১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরিতে লাসলো ক্রাসনাহরকাইয়ের জন্ম। পাঁচটি উপন্যাস, বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ ও ছোটগল্পের সংকলন রচনা করেছেন তিনি। অতিসাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত অন্তত ইংরেজিভাষী বিশ্বে তিনি সম্ভবত চলচ্চিত্র পরিচালক বেলা তরের কাজের ভেতর দিয়েই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিন দশক ধরে তার বেশ কয়েকটি উপন্যাসের অভিযোজনসহ কিছু চলচ্চিত্রে তারা একসঙ্গে কাজ করেছেন।

১৯৪৮ সালে হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণকারী ব্রিটিশ কবি জর্জ সিরতেস ক্রাসনাহরকাইয়ের উপন্যাস দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স উপন্যাসের অনুবাদক। ২০১২ সালে তিনি ই-মেইল মারফত এ সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন ক্রাসনাহরকাইয়ের। হাঙ্গেরীয় লেখকের এটাই ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রথম বই।

২০১৫ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী লাসলো ক্রাসনাহরকাইকে এ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন ঔপন্যাসিক মনে করা হয়।

তার গুরুত্ব একটা ঘটনা থেকে আঁচ করা যায়, ২০১২ সালে সিরতেসের আরেকটি অনুবাদ সাতানতাঙ্গোর প্রকাশ উপলক্ষে নিউইয়র্কের হাউজিং ওয়ার্কস বুকস্টোরে লেখক মূল ধারাবিরোধী হিপস্টারদের ঘেরাওয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। ওই সময়ে প্রখ্যাত সমালোচক জেমস উড তার সাক্ষাত্কার নিচ্ছিলেন। ‘ক্রাসনাহরকাইয়ের রচনার উত্তেজনার দিকটা হলো এই যে, তিনি তার নিজস্ব মৌলিক ধরন নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন...’ নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে লিখেছেন ঔপন্যাসিক অ্যাডাম থারওয়েল। ‘সমসাময়িক সাহিত্যে এ রকম আর কিছুই নেই।’

২০১২ সালে নিউইয়র্কারে লিখতে গিয়ে জেমস উড ক্রাসনাহরকাইকে জার্মান ঔপন্যাসিক টোমাস বার্নহার্ড, ফরাসী ঔপন্যাসিক ক্লোদ সিমোঁ ও মার্কিন লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেসের মতো যুদ্ধোত্তর মহান লেখকদের কাতারে স্থান দিয়েছেন। ‘অতিদীর্ঘ, সজীব, বিরতিহীন বাক্যের’ প্রতি অত্যন্ত সাধারণ দুর্বলতা সত্ত্বেও উড তার তুলনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ক্রাসনাহরকাই ‘সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত,’ তার রচনা ‘বিচিত্র... অদ্ভুত ও চমত্কার।’

এ মুহূর্তে ক্রাসনাহরকাইয়ের তিনটি গ্রন্থের অনুবাদক জর্জ সিরতেস তার রচনাকে ‘বর্ণনার শিথিল লাভা স্রোত, হরফের এক বিশাল কৃষ্ণ নদী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বাক্যগুলো নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সেলারের ভেতর ঢোকা আর বেরোনোর মতো’ আপনাকে ‘সর্পিল ও অন্ধকার গলিপথে’ নিয়ে যায়।

২০১৩ সালে নিউ ডিরেকশন লাসলো ক্রাসনাহরকাইয়ের ইংরেজিতে অনূদিত তার সবর্শেষ বই সেইওবো থ্রি বিলো (ওতিল্লা মুলসসেত অনূদিত) প্রকাশ করে। যুক্তরাজ্যের টাস্কার রক এটি বের করেছে।

প্রশ্ন: অনুবাদের সুবিধা, অসুবিধা ও বিপদগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?

লাসলো ক্রাসনাহরকাই: সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে কিছু বলব না আমি। তবে বিপদের প্রশ্নটি নিয়ে কথা বলব, কারণ তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আমার মতে, অনূদিত রচনাকে কিছুতেই কোনো ভিন্ন ভাষার মৌলিক রচনার সঙ্গে মেলানো চলবে না। সেটা এক অসম্ভব বিষয়। অনূদিত রচনা অনুবাদকের কাজ, লেখকের নয়। লেখকের রচনা হলো মূল ভাষায় লেখা গল্পের বুনন। অনূদিত রচনা অনুবাদকের ব্যবহূত ভাষায় একটি নতুন কাজ, যে রচনার রচয়িতা অনুবাদক ও মোটামুটিভাবে মৌলিক রচনার সঙ্গে কোনো পরিবারের সদস্যদের ভেতর মিল থাকার মতোই মিল থাকে। লেখক স্রেফ তাকিয়ে থেকে পড়ে চলেন: তার কাছে টেক্সট চেনা, কখনো কখনো অতিপরিচিত এবং ভালো হলে তিনি খুবই খুশি হন, খারাপ লাগলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আমি এ পর্যন্ত মাত্র একবারই আমার ওয়ার অ্যান্ড ওয়ারের জার্মান তর্জমার কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। বিশ্রী একটা বইয়ে পরিণত হয়েছিল সেটা। মেরামতের অতীত ছিল বলা চলে। নতুন অনুবাদেরও দায়িত্ব তখন কে নিতে যাবে? খুবই কঠিন কাজ হতো সেটা। কিন্তু ওটা বাদে আমার রচনার প্রতিটি অনুবাদই আমাকে বিস্ময়ে ভরে তুলেছে। অসাধারণ সব অনুবাদক রয়েছেন আমার।

 

প্রশ্ন: আপনি বার্লিনে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কেন?

লাসলো: ১৯৮৭ সালের দিকে প্রথমবার এ শহরে লম্বা একটা সময় কাটানোর সময়েই এর সঙ্গে নিবিড় একটা সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম। তখনকার পশ্চিম বার্লিন আহত হূদয়ের আশ্রয় ছিল। সব ধরনের শিল্পী ও শিল্পী হতে চাইত যারা, সবাই কাজ করতে ওখানে হাজির হতো। আমি মহান শিল্পীদের মতো একই রেস্টুরেন্টে, বারে, সত্যি বলতে কি একই টেবিলে বসতে পারছি জানাটা দারুণ ব্যাপার ছিল। পরিবারের সদস্যের মতোই ওদের সঙ্গে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পেরেছি। আজো এ সম্পর্ক টিকে আছে। এখনো আমার বেশির ভাগ সময় এ শহরে কাটলেও আগের মতো আর স্বস্তি বোধ করি না। এ শহরের মূল আবেদন এখন সৃষ্টির বদলে বিক্রি আকাঙ্ক্ষী শিল্পীদের কাছেই বেশি।

প্রশ্ন: আপনার লেখালেখির ধারা কেমন?

লাসলো: আমি ওয়ার্কস্টেশন মানে রাইটিং ডেস্কে বসে লিখি না এবং ধারণা পাওয়ার আশায় ল্যাপটপের দিকে চেয়েও থাকি না, সাহিত্যকে আমার কাজ মনে করে মাথার ভেতর কাজ করি। ব্যক্তিগত কারণগুলোর কথা বাদ দিলে মূল কথা হলো, আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, বেশ কঠিন একটা অবস্থায় ছিলাম। আমার কোনো রাইটিং ডেস্ক ছিল না, কখনো একাকী থাকতে পারিনি। ফলে মাথার ভেতরই বাক্য শুরু করতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, সেসব প্রতিশ্রুতশীল মনে হলে বাক্যের স্বাভাবিক সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত যোগ করে চলতাম। তারপর লিখে ফেলতাম। এমনকি এখনো এভাবেই কাজটা করি আমি, একেবারে বেখাপ্পা জায়গায় এবং বেখাপ্পা সময়ে— অন্য কথায় আমি সারাক্ষণই কাজের ভেতর থাকি। শেষে সবকিছু লিখে রাখি। সবকিছু মাথার ভেতরই সেরে ফেলি বলে স্বাভাবিক কায়দায় শোধরাই না।

 

প্রশ্ন: কাফকার মতো ধ্রুপদী রচনা বাদে আর কী পড়েন আপনি?

লাসলো: কাফকার রচনা না পড়লে কাফকাকে নিয়ে ভাবি। কাফকাকে নিয়ে না ভাবলে তাকে নিয়ে না ভাবার কথা মনে পড়ে। কিছু সময় তার কথা না ভাবার পর সময় বের করে তার লেখা আবার পড়ি। এভাবেই চলে ব্যাপারটা। হোমার, দান্তে, দস্তয়েভস্কি, প্রোস্ত, এজরা পাউন্ড, বেকেট, টোমাস বার্নহার্ড, আতিলা ইয়োসেফ, স্যান্দর উওরেস ও পিলিস্কির বেলায়ও এ কথা।

 

প্রশ্ন: কী কারণে আপনি সাতানতাঙ্গোকে এত সফল মনে করেন? পৃথিবীতে কি কিছু ঘটে গেছে? কিংবা সাহিত্যে, যেটা এর জন্য দুয়ার খুলে দিয়েছে?

লাসলো: আমার মনে হয়, যেসব পাঠক বেলা তার ও আমার চলচ্চিত্র সাতানতাঙ্গোর সঙ্গে পরিচিত এবং দ্য মেলানকোলি অব রেজিস্ট্যান্স, ওয়ার অ্যান্ড ওয়ার ও অ্যানিমেলসাইড পড়েছেন, তারা এটি পড়ারও অপেক্ষায় ছিলেন। মনে হয়, সাতানতাঙ্গোর প্রকাশনার মুহূর্তে বহু পাঠকই আসলে এ ধরনের বই চাইছিলেন। যারা অতি আনুষ্ঠানিক আড়ম্বর ও আনকোরা নতুনের মাঝমাঠ থেকে পালাতে চেয়েছেন, যারা বিনোদনের বাইরে কিছু পেতে চেয়েছেন, যারা জীবন থেকে পালাতে চাননি কিন্তু নতুন করে যাপন করতে চেয়েছেন, তারা মনে করেন তাদেরও একটা জীবন থাকার কথা, তাতে তাদেরও একটা অংশগ্রহণ থাকার কথা, তারা সেসব জানতে চেয়েছেন এবং তাদরে সরল সৌন্দর্যের প্রতিও একধরনের পক্ষপাত রয়েছে; আমার ব্যাখ্যা হলো, আমাদের হাতে মহান কোনো সাহিত্য নেই। কিন্তু পাঠকের তা দরকার, ওষুধ হিসেবে নয়, বিভ্রম হিসেবে নয়, বরং তাদের এমন একজনকে প্রয়োজন, যিনি বলবেন ওষুধের কোনো দরকার নেই।

প্রশ্ন: সবকিছুর মানচিত্র দেয়া আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? সঠিক অবস্থান নির্দিষ্ট করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লাসলো: তার কারণ সবকিছু কোথায় আছে জানাটা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনো কিছু কেবল তার জায়গায়ই থাকতে পারে।

প্রশ্ন: লেখক হিসেবে যেখানে শুরু করেছিলেন, সেই পৃথিবী কতটা— হয়তো ঠিক শুরু নয়, যখন সাতানতাঙ্গো প্রথম প্রকাশ পেয়েছিল— ২০১৩ সালের পৃথিবী তার সঙ্গে কতটা ও কোনদিক থেকে মেলে?

লাসলো: সাদৃশ্যটুকু বিস্ময়কর। সবকিছুই যেন বদলে গেছে বলে মনে হয়, আবার সবই আবশ্যিকভাবে একই রকম রয়ে গেছে। দ্রুত প্রবহমান বুদ্বুদময় একটা তলের কথা ভাবুন, ফেনা পাক খাওয়ার সময় কীভাবে একক বুদ্বুদ ভেঙে গিয়ে খুদে একটা ফোঁটায় পরিণত হয়ে আবার ছোট স্রোত তৈরি করতে ফেনার সঙ্গে এগিয়ে চলে নিজের পথে। আমি ফোঁটাগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে একটার ওপর মনোযোগ স্থির রাখার চেষ্টা করি। অসম্ভব সেটা। কোনো ফোঁটাই নেই। কোনোভাবে কেবল সমগ্রটুকুই আছে, যেটা প্রতি মুহূর্তেই ভিন্ন হয়েও আবার এক। কিন্তু সমগ্রের অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব নেই অংশগুলোরও। তাহলে আছে কী? সারাক্ষণ বদলে চলা এক ধরনের পরিবর্তনহীনতা। বোধের অতীত।