ্রকরণের ছাপ, যা বিষয়ের সঙ্গে মিলে এক অনাস্বাদিত কাব্যিক অনুভূতির সঞ্চার করে। এমন ছন্দে এমন রূপে পরিচালক তাঁর নিজস্বতার প্রকাশ ঘটালেন, যার মৌলিকত্বে সারা দুনিয়া স্তম্ভিত ও অভিভূত। বিশ্বের মানচিত্রে সকল ভারতীয়ত্ব নিয়ে হাজির হল একটি বাংলা চলচ্চিত্র, চরম আর্থিক দৈন্যদশার মধ্য দিয়ে যেটি তৈরি। কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে মোটেই দীনহীন নয়, বরং অহংকারী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সত্যজিৎ রায় নিজেও সে কথা বলেন, “আমার প্রথম ছবি পথের পাঁচালী যে ভীষণ অন্যরকমের কিছু হবে, তা নিয়ে আলোচনা বিতর্ক হবে তা আমি জানতাম। সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষাতেই ছবিটা করেছিলাম।” পথের পাঁচালী আমাদের আশাকে সীমাহীন করার সাহস জুগিয়েছে, নতুনত্বের প্লাবন এনে দিয়েছে— সেই জোয়ারেই চলে এল এক সঙ্গে একরাশ নতুন ভাবনার পরিচালক। ঋত্বিক ঘটক সমাজ-সচেতনতায় তাঁদের মধ্যে পুরোধা ও বলিষ্ঠ।
১৯৫৫। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মারা যান এ বছর। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিক ও দর্শনমনস্ক বৈজ্ঞানিক। সময় ও আলো সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে তিনি সম্পূর্ণ পালটে দেন। লক্ষণীয়, চলচ্চিত্রেও সময় ও আলোর ব্যবহার করতে হয়, যদিও, ভিন্ন কায়দায়— শৈল্পিক নিয়মে। দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রেসিডেন্সি কলেজের শতবর্ষ পূর্ণ হল। সত্যজিৎও ছিলেন এই কলেজের ছাত্র। দেশের বহু প্রতিভাধর মানুষ শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানে। সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের তাগিদে হিন্দু বিবাহ আইন প্রণয়ন হল পার্লামেন্টে। আর কলকাতায় ৪টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হল পথের পাঁচালী। ২৬ অগাস্ট ১৯৫৫। অনেক দর্শক এমন একটি ছবিকে গ্রহণ করতে অপ্রস্তুত ছিল। সেটা নিতান্তই ছবি সম্পর্কে তাদের ব্যক্তিগত ধারণা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে। আবার অনেকের কাছে এ ছবিটি বিস্ময়কর বোধ হয়েছিল। এও ছবি সম্পর্কে তাদের প্রত্যাশার মাপকাঠিতে ও শিল্প সম্পর্কে সামগ্রিক বোধের ভিত্তিতে। এ ছবি নিয়ে যত লেখা হয়েছে হয়তো আর অন্য কোনও ছবি নিয়ে ততটা হয়নি। দেশে বিদেশে এ ছবি কী রকম হইচই ফেলেছিল তার খবর প্রায় সকলেরই জানা। ষাট বছর পার হয়ে আসার পরও তার আবেদন কি কিছু কমেছে! এতটুকু না। বরং কালজয়ী শিল্প হিসেবে বারবার এ ছবিটিকে দেখার আকাঙ্ক্ষায় কাতর হয়ে ওঠে মানুষ। ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরে পঁচাত্তর বছর পার হয়ে এসেছে। উপন্যাসটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘পথের পাঁচালী আখ্যানটি অত্যন্ত দেশী।... বইখানা দাঁড়িয়ে আছে আপন সত্যের জোরে।’ সত্যজিৎ বইখানিকে ‘বাংলার গ্রামজীবনের বিশ্বকোষ’ বলে মনে করেও তিনি শুধু বিভূতিভূষণের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে ছিলেন না। কেননা তাঁর প্রকাশমাধ্যম ভিন্ন। তিনি তাঁর নিজস্ব উপলব্ধিতে গ্রামীণ জীবনধারার মধ্যে মানবজীবনের সেই চিরন্তন সত্যটিকে চলচ্চিত্রের ভাষায় প্রতিফলিত করলেন। উপন্যাসটির বর্ণনাভঙ্গির ঢিলেঢালা মেজাজের মধ্যে ফুটে ওঠে গ্রামজীবনের নিস্তরঙ্গ মন্থর ছবি। সত্যজিৎ ছবির পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বলে মূল বইয়ের অনেক বাগবিস্তারকে বর্জন করে ঘটনাগুলিকে সাজিয়ে নেন এমনভাবে যাতে ছবির কাহিনিতে একটা নতুন বুনট তৈরি হয়। সত্যজিৎ নিজেই লিখেছেন ‘পথের পাঁচালী উপন্যাসের বারো আনা ঘটনাই ছবিতে ব্যবহার করা সম্ভব হয় নি; সেই সঙ্গে চরিত্রও বাদ পড়েছিল অজস্র। উপন্যাসের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় শ’তিনেক চরিত্র থেকে তিনি বেছে নেন বড় জোর ত্রিশটি চরিত্র। উপন্যাসের কাহিনিতে তথাকথিত কোনও নাটকীয় পরিণতি নেই বলে ছবির ঘটনাবিন্যাসে ভাবের বৈপরীত্য এনে কাঙ্ক্ষিত সংঘাত ফুটিয়ে তোলেন। যাতে গল্পটা এগিয়ে চলার জন্য একটা নির্দিষ্ট গতি পায়। টুকরো টুকরো ঘটনাক্রম সাজিয়ে একটা গল্প বলা গেলেও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য কাহিনির নিস্তেজ ভাব কাটিয়ে এমন কিছু উপাদান আনা চাই যাতে তাদের আগ্রহ অটুট থাকে। তাই, ছবিতে ইন্দির ঠাকরুনকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় অনেকটা সময়।
অন্য দিকে, ছবির জন্য বেছে নেন এমন একটি ভাষা, যে ভাষায় বললে বাংলার গ্রামজীবনের অন্তরাত্মাকে অবিকলভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। নিঃশব্দ গ্রামীণ পরিবেশের রহস্য— যেখানে শুধু শোনা যায় একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, চোখের সামনে মেলে ধরে ভোরের আলোর উজ্জ্বল ভাব, সন্ধ্যাবেলার বিষণ্নতায় ভেসে আসে শাঁখের আওয়াজ, ঘনিয়ে আসে অন্ধকারে পুকুরের জলে গাছের গভীর ছায়া, ধোঁয়ায় ঢাকা কুটিরের চালে গাছের ডালে জমে থাকে কুয়াশার আস্তরণ, বাঁশবনের ফাঁকে ফাঁকে আলোছায়ার ব্যঞ্জনায় রহস্যময় হয়ে ওঠা আঁকাবাঁকা গ্রামের পথ অজানা ঠিকানার দিকে চলে যায়, বর্ষ আসার আগে ধূসর গুমোট ভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে শব্দহীন এক স্থিরতা— এ সব কিছুর অনবদ্য রূপকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন ছবির অবয়বে।
উপন্যাসের বহু ঘটনা বহু চরিত্রকে কাটছাঁট করে নিয়েছেন নিছক ছবির প্রয়োজনে, অথচ সময়ের ব্যবহারে লক্ষ করি এক ছন্দময় নিস্তরঙ্গ ভাব। চিনিবাস ময়রার দৃশ্যটির কথাই ধরা যাক। উপন্যাসের মাত্র কয়েক লাইনের বর্ণনাকে আনেন প্রায় দেড় মিনিট সময় ধরে। পুকুর পাড় দিয়ে বাঁকে করে মণ্ডা-মিঠাই নিয়ে চলেছে সে। তার চলার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেতারে ও গুপিযন্ত্রে বেজে ওঠে ছন্দময় সুর। পেছন পেছন চলে দুর্গা ও অপু। সঙ্গে একটি কুকুর। সমগ্র দৃশ্যটি প্রতিফলিত হয় পুকুরের জলের আয়নায়। বা সমস্ত আকাশ জুড়ে যখন প্রথম বৃষ্টি আছে, সেই আনন্দে পুকুরের জলে জলপোকারা নাচানাচি শুরু করে, পদ্মপাতায় হইচই পড়ে যায়। শালুক, শুকনো ডালে, কলমীলতার পাতায় পাতায় গঙ্গাফড়িংরা উড়ে উড়ে এসে বসে, জলে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়— প্রাণছন্দের স্পর্শে সমগ্র দৃশ্যটি যেন কথা বলে ওঠে। এই দৃশ্যটিরও পর্দায় স্থায়িত্বকাল হল ১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। মন্থর গতির ছবি বলে পথের পাঁচালী সম্পর্কে অপবাদ উঠতে পারে এমন অভিযোগের কথা মাথায় রেখেও এই সব দৃশ্যকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে পরিচালক ছবির বুনটের মধ্যে গেঁথে নেন। তিনি জানতেন ক্যামেরার সচলতার উপর ছবির গতি নির্ভর করে না। বরং ক্যামেরাকে স্থির করে রেখেও মুহূর্তকে গতিশীল করে তোলা যায় যদি দৃশ্যের অন্তর্গত টেনশন পর্যাপ্ত পরিমাণে টানটান থাকে। তবে নজর রাখতে হবে দৃশ্যের স্থায়িত্ব যেন বিন্দুমাত্র সময়ের জন্যও মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়, আর সেসঙ্গে দৃশ্যের শব্দময়তা (তথ্যপূর্ণ সংলাপ বা সংকেতময় সংগীতের সাহায্যে) দর্শকের কানকে যেন সজাগ রাখতে বাধ্য করে। তাই বর্ণিত দৃশ্যগুলিকে আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হলেও ছবির সঙ্গে এরা অত্যন্ত সংলগ্ন হয়ে পড়ে কেননা এই সব রূপময় দৃশ্য নিয়েই, এই সব দৃশ্যের মধ্যেই বাংলার পল্লিগ্রামের অন্তরঙ্গ রূপটি ধরা পড়ে, তাই ছবির পক্ষে নিতান্ত জরুরি একটি আমেজ তৈরি করে। বরং আমাদের ২ মিনিট ৪২ সেকেন্ড ধরে চলা যাত্রা-পালার দৃশ্যটিকে একটু দীর্ঘায়িত মনে হয়।
ছবির সময়ের সঙ্গে কাহিনির সময়কেও তিনি ব্যবহার করেন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে। ছবির প্রথম দৃশ্য থেকেই আমরা জেনে যাই সর্বজয়া অন্তঃসত্ত্বা। এর পর আসে ইন্দিরের খাওয়ার দৃশ্য ও দুর্গার পাশে বসে থাকা, ফল চুরিকে কেন্দ্র করে সর্বজয়ার ইন্দিরকে শাসানো। মায়ের অগ্নিমূর্তি দেখে দুর্গার উঠোন ঝাঁট দেওয়া। গালমন্দে অতিষ্ঠ হয়ে ইন্দিরের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, দুর্গার পীড়াপীড়িতেও বাড়ি না ফিরে বাঁশবনের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। এর পরেই আসে প্রসবের দৃশ্য। হরিহরকে ছবিতে দেখা যায় এই প্রথমবার। পরের দৃশ্যে দাওয়ার এক প্রান্তে ইন্দির ঠাকরুন পা ছড়িয়ে বসে পাঁচ-ছ’মাসের বাচ্চা অপুকে ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে দোলনা দোল খাওয়াচ্ছে, অপর প্রান্তে খেলনা বাক্স নিয়ে দুর্গা আপন মনে খেলছে। অন্য দাওয়ায় সর্বজয়া ও হরিহরের দাম্পত্য জীবনের একটি সুখময় মুহূর্তের ছবি। আমরা জানতে পারি তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা। তার পরই এক লাফে ছ’বছর সময় পার করে অপুর পাঠশালায় যাওয়ার দৃশ্য। সত্যজিৎ লিখেছেন, ‘অপুর পাঠশালায় যাওয়ার দিন থেকে শুরু করে দুর্গার মৃত্যু অবধি এক বছর সময় কল্পনা করে চিত্রনাট্যের ঘটনাগুলিকে ঋতু অনুসারে ভাগ করে ফেলা হয়েছিল।’ এই দৃশ্যটিতে পৌঁছনোর আগের দৃশ্যগুলির মাধ্যমে সত্যজিৎ যেন পরবর্তী ঘটনার জন্য উপযুক্ত একটি পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করে নেন। ছবিতে আসল কাহিনি শুরু হয় এর পর থেকে, তাই এ পর্যন্ত কাহিনির সময় পার হয়ে যায় দ্রুত।
শুধু বছরের হিসেবে নয়, দিনের হিসেবেও সত্যজিৎ ঘটনাকে সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা-রাত্রির দৃশ্যে ভাগ করে নেন। এতে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যের টুকরোগুলোকে জুড়ে দর্শকের মনে গোটা দিনের ছবিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এই সূত্র ধরেই তাঁর ছবিতে আসে খাওয়ার দৃশ্য। যেটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ডিটেল হিসেবে চরিত্রগুলির দৈনন্দিন জীবনযাপনের পুরো চেহারাটাকে ফুটিয়ে তোলে।
দৃশ্য রচনায় বিমুগ্ধ ভাবের পাশাপাশি তিনি জোর দিলেন প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ঘাতপ্রতিঘাতের ওপর। সামাজিক অর্থনৈতিক কারণে একটি পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে গ্রামের মধ্যে, গ্রাম থেকে। আর সে জন্য তারা গ্রামছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কালের অমোঘ নিয়মে মানুষের সৃষ্ট পারিপার্শ্বিকতাই মানুষকে সনাতন জীবনযাত্রার কেন্দ্র থেকে ছিটকে ফেলে অন্যত্র, এ যেন এক অদৃষ্ট নিয়তির খেলা। পুতুল নাচের ইতিকথা মনে পড়ে যায় এই সূত্রে।
ছবির পথের পাঁচালীকে আমি অপুর পাঁচালী বলব না। বরং এ ছবি ইন্দির ঠাকরুনের, সর্বজয়ার, দুর্গার। অপু এখানে দর্শক মাত্র— যে এই জটিল রহস্যময় নিষ্ঠুর জগেক দেখেছে শিশুমন দিয়ে। ছবিতে তার ভূমিকা অনেকটাই গৌণ। তার অবাক করা চোখে সে দেখছে প্রকৃতি, নিসর্গ, রেলগাড়ি, কাশবন আর চেনাশোনা মানুষদের। উপভোগ করে সে মায়ের স্নেহ, বাবার প্রশ্রয় আর দিদির শাসন জড়ানো ভালবাসা। প্রদীপের ম্লান আলোতে পিসির কোলের কাছে শুয়ে সে রূপকথার গল্প শোনে, দিদির সঙ্গে সোনাডাঙার মাঠ আর ধানখেত পেরিয়ে অচেনা জায়গায় বেড়াতে যায়, রেলগাড়ির রহস্য তাকে টানে। টেলিগ্রাফের তারের খুঁটিতে ভেসে আগা রহস্যময় শব্দ শুনে কল্পনায় ভর করে চলে যায় জগতের শেষ সীমায়। যার পর শুরু হয়েছে অজানার দেশ, অসম্ভবের দেশ। সে বিশ্বাস করতে চায় না দিদি পুঁতির মালা চুরি করেছে। দিদির মৃত্যুর পর লুকানো জায়গা থেকে সেটা বের হওয়া মাত্র ছুড়ে পাঠিয়ে দেয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। পুকুরের জলে মালাটাকে বিসর্জন দিয়ে অপুর মনে দিদির স্মৃতির গোপন কক্ষটিকে আড়ালে রাখার কাতরতাই স্পষ্ট হয়। বালক অপু যেন সেই মুহূর্তে বয়স্ক হয়ে ওঠে। তবু সে পথের পাঁচালীর প্রধান চরিত্র না। তবে কে? অনেকে বলবে গ্রাম বাংলা। তাও না। গ্রাম বাংলা শুধুই প্রেক্ষাপট, তার সৌন্দর্য আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে। এই ছবির প্রধান চরিত্র মানুষেরা। একে একে এক-একটি চরিত্র প্রধান হয়ে ওঠে। এক সময় মনে হয় ইন্দির ঠাকরুন এ ছবির অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। এমন একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চরিত্রকে পরিচালক তাঁর ছবির বিন্যাসে একটা বিশেষ গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। অস্তিত্ব নিয়ে সংকট আর আশ্রয়হীনতা ছবির বিষয়ের একটা দিক হিসেবে ভাবা হলে ইন্দির ঠাকরুন তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে’, মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমাণ এই দীন মানুষটি জীবনের শেষ ক’টি দিনের জন্য আশ্রয় চায়। সব খুইয়েও যেন আত্মসম্মানের তলানিটুকু নিয়ে বাঁচতে পারে। তাই সম্বলহীন নিঃসহায় নিরাশ্রয় মানুষটির ঠাঁইয়ের জন্য এত আকুতি।
সত্যজিৎ রায় এই ছবিতে বেশির ভাগটাই বিভূতিভূষণের সংলাপ ব্যবহার করেছেন। বিন্যাসে রদবদল থাকলেও অধিকাংশ ঘটনাকেও সাজিয়েছেন উপন্যাসেরই অনুসরণে। তবে ছবির দৃশ্যকল্পে সমকালীন রূঢ় বাস্তবতার নির্মম রূপকে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব ভাবনায় ও চলচ্চিত্রের নিজস্ব চিত্রভাষায়। বিশেষ করে ইন্দির ঠাকরুনের দৃশ্যগুলিতে। ছবিতে ইন্দিরের বাড়ি ফিরে আসার শেষ দৃশ্যটির কথাই ধরা যাক। কয়েক দিন ধরে ইন্দিরের শরীর ভাল যাচ্ছিল না। রোজই বিকেলে জ্বর আসে। বুঝতে পারে, হয়তো দিন ফুরিয়ে আসছে। জীবনের শেষ ক’টা দিন নিজের ভিটেমাটিতে কাটাবে বলে রাজুর বাড়ি থেকে চলে এসে সর্বজয়ার কাছে আশ্রয় চায়। লাঠিতে ভর দিয়ে বাড়ির দরজা খুলে ঢোকে। দরজার কেঠো কর্কশ আওয়াজটা আর্তনাদে যেন ককিয়ে ওঠে। এ কি তার ভাগ্যের মর্মান্তিক পরিণতির পূর্বাভাস? সর্বজয়া তখন রান্নাঘরে বসে খাচ্ছে। দৃশ্যটিকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলার জন্য পরিচালক বেছে নেন সর্বজয়ার খাওয়ার সময়কে।
ইন্দির: বউ! বউ আছিস?
গাছের ডালে তার চাদরের খুঁট জড়িয়ে যায়।
সর্বজয়া: তুমি কী মনে করে?
একগাল হাসি নিয়ে ইন্দির এগিয়ে আসে। বলে—
শরীরডা তেমন ভালো ঠেকছে না— তাই মনে করলুম শেষ ক’টা দিন এই ভিটেমাটিতে—
সর্বজয়া: তোমাকে আর ভিটের দোহাই দিতে হবে না। ভিটের কথা ভেবে তোমার ত ঘুম নেই। তুমি বিদেয় হও— না হলে আমি অনর্থ করব—
এ কথা শুনে ইন্দিরের শেষ আশাটুকু মিলিয়ে যায়। তবু নিজের দাওয়ার দিকে এগিয়ে আসে। বলে—
দাঁড়া বাপু, দাঁড়া—
দাওয়ায় তার সম্বলটুকু— লাঠি, ঘটি, পুঁটলি আর মাদুর রাখে। ক্লান্ত শরীরে বসে সে হাঁপায়।
সর্বজয়া: বসলে নাকি?
ইন্দির: (হাঁপায়) দাঁড়া বাপু। একটু জিরিয়ে নিই।
(এই নিষ্ঠুর দৃশ্যটির অন্তর্বর্তী সময়ে ক্যামেরা চলে যায় কাশবনের মধ্যে, পিসির দুটি প্রিয় শিশু— অপু-দুর্গার আখ খাওয়ার আনন্দোচ্ছল দৃশ্যে) ইন্দির মুখ মোছে।
দাওয়ায় বসে তখনও হাঁপায়।
সর্বজয়া: ঠাকুরঝি? ঠাকুরঝি, ঘুমুলে নাকি?
ইন্দির: একটু জল দিবি?
সর্বজয়া: গড়িয়ে খাও না। ঘটি আছে ত।
খুব কষ্ট করে ঘটি হাতে ইন্দির দাওয়া থেকে নামে। উঠোন পেরিয়ে এসে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে রান্নাঘরের দাওয়ায় ওঠে সর্বজয়া তাকে লক্ষ করে। তার পর হাত বাড়িয়ে কলসির ঢাকনা খুলে দেয়। সমস্ত পর্দা জুড়ে ইন্দিরের মুখ। মুখে করুণ হাসি। যেন আশ্রয়ভিক্ষার্থীর শেষ প্রার্থনা। সর্বজয়ার গম্ভীর মুখ দেখে সে হাসি আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। ক্যামেরা ইন্দিরের মুখের উপর স্তব্ধ। নেপথ্যে সেতার বেজে ওঠে। ইন্দির কলসি থেকে ঘটিতে জল গড়িয়ে নেয়, খানিকটা খায়, খানিকটা মাথায় দেয়। তার পর নিজের দাওয়ায় ফিরে আসে। ঘটি থেকে বাকি জলটা উঠোনে গাছের গোড়ায় ঢেলে দেয়। তার হাতে পোঁতা গাছটা এখন অনেক বড় হয়েছে। সেটাকে সে লালন করে নিজের তেষ্টার জলের কিছুটা দিয়ে, নিজের জীবনটাকে পারে না। সমস্ত পর্দা জুড়ে মিড ক্লোজ শট ইন্দিরের অসহায় অবস্থার শূন্যতাকে প্রকট করে তোলে। ধীরে ধীরে সে তার জিনিসপত্র তুলতে থাকে। সর্বজয়া খাওয়া বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকে। ইন্দির তার ঘরের দিকে একবার চেয়ে দেখে। সর্বত্র ছন্নছাড়া হতশ্রী চেহারা। দাওয়ায় কুকুরটা এসে আশ্রয় নিয়েছে। শেষবারের মতো ভিটে ছেড়ে ছিন্নমূল মানুষটি শূন্য মনে আশ্রয়হীন অবস্থায় অজানার উদ্দেশে চলে যায়। সেতারে বাজনা ক্রমে মিলিয়ে যায়।
সর্বজয়াও দারিদ্র্যের শিকার। সে ছাড়া আর বাকি তিনটে মুখের অন্ন জোগাতেই সে দিশেহারা। তার কাছে আর একটি মুখের অন্ন জোগানো যেন বাড়তি বোঝা। অবস্থাই তাকে হীনমনা করে তুলেছে। নিষ্ঠুর আচরণ যেন না-খেতে পাওয়ার মতো অবস্থায় পড়ার আশঙ্কার বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তাই ইন্দির ঠাকরুনের স্থান হয় না। মৃত্যুর জন্য তার একটু আশ্রয়ও জোটে না। মরে বাঁশবাগানে লোকচক্ষুর অন্তরালে। স্নেহ মমতা তো দূর অস্ত। (পঞ্চাশের দশকের বাংলার অবস্থা ছিল এমনই) ইন্দির ঠাকরুনের মৃত্যুর বীভত্সতা অপু-দুর্গাকে হতবাক করে। জবুথবু ভাবে বসে থাকার অপ্রাকৃতিক ভাব তাদের ভয় দেখায়। অপুর চোখে তখনও বিস্ময়ের ছোঁয়া। দিদির ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া দেখেই সে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। বালক-বালিকা দুটির কাছে মৃত্যুকে চাক্ষুষ করার প্রথম অভিজ্ঞতা আসে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের ছন্দপতনের মতো। মৃত মানুষটির শরীর যখন জড়বস্তুর মতো শব্দ করে মাটিতে পড়ে যায়, তখন তার শেষ সম্বল ঘটিটি ধাতব শব্দ করতে করতে গড়িয়ে যায় পুকুরের জলে। অপু-দুর্গা দৌড়ে ছুটে আসে জীবনের কাছে মৃত্যু দর্শনের ভয়াবহতাকে নিয়ে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, বাঁশগাছের ঘষটানির মর্মর শব্দ, নেপথ্য বাজনার মৃদু একঘেয়ে আওয়াজ দৃশ্যটিকে আরও মর্মান্তিক করে তোলে।
দুর্গা এ-ছবিতে দাপিয়ে বেড়ায়। তার উপস্থিতি ছবিতে একটা গতি এনে দেয়। তার প্রাণোচ্ছল প্রকৃতি কোনও আবরণ, কোনও সামাজিক বাছ-বিচার, ভালমন্দ মানে না। সে চুরি করে, হ্যাংলামি করে। প্রাণের উচ্ছলতায় সে সব কিছু উপভোগ করতে চায়। ভালো-অবস্থা খারাপ-অবস্থার ভেদাভেদ সে জানে না। মনেও আসে না। সেটা বড়রা করে। তাই সে স্বীকার করে না তাদের দীন-অবস্থাকে। পেড়া খাবার ইচ্ছায় সে ছুটে যায় ভাইকে নিয়ে চিনিবাস কাকার পেছন পেছন। মুখুজ্যে গিন্নি, সেজবউয়ের মুখঝামটা সহ্য করেও সে-বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলে অনায়াসে, হয়তো খাওয়ার লোভে। পুঁতির মালাটা তার এত পছন্দ যে সেটাকে পাওয়ার জন্য চুরি করতেও পেছপা হয় না। এই পুঁতির মালা চুরির সময় দুর্গার মনে আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির সহজ ইচ্ছে যতটা থাকে, পাপের কলুষ ততটা থাকে না। তাই দুর্গার মনে কোনও গ্লানিবোধ স্পষ্ট করে না। বাড়ির লোকের তাকে লেখাপড়া শেখানোর কোনও আগ্রহ নেই বা ভাইয়ের সঙ্গে মায়ের ব্যবহারের পার্থক্য তার মনে কোনও অভিযোগ তোলে না। পিসিকে ছাড়া তার একদণ্ড চলে না, তার জগতে পিসির আশ্রয় নির্দিষ্ট। সে ফল চুরি করে আনে পিসিকে খাওয়ানোর জন্য, বাড়ি থেকে রাগ করে চলে গেলে পিসিকে জোর করে ডেকে আনতে যায়, পিসি বাড়ি ফিরে এলে সে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। বাড়ির সামান্য দুধটুকুরও ভাগ দেয় তার পোষা বেড়ালছানাকে। আচার খাওয়ার সঙ্গী করে ভাইকে, স্কুলে পাঠানোর সময় চুল আঁচড়ে তাকে সাজিয়ে তোলে। পুণ্যিপুকুর ব্রত করে আর বন্ধুদের সঙ্গে চড়ুইভাতি। অপুকে নিয়ে কাশবনে বেড়াতে চলে যায়, রেলগাড়ির শব্দ তার মনকে টানে, যদিও শেষ পর্যন্ত তার আর রেলগাড়ি দেখা হয় না। বৃষ্টিতে ভিজতে ভালবাসে প্রাণভরে। এই দুরন্ত প্রাণবন্ত মেয়েটি পথের পাঁচালী ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র। তার মৃত্যুতে আমরা টের পাই ছবির আগাগোড়া সে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে ছিল। আমরা কি এতক্ষণ তার প্রতি খেয়ালশূন্য ছিলাম? আমাদের নজর কি অপুর দিকে ছিল? হরিহরের আর্তনাদ আর সর্বজয়ার ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আমরা অনুভব করি কাহিনির কতখানি হূদয় জুড়ে ছিল এই কিশোরীটি। তাই তার মৃত্যু ছবির পরিণতির সূচনা করে। এর পর আর যেন কিছু বলার থাকে না। আমাদেরও আকর্ষণও ফুরিয়ে যায়। তার মৃত্যুশোক পরিবারকে গ্রামছাড়া করে।
পথের পাঁচালী ছবিটি নিয়ে গত ষাট বছরের অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে দেশে বিদেশে সর্বত্র। এত সংখ্যক লেখা তাঁর আর কোনও ছবি নিয়ে হয়েছে কি না, অনুমান সাপেক্ষ। সত্যজিৎ রায় পরবর্তীকালে আরও দক্ষতার সঙ্গে ছবি তৈরি করলেও তাঁর নাম যেন আষ্টেপৃষ্ঠে এই ছবির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। এর কারণ হয়তো এই যে, এমন একটা টাটকা তাজা ছবি যা প্রয়োগের সব চিন্তাকে তছনছ করে দিয়ে আমাদের সেই পঞ্চাশের দশকে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো প্রাণমন মাতিয়ে দিয়েছিল।
পথের পাঁচালীর প্রস্তুতিকালীন কষ্টসাধনের কথা প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গেছে। এ ছবির পুরস্কারের তালিকা সবচেয়ে দীর্ঘ এবং এ ছবির থেকে রোজগারের অংশটাও বেশ পুষ্ট। তবে কি একে সত্যজিৎ রায়ের শ্রেষ্ঠ ছবি বলে গণ্য করা হয়? সত্যজিৎ রায় অবশ্য বলেছেন পথের পাঁচালীর কয়েকটি দৃশ্যে ঠিক জায়গায় ক্যামেরা বসানো হয়নি বা উপযুক্ত লেন্স ব্যবহার করা হয়নি বলে কিছু কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে, যেটা শোধরাতে হলে নতুন করে শুটিং করার দরকার হত। ছবিতে বৃষ্টির আগে কালবৈশাখী ঝড়ের দৃশ্য দেখানোর ইচ্ছে ছিল। অনিল চৌধুরী লিখেছেন, ‘ঝড় এসে পড়ল। দুর্গা ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। অপু জানালা দিয়ে বইখাতা ফেলে দিয়ে তার পেছন পেছন ছুটল। এইখানে ঝড়ে আম পড়া অপু-দুর্গার আম কুড়োনোর দৃশ্য থাকার কথা ছিল। আর্থিক অভাবে বছরের ঠিক সময়টা বেছে নিয়ে ঝড়ের দৃশ্য তোলা সম্ভব হয়নি।’ সত্যজিৎ রায়ও পরে আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘ওই রকম বৃষ্টি তো জুলাই-অগাস্ট মাসে পড়ে। তা সেই সময়ে সরকারি দপ্তর ব্যস্ত ছিলেন আমাদের হিসেব পরীক্ষার কাজে। ফলে, পরের কিস্তিটা যখন এল, বর্ষাকাল তখন শেষ হয়ে গেছে।’
অনিল চৌধুরীর লেখায় আরও জেনেছি যে কাশবনের দৃশ্যে সত্যজিৎ রায়ের পরিকল্পনা ছিল খুব ভালো করে দেখানো যে অপু ট্রেন দেখতে পেল, দুর্গা পেল না। ছবিতে ‘কিন্তু দর্শক খুব ভালো করে বুঝতে পারে না যে দুর্গা ট্রেন দেখতে পায়নি। এর জন্য আর একদিন শুটিং করা দরকার ছিল। সেটা আমরা করতে পারিনি। এই ত্রুটিগুলো পথের পাঁচালীতে থকে গেছে, তার মূল কারণ আর্থিক। না হলে সত্যজিত্বাবু যা খুঁতখুঁতে লোক, আর খুঁটিনাটি ব্যাপারের দিকে যতটা মনোযোগ, তাতে আর্থিক সঙ্গতি থাকলে ওই শটগুলো নিশ্চয়ই রিটেক করা হতো।’
একেবারে আনকোরা হাত, তার সঙ্গে চরম আর্থিক টানাটানি, তাই বারবার ভাঁড়ার শূন্য হয়ে যাওয়ার জন্য হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা, আবার টাকার জোগাড় হলে ছবির কাজ শুরু করা, এ রকম পরিস্থিতিতে ছবির মান কিছুটা তো খর্ব হবেই। তবু এ সব সত্ত্বেও পথের পাঁচালী শুধু বাংলা ছবির ক্ষেত্রে নয়, সমগ্র ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা আমাদের আজও মুগ্ধ করে, শতাব্দী জুড়ে আরও অসংখ্য মানুষকে মুগ্ধ করে রাখবে। আশা করি, তখনও ছেলেমেয়েদের মধ্যে চিরকালীন অপুর দেখা মিলবে, যারা অবাক হতে পারে, যারা বিস্ময় বোধ করে, স্বপ্ন যারা দেখে। জ্ঞানের সীমা যাদের কল্পনার জগেক সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে ফেলেনি। শিল্প যেহেতু সৃষ্টি, তাই জীবধর্মী। জীবের মতো তার অস্তিত্বের ধারা প্রবহমান কাল ধরে চলে। চিরায়ত শিল্পের এটাই লক্ষণ।
এই ছবির শেষ দৃশ্যে মুখুজ্যে গিন্নি সেজবউ সর্বজয়াকে বলে, ‘বছরের পর বছর এক জায়গায় গুণ পুঁতে বসে থাকা— এ ভালো না ছোট বউ। এতে মানুষের মন বড় ছোট হয়ে যায়।’ তাঁর শেষ ছবি আগন্তুক-এর শেষ দৃশ্যে মনোমোহন তার তৃতীয় প্রজন্মের বাবলুকে বলে, ‘এইবার ছোট দাদু দেবে ছুট।... এবার তুমি আসবে আমার কাছে, আর কোন জিনিসটা কখনও হবে না, কথা দিয়েছ? কূপমণ্ডুক। মনে থাকে যেন।’
সীমাকে লঙ্ঘন করে বেরিয়ে পড়ার এই ডাকটি শোনা যায় তাঁর প্রায় সব ছবিতেই।






